ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অলৌকিক দিন বেঙ্গালুরুর নিমহ্যান্স হাসপাতালে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হলো বিশ্বের প্রথম স্পাইনাল কর্ড চিপ মেরুদণ্ড দীর্ঘ ২০ বছর ধরে হুইলচেয়ারে বন্দি এক রোগী আজ নিজের পায়ে হেঁটে মঞ্চে উঠলেন ভারতের বিজ্ঞানীদের তৈরি এই সস্তা এবং কার্যকর প্রযুক্তি বিশ্বের কোটি কোটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষের জীবনে নতুন ভোরের আলো নিয়ে এল
মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় অভিশাপগুলোর মধ্যে একটি হলো পক্ষাঘাত বা প্যারালাইসিস যখন একজন সুস্থ সবল মানুষ হঠাৎ কোনো দুর্ঘটনায় বা রোগের কারণে নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন তখন তার জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে ওঠে হাত পা নাড়ানোর ক্ষমতা থাকে না এবং সারা জীবনের জন্য হুইলচেয়ার বা বিছানাই হয় তাদের সঙ্গী এতদিন চিকিৎসা বিজ্ঞান এই সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি ফিজিওথেরাপি বা কিছু ওষুধ দিয়ে সামান্য উন্নতি হলেও পুরোপুরি সুস্থ হওয়া ছিল এক প্রকার অসম্ভব কিন্তু আজ সেই অসম্ভব সম্ভব হলো ভারতের মাটিতে ভারতীয় বিজ্ঞানীদের মেধা এবং অধ্যবসায়ের ফলে আজ পক্ষাঘাত হার মানল প্রযুক্তির কাছে বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরো সায়েন্সেস বা নিমহ্যান্স এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স বা আইআইএসসি এর যৌথ উদ্যোগে তৈরি হলো বিশ্বের প্রথম স্পাইনাল কর্ড ব্রিজ বা মেরুদণ্ড চিপ যার নাম দেওয়া হয়েছে মেরুদণ্ড
আজ সকালে বেঙ্গালুরুর বিজ্ঞান ভবনে আয়োজিত এক ভাবগ গম্ভীর অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের সূচনা করেন কিন্তু আজকের অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ কোনো নেতা বা মন্ত্রী ছিলেন না ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ নাম বিক্রম সিং বয়স ৪৫ বছর পেশায় একজন প্রাক্তন সেনা জওয়ান কার্গিল যুদ্ধের সময় মেরুদণ্ডে গুলি লেগে তিনি গত ২৫ বছর ধরে কোমর থেকে নিচ পর্যন্ত অবশ ছিলেন ডাক্তাররা বলেছিলেন তিনি আর কোনোদিন হাঁটতে পারবেন না কিন্তু আজ সকালে যখন তার নাম ঘোষণা করা হলো তখন তিনি হুইলচেয়ার ছেড়ে নিজের পায়ে হেঁটে মঞ্চে এলেন এবং প্রধানমন্ত্রীকে স্যালুট জানালেন এই দৃশ্য দেখে অডিটোরিয়ামে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষ এবং টিভিতে চোখ রাখা কোটি কোটি ভারতবাসী চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি এটি ছিল বিজ্ঞানের জয়ের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত
মেরুদণ্ড চিপ তৈরির নেপথ্য কাহিনী
এই অসাধ্য সাধনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ১২ বছরের গবেষণা আইআইএসসি এর বায়ো ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান ডক্টর সুমিত্রা মেনন এবং নিমহ্যান্স এর নিউরোসার্জন ডক্টর রাকেশ গুপ্তা যৌথভাবে এই প্রজেক্ট হাতে নিয়েছিলেন তাদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি যন্ত্র তৈরি করা যা মানুষের মেরুদণ্ডের কাটা তার জোড়া লাগাতে পারে বা বাইপাস করতে পারে
ডক্টর মেনন বলেন আমাদের মস্তিষ্ক হলো শরীরের সিপিইউ বা সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট মস্তিষ্ক থেকেই সমস্ত নির্দেশ হাত এবং পায়ে যায় এই নির্দেশগুলো নিয়ে যায় আমাদের স্পাইনাল কর্ড বা মেরুদণ্ডের ভেতরে থাকা স্নায়ু গুচ্ছ যখন মেরুদণ্ডে আঘাত লাগে তখন এই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় অনেকটা টেলিফোনের তার কেটে যাওয়ার মতো মস্তিষ্ক নির্দেশ পাঠায় হাঁটার জন্য কিন্তু সেই নির্দেশ পায়ে পৌঁছায় না ফলে পা নড়ে না আমাদের তৈরি মেরুদণ্ড চিপ ঠিক এই কাজটাই করে এটি একটি ডিজিটাল ব্রিজ বা সেতু তৈরি করে মস্তিষ্ক এবং পায়ের মধ্যে
প্রযুক্তি এবং কার্যপদ্ধতি
মেরুদণ্ড যন্ত্রটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত প্রথম অংশটি হলো একটি অতি ক্ষুদ্র চিপ বা ইলেকট্রোড অ্যারে যা মস্তিষ্কের সেই অংশে বসানো হয় যা হাঁটাচলা নিয়ন্ত্রণ করে একে বলা হয় মোটর কর্টেক্স যখন রোগী হাঁটার কথা ভাবেন তখন এই চিপটি মস্তিষ্কের সেই সংকেত বা সিগন্যাল ধরে ফেলে দ্বিতীয় অংশটি বসানো হয় মেরুদণ্ডের আঘাতপ্রাপ্ত অংশের নিচে অর্থাৎ যেখানে স্নায়ুগুলো সচল আছে এই দুটি অংশের মধ্যে কোনো তার থাকে না এরা ওয়্যারলেস বা তারবিহীন প্রযুক্তিতে একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে
যখন বিক্রম সিং হাঁটার কথা ভাবেন তখন তার মস্তিষ্কের চিপ সেই ভাবনাকে ডিজিটাল সংকেতে পরিণত করে এবং কোমরের নিচে থাকা চিপে পাঠিয়ে দেয় সেই চিপটি তখন পায়ের পেশিগুলোকে বৈদ্যুতিক শক বা স্টিমুলেশন দেয় এবং পা নড়তে শুরু করে এই পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটতে সময় লাগে চোখের পলক ফেলার চেয়েও কম সময় অর্থাৎ রোগী ভাবা মাত্রই পা নড়ে ওঠে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখানে এক বড় ভূমিকা পালন করে এআই রোগীর হাঁটার ভঙ্গি এবং ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে যাতে তিনি পড়ে না যান
অস্ত্রপচার এবং ঝুঁকি
এই অস্ত্রপচারটি ছিল অত্যন্ত জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ১০ ঘণ্টা ধরে চলা এই অপারেশনে ডাক্তাররা মাইক্রোস্কোপ বা অনুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে চুলের চেয়েও সরু স্নায়ুর সাথে চিপটিকে যুক্ত করেছেন ডক্টর গুপ্তা বলেন আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল যাতে শরীরের নিজস্ব ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা চিপটিকে প্রত্যাখ্যান বা রিজেক্ট না করে তাই আমরা চিপের ওপর একটি বিশেষ জৈব প্রলেপ বা বায়ো কোটিং ব্যবহার করেছি যা শরীরের সাথে মিশে যায় অপারেশনের পর বিক্রমকে তিন মাস রিহ্যাবিলিটেশন বা পুনর্বাসন কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল সেখানে তাকে নতুন করে হাঁটতে শেখানো হয়েছে কারণ তার পায়ের পেশিগুলো দীর্ঘ দিন অব্যবহৃত থাকায় দুর্বল হয়ে গিয়েছিল
প্রথম রোগীর অভিজ্ঞতা ও আবেগ
বিক্রম সিং যখন মঞ্চে মাইক্রোফোন হাতে নিলেন তখন তার গলা কাঁপছিল তিনি বলেন আমি যখন প্রথমবার নিজের পায়ে দাঁড়ালাম তখন মনে হলো আমি আবার জন্ম নিলাম আমার মেয়ের বিয়েতে আমি নিজের পায়ে হেঁটে তাকে আশীর্বাদ করতে পারব এটা আমার কাছে স্বপ্নের মতো ছিল আজ আমার মনে হচ্ছে আমি এভারেস্ট জয় করেছি এই চিপ কেবল আমার পা ফিরিয়ে দেয়নি আমার আত্মসম্মান ফিরিয়ে দিয়েছে আমি এখন আর কারো দয়ার পাত্র নই আমি একজন সক্ষম মানুষ
খরচ এবং সাধারণ মানুষের নাগাল
সুইজারল্যান্ড এবং আমেরিকায় এই ধরনের প্রযুক্তির পরীক্ষা চলছে কিন্তু তার খরচ ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৫ কোটি টাকা যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে কিন্তু ভারতীয় বিজ্ঞানীরা এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন মাত্র ৫ লক্ষ টাকার মধ্যে মেরুদণ্ড চিপ তৈরি করা হয়েছে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে এবং দেশীয় কাঁচামাল দিয়ে সরকার জানিয়েছে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের আওতায় গরিব রোগীরা এই চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাবেন এবং মধ্যবিত্তদের জন্য সহজ কিস্তির ব্যবস্থা থাকবে টাটা এবং ইনফোসিস ফাউন্ডেশন এই প্রকল্পে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে
সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
ভারতে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনা এবং উপর থেকে পড়ে গিয়ে হাজার হাজার মানুষ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হন এদের অধিকাংশই তরুণ এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী সদস্য যখন এরা বিছানায় পড়ে যান তখন পুরো পরিবারটি পথে বসে যায় মেরুদণ্ড চিপ এই সব পরিবারের কাছে আশার আলো হয়ে এসেছে এই মানুষগুলো আবার কাজে ফিরতে পারবেন এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবেন সরকার জানিয়েছে আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি রাজ্যে একটি করে মেরুদণ্ড নিরাময় কেন্দ্র বা স্পাইনাল রিহ্যাব সেন্টার খোলা হবে যেখানে এই চিপ বসানো হবে
