Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ডায়াবেটিস রোগীদের মুক্তি বাজারে এল ভারতের তৈরি স্মার্ট ইনসুলিন প্যাচ ইঞ্জেকশনের দিন শেষ এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক নতুন সূর্যোদয়

৬ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী দিন। আইসিএমআর আজ হায়দ্রাবাদের একটি বায়োটেক সংস্থার তৈরি স্মার্ট ইনসুলিন প্যাচ এর অনুমোদন দিয়েছে। এটি দেখতে অনেকটা ব্যান্ডেজের মতো যা হাতে ঘড়ির মতো বা বাহুতে লাগিয়ে রাখা যাবে। রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়লে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শরীরে ইনসুলিন প্রবেশ করাবে। যন্ত্রণাদায়ক ইঞ্জেকশন থেকে মুক্তি পাবে কোটি কোটি মানুষ। দামও সাধারণের সাধ্যের মধ্যে।

ডায়াবেটিস রোগীদের মুক্তি বাজারে এল ভারতের তৈরি স্মার্ট ইনসুলিন প্যাচ ইঞ্জেকশনের দিন শেষ এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক নতুন সূর্যোদয়
Health & Science

ভারতের প্রায় ১০ কোটি ডায়াবেটিস রোগীর জন্য আজ এক নতুন ভোরের সূচনা হলো। প্রতিদিন খাওয়ার আগে পেটে বা হাতে সুচ ফোটানোর যন্ত্রণা আর সহ্য করতে হবে না। ইনসুলিন নেওয়ার সময় মনে রাখার বা ডোজ কম বেশি হওয়ার ভয় আর থাকবে না। ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞান আজ এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে যা বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলোকে টেক্কা দিতে পারে। হায়দ্রাবাদের এক অগ্রণী বায়োটেক স্টার্টআপ সংস্থা তৈরি করেছে বিশ্বের সবচেয়ে সাশ্রয়ী এবং কার্যকরী স্মার্ট ইনসুলিন প্যাচ। আজ সকালে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ বা আইসিএমআর এর ডিরেক্টর জেনারেল আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্যাচটিকে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য ছাড়পত্র বা অনুমোদন দিয়েছেন। আগামী সপ্তাহ থেকেই এটি ভারতের ওষুধের দোকানগুলোতে পাওয়া যাবে।

দীর্ঘ গবেষণার ফসল

গত পাঁচ বছর ধরে হায়দ্রাবাদের ওই সংস্থার বিজ্ঞানীরা দিনরাত এক করে এই প্রযুক্তির ওপর কাজ করছিলেন। আইআইটি মাদ্রাজ এবং অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস বা এইমস এর সহযোগিতায় এই গবেষণা চালানো হয়। সংস্থার সিইও ডক্টর রেড্ডি এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন আমাদের লক্ষ্য ছিল এমন কিছু তৈরি করা যা কেবল ধনীদের জন্য নয় বরং গ্রামের সাধারণ কৃষকেরাও ব্যবহার করতে পারবেন। আজ আমরা সফল। এই প্যাচটি কেবল একটি ওষুধ দেওয়ার যন্ত্র নয় এটি একটি কৃত্রিম অগ্ন্যাশয় বা আর্টিফিশিয়াল প্যানক্রিয়াসের মতো কাজ করে।

কীভাবে কাজ করবে এই স্মার্ট প্যাচ

এই স্মার্ট ইনসুলিন প্যাচটি আকারে একটি ছোট কয়েন বা বোতামের মতো। এটি একটি বিশেষ আঠালো পদার্থের সাহায্যে বাহুতে বা পেটে লাগিয়ে রাখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে শত শত অতি ক্ষুদ্র বা মাইক্রো নিডল যা মানুষের চুলের চেয়েও সরু। এই নিডলগুলো পলিমার দিয়ে তৈরি এবং এর ভেতরেই ইনসুলিন ভরা থাকে।

১ সেন্সিং বা শনা্ক্তকরণ প্যাচটিতে রয়েছে গ্লুকোজ অক্সিডেস এনজাইম ভিত্তিক বায়োসেন্সর। এটি প্রতি মুহূর্তে ত্বকের নিচের ইন্টারস্টিশিয়াল ফ্লুইড বা কোষীয় তরল থেকে রক্তে শর্করার মাত্রা মাপতে থাকে। এটি অনেকটা কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটরিং বা সিজিএম এর মতো কাজ করে।

