Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

পেঁয়াজ-রসুন খেলে ভাল না খারাপ? টিউমারের ঝুঁকি কমায় কি সত্যিই

অনেক সমাজে ‘শরীর গরম করে’—এই যুক্তিতে পেঁয়াজ-রসুন এড়িয়ে চলার প্রথা আজও রয়েছে। কিন্তু সত্যিই কি এগুলি খাওয়া খারাপ? বিজ্ঞান ও পুষ্টিবিদদের মতে পেঁয়াজ-রসুন শরীরের জন্য ক্ষতিকর নাকি উপকারী—জেনে নিন বাস্তব তথ্য। 

ভারতীয় রান্নার ইতিহাসে পেঁয়াজ-রসুনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মশলা, স্বাদ, গন্ধ—সবই যেন অসম্পূর্ণ এই দুই উপাদান ছাড়া। অথচ সমাজের নানা স্তরে এই খাবারকে ‘গুরুপাক’ বা ‘অতিমশলাদার’ বলে ধরা হয়। দীর্ঘ দিন ধরে বহু ভারতীয় পরিবার বিশেষ করে বাংলার বিধবা সমাজ, কিছু ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়, এবং জৈন ধর্মাবলম্বীরা নিয়ম করে পেঁয়াজ-রসুন এড়িয়ে চলেন। তাদের বিশ্বাস—পেঁয়াজ-রসুন ‘শরীর গরম’ করে, কামনা বাড়ায়, অথবা আধ্যাত্মিকতার পথে বাধা সৃষ্টি করে। ধর্মীয়, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক নানা কারণ আজও এই খাদ্যআচরণ বজায় রেখেছে।

কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কি সত্যিই পেঁয়াজ-রসুন খাওয়া শরীরের জন্য ক্ষতিকর? বরং ঠিক বিপরীতটাই কি সত্যি? সাম্প্রতিক কালে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট এবং লিভার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেঁয়াজ–রসুন মানুষের শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। শুধু তাই নয়, গবেষণা বলছে—পেঁয়াজ-রসুনে থাকা কিছু রাসায়নিক উপাদান টিউমার গঠনের সম্ভাবনা কমাতে বিশেষ ভূমিকা নিতে পারে।

এমনই একটি বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন এমস ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়–প্রশিক্ষিত অন্ত্রের চিকিৎসক ডক্টর সৌরভ শেঠি, যিনি বর্তমানে সান ফ্রান্সিসকোয় গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, হেপাটোলজি এবং অ্যাডভান্সড ইন্টারভেনশনাল এন্ডোস্কপির বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছেন। চিকিৎসা সচেতনতার জন্য তাঁর ইনস্টাগ্রাম চ্যানেল অত্যন্ত জনপ্রিয়। সম্প্রতি তিনি পেঁয়াজ-রসুন খাওয়া নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করতে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেই তথ্যই আজকের আলোচনার মূল ভিত্তি।


পেঁয়াজ-রসুন নিয়ে সামাজিক ভুল ধারণা

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে পেঁয়াজ-রসুন খাওয়ার বিরুদ্ধে যে আপত্তিগুলি রয়েছে, তার মূল কারণ ধর্মীয় নিয়ম এবং পুরনো সমাজরীতি। বাংলায় বিধবারা পেঁয়াজ-রসুন খেতেন না, কারণ রান্নায় এই দুটি উপাদান 'উত্তেজক' বলে ধরা হত। এর ফলে তারা যেন বেশি 'সাধারণ' খাবার খান—এই ছিল সমাজের মানসিকতা।

জৈন সম্প্রদায়ের খাদ্যরীতিতে এই নিষেধাজ্ঞা আসে জীবহিংসা কমানোর উদ্দেশ্যে। পেঁয়াজ-রসুন মাটি খুঁড়ে তুলতে হয়, যার ফলে ছোট জীবজন্তুর মৃত্যু হতে পারে—এটাও তাদের না খাওয়ার একটি কারণ।

তবে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণে এর কোনও ভিত্তি রয়েছে কি? আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্র বলছে—না


বৈজ্ঞানিকভাবে পেঁয়াজ-রসুন কেন উপকারী?