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা এবং অন্যান্য রোগ
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন মেরুদণ্ড চিপ কেবল পক্ষাঘাত নয় স্ট্রোক এবং সেরিব্রাল পালসি বা মস্তিষ্কের পক্ষাঘাতে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যেতে পারে স্ট্রোকের কারণে যাদের এক পাশ অবশ হয়ে গেছে তাদের মস্তিষ্কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশকে বাইপাস করে এই চিপ সুস্থ অংশের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে এছাড়াও পারকিনসন্স রোগে আক্রান্তদের হাত কাঁপা বন্ধ করতেও এই প্রযুক্তি সফল হয়েছে
আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের জয়জয়কার
চিকিৎসা বিজ্ঞানে ভারতের এই সাফল্য বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে বিখ্যাত বিজ্ঞান জার্নাল নেচার এবং সায়েন্স এই আবিষ্কারকে কভার স্টোরি বা প্রচ্ছদ কাহিনী হিসেবে ছেপেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু বলেছে ভারত এখন গ্লোবাল হেলথ লিডার বা বিশ্ব স্বাস্থ্যের নেতা আমেরিকা এবং ইউরোপের রোগীরা এখন ভারতে আসার জন্য ভিসা আবেদন করছেন কারণ এত কম খরচে এমন উন্নত চিকিৎসা আর কোথাও নেই
নৈতিকতা এবং সাইবর্গ বিতর্ক
মানুষের শরীরে কম্পিউটার চিপ বসানো নিয়ে কিছু নৈতিক প্রশ্নও উঠছে অনেকে বলছেন এর ফলে মানুষ কি রোবট হয়ে যাবে হ্যাকাররা কি এই চিপ হ্যাক করে মানুষকে রিমোট কন্ট্রোলে চালাতে পারবে এই প্রশ্নের উত্তরে আইআইএসসি এর সাইবার নিরাপত্তা প্রধান বলেন মেরুদণ্ড চিপ একটি ক্লোজড লুপ সিস্টেম বা বদ্ধ ব্যবস্থায় কাজ করে এটি ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত নয় তাই বাইরে থেকে একে হ্যাক করা অসম্ভব তাছাড়া এই চিপটি মানুষের ইচ্ছা বা চেতনার ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না এটি কেবল মস্তিষ্কের নির্দেশ পালন করে মাত্র
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া
ভারতের সাধারণ মানুষের কাছে আজকের দিনটি উৎসবের মতো হাসপাতালের বাইরে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেছেন তাদের প্রিয়জনকে সুস্থ করার আশায় কলকাতার এক মা তার পক্ষাঘাতগ্রস্ত ছেলেকে নিয়ে এসেছেন তিনি বলেন আমার ছেলেটা ফুটবল খেলত একটা অ্যাক্সিডেন্টে সব শেষ হয়ে গেল টিভিতে খবরটা দেখে আমি আর থাকতে পারলাম না আমার বিশ্বাস আমার ছেলে আবার মাঠে নামবে মুম্বাইয়ের এক শিল্পপতি ঘোষণা করেছেন তিনি ১০০ জন গরিব রোগীর অপারেশনের খরচ বহন করবেন
চ্যালেঞ্জ এবং সতর্কতা
ডাক্তাররা অবশ্য অতি উৎসাহী না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা বলছেন সব রোগী এই চিপের জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারেন যাদের স্নায়ু পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে বা পেশি শুকিয়ে গেছে তাদের ক্ষেত্রে এটি কাজ নাও করতে পারে তাই প্রতিটি কেস বা ঘটনা আলাদাভাবে বিচার করতে হবে এছাড়াও অপারেশনের পর দীর্ঘ ফিজিওথেরাপি বা ব্যায়াম করা অত্যন্ত জরুরি চিপ লাগালেই সাথে সাথে দৌড়ানো যাবে না তার জন্য ধৈর্য এবং কঠোর পরিশ্রমের প্রয়োজন
উপসংহার
২০২৬ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি দিনটি মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যোগ করল মানুষ চাঁদ জয় করেছে সাগর জয় করেছে কিন্তু নিজের শরীরের সীমাবদ্ধতা জয় করা বাকি ছিল মেরুদণ্ড চিপ সেই সীমাবদ্ধতাকে ভেঙে দিল আজ থেকে হুইলচেয়ার আর পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষের শেষ ঠিকানা নয় তা কেবল একটি সাময়িক বিশ্রামস্থল ভারত আজ বিশ্বকে দেখাল যে ইচ্ছাশক্তি এবং বিজ্ঞান যদি এক হয় তবে কোনো বাধাই বাধা নয় যে পা একদিন স্থির হয়ে গিয়েছিল আজ তা আবার ছন্দে ফিরল যে মেরুদণ্ড একদিন ভেঙে গিয়েছিল আজ তা আবার সোজা হয়ে দাঁড়াল জয় বিজ্ঞান জয় ভারত