২ ডেলিভারি বা ওষুধ প্রয়োগ যখনই সেন্সরটি বুঝতে পারে যে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে গেছে তখন সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংকেত পাঠায়। সেই সংকেত পেয়ে মাইক্রো নিডলগুলো গলে যায় বা খুলে যায় এবং প্রয়োজনীয় পরিমাণ ইনসুলিন শরীরে প্রবেশ করায়। গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক হয়ে গেলে ইনসুলিন দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা সুগার হঠাৎ কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে না যা সাধারণ ইনসুলিন ইঞ্জেকশনের ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা।

যন্ত্রণাহীন অভিজ্ঞতা

সবচেয়ে বড় কথা হলো এই প্রক্রিয়ায় রোগী কোনো ব্যথা অনুভব করেন না। সাধারণ ইনসুলিন সিরিঞ্জ ত্বকের গভীরে নার্ভ বা স্নায়ু পর্যন্ত পৌঁছায় তাই ব্যথা লাগে। কিন্তু এই স্মার্ট প্যাচের মাইক্রো নিডলগুলো ত্বকের ওপরের স্তরেই কাজ করে যেখানে কোনো নার্ভ এন্ডিং বা স্নায়ুপ্রান্ত থাকে না। তাই বাচ্চারা যারা সুচ দেখে ভয় পায় তাদের জন্য এটি আশীর্বাদস্বরূপ।

দাম এবং সাধারণের নাগাল

বাজারে বর্তমানে যেসব বিদেশি ইনসুলিন পাম্প পাওয়া যায় তার দাম ৩ থেকে ৫ লক্ষ টাকা এবং তার রক্ষণাবেক্ষণ খরচ মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। কিন্তু ভারতের তৈরি এই স্মার্ট প্যাচের দাম শুনলে চমকে যেতে হয়। সংস্থা জানিয়েছে স্টার্টার কিট বা প্রাথমিক মেশিনের দাম হবে মাত্র ২৫০০ টাকা। আর প্রতিটি রিফিল প্যাচ যা একবার লাগালে ৩ দিন চলবে তার দাম হবে মাত্র ১৫০ টাকা। অর্থাৎ মাসে খরচ দাঁড়াবে ১৫০০ টাকার মতো যা অনেক ইনসুলিন ইঞ্জেকশনের খরচের সমান বা কম।

আইসিএমআর এর বক্তব্য

আইসিএমআর এর ডিরেক্টর জেনারেল বলেন আমরা গত এক বছর ধরে ৩০০০ রোগীর ওপর এই প্যাচটির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা পরীক্ষা চালিয়েছি। এর ফলাফল অভূতপূর্ব। টাইপ ১ এবং টাইপ ২ উভয় ধরনের ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রেই এটি ১০০ শতাংশ কার্যকরী প্রমাণিত হয়েছে। এটি মেক ইন ইন্ডিয়া প্রকল্পের এক বিশাল সাফল্য। আমরা আশা করছি এটি খুব শীঘ্রই জন ঔষধি কেন্দ্রগুলোতেও পাওয়া যাবে।

ডায়াবেটিস রোগীদের প্রতিক্রিয়া

এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই রোগীদের মধ্যে স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়েছে। কলকাতার এক ডায়াবেটিস রোগী বছর পঞ্চান্নর সুতপা দেবী বলেন গত ২০ বছর ধরে আমি দিনে দুবার করে ইনসুলিন নিই। পেটে আর জায়গা নেই সব জায়গা শক্ত হয়ে গেছে। এই প্যাচ যদি সত্যি কাজ করে তবে আমি নতুন জীবন পাব। দিল্লির এক অভিভাবক তার ৮ বছরের ডায়াবেটিক বাচ্চার কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। তিনি বলেন আমার ছেলে ভয়ে খেতে চায় না কারণ খেলেই ইঞ্জেকশন নিতে হবে। এই প্যাচ আমার ছেলের মুখে হাসি ফোটাবে।

চিকিৎসকদের মতামত

news image
আরও খবর

বিশিষ্ট এন্ডোক্রিনোলজিস্ট বা হরমোন রোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর অম্লান ঘোষ বলেন এটি ডায়াবেটিস ম্যানেজমেন্ট বা পরিচালনায় এক বিপ্লব আনবে। রোগীরা অনেক সময় ইনসুলিন নিতে ভুলে যান বা ডোজ ভুল নেন। এর ফলে কিডনি চোখ এবং হার্টের ক্ষতি হয়। এই স্মার্ট প্যাচ সেই ভুলের বা হিউম্যান এরর এর সম্ভাবনা শূন্য করে দেবে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা বা কমপ্লিকেশন অনেক কমবে।

