Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

চরিত্র বদলাচ্ছে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস একাধিক উপরূপকে জব্দ করতে নতুন টিকা তৈরি করলেন বিজ্ঞানীরা

শীত এলেই ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ বাড়ে, সে ধারণা এখন অতীত। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস এত দ্রুত তার চরিত্র বদলে ফেলছে, যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-ও রীতিমতো উদ্বিগ্ন। ভাইরাসের জিনে রাসায়নিক বদল চলছে। তাই পুরনো টিকাও আর তেমন ভাবে কাজ করছে না।

কাশি-জ্বর দীর্ঘদিন থাকলে সতর্ক হোন! ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের নতুন রূপ নিয়ে উদ্বেগ, আসছে নতুন মিউকোজ়াল টিকা

কাশি আর সঙ্গে জ্বর—এই উপসর্গকে আমরা অনেক সময় সাধারণ সর্দি-কাশি বা মৌসুমি অসুখ বলে এড়িয়ে যাই। কিন্তু যদি এই কাশি এবং জ্বর টানা দু’তিন মাস ধরে চলতে থাকে, তা হলে বিষয়টিকে মোটেই হালকা ভাবে নেওয়া উচিত নয়। চিকিৎসক ও গবেষকেরা বারবার সতর্ক করছেন, দীর্ঘদিন ধরে কাশি-জ্বর থাকা মানেই শরীরে কোনও ভাইরাল সংক্রমণ সক্রিয় থাকতে পারে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের বিভিন্ন উপরূপ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর)-এর মতে, দীর্ঘদিন কাশি, জ্বর, গলা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা দুর্বলতা দেখা গেলে তার অন্যতম কারণ হতে পারে ইনফ্লুয়েঞ্জা এ ভাইরাসের এইচ৩এন২ উপরূপ। তবে সমস্যা শুধু এইচ৩এন২-এ সীমাবদ্ধ নেই। গবেষকেরা বলছেন, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের এখন একাধিক উপরূপ সক্রিয় রয়েছে এবং ভাইরাস দ্রুত তার জিনগত গঠন বদলে আরও সংক্রামক হয়ে উঠছে।

কেন বাড়ছে ইনফ্লুয়েঞ্জার ভয়?

বিশ্ব জুড়ে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল দ্রুত মিউটেশন বা চরিত্র বদলানো। ভাইরাসের এই পরিবর্তনের ফলে পুরনো টিকা বা ওষুধ অনেক সময় কার্যকরী থাকে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-ও ইনফ্লুয়েঞ্জা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কারণ, প্রতি বছর ভাইরাসের নতুন রূপ সামনে আসছে এবং সেই অনুযায়ী নতুন টিকা তৈরির প্রয়োজন হচ্ছে। অনেক সময় দেখা যাচ্ছে, আগের বছরে তৈরি টিকা পরের বছরে তেমন কার্যকরী হচ্ছে না। ফলে বিজ্ঞানীদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এমন একটি টিকা তৈরি করা, যা ইনফ্লুয়েঞ্জার সব ধরনের উপরূপকে প্রতিরোধ করতে পারে।

ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস কীভাবে শরীরে আক্রমণ করে?

ইনফ্লুয়েঞ্জা একটি শ্বাসযন্ত্রজনিত ভাইরাস, যা মূলত নাক, গলা এবং ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায়। সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি বা শ্বাসের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে।

ভাইরাস শরীরে ঢোকার পর প্রথমে শ্বাসনালীর কোষে আক্রমণ করে এবং দ্রুত সংখ্যায় বাড়তে থাকে। এর ফলে শরীরে জ্বর, কাশি, গলা ব্যথা, শরীর ব্যথা, ক্লান্তি, মাথা ব্যথা এবং শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া বা ফুসফুসের সংক্রমণও হতে পারে, যা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী মহিলা এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে ইনফ্লুয়েঞ্জা মারাত্মক আকার নিতে পারে।

এইচ৩এন২ উপরূপ কেন বিপজ্জনক?