ডক্টর সৌরভ শেঠি পেঁয়াজ-রসুন খাওয়ার পাঁচটি বড় উপকারিতা ব্যাখ্যা করেছেন। আসুন একে একে সেগুলি বুঝে নেওয়া যাক—


১. অ্যালিয়াম পরিবারের সব্জি: শরীরের প্রাকৃতিক ডিটক্স প্রক্রিয়া সক্রিয় করে

পেঁয়াজ ও রসুন দু’টিই অ্যালিয়াম (Allium) পরিবারভুক্ত সবজি। এই পরিবারের বৈশিষ্ট্য হল—খাদ্যে গেলে তারা লিভারকে বিশেষ কিছু এনজাইম তৈরি করতে সাহায্য করে, যাকে ‘ডিটক্স এনজাইম’ বলা হয়। এগুলি শরীরের ভেতরে জমে থাকা টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ দূর করতে সাহায্য করে।

অর্থাৎ, পেঁয়াজ-রসুন আপনার শরীরকে ‘পরিষ্কার’ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এর সঙ্গে রয়েছে স্ক্যালিয়ন, শ্যালট, লিক, চিভ, পেঁয়াজকলি—সবই শরীরের ডিটক্স ব্যবস্থাকে উন্নত করে।


২. শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট—কোষ রক্ষা করে

অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট এমন এক যৌগ যা কোষকে ফ্রি-র‌্যাডিক্যালদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। ফ্রি-র‌্যাডিক্যাল হল এমন এক ধরনের অস্থিতিশীল অণু যা শরীরে নানা ক্ষতি করতে পারে—প্রদাহ, বার্ধক্য, কোষের ক্ষতি, এমনকি ক্যানসারের সম্ভাবনাও বাড়ায়।

পেঁয়াজ-রসুনে থাকা বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে। পেঁয়াজে রয়েছে কোয়ারসেটিন, রসুনে অ্যালিসিন—দুটিই অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টের দিক থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী।


৩. অরগ্যানো-সালফার যৌগ: টিউমার প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা

পেঁয়াজ-রসুনের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য হলো—এগুলিতে পাওয়া যায় অরগ্যানো-সালফার যৌগ, যেমন—

  • অ্যালিসিন

  • ডায়ালিল সালফাইড

  • ডায়ালিল ডিসালফাইড

গবেষণাগারে পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই যৌগগুলি টিউমার গঠনের প্রাথমিক ধাপগুলোকে বাধা দিতে পারে। এরা ক্যানসারের সম্ভাব্য কোষগুলিকে বৃদ্ধি পেতে দেয় না, বরং তাদের স্বাভাবিক মৃত্যুর প্রক্রিয়া (apoptosis) ত্বরান্বিত করে।

হার্ভার্ড হেল্‌থ জার্নালে এ বিষয়ে একাধিকবার গবেষণা প্রকাশ হয়েছে যেখানে অ্যালিসিনকে “টিউমারনাশক” উপাদান বলা হয়েছে।

অর্থাৎ, নিয়মিত পেঁয়াজ-রসুন খেলে শরীর এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারে যা ক্যানসারের কোষ তৈরি হতে দেয় না।


৪. ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি রোধ করতে সক্ষম

ডক্টর শেঠির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পেঁয়াজ-রসুন কেবল কোষ রক্ষা করে না, সম্ভাব্য ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি রোধ করতেও সাহায্য করে। অর্থাৎ—

  • ক্যানসার কোষ বাড়তে দেয় না

  • কোষের ডিএনএ ক্ষতি হতে বাধা দেয়

  • ক্যানসার কোষের apoptosis দ্রুত ঘটায়

  • কার্সিনোজেন তৈরি হওয়া প্রতিরোধ করে

বেশ কয়েকটি স্টাডিতে দেখা গেছে, অ্যালিয়াম পরিবারের সবজি বেশি খাওয়ার ফলে পেটের ক্যানসার, কোলন ক্যানসার এবং প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি কমতে পারে।


৫. অন্ত্রে ‘গুড ব্যাকটেরিয়া’ বাড়ায়, রোগ প্রতিরোধশক্তি উন্নত করে

পেঁয়াজ-রসুনে আছে প্রিবায়োটিক, বিশেষ করে ‘ইনুলিন’—যা অন্ত্রে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য হিসেবে কাজ করে। এতে—

  • হজম শক্তি বাড়ে

  • অন্ত্রের প্রদাহ কমে

  • মেটাবলিজম উন্নত হয়

  • রোগ প্রতিরোধশক্তি (ইমিউনিটি) শক্তিশালী হয়

ইমিউন সিস্টেম দৃঢ় হলে দীর্ঘমেয়াদি অসুখ যেমন ক্যানসার, ডায়াবিটিস, হৃদরোগ ইত্যাদি ঝুঁকিও কমে।


তাহলে কি পেঁয়াজ-রসুন খেলে সত্যিই ক্যানসারের আশঙ্কা কমে?

প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেকেই ভাবেন, একটি খাবার কি সত্যিই ক্যানসারের মতো গুরুতর রোগ প্রতিরোধ করতে পারে?

