Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

২৪ ২৫ ২৬ ২৭ ২৮ জানুয়ারি ভারী বৃষ্টি কাঁপাবে ৯ রাজ্য শিলাবৃষ্টির হুঁশিয়ারি ৬ রাজ্যে শৈত্যপ্রবাহ কোন কোন রাজ্যে কী হবে বাংলায়

দেশ জুড়ে আবহাওয়ার মেগা রদবদলের সম্ভাবনা। আন্তর্জাতিক আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুসারে, ২৪ এবং ২৮ জানুয়ারি উত্তর ভারতে একটি সক্রিয় পশ্চিমা ঝঞ্ঝার প্রভাব পড়বে।


মহাপ্রলয়ের সঙ্কেত: ২৪ থেকে ২৮ জানুয়ারি দেশজুড়ে আবহাওয়ার মেগা রদবদল; ৯ রাজ্যে অতি ভারী বৃষ্টি ও তুষারপাতের লাল সতর্কতা

 

বিশেষ আবহাওয়া মহাপ্রেতিবেদন: প্রকৃতি যখন তার মেজাজ বদলায়, তখন তার প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের শেষার্ধে ঠিক তেমন এক পরিস্থিতির সাক্ষী হতে চলেছে গোটা ভারত। ভারতীয় মৌসম ভবন (IMD) এবং আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থাগুলোর যৌথ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২৪ জানুয়ারি থেকে ২৮ জানুয়ারির মধ্যে উত্তর ও মধ্য ভারতের আকাশ কার্যত রণক্ষেত্রের রূপ নিতে চলেছে। দু-দুটি শক্তিশালী 'পশ্চিমী ঝঞ্ঝা' (Western Disturbance), একাধিক ঘূর্ণাবর্ত এবং আরব সাগরের আর্দ্র বায়ুর মেলবন্ধনে তৈরি হয়েছে এক বিধ্বংসী আবহাওয়া সিস্টেম। এই প্রতিবেদনে আমরা বিশ্লেষণ করব কেন এই পরিবর্তন, কোন কোন রাজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বাংলার ভাগ্যে ঠিক কী আছে।


 

১. আবহাওয়ার সিস্টেম বিশ্লেষণ: কেন এই মেগা রদবদল?

সাধারণত জানুয়ারি মাসে উত্তর ভারতে ঠান্ডা থাকে, কিন্তু এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। এর পেছনে রয়েছে একাধিক বায়ুমণ্ডলীয় কারণের জটিল সমীকরণ।

ক) জোড়া পশ্চিমী ঝঞ্ঝার হানা

আবহাওয়াবিদদের মতে, প্রথম পশ্চিমী ঝঞ্ঝাটি ২৪ জানুয়ারি উত্তর-পশ্চিম ভারতে প্রবেশ করেছে। এটি মূলত দক্ষিণ আফগানিস্তান এবং সংলগ্ন পাকিস্তানের ওপর অবস্থান করছে। কিন্তু আসল উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে দ্বিতীয় ঝঞ্ঝাটি, যা ২৬ জানুয়ারি অর্থাৎ সাধারণতন্ত্র দিবসের দিন ভারতে প্রবেশ করবে। এই জোড়া ঝঞ্ঝার প্রভাবে বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে বাতাসের গতিবেগ ও চাপের ভারসাম্য সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছে।

খ) মধ্য পাকিস্তানের নিম্নচাপ ও ঘূর্ণাবর্ত

মধ্য পাকিস্তানের ওপর একটি শক্তিশালী সাইক্লোনিক সার্কুলেশন বা ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হয়েছে। এই ঘূর্ণাবর্তটি একটি নিম্নচাপ অঞ্চলের জন্ম দিয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই নিম্নচাপের সঙ্গে একটি অক্ষরেখা (Trough Line) উত্তর-পূর্ব আরব সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এর ফলে আরব সাগর থেকে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প উত্তর ভারতের সমতল ও পাহাড়ি অঞ্চলে প্রবেশ করছে।