আইসিএমআর-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ইনফ্লুয়েঞ্জা এ ভাইরাসের এইচ৩এন২ উপরূপ বর্তমানে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। এই ভাইরাসের বিশেষত্ব হল—

  • দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে
  • দীর্ঘদিন কাশি ও জ্বর থাকে
  • দুর্বলতা দীর্ঘ সময় থাকে
  • অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়
  • শ্বাসকষ্ট বাড়তে পারে

চিকিৎসকেরা বলছেন, অনেক রোগীর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, সাধারণ সর্দি-কাশি ভেবে চিকিৎসা শুরু করা হলেও পরে ইনফ্লুয়েঞ্জা ধরা পড়ছে। ফলে রোগ নির্ণয়ে দেরি হলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে।

পুরনো টিকা কেন কাজ করছে না?

গবেষকেরা জানাচ্ছেন, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের গায়ে থাকা প্রোটিনের গঠন দ্রুত বদলে যায়। এই প্রোটিনের পরিবর্তনের কারণে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভাইরাসকে চিনতে পারে না।

পুরনো টিকা মূলত নির্দিষ্ট একটি উপরূপের বিরুদ্ধে কাজ করে। কিন্তু ভাইরাস যদি তার গঠন বদলে ফেলে, তা হলে সেই টিকা আর কার্যকরী থাকে না।

এ কারণেই প্রতি বছর নতুন করে ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা তৈরি করতে হয়।

নতুন আশার আলো: নভেল মিউকোজ়াল টিকা

এই পরিস্থিতিতে আমেরিকার জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা একটি নতুন ধরনের টিকা তৈরি করেছেন, যা ইনফ্লুয়েঞ্জার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুন আশা জাগিয়েছে।

গবেষকেরা তৈরি করেছেন একটি নভেল মিউকোজ়াল ভ্যাকসিন, যা শরীরের শ্বাসনালীর মিউকোজ়াল স্তরে সরাসরি প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে পারে।

এই টিকার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল—

  • ইনফ্লুয়েঞ্জার সব ধরনের উপরূপকে প্রতিরোধ করতে পারে
  • শ্বাসনালীর ভিতরেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করে
  • দ্রুত কাজ করতে পারে
  • ভবিষ্যতের ভাইরাসের বিরুদ্ধেও কার্যকরী হতে পারে

মিউকোজ়াল টিকা কী?

মিউকোজ়াল টিকা এমন একটি ভ্যাকসিন, যা শরীরের মিউকাস মেমব্রেনে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে।

নাক, গলা এবং শ্বাসনালীর ভিতরে যে মিউকাস স্তর থাকে, সেটিই ভাইরাসের প্রথম আক্রমণের জায়গা।

এই টিকা সরাসরি সেই জায়গাতেই প্রতিরোধ তৈরি করে, ফলে ভাইরাস শরীরে ঢোকার আগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।

গবেষকেরা বলছেন, এই ধরনের টিকা ভবিষ্যতে শ্বাসযন্ত্রের সব ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকরী হতে পারে।

শুধু ইনফ্লুয়েঞ্জা নয়, আরও ভাইরাসে কাজ করবে

গবেষকেরা দাবি করেছেন, এই মিউকোজ়াল টিকা শুধু ইনফ্লুয়েঞ্জা নয়, শ্বাসযন্ত্রের অন্যান্য ভাইরাসের বিরুদ্ধেও কাজ করতে পারে।

যেমন—

news image
আরও খবর
  • করোনাভাইরাস
  • রেসপিরেটরি ভাইরাস
  • নিউমোনিয়া সৃষ্টিকারী ভাইরাস
  • মৌসুমি ফ্লু ভাইরাস

যদি এই গবেষণা সফল হয়, তা হলে ভবিষ্যতে একটি ইউনিভার্সাল ভ্যাকসিন তৈরি করা সম্ভব হবে, যা একাধিক ভাইরাসকে একসঙ্গে প্রতিরোধ করতে পারবে।

কেন এই টিকা গুরুত্বপূর্ণ?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রের ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

কোভিড-১৯ মহামারির পরে বিশ্ব আরও সচেতন হয়েছে যে, একটি ভাইরাস কত দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এই পরিস্থিতিতে এমন একটি টিকা তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা—

  • দ্রুত প্রতিরোধ তৈরি করবে
  • নতুন ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করবে
  • মহামারি প্রতিরোধে সাহায্য করবে

গবেষণা কতটা এগিয়েছে?

জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা জানিয়েছেন, এই টিকা নিয়ে পরীক্ষাগারে ইতিমধ্যেই সফল ফল পাওয়া গেছে।

প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা গেছে—

  • টিকা ভাইরাসের সংক্রমণ কমিয়েছে
  • শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়েছে
  • শ্বাসনালীকে সুরক্ষিত করেছে

এখন এই টিকার আরও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন, যাতে মানুষের উপর এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা যায়।

ভারতে এর প্রভাব কী হতে পারে?

ভারতে প্রতি বছর ইনফ্লুয়েঞ্জার সংক্রমণ দেখা যায়। বিশেষ করে শীত এবং বর্ষার সময়ে ফ্লু ছড়িয়ে পড়ে।

যদি এই নতুন টিকা সফল হয়, তা হলে ভারতের মতো জনবহুল দেশে এটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

কারণ—

  • দ্রুত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে
  • হাসপাতালে ভর্তি কমবে
  • মৃত্যুর হার কমবে
  • স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর চাপ কমবে

দীর্ঘদিন কাশি-জ্বর থাকলে কী করবেন?

চিকিৎসকেরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন—

  • ৫ দিনের বেশি জ্বর থাকলে চিকিৎসকের কাছে যান
  • কাশি দীর্ঘদিন থাকলে পরীক্ষা করুন
  • শ্বাসকষ্ট হলে দেরি করবেন না
  • মাস্ক ব্যবহার করুন
  • ভিড় এড়িয়ে চলুন
  • হাত পরিষ্কার রাখুন
  • ফ্লু টিকা নিন

প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় অস্ত্র

ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে সচেতনতা এবং প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে সংক্রমণ অনেকটাই কমানো সম্ভব।

যেমন—

  • নিয়মিত হাত ধোয়া
  • মাস্ক ব্যবহার
  • অসুস্থ হলে বাড়িতে থাকা
  • সঠিক চিকিৎসা নেওয়া
  • টিকা নেওয়া

ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে

বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা এখন এমন একটি ইউনিভার্সাল ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা করছেন, যা সব ধরনের ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে পারবে।

জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির এই নতুন মিউকোজ়াল টিকা সেই দিকেই একটি বড় পদক্ষেপ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

উপসংহার

কাশি ও জ্বরকে কখনও হালকা ভাবে নেওয়া উচিত নয়, বিশেষ করে যদি তা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস দ্রুত তার রূপ বদলাচ্ছে এবং নতুন নতুন উপরূপ তৈরি হচ্ছে, যা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। পুরনো টিকা বা ওষুধ সব সময় কার্যকরী না হওয়ায় নতুন প্রতিষেধক তৈরির প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকদের তৈরি নভেল মিউকোজ়াল টিকা নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। শুধু ইনফ্লুয়েঞ্জা নয়, শ্বাসযন্ত্রের বিভিন্ন ভাইরাসের বিরুদ্ধে এই টিকা ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা নিতে পারে।

তবে টিকা তৈরি হলেও সচেতনতা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘদিন কাশি-জ্বর থাকলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ সময়মতো চিকিৎসা নিলে বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব।

ভবিষ্যতে যদি এই নতুন টিকা সফল হয়, তা হলে ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধে বিশ্ব এক নতুন দিগন্তের দিকে এগোবে—এমনটাই আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।

যদি এই টিকা সফল হয়, তা হলে ভবিষ্যতে ইনফ্লুয়েঞ্জা আর বড় আতঙ্ক হয়ে থাকবে না।

Preview image