প্রায় ১৬০ বছর আগে আবিষ্কৃত প্রোটোট্যাক্সাইট নামের এই রহস্যময় বিশালদেহী জীবেরা আজও বিজ্ঞানীদের কাছে অজানা—প্রাণী, উদ্ভিদ বা ছত্রাক কোনোটাই নয় বলে ধরা হচ্ছে।
প্রায় ৪০ কোটি বছর আগের পৃথিবী কেমন ছিল, তা কল্পনা করাই কঠিন। আজকের মতো নীল আকাশ, সবুজ বনভূমি, প্রাণীতে ভরা পৃথিবী তখনও গড়ে ওঠেনি। মানুষ তো দূরের কথা, ডাইনোসরদেরও তখন অস্তিত্ব ছিল না। তবুও সেই আদিম পৃথিবীতেই ঘুরে বেড়াত বা দাঁড়িয়ে থাকত এমন কিছু রহস্যময় জীব, যাদের পরিচয় আজও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। তারা প্রাণী নয়, উদ্ভিদ নয়, এমনকি ছত্রাকও নয়। বহুকোষী হলেও জীববিজ্ঞানের পরিচিত কোনও শ্রেণির মধ্যেই তাদের ফেলা যাচ্ছে না।
এই রহস্যময় জীবগুলির নাম — প্রোটোট্যাক্সাইট (Prototaxites)। বিশালদেহী, লম্বাটে পাইপের মতো গঠন, প্রায় ৩০ ফুট উঁচু, চওড়ায় প্রায় ৬ ফুট — মানুষের তুলনায় চার-পাঁচ গুণ উঁচু এই জীবেরা এক সময় পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে ছড়িয়ে ছিল বলে জীবাশ্ম গবেষণায় জানা যায়। কিন্তু তারা কীভাবে বেঁচে থাকত, কীভাবে খাদ্য সংগ্রহ করত, চলাফেরা করতে পারত কি না, কিংবা তারা আদৌ কোন জীবগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত — এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও বিজ্ঞানীদের কাছে অজানা।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এই ধোঁয়াশা আরও গভীর হয়েছে। বরং এত দিন যে ধারণাগুলি প্রচলিত ছিল, সেগুলিকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিতে করা বিশ্লেষণ। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রোটোট্যাক্সাইট সম্ভবত পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের ইতিহাসে এমন এক সম্পূর্ণ ভিন্ন শাখার প্রতিনিধি, যে গোত্র আজ আর অস্তিত্বেই নেই।
এই প্রতিবেদনে জানব প্রোটোট্যাক্সাইট কী, কোথায় পাওয়া গেছে এদের জীবাশ্ম, কেন এরা এত গুরুত্বপূর্ণ, এবং কেন আধুনিক বিজ্ঞান এখনও নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে না—এরা আসলে কী ছিল।
? পৃথিবীর আদিম যুগ: যখন জীবন ছিল অন্য রকম
আজ থেকে প্রায় ৪০০ থেকে ৪৩০ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী ছিল একেবারেই আলাদা। ভূতাত্ত্বিক হিসাবে একে বলা হয় ডেভোনিয়ান যুগের শুরুর দিক, যখন স্থলভাগে জীবনের বিস্তার শুরু হলেও তা ছিল সীমিত। ছোট ছোট উদ্ভিদ, শৈবালজাতীয় জীব এবং প্রাথমিক ছত্রাক ছাড়া স্থলে তেমন কিছু ছিল না। প্রাণীদের মধ্যে তখনও মূলত জলচর প্রাণীরাই আধিপত্য বিস্তার করেছিল।
এই সময়েই পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে হঠাৎ করে দেখা দেয় এমন কিছু বিশালাকার জীবাশ্ম কাঠামো, যেগুলি কোনও পরিচিত গাছের কাণ্ডের মতো দেখতে হলেও তাদের ভেতরের গঠন একেবারেই আলাদা। লম্বা, সোজা, প্রায় স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে থাকা এই জীবগুলির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২০ থেকে ৩০ ফুট পর্যন্ত। সেই সময়ের অন্যান্য স্থলজ জীবের তুলনায় তারা ছিল অবিশ্বাস্য রকমের বৃহৎ।
