Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

দানবীর মন্মথ পালের স্মরণে অমরপুরে শুরু কৃষি-শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও হস্তশিল্প মেলা

অমরপুর নজরুল সংঘের উদ্যোগে দানবীর রায় বাহাদুর মন্মথ পালের স্মরণে শুরু হলো সাত দিনব্যাপী কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্প, সংস্কৃতি ও হস্তশিল্প মেলা। জেলা পরিষদের সভাপতি শ্যামা প্রসন্ন লোহার মেলার শুভ উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী দিনেই ২০০ জনের অংশগ্রহণে মেগা রক্তদান শিবির উৎসবের রূপ নেয়।

অমরপুরে মানবতা, কৃষি ও সংস্কৃতির মিলনমেলা

দানবীর রায় বাহাদুর মন্মথ পালের স্মরণে নজরুল সংঘের উদ্যোগে সাত দিনব্যাপী সৃজনী কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্প, সংস্কৃতি ও হস্তশিল্প মেলার শুভ সূচনা

গ্রাম বাংলার মাটিতে আজও যে মানবতা, ঐক্য এবং সংস্কৃতির শিকড় কতটা গভীরে প্রোথিত—তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠল পূর্ব বর্ধমান জেলার জামালপুর ব্লকের অমরপুর। দানবীর রায় বাহাদুর মন্মথ পালের স্মরণে অমরপুর নজরুল সংঘের পরিচালনায় আজ থেকে শুরু হলো সাত দিনব্যাপী সৃজনী কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্প, সংস্কৃতি ও হস্তশিল্প মেলা। এই মেলা শুধু একটি প্রদর্শনী বা বিনোদনের আয়োজন নয়, বরং এটি এক অনন্য সামাজিক আন্দোলন—যেখানে কৃষি, মানবিকতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও গ্রামীণ শিল্প এক সুতোয় গাঁথা। এই মেলা শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি দর্শন। যেখানে কৃষক সম্মানিত, নারী সাহসী, যুবসমাজ সক্রিয় এবং সংস্কৃতি জীবন্ত।

প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে শুভ উদ্বোধন

আজ সকালে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আবহে প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে মেলার শুভ উদ্বোধন করেন জেলা পরিষদের সভাপতি শ্যামা প্রসন্ন লোহার। তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি পূর্ণিমা মালিক, সহ সভাপতি ভূতনাথ মালিক, জামালপুর ব্লকের বিডিও পার্থ সারথী দে, পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ মেহেমুদ খাঁন, জামালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক কৃপাসিন্ধু ঘোষ, ব্লকের কৃষি আধিকারিক বিপাশা দাস, জেলা পরিষদের সদস্য শোভা দে ও কল্পনা সাঁতরা, বিশিষ্ট সমাজসেবী তাবারক আলী মন্ডল, তপন দে সহ বিভিন্ন পঞ্চায়েতের প্রধান, উপপ্রধান এবং বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

উদ্বোধনী মুহূর্তেই গোটা মেলা প্রাঙ্গণ এক উৎসবের চেহারা নেয়। ঢাক, উলুধ্বনি, মঙ্গলাচরণ এবং অতিথিদের উষ্ণ সংবর্ধনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এই মেলা শুধু প্রশাসনিক বা সাংগঠনিক কর্মসূচি নয়, এটি মানুষের হৃদয়ের উৎসব।

রায় বাহাদুর মন্মথ পাল ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁর জীবনদর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানবকল্যাণ। শিক্ষা বিস্তার, দরিদ্রের পাশে দাঁড়ানো, অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা সহায়তা—সব ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়। অমরপুরের এই মেলা তাঁর সেই আদর্শকেই বাস্তবে রূপ দেওয়ার এক প্রয়াস।

মেলার আয়োজকেরা জানিয়েছেন, মন্মথ পালের নাম শুধু স্মরণ করার জন্য নয়, তাঁর চিন্তাধারা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াই এই মেলার মূল উদ্দেশ্য।

নজরুল সংঘ ও মেলার মূল উদ্যোক্তা

এই বিশাল আয়োজনের মূল কারিগর অমরপুর নজরুল সংঘ এবং মেলার প্রধান উদ্যোক্তা শেখ মিন্টু। দীর্ঘদিন ধরে সমাজসেবামূলক কাজ, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং গ্রামীণ উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত নজরুল সংঘ আবারও প্রমাণ করল—সংগঠনের সদিচ্ছা থাকলে গ্রামবাংলা থেকেই বৃহৎ সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা করা সম্ভব।

সংঘের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দানবীর মন্মথ পালের আদর্শ—মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশের উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা—এই মেলার মূল প্রেরণা। সেই আদর্শকে সামনে রেখেই মেলার প্রতিটি দিক পরিকল্পনা করা হয়েছে।

উদ্বোধনী দিনেই মেগা রক্তদান শিবির

এই মেলার অন্যতম বড় আকর্ষণ ও সামাজিক বার্তা বহনকারী কর্মসূচি ছিল উদ্বোধনী দিনের মেগা রক্তদান শিবির। পুরুষ ও মহিলা মিলিয়ে মোট ২০০ জন রক্তদাতা স্বেচ্ছায় রক্তদান করেন। এর মধ্যে ১০০ জন মহিলা রক্তদান করেছেন—যা গ্রামবাংলার প্রেক্ষাপটে সত্যিই একটি বিরাট ও ঐতিহাসিক ঘটনা।

রক্তদান শিবিরটি যেন মুহূর্তের মধ্যেই এক উৎসবে পরিণত হয়। হাসিমুখে, গর্বের সঙ্গে রক্তদাতারা অংশ নেন। সংগৃহীত রক্ত তুলে দেওয়া হয় টেরেসা ওম ব্লাড সেন্টারের হাতে, যা আগামী দিনে বহু মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচাতে সহায়ক হবে।

নারীদের রক্তদানে বিশেষ গুরুত্ব

এই রক্তদান শিবিরে মহিলাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। সামাজিক নানা কুসংস্কার ভেঙে গ্রামের নারীরা যে মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা নিঃসন্দেহে সমাজের জন্য অনুপ্রেরণার।

জেলা পরিষদের সভাপতি শ্যামা প্রসন্ন লোহার তাঁর বক্তব্যে বলেন,
“কৃষি মেলাকে কেন্দ্র করে এত বড় রক্তদান শিবির, যেখানে ১০০ জন মহিলা রক্ত দিয়েছেন—এটা সত্যিই বিরাট বিষয়। নজরুল সংঘকে আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।”

কৃষি মেলা: চাষির সম্মানের মঞ্চ

এই মেলার অন্যতম মূল লক্ষ্য কৃষকদের সম্মান ও স্বীকৃতি প্রদান। জামালপুর ব্লক জেলার অন্যতম কৃষিপ্রধান এলাকা। এখানকার কৃষকদের উৎপাদিত বিভিন্ন ফসল এই মেলায় প্রদর্শিত হচ্ছে—ধান, শাকসবজি, ডাল, তেলবীজ, ফল, ফুল এবং আধুনিক কৃষিপদ্ধতির নমুনা। জামালপুর ব্লক কৃষিপ্রধান এলাকা হিসেবে জেলার মধ্যে পরিচিত। এই মেলায় সেই কৃষির শক্তি ও সম্ভাবনাকে তুলে ধরা হয়েছে নানা দিক থেকে।

শ্যামা প্রসন্ন লোহার বলেন,
“চাষি মানে অচ্ছুত নয়। এই কৃষি মেলায় যেভাবে কৃষকদের সম্মান দেওয়া হচ্ছে, তাতেই সেটা প্রমাণিত হয়।”

এই বক্তব্য গ্রামবাংলার চাষিদের আত্মসম্মান ও সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

পুষ্প প্রদর্শনী ও হস্তশিল্প

মেলার আরেকটি বড় আকর্ষণ পুষ্প প্রদর্শনী। নানা রঙের ফুল, দেশি-বিদেশি প্রজাতির গাছ, ফুলচাষের আধুনিক কৌশল দর্শকদের মুগ্ধ করছে। পাশাপাশি হস্তশিল্প প্রদর্শনীতে স্থানীয় শিল্পীদের তৈরি মৃৎশিল্প, বাঁশের কাজ, হাতে বোনা সামগ্রী, গ্রামীণ কারুশিল্প বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।

এই প্রদর্শনীগুলি শুধু শিল্পের সৌন্দর্যই তুলে ধরছে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতির সম্ভাবনার কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের রঙিন আবহ

সাত দিনব্যাপী মেলায় প্রতিদিন থাকছে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সংগীতানুষ্ঠান, নৃত্যানুষ্ঠান, লোকসংগীত, আবৃত্তি, নাটক—সব মিলিয়ে মেলা প্রাঙ্গণ পরিণত হয়েছে এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক মঞ্চে।

news image
আরও খবর

এছাড়াও কৃতি ছাত্র-ছাত্রীদের সংবর্ধনা দেওয়া হবে, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা জোগাবে।

ধান, গম, সরিষা, আলু, সবজি, ডাল, ফুল—স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত ফসল প্রদর্শিত হচ্ছে গর্বের সঙ্গে। অনেক কৃষক প্রথমবার তাঁদের ফসল এত বড় পরিসরে প্রদর্শনের সুযোগ পেলেন।

একজন কৃষক বলেন,
“আমাদের ফসল সাধারণত আড়তেই সীমাবদ্ধ থাকে। এখানে মানুষ দেখে, প্রশ্ন করে, সম্মান দেয়—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”

প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য

পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ মেহেমুদ খাঁন বলেন,
“কৃষি মেলায় এত বড় রক্তদান শিবির করার জন্য নজরুল সংঘকে ধন্যবাদ। এই মহতী কাজে কত মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচবে, তা ভাবলেই গর্ব হয়।”

তিনি আরও বলেন, গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত এলাকায় এই ধরনের অনুষ্ঠান সত্যিই প্রশংসনীয়। কৃষি, পুষ্প ও হস্তশিল্পের প্রদর্শনীতে যাঁরা পুরস্কার পাবেন, তা যেমন তাঁদের ভালো লাগবে, তেমনই অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে।

মেলাকে ঘিরে গ্রামজুড়ে উৎসব

কৃষি মেলাকে কেন্দ্র করে এলাকাজুড়ে বসেছে মেলা। নাগরদোলা, খেলনা, খাবারের দোকান, লোকজ শিল্প—সব মিলিয়ে শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলের জন্য আনন্দের ব্যবস্থা। সন্ধ্যা নামলেই আলোর সাজে ঝলমল করছে মেলা প্রাঙ্গণ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই মেলা শুধু বিনোদনের নয়—এটি গ্রামবাংলার সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে।

রক্তদান: মানবতার সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা

এই মেলার সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় হলো উদ্বোধনী দিনের মেগা রক্তদান শিবির।

২০০ জন রক্তদাতা: এক অভূতপূর্ব নজির

পুরুষ ও মহিলা মিলিয়ে মোট ২০০ জন রক্তদান করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—১০০ জন মহিলা রক্তদান করেছেন। গ্রামাঞ্চলে যেখানে এখনও নানা ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত, সেখানে এই অংশগ্রহণ এক বিপ্লব।

রক্তদান উৎসবে পরিণত

ভয় নয়, সংশয় নয়—রক্তদাতাদের মুখে ছিল হাসি। অনেকেই প্রথমবার রক্ত দিয়েছেন। সংগৃহীত রক্ত টেরেসা ওম ব্লাড সেন্টারের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

এক মহিলা রক্তদাতা বলেন,
“রক্ত দিলে কারও প্রাণ বাঁচে—এর চেয়ে বড় কাজ আর কী হতে পারে?”

নারীর ক্ষমতায়ন: নীরব বিপ্লব

এই রক্তদান শিবির প্রমাণ করেছে—গ্রামবাংলার নারীরা আর পিছিয়ে নেই। তারা শুধু ঘরের কাজেই সীমাবদ্ধ নয়, সমাজের বৃহত্তর মানবিক দায়িত্বও তারা নিতে প্রস্তুত।

শ্যামা প্রসন্ন লোহার বলেন,
“১০০ জন মহিলা রক্তদান—এটা শুধু সংখ্যা নয়, এটা সামাজিক পরিবর্তনের প্রতীক।”

দানবীর মন্মথ পালের আদর্শে অনুপ্রাণিত

দানবীর রায় বাহাদুর মন্মথ পাল ছিলেন সমাজসেবার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দান ও মানবকল্যাণে তাঁর অবদান আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তাঁর স্মরণে এই মেলার আয়োজন সেই আদর্শকেই নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরছে।

উপসংহার

অমরপুরের এই সাত দিনব্যাপী কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্প, সংস্কৃতি ও হস্তশিল্প মেলা প্রমাণ করে দিল—গ্রামবাংলা আজও মানবতা, ঐক্য ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। কৃষকদের সম্মান, নারীদের রক্তদান, শিল্পীদের স্বীকৃতি এবং সমাজসেবার বার্তা মিলিয়ে এই মেলা নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক সামাজিক উদ্যোগ।

এই ধরনের উদ্যোগ যদি আরও বেশি করে ছড়িয়ে পড়ে, তবে গ্রামবাংলার উন্নয়নের পথ আরও সুদৃঢ় হবে—এমনটাই আশা সকলের।

Preview image