এর উত্তর—আংশিকভাবে হ্যাঁ।

২০১৬ সালে American Institute for Cancer Research (AICR) রসুনকে তাদের “Foods That Fight Cancer” তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। তারা জানায়—

  • রসুন এবং পেঁয়াজে থাকা সালফার যৌগ ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি রোধ করে

  • এগুলি শরীরে কার্সিনোজেন তৈরি বাধা দেয়

  • অ্যালিয়াম জাতীয় সবজি টিউমারের আকার বাড়তে দেয় না

অ্যালিয়াম পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যেগুলিকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—

news image
আরও খবর
  • রসুন

  • লাল পেঁয়াজ

  • শ্যালট

  • পেঁয়াজকলি

  • পেঁয়াজ শাক

এগুলিতে রয়েছে—

  • ফাইটোকেমিক্যাল

  • ভিটামিন সি

  • ভিটামিন বি৬

  • অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট

  • ফ্ল্যাভোনয়েড

  • সালফার যৌগ

যা টিউমারের সম্ভাবনা কমানোর বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।


তাহলে পেঁয়াজ-রসুন খাওয়া কি সবার জন্য নিরাপদ?

বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে হ্যাঁ, তবে নির্দিষ্ট কিছু অবস্থায় সতর্কতা দরকার—

  • অ্যাসিডিটি বা গ্যাস্ট্রাইটিসে কারও কারও সমস্যা বাড়ে

  • কিছু মানুষের ক্ষেত্রে কাঁচা রসুন পেটের জ্বালা বাড়াতে পারে

  • ব্লাড থিনার ওষুধ খেলে অতিরিক্ত রসুন খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে

  • অ্যালিয়াম অ্যালার্জি থাকলে এড়িয়ে চলতে হয়

তবে পরিমাণমতো পেঁয়াজ-রসুন খেলে অধিকাংশ মানুষেরই কোনও সমস্যা হয় না।


পরিমাণ কত হওয়া উচিত?

গবেষণা বলছে—

  • রোজ ১-২ কোয়া রসুন

  • অর্ধেক থেকে ১টি মাঝারি পেঁয়াজ

এই পরিমাণ নিয়মিত খেলে যথেষ্ট স্বাস্থ্য উপকার পাওয়া যায়।

রসুন কুচিয়ে-চেঁচে ১০ মিনিট রেখে দিলে অ্যালিসিনের পরিমাণ সর্বোচ্চ হয়। রান্না করলেও এর উপকারিতা অনেকটাই বজায় থাকে।


এই ভুল ধারণা কেন তৈরি হয়েছিল?

সামাজিক ও ধর্মীয় কারণ ছাড়া এটির কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। আসলে—

  • পেঁয়াজ-রসুনের গন্ধ প্রবল

  • এগুলি হজমে সময় লাগে

  • কিছু মানুষের ক্ষেত্রে গ্যাস বা অ্যাসিডিটি হয়

ফলে অতীতে ধরা হত যে এগুলি ‘গুরুপাক’। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে—
এগুলি কেবল খাবারের স্বাদ বাড়ায় না, শরীরকে রোগ থেকে রক্ষা করতেও সাহায্য করে।


শেষ কথা

পেঁয়াজ-রসুন নিয়ে বহু পুরনো ধারণা আজও সমাজে প্রচলিত। কিন্তু আজকের বিজ্ঞান বলছে—

  • এগুলি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট

  • কোষকে রক্ষা করে

  • গুড ব্যাকটেরিয়া বাড়ায়

  • শরীরের ডিটক্স প্রক্রিয়া সক্রিয় করে

  • প্রদাহ কমায়

  • এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—টিউমার ও ক্যানসার প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখে

অবশ্যই এর মানে এই নয় যে কেবল পেঁয়াজ-রসুন খেয়ে ক্যানসার ঠেকানো যায়। তবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যের অংশ হিসেবে এগুলি প্রতিদিনের ডায়েটে রাখলে ক্যানসারের ঝুঁকি, প্রদাহ, এবং কোষের ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে—এ কথা গবেষণাই বলছে।

অতএব, বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিকোণ থেকে পেঁয়াজ-রসুন খাওয়া কোনওভাবেই খারাপ নয়, বরং শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এগুলি শরীরের স্বাভাবিক রোগপ্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়, অন্ত্রের সুস্থ ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি করে এবং কোষের ক্ষয় রোধে সক্রিয় ভূমিকা নেয়। দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় পরিমাণমতো পেঁয়াজ-রসুন অন্তর্ভুক্ত করলে হজমশক্তি উন্নত হয়, প্রদাহ কমে এবং ক্যানসারের মতো জটিল অসুখের ঝুঁকিও দীর্ঘমেয়াদে হ্রাস পেতে পারে। তাই ধর্মীয় বা সামাজিক বিশ্বাসের বাইরে গিয়ে, প্রকৃত বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে এই সহজলভ্য সবজিগুলির উপকারিতা গ্রহণ করাই শ্রেয়। 

Preview image