Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কিডনির রোগ জব্দ হবে ডায়ালিসিস প্রতিস্থাপন ছাড়াই নতুন ডিজিটাল টুইন মডেল নিয়ে গবেষণা ভারতেও

কিডনি বিকল হলে রোগীর প্রাণসংশয় হবে না। আগে থেকেই রোগের ধরন বুঝে চিকিৎসা শুরু হবে। ‘ডিজিটাল টুইন’ মডেল নিয়ে গবেষণা চলছে।

কিডনি মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। শরীরের রক্ত পরিষ্কার করা, অতিরিক্ত পানি ও বর্জ্য পদার্থ বের করে দেওয়া, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, হরমোন তৈরি এবং ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখার মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ কিডনির ওপর নির্ভরশীল। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটির অসুখ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা এখনও যথেষ্ট নয়। কিডনির রোগ শুরুতে অনেক সময়ই তেমন লক্ষণ দেয় না। ফলে রোগ ধরা পড়ে দেরিতে, যখন পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।

কিডনিতে পাথর, সংক্রমণ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসজনিত সমস্যা কিংবা জেনেটিক কারণ—বিভিন্ন কারণে কিডনির কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে। বিশেষ করে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ বা দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ হলে তা ভয়াবহ আকার নিতে পারে। একবার কিডনি পুরোপুরি বিকল হয়ে গেলে, রোগীকে নিয়মিত ডায়ালিসিস করাতে হয় অথবা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন পড়ে। কিডনি প্রতিস্থাপন অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি চিকিৎসা পদ্ধতি। দাতা কিডনি পাওয়া কঠিন, অস্ত্রোপচার ঝুঁকিপূর্ণ, তার উপর প্রতিস্থাপনের পর শরীরের প্রত্যাখ্যানের ভয় সবসময় থাকে। তাই চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরেই এমন চিকিৎসা পদ্ধতির খোঁজ করছেন, যাতে কিডনি রোগ আগেভাগেই শনাক্ত করা যায় এবং ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়।

এই প্রেক্ষাপটেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) ভিত্তিক এক যুগান্তকারী প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলছে, যার নাম ডিজিটাল-টুইন মডেল। এই প্রযুক্তিকে অনেকেই ভবিষ্যতের চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম বড় বিপ্লব বলে মনে করছেন।

ডিজিটাল-টুইন মডেল আসলে কী?
ডিজিটাল টুইন বলতে বোঝায় বাস্তব কোনো বস্তু বা অঙ্গের একটি ভার্চুয়াল বা ডিজিটাল প্রতিরূপ, যা আসলটির মতোই কাজ করতে পারে। কিডনির ক্ষেত্রে, রোগীর শরীরের কিডনির একটি ডিজিটাল কপি তৈরি করা হচ্ছে কম্পিউটার অ্যালগরিদম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে। এই ভার্চুয়াল কিডনি শুধু দেখতে আসল কিডনির মতো নয়, বরং আসল কিডনির মতোই কার্যকরীভাবে কাজ করার চেষ্টা করে।

রোগীর রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট, প্রস্রাব পরীক্ষা, রক্তচাপের তথ্য, হরমোনের মাত্রা, শরীরের গঠন, বয়স, লিঙ্গ, পূর্ববর্তী রোগের ইতিহাসসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ডেটা সংগ্রহ করে সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয় এই ডিজিটাল কিডনি মডেল। এরপর এই মডেল ব্যবহার করে চিকিৎসকেরা জানতে পারেন রোগীর কিডনির ভেতরে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটছে বা ভবিষ্যতে কী ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে।