গ) জেট স্ট্রিমের অবস্থান

বর্তমানে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আকাশে 'সাব-ট্রপিক্যাল ওয়েস্টার্লি জেট স্ট্রিম' (Sub-tropical Westerly Jet Stream) সক্রিয় রয়েছে। এটি বায়ুমণ্ডলের প্রায় ১০-১২ কিলোমিটার উচ্চতায় তীব্র গতিতে প্রবাহিত একটি বায়ুপ্রবাহ। এই জেট স্ট্রিমই মূলত ঝঞ্ঝাগুলোকে ভারতের অভ্যন্তরে টেনে আনছে এবং বৃষ্টির তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।


 

২. ৯ রাজ্যে ভারী বৃষ্টি ও ঝড়ের তাণ্ডব: ধ্বংসলীলার আশঙ্কা

মৌসম ভবনের বুলেটিন অনুযায়ী, আগামী ৪-৫ দিন ভারতের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের ৯টি রাজ্যে বৃষ্টিপাত কেবল হবে না, বরং তা দাপট দেখাবে।

  • রাজ্যগুলোর তালিকা: জম্মু ও কাশ্মীর, লাদাখ, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, পঞ্জাব, হরিয়ানা, চণ্ডীগড়, দিল্লি-এনসিআর এবং উত্তরপ্রদেশ।

  • বাতাসের গতিবেগ: ঝোড়ো হাওয়ার গতিবেগ ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার হতে পারে, যা সর্বোচ্চ ৬৫ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

  • বৃষ্টির তীব্রতা: পঞ্জাব, হরিয়ানা এবং দিল্লিতে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। দিল্লির রাজপথের সাধারণতন্ত্র দিবসের প্যারেডে বৃষ্টির ভ্রুকুটি এখন সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


 

৩. তুষারপাত ও শিলাবৃষ্টি: শৈত্যের নতুন রূপ

যখন সমতলে বৃষ্টি হয়, পাহাড়ে তখন বরফ পড়ে। এবারের তুষারপাত কেবল স্বাভাবিক সাদা চাদর নয়, বরং তা জনজীবন স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

পাহাড়ি অঞ্চলের সতর্কতা (তুষারপাত):

১. জম্মু ও কাশ্মীর: উপত্যকায় অতি ভারী তুষারপাতের সতর্কতা জারি করা হয়েছে। জোজিলা পাস, বানিহাল এবং গুলমার্গের মতো উচ্চ উচ্চতার অঞ্চলগুলো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। ২. হিমাচল ও উত্তরাখণ্ড: মানালি, কাসোল, রোটাং পাস এবং চামোলি জেলায় ভারী তুষারপাতের ফলে ধস নামার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রশাসনের তরফে পর্যটকদের উঁচু পাহাড়ে চড়তে নিষেধ করা হয়েছে।

শিলাবৃষ্টির সতর্কতা (Hailstorm Warning):

৬টি রাজ্যে শিলাবৃষ্টির বিশেষ সতর্কতা রয়েছে। পঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান এবং পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে বড় আকারের শিলাবৃষ্টির ফলে রবি শস্যের ব্যাপক ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। শিলাবৃষ্টির কারণে যানবাহন এবং কাঁচা বাড়ির টিনের চাল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।


 

৪. শৈত্যপ্রবাহ ও কুয়াশার দাপট: কাঁপছে ১৭টি শহর

বৃষ্টি থামার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। যখন পশ্চিমী ঝঞ্ঝা বিদায় নেয়, তখন সে পাহাড় থেকে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া সমতলে টেনে আনে।


 

৫. বাংলার আবহাওয়া: উত্তরবঙ্গ বনাম দক্ষিণবঙ্গ

বাংলার আবহাওয়া সরাসরি উত্তর ভারতের মতো ঝড়-বৃষ্টির মুখে না পড়লেও, এই মেগা রদবদলের ঢেউ এসে পৌঁছাবে এরাজ্যেও।

উত্তরবঙ্গের পরিস্থিতি (কুয়াশার সতর্কতা):

উত্তরবঙ্গ বর্তমানে কুয়াশার কবলে। সোমবার পর্যন্ত দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার এবং উত্তর দিনাজপুরে ঘন কুয়াশার দাপট থাকবে।

  • দৃশ্যমানতা: কুয়াশার কারণে বাগডোগরা বিমানবন্দরে বিমান ওঠানামা ব্যাহত হতে পারে। উত্তরবঙ্গের মহাসড়কগুলোতে যান চলাচল ধীরগতির হবে।

  • বৃষ্টি: উত্তরবঙ্গের ওপরের পাঁচটি জেলায় খুব হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও ভারী বৃষ্টির কোনো সঙ্কেত নেই।

দক্ষিণবঙ্গের পরিস্থিতি (মেঘলা আকাশ ও আর্দ্রতা):

দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলোতে বিশেষ করে বীরভূম, মুর্শিদাবাদ এবং দুই বর্ধমানে ভোরের দিকে কুয়াশা থাকবে।

  • কলকাতার আবহাওয়া: কলকাতায় ভোরের দিকে ধোঁয়াশা ও কুয়াশা থাকবে। দিনের বেলা আকাশ আংশিক মেঘলা থাকার সম্ভাবনা। ঝঞ্ঝার প্রভাবে উত্তুরে হাওয়া বাধা পাওয়ায় তাপমাত্রা ১৬-১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশে থাকবে, অর্থাৎ শীতের তীব্রতা কিছুটা কম অনুভূত হবে।

  • উপকূলীয় এলাকা: উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনাতেও ভোরের দিকে ঘন কুয়াশা থাকবে। সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় জলীয় বাষ্পের আধিক্য বাড়বে।


৬. কৃষিক্ষেত্রে প্রভাব: অন্নদাতার কপালে চিন্তার ভাঁজ

এই অসময়ের বৃষ্টি এবং শিলাবৃষ্টি কৃষকদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

  • গম ও সরিষা: উত্তর ভারতের গম চাষ এবং রাজস্থানের সরিষা চাষ শিলাবৃষ্টির কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

  • আলু চাষ: বাংলার আলু চাষিরাও কুয়াশার কারণে চিন্তিত। দীর্ঘক্ষণ কুয়াশা থাকলে আলুর 'নাবসা' বা 'ধসা' রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

  • আম চাষ: মুকুল আসার এই সময়ে শিলাবৃষ্টি হলে আমের ফলনে বড় প্রভাব পড়তে পারে।


৭. সাধারণ মানুষের জন্য নির্দেশিকা ও সতর্কতা

আইএমডি এবং দুর্যোগ মোকাবিলা দফতরের তরফে কিছু বিশেষ পরামর্শ দেওয়া হয়েছে: ১. ভ্রমণ সতর্কতা: যারা এই সময়ে পাহাড়ে ভ্রমণে যাচ্ছেন, তারা অবশ্যই স্থানীয় প্রশাসনের খবরের দিকে নজর রাখুন। তুষারপাতের সময় গাড়ি চালানো অত্যন্ত বিপজ্জনক। ২. স্বাস্থ্য সচেতনতা: হঠাৎ তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং পরক্ষণেই বৃষ্টির কারণে ঠান্ডা লেগে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। শিশু ও বৃদ্ধদের বিশেষ যত্ন নিন। ৩. পরিবহণ: ট্রেন বা ফ্লাইটের টিকিট থাকলে অবশ্যই স্ট্যাটাস চেক করে বেরোন, কারণ কুয়াশার কারণে বড় ধরণের সিডিউল বিপর্যয় ঘটতে পারে।


৮. উপসংহার: শীত কি বিদায় নিচ্ছে?

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগছে, এই ঝঞ্ঝার পর কি শীত বিদায় নেবে? উত্তর হলো—না। বরং ঝঞ্ঝা কেটে যাওয়ার পর উত্তর দিক থেকে আসা হিমেল হাওয়া ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতেও ঠান্ডার আমেজ বজায় রাখবে। তবে এবারের এই 'জানুয়ারি মেগা রদবদল' আবহাওয়ার ইতিহাসে এক বিশেষ জায়গা করে নেবে তার তীব্রতা ও ব্যাপ্তির কারণে।

প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জলবায়ু পরিবর্তন (Climate Change) এখন আর কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক কঠোর বাস্তবতা।

Preview image