প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য

এই স্মার্ট প্যাচটি ব্লুটুথ এর মাধ্যমে স্মার্টফোনের সাথে যুক্ত করা যাবে। একটি অ্যাপের মাধ্যমে রোগী দেখতে পাবেন তার সুগার লেভেল কত আছে এবং গত ২৪ ঘণ্টায় কতটা ইনসুলিন শরীরে গেছে। এই ডেটা সরাসরি ডাক্তারের কাছেও পাঠানো যাবে। ফলে ডাক্তার দূর থেকেই রোগীর ওপর নজর রাখতে পারবেন। ব্যাটারির কোনো ঝামেলা নেই কারণ প্যাচটি নিজেই বায়ো এনার্জি বা শরীরের তাপ থেকে শক্তি সংগ্রহ করতে পারে।

গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় প্রভাব

ভারতে ডায়াবেটিস এখন আর কেবল শহরের রোগ নয় গ্রামেও এটি মহামারীর আকার ধারণ করেছে। গ্রামের মানুষেরা অনেক সময় ইনসুলিন সংরক্ষণ করতে পারেন না কারণ ফ্রিজ থাকে না। এই স্মার্ট প্যাচটির একটি বিশেষ গুণ হলো এটি সাধারণ তাপমাত্রায় বা রুম টেম্পারেচারে ১ মাস পর্যন্ত ভালো থাকে। তাই গ্রামের রোগীদের জন্য এটি ব্যবহার করা সহজ হবে।

রপ্তানির সম্ভাবনা

সংস্থাটি জানিয়েছে ভারতের চাহিদা মেটানোর পর তারা এটি আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে রপ্তানি করার পরিকল্পনা করছে। ইতিমধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু এই প্রযুক্তির প্রশংসা করেছে। আমেরিকার এফডিএ বা খাদ্য ও ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থাও এই প্যাচটি নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে।

ভবিষ্যতের পরিকল্পনা

সংস্থাটি জানিয়েছে তারা বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যুক্ত করে এই প্যাচটিকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করছে। ভবিষ্যতে এই প্যাচটি রোগীর খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার ধরন বা লাইফস্টাইল বিশ্লেষণ করে আগে থেকেই সতর্ক করতে পারবে। অর্থাৎ আপনি যদি মিষ্টি খেতে যান তার আগেই আপনার হাতের প্যাচটি ভাইব্রেট করে আপনাকে বারণ করবে বা ইনসুলিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেবে।

অর্থনৈতিক প্রভাব

অর্থনীতিবিদরা বলছেন এই আবিষ্কার ভারতের স্বাস্থ্যখাতে আমদানি খরচ কমাবে। বর্তমানে ভারত বিদেশ থেকে কোটি কোটি টাকার ইনসুলিন পেন এবং পাম্প আমদানি করে। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই সস্তা বিকল্প সেই টাকা সাশ্রয় করবে। পাশাপাশি বায়োটেক শিল্পে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

প্রতিযোগীদের প্রতিক্রিয়া

এই লঞ্চের ফলে বিদেশি ওষুধ কোম্পানিগুলো বড় ধাক্কা খাবে বলে মনে করা হচ্ছে। এতদিন তারা ইনসুলিন পেন এবং কার্টিজ বিক্রি করে একচেটিয়া ব্যবসা করত। সস্তা এবং ব্যথাহীন বিকল্প আসায় তাদের এখন দাম কমাতে বাধ্য হতে হবে। এটি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষেরই লাভ।

উপসংহার

২০২৬ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি দিনটি প্রমাণ করল যে সদিচ্ছা এবং মেধা থাকলে ভারত অসাধ্য সাধন করতে পারে। স্মার্ট ইনসুলিন প্যাচ কেবল একটি পণ্য নয় এটি কোটি কোটি মানুষের যন্ত্রণামুক্তির চাবিকাঠি। ডায়াবেটিসকে হয়তো পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয় কিন্তু তাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং তার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণভাবে বেঁচে থাকা এখন সম্ভব। সুচ ফোটানোর দিন শেষ এবার স্মার্ট হওয়ার পালা। বিজ্ঞান যখন মানুষের চোখের জল মুছিয়ে মুখে হাসি ফোটায় তখনই তার সার্থকতা। আজ ভারতের বিজ্ঞান সেই সার্থকতাই অর্জন করল।

Preview image