বিশ্বব্যাপী গবেষণা ও ভারতের ভূমিকা
এই ডিজিটাল-টুইন কিডনি মডেল নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছেন বিশ্বের নামী শিক্ষা ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলি। আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অফ ভার্জিনিয়া এবং ভারতের আইআইটি দিল্লি ও দিল্লি এমস-এর চিকিৎসক ও গবেষকেরা যৌথভাবে এই প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছেন। এটি শুধুমাত্র একটি দেশের গবেষণা নয়, বরং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় তৈরি হওয়া এক আধুনিক চিকিৎসা উদ্যোগ।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করে গবেষকেরা এমন একটি সিস্টেম তৈরি করছেন, যা প্রতিটি রোগীর কিডনির আলাদা আলাদা ডিজিটাল সংস্করণ বানাতে পারে। ফলে একেক জন রোগীর জন্য আলাদা চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব হবে।

ডিজিটাল কিডনি কীভাবে কাজ করে
ডিজিটাল-টুইন কিডনি মডেল মূলত একটি সিমুলেশন সিস্টেম। অর্থাৎ এটি রোগীর কিডনির বাস্তব আচরণ কম্পিউটারের মধ্যে অনুকরণ করে। রোগীর রক্তচাপ বাড়লে কিডনির উপর কী প্রভাব পড়বে, কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ দিলে কিডনির কার্যক্ষমতা বাড়বে না কমবে, শরীরে হরমোনের পরিবর্তন হলে কিডনি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এই ডিজিটাল মডেল থেকে আগেভাগেই পাওয়া যেতে পারে।

এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, চিকিৎসকেরা বাস্তবে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ ওষুধ বা চিকিৎসা প্রয়োগ করার আগে ডিজিটাল কিডনির ওপর পরীক্ষা চালাতে পারবেন। ফলে রোগীর শরীরে ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা অনেকটাই কমে যাবে।

ভবিষ্যতের চিকিৎসায় সম্ভাব্য বিপ্লব
ডিজিটাল-টুইন প্রযুক্তি কেবল কিডনির ক্ষেত্রেই নয়, ভবিষ্যতে হৃদ্‌যন্ত্র, ফুসফুস, লিভারসহ অন্যান্য অঙ্গের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসা বা পার্সোনালাইজড মেডিসিন বাস্তব রূপ পেতে পারে। অর্থাৎ একেক জন মানুষের শরীরের জন্য আলাদা আলাদা চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরি করা সম্ভব হবে।

news image
আরও খবর

কিডনি রোগের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কিডনি ধীরে ধীরে বিকল হয় এবং শুরুতে লক্ষণ ধরা পড়ে না। ডিজিটাল কিডনি মডেলের মাধ্যমে আগেভাগেই রোগের পূর্বাভাস পাওয়া গেলে রোগীর জীবন বাঁচানো সহজ হবে এবং ডায়ালিসিস বা প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন অনেকটাই কমে যেতে পারে।

চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা
যদিও ডিজিটাল-টুইন প্রযুক্তি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক, তবে এটি এখনও গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে। বিপুল পরিমাণ স্বাস্থ্য ডেটা সংগ্রহ, রোগীর ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, অ্যালগরিদমের নির্ভুলতা এবং প্রযুক্তির খরচ—এসবই বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া, সব ধরনের রোগীর জন্য সমানভাবে কার্যকর হতে গেলে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।

তবুও চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী এক থেকে দুই দশকের মধ্যে ডিজিটাল-টুইন প্রযুক্তি চিকিৎসাক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলির পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলিতেও এই প্রযুক্তি পৌঁছে গেলে কিডনি রোগে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।

উপসংহার

কিডনি মানবদেহের এমন একটি অঙ্গ, যার গুরুত্ব অনেক সময় আমরা বুঝতে পারি খুব দেরিতে। শরীরের ভেতরে প্রতিনিয়ত যে অসংখ্য জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়া চলে, তার ভারসাম্য রক্ষায় কিডনি নীরবে কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অথচ আধুনিক জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত জল না খাওয়া, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, মানসিক চাপ ও পরিবেশ দূষণের মতো নানা কারণে কিডনি রোগের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ বুঝতে পারে না যে কিডনির কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমছে, কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে কিডনি রোগ প্রায় উপসর্গহীন থাকে। ফলে রোগ শনাক্ত হয় তখন, যখন ক্ষতি অনেকটাই হয়ে গেছে।

