এক চিকিৎসক যা করেছেন, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য! নাইজেরিয়ার এক ডাক্তার ২৩ সপ্তাহে একটি গর্ভের শিশুর শরীর থেকে একটি টিউমার অপসারণ করেন এবং পরে শিশুটিকে আবার গর্ভে ফিরিয়ে দেন। এর পর, ৩৬ সপ্তাহের শেষে, শিশুটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে জন্ম নেন। এই ঘটনা চিকিৎসাবিজ্ঞানের চমকপ্রদ অগ্রগতি এবং মানুষের জীবন রক্ষার ক্ষেত্রে তার অদ্বিতীয় ক্ষমতার প্রমাণ। এমন অসাধারণ চিকিৎসা কখনও কখনও অলৌকিক বলে মনে হতে পারে, কিন্তু এটি আধুনিক মেডিসিনের আশ্চর্যজনক সফলতা।
চিকিৎসাবিজ্ঞান আজ যেখানে পৌঁছেছে, তা কল্পনাকেও হার মানায়। কিন্তু কিছু কিছু ঘটনা এমন থাকে, যা শুধুমাত্র বিজ্ঞানের জয়গান নয়, বরং মানবিক সাহস, দক্ষতা এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অপূর্ব মিলন। এমনই এক অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছিল ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে আমেরিকার টেক্সাসে, যেখানে নাইজেরিয়ার এক চিকিৎসক ডাক্তার ওলুয়িনকা ওলুটয়ে এমন এক অস্ত্রোপচার করেন, যা সারা বিশ্বকে হতবাক করে দেয়। তিনি মাত্র তেইশ সপ্তাহের গর্ভস্থ শিশুকে মায়ের গর্ভ থেকে বের করে এনে তার দেহ থেকে একটি প্রাণঘাতী টিউমার অপসারণ করেন এবং তারপর শিশুটিকে আবার গর্ভে ফিরিয়ে দেন। আর অবাক করার বিষয় হলো, সেই শিশু ছত্রিশ সপ্তাহে সম্পূর্ণ সুস্থভাবে জন্মগ্রহণ করে। এই ঘটনা শুধুমাত্র একটি চিকিৎসা অলৌকিকতা নয়, বরং এটি মানব সভ্যতার চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে।
গল্পটা শুরু হয়েছিল টেক্সাসের বাসিন্দা মার্গারেট বোয়েমারের সাধারণ একটি প্রসবপূর্ব পরীক্ষা থেকে। তিনি তাঁর তৃতীয় গর্ভধারণের ষোল সপ্তাহে আল্ট্রাসাউন্ড করাতে গিয়ে জানতে পারেন যে তাঁর গর্ভের শিশুটির সঙ্গে একটি বিরল এবং অত্যন্ত জটিল সমস্যা রয়েছে। চিকিৎসকরা আল্ট্রাসাউন্ডে দেখতে পান যে শিশুটির কক্সিক্স বা লেজের হাড় থেকে একটি বড় আকারের টিউমার বেড়ে উঠছে। এই বিশেষ ধরনের টিউমারকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় স্যাক্রোকক্সিজিয়াল টেরাটোমা বলা হয়। এটি এমন একটি অস্বাভাবিক অবস্থা যা প্রতি পঁয়ত্রিশ হাজার জন্মের মধ্যে মাত্র একবার দেখা যায়। এই টিউমার জন্মের আগেই শিশুর দেহে বিকশিত হতে শুরু করে এবং যদি সময়মতো চিকিৎসা না করা হয়, তাহলে এটি শিশুর জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
মার্গারেট বোয়েমার যখন প্রথম এই খবর পান, তখন তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েন। তিনি একজন মা হিসেবে ইতিমধ্যেই যমজ সন্তানের একজনকে হারিয়েছিলেন এবং তাঁর জন্য আরেকটি সুস্থ সন্তান পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছিল অপরিসীম। কিন্তু চিকিৎসকদের মতামত শুনে তাঁর হৃদয় ভেঙে যায়। একের পর এক হাসপাতালে গিয়ে তিনি একই ধরনের পরামর্শ পেতে থাকেন। বেশিরভাগ চিকিৎসক তাঁকে গর্ভপাত করানোর পরামর্শ দেন কারণ তাঁরা মনে করতেন যে এই অবস্থায় শিশুটির বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। টিউমারটি শিশুর হৃদযন্ত্রের উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছিল কারণ হৃদযন্ত্রকে কেবলমাত্র শিশুর দেহেই নয়, বরং সেই বিশাল টিউমারেও রক্ত সরবরাহ করতে হচ্ছিল। এতে হৃদযন্ত্র ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছিল এবং কার্ডিয়াক ফেইলিয়ারের ঝুঁকি বাড়ছিল।
কিন্তু মার্গারেট হাল ছাড়তে রাজি ছিলেন না। তিনি বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরতে থাকেন এবং অবশেষে তাঁর পথ গিয়ে পৌঁছায় টেক্সাস চিলড্রেনস হাসপাতালের ফেটাল সেন্টারে। এখানেই তাঁর জীবনে আশার আলো জ্বলে ওঠে। এই কেন্দ্রের সহ-পরিচালক ডাক্তার ডারেল ক্যাস এবং ডাক্তার ওলুয়িনকা ওলুটয়ে মার্গারেটের কেস পরীক্ষা করে দেখেন এবং তাঁদের দুজনের মধ্যে একটি সাহসী সিদ্ধান্ত জন্ম নেয়। তাঁরা জানতেন যে এই ধরনের অস্ত্রোপচার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিশ্বে খুব কম সংখ্যক চিকিৎসক এই ধরনের ফেটাল সার্জারি করার সাহস ও দক্ষতা রাখেন। কিন্তু ডাক্তার ওলুটয়ে এবং তাঁর দল এর আগেও এই ধরনের জটিল অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন করেছিলেন। তাঁরা মার্গারেটকে বলেন যে তাঁর শিশুর বেঁচে থাকার একটা সুযোগ আছে, তবে তার জন্য দরকার একটি অত্যন্ত জটিল এবং সাহসী অপারেশন।
ডাক্তার ওলুয়িনকা ওলুটয়ে কোনো সাধারণ চিকিৎসক নন। তাঁর জীবনযাত্রা এবং পেশাগত পথচলা নিজেই এক অনুপ্রেরণার গল্প। তিনি ১৯৬৭ সালের ১৫ জানুয়ারি নাইজেরিয়ার লাগোস শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মেজর জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত ওলুফেমি ওলুটয়ে ছিলেন একজন খ্যাতিমান সামরিক কর্মকর্তা এবং তাঁর মা প্রফেসর ওমোটায়ো ওলুটয়ে ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ। এমন একটি শিক্ষিত এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ পরিবারে বেড়ে ওঠা ওলুটয়ে ছোটবেলা থেকেই চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। তিনি তাঁর শৈশবকে অত্যন্ত সুন্দর এবং অনুপ্রেরণাদায়ক বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, তিনি কখনোই চিকিৎসক ছাড়া অন্য কিছু হতে চাননি। তাঁর লক্ষ্য ছিল মানুষের দেহের সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সেগুলি সমাধান করা।
উচ্চ বিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে ওলুটয়ে নাইজেরিয়ার ওবাফেমি আওলোও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলে-ইফে ক্যাম্পাসে ছয় বছরের চিকিৎসা কোর্সে ভর্তি হন। ১৯৮৮ সালে তিনি ব্যাচেলর অফ মেডিসিন এবং ব্যাচেলর অফ সার্জারি ডিগ্রি নিয়ে তাঁর ক্লাসের প্রথম স্থান অধিকারী হিসেবে স্নাতক হন। তিনি বলেছিলেন যে তিনি সার্জারি বেছে নিয়েছিলেন কারণ তিনি দেহের সমস্যা চিহ্নিত করতে এবং তা ঠিক করতে পছন্দ করতেন। পাশাপাশি তিনি ভ্রূণবিদ্যায় বিশেষ আগ্রহী ছিলেন, তাই শিশু চিকিৎসা তাঁর জন্য একটি স্বাভাবিক পছন্দ ছিল।
কিন্তু ওলুটয়ে বুঝতে পেরেছিলেন যে যদি তিনি নাইজেরিয়াতে থাকেন, তাহলে তিনি সর্বশেষ চিকিৎসা প্রযুক্তি এবং উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন না। তাই তিনি আরও উন্নত শিক্ষার সন্ধানে আমেরিকা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে এই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। আমেরিকায় পৌঁছে তিনি দেখেন যে তাঁর বিদেশি ডিগ্রি তাঁর পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক হাসপাতাল তাঁর যোগ্যতা স্বীকার করতে চায়নি। কিন্তু হাল না ছেড়ে তিনি হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে একটি পেডিয়াট্রিক ইন্টার্নশিপ গ্রহণ করেন। সেখানকার দল তাঁর উচ্চাভিলাষকে সমর্থন করে এবং তাঁকে ন্যাশনাল রেসিডেন্ট ম্যাচিং প্রোগ্রামে আবেদন করতে সাহায্য করে। এর ফলে তিনি ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটির স্কুল অফ মেডিসিনে একটি সাক্ষাৎকারের সুযোগ পান।