প্রথম দিকে বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন, এগুলি হয়তো আদিম কোনও গাছের কাণ্ড বা বৃহদাকার উদ্ভিদজাতীয় জীবের অবশেষ। কিন্তু পরে গবেষণায় দেখা যায়, এগুলির ভেতরের গঠন কোনও উদ্ভিদের মতো নয়। নেই কাঠের কোষ, নেই ভাস্কুলার টিস্যু, নেই পাতার চিহ্ন। বরং এগুলির গঠন ছিল অসংখ্য পরস্পর-সংযুক্ত টিউবের মতো কাঠামোয় তৈরি — যা অনেকটা ছত্রাকের হাইফার মতো হলেও পুরোপুরি মিলছে না।
এই অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যই প্রোটোট্যাক্সাইটকে জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম রহস্যময় জীব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
? প্রোটোট্যাক্সাইটের আবিষ্কার: ১৬০ বছরের পুরনো রহস্য
আজ থেকে প্রায় ১৬০ বছর আগে, অর্থাৎ উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় প্রথম এই জীবাশ্মগুলির সন্ধান পান বিজ্ঞানীরা। ১৮৫৯ সালে কানাডার কুইবেক অঞ্চলে প্রথমবার এই অদ্ভুত কাঠামোর জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়। জীবাশ্মটির আকৃতি ছিল এতটাই অস্বাভাবিক যে বিজ্ঞানীরা প্রথমে বুঝতেই পারেননি এটি আসলে কী।
এই জীবাশ্মগুলির নাম দেওয়া হয় Prototaxites, যার অর্থ দাঁড়ায় প্রায় “আদিম ইউ (Yew) গাছ” বা প্রাচীন কাঠজাতীয় কিছু। নাম থেকেই বোঝা যায়, প্রথম দিকে একে উদ্ভিদ বলেই ধরে নেওয়া হয়েছিল। অনেক গবেষকই মনে করেছিলেন, এগুলি আসলে কোনও প্রাচীন কনিফার বা পাইন জাতীয় গাছের কাণ্ডের জীবাশ্ম।
কিন্তু যতই মাইক্রোস্কোপিক বিশ্লেষণ এগোতে থাকে, ততই স্পষ্ট হয় — এই কাঠামোর মধ্যে কোনও উদ্ভিদ কোষ নেই। নেই সেলুলোজ দিয়ে তৈরি কোষপ্রাচীর, নেই ভাস্কুলার বান্ডল বা জাইলেম-ফ্লোয়েমের মতো পরিবাহী কলা। পরিবর্তে দেখা যায়, এর ভেতরটা তৈরি অসংখ্য সূক্ষ্ম নলাকার টিউব দিয়ে, যেগুলি একে অপরের সঙ্গে জালিকার মতো যুক্ত।
এই আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের সামনে এক নতুন প্রশ্ন তুলে দেয় — তাহলে এটি কী?
? উদ্ভিদ নয়, প্রাণী নয়, ছত্রাকও নয়?
পৃথিবীর জীবজগতকে সাধারণভাবে পাঁচটি বৃহৎ গোষ্ঠীতে ভাগ করা হয়:
প্রাণী (Animalia)
উদ্ভিদ (Plantae)
ছত্রাক (Fungi)
মোনেরা (Monera)
প্রোটিস্টা (Protista)
কিন্তু প্রোটোট্যাক্সাইটকে কোনওভাবেই এই পাঁচটির কোনও একটির মধ্যেও নির্দিষ্টভাবে ফেলা যাচ্ছে না। কারণ:
এটি প্রাণী নয়, কারণ এর মধ্যে চলাফেরা, স্নায়ুতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র বা পেশির কোনও চিহ্ন নেই।
এটি উদ্ভিদ নয়, কারণ এতে সালোকসংশ্লেষের প্রমাণ নেই, নেই উদ্ভিদ কোষের বৈশিষ্ট্য।
এটি ছত্রাকও নয়, কারণ এর কোষপ্রাচীরের রাসায়নিক গঠন আধুনিক ছত্রাকের মতো নয়।
এটি মোনেরা বা প্রোটিস্টাও নয়, কারণ এটি ছিল বৃহদাকার বহুকোষী জীব, যা ওই দুই গোষ্ঠীর সংজ্ঞার বাইরে।
এই কারণেই প্রোটোট্যাক্সাইটকে জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন এক জীব হিসেবে দেখা হয়, যাকে কোনও পরিচিত শাখার সঙ্গে সহজে যুক্ত করা যায় না।
? লাইকেন তত্ত্ব: ছত্রাক-শৈবালের যুগল জীবন?
একসময় বিজ্ঞানীদের মধ্যে একটি জনপ্রিয় ধারণা ছিল যে প্রোটোট্যাক্সাইট সম্ভবত কোনও লাইকেনজাতীয় জীব। লাইকেন কোনও একক জীব নয় — এটি ছত্রাক ও শৈবালের সহাবস্থানে তৈরি এক যৌথ জীবন ব্যবস্থা। ছত্রাক কাঠামো গড়ে তোলে, আর শৈবাল সালোকসংশ্লেষের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন করে।
লাইকেন তত্ত্বের পক্ষে যুক্তি ছিল — প্রোটোট্যাক্সাইটের ভেতরের নলাকার কাঠামো ছত্রাকের হাইফার মতো, আবার আকারে বিশাল হওয়ায় মনে করা হয়েছিল হয়তো এতে কোনও আলোকসংশ্লেষী অংশও ছিল।
কিন্তু আধুনিক রাসায়নিক বিশ্লেষণ ও আইসোটোপ গবেষণায় দেখা গেছে — প্রোটোট্যাক্সাইট সালোকসংশ্লেষ করতে পারত না। অর্থাৎ এটি লাইকেন হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
এরপর বিজ্ঞানীদের নজর পড়ে ছত্রাকের দিকে।
? ছত্রাক তত্ত্ব: কিন্তু এখানেও সমস্যা
২০০৭ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দাবি করা হয় — প্রোটোট্যাক্সাইট আসলে একটি বিশালদেহী প্রাচীন ছত্রাক। কারণ এর গঠন অনেকটাই ছত্রাকের মতো এবং এটি নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করতে পারত না — বরং পরিবেশ থেকে জৈব পদার্থ শোষণ করত।
কিন্তু এখানেও একাধিক সমস্যা দেখা দেয়।
ছত্রাকের কোষপ্রাচীরে সাধারণত কাইটিন এবং গ্লুকান নামের রাসায়নিক যৌগ পাওয়া যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে — প্রোটোট্যাক্সাইটের জীবাশ্মে এই উপাদানগুলির কোনও নির্দিষ্ট চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
তাছাড়া, আধুনিক ছত্রাক সাধারণত এত বিশাল আকারের হয় না, বিশেষ করে স্থলভাগে দাঁড়িয়ে থাকা ৩০ ফুট লম্বা স্তম্ভাকৃতি কাঠামো তৈরি করার মতো শক্ত কাঠামো তাদের নেই।
এই সব কারণেই বিজ্ঞানীরা আজ আর নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না — প্রোটোট্যাক্সাইট সত্যিই ছত্রাক ছিল কি না।
? সাম্প্রতিক গবেষণা: রহস্য আরও গভীর
২০২৫ সালের শেষ দিকে (সাম্প্রতিক সময়ে) ‘Science Advances’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় প্রোটোট্যাক্সাইট নিয়ে নতুন করে আলোড়ন তৈরি হয়েছে। এই গবেষণাটি পরিচালনা করেন এডেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাশ্মবিদ কোরেন্টিন লোরেন (Corentin Loron) এবং তাঁর গবেষক দল।
তাঁরা স্কটল্যান্ডের উত্তরের রেইনি (Rhynie) অঞ্চলে পাওয়া তিনটি প্রোটোট্যাক্সাইট জীবাশ্মের রাসায়নিক ও অণুগঠনগত বিশ্লেষণ করেন। এই অঞ্চলটি জীবাশ্মবিদদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে প্রায় ৪০ কোটি বছর পুরনো বহু আদিম উদ্ভিদ, ছত্রাক ও ক্ষুদ্র প্রাণীর জীবাশ্ম পাওয়া গেছে।
এই কারণে গবেষকদের কাছে একই সময়কালের অন্যান্য জীবের সঙ্গে প্রোটোট্যাক্সাইটের তুলনা করার সুযোগ তৈরি হয়।
গবেষণার ফলাফল ছিল চমকপ্রদ।
লোরেন ও তাঁর সহকর্মীরা দেখেন:
প্রোটোট্যাক্সাইটের জীবাশ্মে ছত্রাকের মতো কাইটিন বা গ্লুকান ভাঙনের চিহ্ন নেই।
এর কোষগঠন আধুনিক উদ্ভিদ বা ছত্রাকের সঙ্গে সরাসরি মেলে না।
এর রাসায়নিক সিগনেচার অন্য কোনও পরিচিত জীবগোষ্ঠীর সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এই সব তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা উপসংহারে পৌঁছন — প্রোটোট্যাক্সাইট সম্ভবত না উদ্ভিদ, না প্রাণী, না ছত্রাক। বরং এটি ছিল এক সম্পূর্ণ আলাদা গোত্রের বহুকোষী জীব, যে গোত্র এখন পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত।
লোরেন বলেন,
“নতুন তথ্য বিশ্লেষণ করে আমরা বলতে পারি, এগুলি যে কোনও আধুনিক জীবগোষ্ঠীর চেয়ে অনেকটাই আলাদা। এগুলি হয়তো এমন কোনও জীবগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে, যা আজ আর অস্তিত্বেই নেই।”
?️ রেইনি অঞ্চল: আদিম জীবনের এক জানালা
স্কটল্যান্ডের এডেনবার্গ শহর থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত রেইনি (Rhynie) এলাকা জীবাশ্মবিদদের কাছে একটি অমূল্য ভাণ্ডার। এখান থেকে পাওয়া জীবাশ্মগুলিকে একত্রে বলা হয় Rhynie Chert Fossils — পৃথিবীর প্রাচীনতম স্থলজ জীবের অন্যতম নিদর্শন।
এই অঞ্চলে পাওয়া গেছে:
আদিম ভাস্কুলার উদ্ভিদ
প্রাথমিক ছত্রাক
ক্ষুদ্র আর্থ্রোপড জাতীয় প্রাণী
অণুজীবের জীবাশ্ম
এই সমস্ত জীবাশ্মই প্রায় ৪০ কোটি বছরের পুরনো। ফলে প্রোটোট্যাক্সাইটের জীবাশ্মকে এই অন্যান্য জীবাশ্মের সঙ্গে তুলনা করে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়েছে — যা অন্য অনেক জায়গায় সম্ভব নয়।
এই তুলনামূলক গবেষণাই দেখিয়েছে — প্রোটোট্যাক্সাইট সমসাময়িক ছত্রাক বা উদ্ভিদের সঙ্গে খুব বেশি সাদৃশ্য রাখে না।
? সব বিজ্ঞানী একমত নন
তবে সব বিজ্ঞানী এই নতুন গবেষণার সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নন। বিশেষ করে ফ্রান্সের প্যারিসে অবস্থিত ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম-এর অধ্যাপক মার্ক-আন্দ্রে সেলোস (Marc-André Selosse) এই গবেষণা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তাঁর বক্তব্য,
“প্রোটোট্যাক্সাইটের অন্তত ২৫টি ভিন্ন প্রজাতির অস্তিত্বের কথা জানা যায়। কিন্তু এই গবেষণায় মাত্র একটি প্রজাতির উপরেই বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলে এর ভিত্তিতে গোটা গোষ্ঠী সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়।”
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন প্রজাতির প্রোটোট্যাক্সাইটের জীবাশ্ম নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ না করলে, এদের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
এই মতবিরোধই দেখাচ্ছে — প্রোটোট্যাক্সাইট নিয়ে গবেষণা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। বরং নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে প্রতিটি আবিষ্কার।
? এরা কীভাবে বেঁচে থাকত?
প্রোটোট্যাক্সাইটের অন্যতম রহস্য হলো — এরা কীভাবে বেঁচে থাকত?
যেহেতু এরা সালোকসংশ্লেষ করতে পারত না, তাই নিজেদের খাদ্য নিজেরা তৈরি করার ক্ষমতা ছিল না। আবার প্রাণীদের মতো শিকার করে খাবার সংগ্রহের প্রমাণও নেই।
তাই বিজ্ঞানীদের ধারণা — এরা সম্ভবত পরিবেশ থেকে জৈব পদার্থ শোষণ করে বেঁচে থাকত, অনেকটা আধুনিক ছত্রাকের মতো। কিন্তু ছত্রাক হলে তাদের কোষপ্রাচীরের রাসায়নিক গঠন আলাদা হওয়ার কথা, যা এখানে পাওয়া যায়নি।
তাহলে এরা কি মৃত উদ্ভিদ বা অন্যান্য জীবের অবশিষ্টাংশ ভেঙে পুষ্টি গ্রহণ করত? নাকি এরা অন্য কোনও অজানা বিপাকীয় পদ্ধতি ব্যবহার করত? এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি।
? চলাফেরা করতে পারত কি না?
আরেকটি বড় প্রশ্ন — প্রোটোট্যাক্সাইট কি চলাফেরা করতে পারত?
বর্তমান জীবাশ্মগুলির গঠন দেখে মনে হয় — এগুলি মাটির উপর খাঁড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকত, অনেকটা স্তম্ভ বা গাছের মতো। কিন্তু এগুলির কোনও শিকড়ের মতো কাঠামো পাওয়া যায়নি। আবার প্রাণীদের মতো চলাফেরা করার অঙ্গও নেই।
তাই বিজ্ঞানীদের ধারণা — এরা সম্ভবত স্থির অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকত। তবে তারা কীভাবে মাটির সঙ্গে যুক্ত থাকত, কীভাবে নিজেদের ভার বহন করত — সেটিও পরিষ্কার নয়।
? পৃথিবীর প্রথম বিশাল স্থলজ জীব?
প্রোটোট্যাক্সাইটকে অনেক বিজ্ঞানী পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম বিশালাকার স্থলজ জীব বলে মনে করেন। কারণ এদের আবির্ভাব হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন স্থলভাগে অন্য জীবেরা ছিল আকারে খুবই ছোট।
সেই সময়ের উদ্ভিদগুলি সাধারণত কয়েক সেন্টিমিটার বা কয়েক ইঞ্চির বেশি লম্বা হতো না। অথচ প্রোটোট্যাক্সাইট প্রায় ৩০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারত — যা তাকে সেই যুগের স্থলজ পরিবেশে একেবারে আলাদা করে তুলেছিল।
অনেকে মনে করেন, প্রোটোট্যাক্সাইট সম্ভবত সেই সময়ের বাস্তুতন্ত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত — হয়তো মৃত জৈব পদার্থ ভাঙতে সাহায্য করত, কিংবা পরিবেশের রাসায়নিক ভারসাম্য বজায় রাখতে ভূমিকা রাখত।
? বিবর্তনের ইতিহাসে প্রোটোট্যাক্সাইটের গুরুত্ব
প্রোটোট্যাক্সাইট শুধু একটি রহস্যময় জীবই নয় — এটি বিবর্তনের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যদি প্রোটোট্যাক্সাইট সত্যিই কোনও পরিচিত গোত্রের অন্তর্ভুক্ত না হয়ে থাকে, তবে এর মানে দাঁড়ায় — পৃথিবীতে একসময় এমন এক বৃহৎ বহুকোষী জীবগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ছিল, যারা পরবর্তীকালে সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং আধুনিক জীবজগতে তাদের কোনও প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকার নেই।
এটি আমাদের শেখায় যে বিবর্তনের ইতিহাস সরলরৈখিক নয়। বহু শাখা তৈরি হয়েছে, বহু শাখা আবার হারিয়ে গেছে। আজকের পৃথিবীতে যে জীবগোষ্ঠীগুলি টিকে আছে, তারা হয়তো অতীতের সম্ভাবনার কেবল একটি ক্ষুদ্র অংশমাত্র।
প্রোটোট্যাক্সাইট সেই হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনাগুলির এক জীবন্ত (বা বলা ভালো, জীবাশ্মে সংরক্ষিত) নিদর্শন।
? ভবিষ্যতের গবেষণা: রহস্য কি আদৌ কাটবে?
বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে প্রোটোট্যাক্সাইটের জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে:
উন্নত আইসোটোপ বিশ্লেষণ
উন্নত অণুগঠনগত স্ক্যানিং
আরও বেশি সংখ্যক জীবাশ্ম নমুনার তুলনামূলক গবেষণা
এই সব পদ্ধতির মাধ্যমে হয়তো একদিন নিশ্চিতভাবে বলা যাবে — প্রোটোট্যাক্সাইট আসলে কোন গোত্রের জীব ছিল, কিংবা আদৌ কোনও পরিচিত গোত্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল কি না।
তবে এটাও সম্ভব — প্রোটোট্যাক্সাইট এমনই এক জীবগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, যাদের কোনও আধুনিক সমতুল্য নেই। সে ক্ষেত্রে এই রহস্য হয়তো কখনও পুরোপুরি উন্মোচিত হবে না।