এই পরিস্থিতিতে ডিজিটাল-টুইন মডেলের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর প্রযুক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য এক যুগান্তকারী সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। কেবল রোগ শনাক্ত নয়, রোগের ভবিষ্যৎ গতিপথ, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, শরীরের প্রতিক্রিয়া—সবকিছুর পূর্বাভাস দিতে পারা মানে চিকিৎসাকে সম্পূর্ণ নতুন স্তরে নিয়ে যাওয়া। এতদিন চিকিৎসকেরা অভিজ্ঞতা, পরীক্ষার রিপোর্ট এবং সাধারণ গাইডলাইনের উপর নির্ভর করে চিকিৎসা দিতেন। কিন্তু ডিজিটাল টুইন প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদা ডিজিটাল কিডনি তৈরি করে একেবারে ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব হতে চলেছে।

এই প্রযুক্তি সফল হলে কিডনি রোগের চিকিৎসা পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আসতে পারে। ডায়ালিসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপনের মতো ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসার ওপর নির্ভরতা কমে যেতে পারে। আগেভাগেই রোগ শনাক্ত হলে জীবনযাত্রার পরিবর্তন, সঠিক ওষুধ ও সময়মতো চিকিৎসার মাধ্যমে কিডনির কার্যক্ষমতা অনেক বছর ধরে বজায় রাখা সম্ভব হবে। ফলে রোগীর জীবনমান উন্নত হবে এবং চিকিৎসা খরচও অনেকাংশে কমবে।

তবে একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, এই প্রযুক্তি এখনও গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে। বাস্তব চিকিৎসাক্ষেত্রে প্রয়োগের আগে আরও বহু পরীক্ষানিরীক্ষা, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এবং নৈতিক দিকের মূল্যায়ন প্রয়োজন। রোগীর ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য তথ্যের সুরক্ষা, ডেটার গোপনীয়তা, প্রযুক্তির নির্ভুলতা এবং সহজলভ্যতা—এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত দেশগুলিতে এই প্রযুক্তি দ্রুত পৌঁছালেও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে তা সহজলভ্য করতে বড় ধরনের অবকাঠামোগত ও নীতিগত পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে।

তবুও বলা যায়, ডিজিটাল-টুইন মডেল ভবিষ্যতের চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক বিপ্লবী দিকনির্দেশ। কেবল কিডনি নয়, ভবিষ্যতে হৃদ্‌যন্ত্র, লিভার, ফুসফুস, এমনকি পুরো মানবদেহের ডিজিটাল প্রতিরূপ তৈরি করে চিকিৎসার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা সম্ভব হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা ও আধুনিক কম্পিউটিং শক্তির যুগে দাঁড়িয়ে মানবস্বাস্থ্যের এমন ব্যক্তিকেন্দ্রিক, পূর্বাভাসভিত্তিক চিকিৎসা একসময় বাস্তব হয়ে উঠতে পারে।

অতএব, কিডনি রোগের মতো প্রাণঘাতী সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ডিজিটাল-টুইন প্রযুক্তি মানবজাতির জন্য এক নতুন আশার আলো। বিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণা, চিকিৎসকদের বাস্তব প্রয়োগ এবং সমাজের সচেতনতা মিলেই এই প্রযুক্তিকে সফল করে তুলতে পারে। ভবিষ্যতে যদি প্রতিটি মানুষের শরীরের জন্য একটি করে ডিজিটাল কপি তৈরি করা সম্ভব হয়, তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান শুধু রোগ সারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না—বরং রোগ হওয়া রোধ করাই হবে তার প্রধান লক্ষ্য। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এটি হতে পারে স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের এক নতুন যুগের সূচনা, যেখানে প্রযুক্তি ও মানবজীবনের সমন্বয়ে দীর্ঘ, সুস্থ ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

Preview image