১৯৯৬ সালে ওলুটয়ে ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি থেকে অ্যানাটমিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি মেডিকাল কলেজ অফ ভার্জিনিয়া হাসপাতালে জেনারেল সার্জারিতে তাঁর রেসিডেন্সি সম্পন্ন করেন। তিনি ফিলাডেলফিয়ার চিলড্রেনস হাসপাতাল এবং ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়া স্কুল অফ মেডিসিনে পেডিয়াট্রিক সার্জারিতে তাঁর ফেলোশিপ করেন। এইভাবে দীর্ঘ এবং কঠোর প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে তিনি একজন বিশেষজ্ঞ পেডিয়াট্রিক এবং ফেটাল সার্জন হয়ে ওঠেন। তিনি বেইলর কলেজ অফ মেডিসিনে একটি ফ্যাকাল্টি পদ গ্রহণ করেন এবং তাঁর সহকর্মী ডাক্তার ডারেল ক্যাসের সঙ্গে মিলে হিউস্টনের টেক্সাস চিলড্রেনস হাসপাতালে টেক্সাস চিলড্রেনস ফেটাল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন।
এবার ফিরে আসি ২০১৬ সালের সেই ঐতিহাসিক অস্ত্রোপচারের গল্পে। মার্গারেট বোয়েমার যখন তেইশ সপ্তাহ এবং পাঁচ দিনের গর্ভবতী ছিলেন, তখন অপারেশনের পরিকল্পনা করা হয়। এটি ছিল একটি অত্যন্ত জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিকল্পনা কারণ এই পর্যায়ে শিশুটি এখনো অত্যন্ত অপরিণত এবং দুর্বল। কিন্তু অপেক্ষা করাও সম্ভব ছিল না কারণ টিউমারটি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছিল এবং শিশুর হৃদযন্ত্র ক্রমশ ব্যর্থ হয়ে পড়ছিল। ডাক্তার ওলুটয়ে এবং ডাক্তার ক্যাস একসাথে একুশজন ডাক্তার এবং চিকিৎসা বিশেষজ্ঞের একটি দল গঠন করেন। এই দলে ছিলেন ফেটাল সার্জন, পেডিয়াট্রিক সার্জন, অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট, নিওনাটোলজিস্ট, মাতৃত্ব-ফেটাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং আরও অনেকে। সবাই মিলে একটি বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরি করেন।
অপারেশনের দিন এসে পৌঁছায় এবং সকাল থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয়। প্রথমে মার্গারেট এবং তাঁর গর্ভের শিশু উভয়কেই সাধারণ অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়া হয়। তারপর ডাক্তাররা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মার্গারেটের জরায়ু খোলেন। তারপর শিশুটিকে আংশিকভাবে জরায়ু থেকে বের করে আনা হয় যাতে টিউমারটি অপসারণ করা যায়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত নাজুক কারণ শিশুটি এখনো অ্যাম্নিয়োটিক তরলে ডুবে ছিল এবং তার জীবন সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছিল মায়ের প্লাসেন্টার সঙ্গে সংযুক্ত আম্বিলিক্যাল কর্ডের উপর। শিশুটিকে প্রায় কুড়ি মিনিটের জন্য জরায়ুর বাইরে রাখা হয় যখন ডাক্তাররা তার লেজের হাড় থেকে বিশাল টিউমারটি অপসারণ করেন। টিউমারটি এতটাই বড় ছিল যে এটি শিশুর নিজের আকারের প্রায় সমান ছিল। ডাক্তাররা যতটা সম্ভব টিউমার অপসারণ করেন এবং তারপর শিশুটিকে সাবধানে আবার জরায়ুতে ফিরিয়ে দেন। জরায়ু বন্ধ করা হয় এবং মার্গারেটকে পুনরুদ্ধারের জন্য প্রস্তুত করা হয়। পুরো অপারেশনটি পাঁচ ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিল এবং প্রতিটি মুহূর্তে চিকিৎসক দল তাঁদের সর্বোচ্চ দক্ষতা এবং মনোযোগ দিয়ে কাজ করেছিলেন।
অস্ত্রোপচারের পরের সপ্তাহগুলো ছিল উদ্বেগ এবং অপেক্ষার সময়। মার্গারেটকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হয় এবং তাঁর গর্ভের শিশুটির বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হতে থাকে। চিকিৎসকরা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন যে অপারেশনের কারণে কোনো জটিলতা সৃষ্টি হয়নি এবং শিশুটি স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠছে। এবং আশ্চর্যজনকভাবে, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চলছিল। শিশুটি জরায়ুর ভেতরে বেড়ে উঠতে থাকে এবং তার হৃদযন্ত্র এখন স্বাভাবিকভাবে কাজ করছিল কারণ সেই বিশাল টিউমারের বোঝা আর ছিল না। ছত্রিশ সপ্তাহে, মার্গারেট সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে একটি সুন্দর কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। শিশুটির নাম রাখা হয় লিনলি হোপ বোয়েমার এবং তার ওজন ছিল প্রায় দুই দশমিক চার কিলোগ্রাম।
তবে লিনলির যাত্রা এখানেই শেষ হয়নি। জন্মের পর ডাক্তাররা লক্ষ্য করেন যে টিউমারের একটি ছোট অংশ যা অপারেশনের সময় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি, তা আবার বাড়তে শুরু করেছে। তাই লিনলি যখন মাত্র আট দিনের ছিল, তখন তাকে আবার অপারেশন করতে হয়। এবারের অপারেশনে ডাক্তাররা টিউমারের বাকি সমস্ত অংশ সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করতে সক্ষম হন। এরপর থেকে লিনলি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে এবং আজ সে একটি স্বাভাবিক, সুস্থ শিশু হিসেবে বড় হচ্ছে। তার মা মার্গারেট প্রায়ই বলেন যে লিনলি হলো এমন একটি শিশু যে দুবার জন্মেছে, একবার অপারেশনের সময় এবং দ্বিতীয়বার স্বাভাবিক প্রসবের সময়।
এই অসাধারণ অস্ত্রোপচার ডাক্তার ওলুটয়েকে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি এনে দেয়। তিনি শুধুমাত্র একজন দক্ষ চিকিৎসক নন, বরং তিনি একজন অগ্রগামী যিনি ফেটাল সার্জারির ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। এই সার্জারির সাফল্য প্রমাণ করে যে অত্যন্ত জটিল জন্মগত ত্রুটি যা একসময় অসাধ্য বলে মনে করা হতো, তাও এখন চিকিৎসা করা সম্ভব। ডাক্তার ওলুটয়ের এই কাজ অগণিত পরিবারের জন্য আশার আলো হয়ে উঠেছে যারা একইরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়।
ডাক্তার ওলুটয়ের সাফল্যের পর তাঁর পেশাগত জীবন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ২০১৯ সালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেশনওয়াইড চিলড্রেনস হাসপাতালের সার্জন-ইন-চিফ হিসেবে নিযুক্ত হন, যা বিশ্বের বৃহত্তম শিশু হাসপাতালগুলোর মধ্যে একটি। তিনি ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটি কলেজ অফ মেডিসিনে পেডিয়াট্রিক সার্জারির প্রফেসর এবং ই টমাস বোলস চেয়ার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর গবেষণা কাজ এখনো চলমান এবং তিনি ফেটাল এবং নবজাতক সার্জারিতে নতুন পদ্ধতি আবিষ্কারের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর বিশেষ আগ্রহের বিষয় হলো ফেটাল ক্ষত নিরাময়ে প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া এবং কীভাবে জন্মগত অস্বাভাবিকতার চিকিৎসায় ফলাফল উন্নত করা যায়।
ডাক্তার ওলুটয়ে শুধুমাত্র একজন চিকিৎসক নন, তিনি একজন মানবিক এবং আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সম্প্রদায়ের একটি অনুপ্রেরণা। তিনি নিয়মিতভাবে নাইজেরিয়াতে ফিরে যান এবং সেখানকার স্থানীয় চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিতে সাহায্য করেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে আফ্রিকার প্রচুর প্রতিভা রয়েছে, কিন্তু আরও অবকাঠামো এবং অত্যাধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। তাঁর আশা হলো এই ফাঁক পূরণ করা এবং আফ্রিকাকে চিকিৎসা ক্ষেত্রে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। ২০২০ সালে নাইজেরিয়ার রাষ্ট্রপতি মুহাম্মদু বুহারি তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ নাইজেরিয়ান ন্যাশনাল অর্ডার অফ মেরিট পুরস্কারে ভূষিত করেন, যা তাঁর অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতি।
ডাক্তার ওলুটয়ের গল্প শুধুমাত্র চিকিৎসাবিজ্ঞানের জয়গান নয়, এটি মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, নিষ্ঠা এবং সাহসের এক জীবন্ত উদাহরণ। একজন মানুষ যখন তার লক্ষ্যের প্রতি সত্যিকারের নিবেদিত হয় এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার স্বপ্ন দেখে, তখন অলৌকিক ঘটনা ঘটে। ডাক্তার ওলুটয়ে প্রমাণ করেছেন যে ভৌগোলিক সীমানা, সম্পদের অভাব বা প্রাথমিক বাধা কোনো কিছুই একজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মানুষকে তার লক্ষ্য অর্জন থেকে দূরে রাখতে পারে না।
আজকের দিনে যখন আমরা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি দেখি, তখন এই ধরনের ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বিজ্ঞান এবং মানবিকতার সংমিশ্রণই হলো সত্যিকারের অলৌকিকতা। চিকিৎসাবিজ্ঞান আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে গর্ভস্থ শিশুকে অপারেশন করা, জটিল জন্মগত ত্রুটি সংশোধন করা এবং অসাধ্য রোগের চিকিৎসা করা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু এই সমস্ত অগ্রগতির পেছনে রয়েছে হাজার হাজার চিকিৎসক, গবেষক এবং বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং নিবেদন।
লিনলি হোপ বোয়েমারের গল্প আমাদের শেখায় যে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান এবং লড়াই করার মূল্য রয়েছে। মার্গারেট বোয়েমার যখন হাল ছাড়তে অস্বীকার করেছিলেন এবং তার সন্তানের জন্য আশা ধরে রেখেছিলেন, তখন তিনি জানতেন না যে তার এই সাহস একটি নতুন জীবনকে এই পৃথিবীতে আনবে। আর ডাক্তার ওলুটয়ে এবং তার দল যখন সেই অসম্ভব অস্ত্রোপচার করার সাহস দেখিয়েছিলেন, তখন তারা শুধুমাত্র একটি শিশুর জীবন বাঁচাননি, বরং লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য আশার এক নতুন দরজা খুলে দিয়েছিলেন।
এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে চিকিৎসাবিজ্ঞান শুধুমাত্র রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার ক্ষেত্র নয়, এটি মানবিকতা, সহানুভূতি এবং জীবনের প্রতি শ্রদ্ধার এক প্রকাশ। যখন একজন চিকিৎসক তার সমস্ত জ্ঞান, দক্ষতা এবং সাহস দিয়ে একটি জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেন, তখন তা সত্যিই একটি অলৌকিক কাজ হয়ে ওঠে। ডাক্তার ওলুয়িনকা ওলুটয়ের কাজ প্রমাণ করে যে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান কখনো কখনো সত্যিই জাদুর মতো মনে হয়, কিন্তু এই জাদুর পেছনে রয়েছে বছরের পর বছরের কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা।