মাসকয়েক আগে লেখিকা শোভা দে জানান, শিল্পার রেস্তরাঁর দৈনিক আয় নাকি ২ কোটি। সপ্তাহান্তে সেই আয় পৌঁছে যায় ৩ কোটির কাছাকাছি। সত্যি কি তাই?
মুম্বইয়ের বিলাসবহুল রেস্তরাঁ জগতের অন্যতম আলোচিত নাম ‘বাস্টিয়ান’। বলিউড তারকা শিল্পা শেট্টি-র সঙ্গে যুক্ত এই রেস্তরাঁ প্রায়ই উঠে আসে খবরের শিরোনামে—কখনও তার জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের জন্য, কখনও অতিথি তালিকার তারকাখচিত উপস্থিতির কারণে, আবার কখনও আর্থিক সাফল্য নিয়ে চর্চার সূত্র ধরে। সম্প্রতি রেস্তরাঁটির দৈনিক আয় নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর দাবি ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘বাস্টিয়ান’।
মুম্বই শহর বরাবরই ভারতের বিনোদন ও বাণিজ্য জগতের কেন্দ্র। সেই শহরেরই অন্যতম অভিজাত অঞ্চলে অবস্থিত ‘বাস্টিয়ান’ যেন আধুনিক নাইটলাইফের এক নতুন সংজ্ঞা। প্রায় ২১ হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই রেস্তরাঁর অবস্থান এমন এক উচ্চতায়, যেখান থেকে শহরের বিস্তীর্ণ দৃশ্য চোখে পড়ে। কাচঘেরা দেয়াল, মনোরম আলোকসজ্জা, আন্তর্জাতিক মানের ইন্টিরিয়র ডিজাইন—সব মিলিয়ে এটি কেবল খাবারের জায়গা নয়, বরং এক অভিজ্ঞতা।
এখানে প্রায়ই আয়োজিত হয় কর্পোরেট পার্টি, সেলিব্রিটি গেট-টুগেদার, ফ্যাশন লঞ্চ কিংবা ব্যক্তিগত উৎসব। সম্প্রতি বলিউড অভিনেত্রী সোনাক্ষী সিন্হা এবং অভিনেতা জ়াহির ইকবাল-এর বিয়ের প্রীতিভোজও অনুষ্ঠিত হয় এই রেস্তরাঁয়। সেই অনুষ্ঠান ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবির বন্যা বয়ে যায়, যা ‘বাস্টিয়ান’-এর জনপ্রিয়তাকে আরও কয়েক ধাপ উপরে তুলে দেয়।
কয়েক মাস আগে লেখিকা শোভা দে ‘বাস্টিয়ান’ ঘুরে এসে এক সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেন যে রেস্তরাঁটির দৈনিক আয় নাকি ২ কোটি টাকা, আর সপ্তাহান্তে তা ৩ কোটির কাছাকাছি পৌঁছে যায়। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে এক বিলাসী পরিবেশের ছবি—যেখানে অতিথিরা বহু কোটি টাকার গাড়িতে এসে নামছেন, প্রিমিয়াম পানীয় উপভোগ করছেন এবং মুহূর্তে লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করছেন।
শোভা দে-র এই মন্তব্য দ্রুত ভাইরাল হয়। সোশ্যাল মিডিয়া এবং সংবাদমাধ্যমে শুরু হয় তুমুল আলোচনা। অনেকেই বিস্মিত হন এই বিপুল অঙ্ক শুনে। কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, সত্যিই কি একটি রেস্তরাঁর দৈনিক আয় এত হতে পারে?
‘বাস্টিয়ান’-এর মালিকানা এককভাবে শিল্পা শেট্টির নয়। তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদার হলেন উদ্যোক্তা রণজিৎ বিন্দ্রা। জানা যায়, এই উদ্যোগে শিল্পা ও রণজিৎ—দু’জনেরই ৫০ শতাংশ করে অংশীদারিত্ব রয়েছে।
শিল্পা নিজেই জানিয়েছেন, প্রথমে তিনি এই রেস্তরাঁর একজন গ্রাহক ছিলেন। সেই সময় রণজিৎ তাঁর সঙ্গে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা শেয়ার করেন—বিশেষ করে ওরলিতে নতুন আউটলেট খোলার পরিকল্পনা। ব্যবসার সম্ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি শিল্পার ভালো লাগে। এরপরই তিনি অংশীদার হিসেবে যুক্ত হন।
অতিমারির কঠিন সময়েই ‘বাস্টিয়ান’-এর নতুন শাখা চালু হয়। যখন অধিকাংশ রেস্তরাঁ বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল বা লোকসানে চলছিল, তখন এমন এক ঝুঁকি নেওয়া ছিল যথেষ্ট সাহসের বিষয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সিদ্ধান্তই হয়ে ওঠে সাফল্যের সোপান।
লকডাউন-পরবর্তী সময়ে মানুষ যখন আবার বাইরে বেরোতে শুরু করেন, তখন প্রিমিয়াম ডাইনিং স্পেসের চাহিদা দ্রুত বাড়ে। ‘বাস্টিয়ান’ সেই চাহিদাকে সঠিকভাবে ধরতে পেরেছিল। উচ্চমানের খাবার, বিশ্বমানের সেবা এবং সেলিব্রিটি আকর্ষণ—সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে শহরের ‘হটস্পট’।
তবে দৈনিক ২ কোটি টাকার আয়ের দাবি নিয়ে সরাসরি প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন রণজিৎ বিন্দ্রা। তিনি রসিকতার সুরে বলেন, তিনিও শুনেছেন এমন কথা। “ইশ্! যদি সত্যি হত,”—এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে শোভা দে-র দাবি বাস্তবের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। তবে তিনি এটাও জানান, একদিন হয়তো সেই লক্ষ্য পূরণ হবে।
এই বক্তব্যে যেমন বিনয়ের ছাপ রয়েছে, তেমনই রয়েছে আত্মবিশ্বাসের ইঙ্গিত। ব্যবসায়িক দুনিয়ায় প্রায়ই সংখ্যার অতিরঞ্জন ঘটে, বিশেষ করে যখন তা সেলিব্রিটি-সংযুক্ত উদ্যোগের ক্ষেত্রে হয়। রণজিৎ বাস্তবতা মেনে নিয়েও ভবিষ্যতের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন।
রণজিৎ বিন্দ্রা এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন, শিল্পা ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার পর থেকেই রেস্তরাঁর ভাগ্য যেন বদলে যায়। তাঁর জনপ্রিয়তা, জনসংযোগ ক্ষমতা এবং ব্র্যান্ড ভ্যালু ‘বাস্টিয়ান’-কে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
শিল্পা শেট্টি বরাবরই ফিটনেস, স্বাস্থ্য এবং লাইফস্টাইল আইকন হিসেবে পরিচিত। তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপুল অনুসারীসংখ্যা রেস্তরাঁটির প্রচারে বড় ভূমিকা রেখেছে। ফলে এটি শুধু একটি খাবারের জায়গা নয়, বরং এক ‘লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড’ হয়ে উঠেছে।
দৈনিক কয়েক কোটি টাকার আয়ের দাবি শুনতে যতই চমকপ্রদ হোক না কেন, রেস্তরাঁ ব্যবসার বাস্তব চিত্র অনেক জটিল। ভাড়া, কর্মচারীর বেতন, কাঁচামালের খরচ, রক্ষণাবেক্ষণ, লাইসেন্স ফি—সব মিলিয়ে ব্যয়ও বিপুল। ফলে মোট আয় এবং প্রকৃত লাভের মধ্যে বড় ফারাক থাকতে পারে।
তবে এটাও অস্বীকার করা যায় না যে ‘বাস্টিয়ান’ মুম্বইয়ের উচ্চবিত্ত সমাজের কাছে একটি মর্যাদাপূর্ণ ঠিকানা। এখানে ডাইনিং করা মানে কেবল খাবার নয়, বরং সামাজিক অবস্থানেরও প্রদর্শন।
বর্তমানে ‘বাস্টিয়ান’ একাধিক আউটলেট নিয়ে কাজ করছে। ব্যবসার সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। রেস্তরাঁ শিল্পে ব্র্যান্ড ভ্যালু এবং অভিজ্ঞতা—এই দুই বিষয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেই দিক থেকে ‘বাস্টিয়ান’ ইতিমধ্যেই একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
রণজিৎ বিন্দ্রার কথায়, হয়তো আজ ২ কোটি দৈনিক আয় বাস্তব নয়, কিন্তু ভবিষ্যতে তা অসম্ভবও নয়। এই আত্মবিশ্বাসই একটি ব্যবসাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়।
সব মিলিয়ে ‘বাস্টিয়ান’কে ঘিরে যে আলোচনার ঝড় উঠেছে, তা নিছক একটি রেস্তরাঁর আর্থিক হিসাব-নিকাশের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়—এটি আসলে আমাদের সময়ের এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। যখন কোনও ব্যবসার সঙ্গে তারকার নাম জড়িয়ে যায়, তখন সেটি কেবল একটি পরিষেবা নয়, বরং একটি ব্র্যান্ডে পরিণত হয়। শিল্পা শেট্টি-র জনপ্রিয়তা, তাঁর সুপরিচিত লাইফস্টাইল ইমেজ এবং সামাজিক মাধ্যমে বিপুল উপস্থিতি ‘বাস্টিয়ান’-কে এক অন্য মাত্রা দিয়েছে। ফলে এই রেস্তরাঁকে ঘিরে সাধারণ কৌতূহলও হয়ে উঠেছে অসাধারণ।
দৈনিক আয় ২ কোটি কিংবা সপ্তাহান্তে ৩ কোটি—এই ধরনের অঙ্ক শুনলেই স্বাভাবিকভাবেই চমক লাগে। কিন্তু ব্যবসার বাস্তব জগৎ শুধুমাত্র মোট আয়ের ওপর নির্ভর করে না; সেখানে থাকে বিপুল বিনিয়োগ, পরিচালন খরচ, কর্মী ব্যবস্থাপনা, বিপণন, লাইসেন্সিং, রক্ষণাবেক্ষণ—অসংখ্য উপাদান। উদ্যোক্তা রণজিৎ বিন্দ্রা যেভাবে রসিকতার সুরে এই দাবি উড়িয়ে দিয়ে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার কথা বলেছেন, তাতে স্পষ্ট—তিনি বাস্তববাদী হলেও উচ্চাকাঙ্ক্ষী। এই দুইয়ের সমন্বয়ই একটি উদ্যোগকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখে।
অন্যদিকে, লেখিকা শোভা দে-র মন্তব্যও এক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে বিলাসী অতিথি, প্রিমিয়াম গাড়ি, উচ্চমূল্যের পানীয়—যা ‘বাস্টিয়ান’-এর অভিজাত পরিবেশকে আরও দৃশ্যমান করে। হয়তো সেই অভিজ্ঞতার আবেগ থেকেই আয় নিয়ে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে। কিন্তু তর্ক-বিতর্কের মধ্যেই যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হল—রেস্তরাঁটি ইতিমধ্যেই শহরের সামাজিক মানচিত্রে একটি প্রভাবশালী স্থান দখল করে নিয়েছে।
এখানে সেলিব্রিটি প্রীতিভোজ, কর্পোরেট পার্টি কিংবা বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন ‘বাস্টিয়ান’-কে কেবল খাবারের জায়গা হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেনি। এটি হয়ে উঠেছে এক মিলনমঞ্চ—যেখানে বিনোদন, ব্যবসা ও বিলাসিতা মিলেমিশে যায়। এমনকি অতিমারির কঠিন সময় পেরিয়েও দ্রুত সাফল্য পাওয়া এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা ও ব্র্যান্ড কৌশল থাকলে চ্যালেঞ্জকেও সুযোগে বদলে দেওয়া যায়।
সবচেয়ে বড় কথা, ‘বাস্টিয়ান’ এখন কেবল একটি রেস্তরাঁ নয়—এটি এক প্রতীক। আধুনিক নগরজীবনের ভোগ-বিলাস, সামাজিক অবস্থান, সেলিব্রিটি সংস্কৃতি এবং উদ্যোক্তা মনোভাব—সবকিছুর সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি যেন এই জায়গা। আয়ের অঙ্ক যাই হোক না কেন, আলোচনার কেন্দ্রে থাকার ক্ষমতাই প্রমাণ করে এর প্রভাব কতটা গভীর।
সম্ভবত একদিন দৈনিক ২ কোটির সেই স্বপ্নও বাস্তব হবে—যেমন আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন রণজিৎ। তবে তার আগেই ‘বাস্টিয়ান’ ইতিমধ্যেই নিজের জায়গা পাকা করে ফেলেছে মুম্বইয়ের বিলাসবহুল আতিথেয়তা শিল্পে। আর সেই সাফল্যের গল্পই আজ আলোচনার মূল বিষয়—অঙ্কের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে ব্র্যান্ডের শক্তি, দৃষ্টিভঙ্গির সাহস এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা।