Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

গোলপার্কে গন্ডগোলের জেরে কলকাতায় বোমাবাজি ও গুলির ঘটনায় গ্রেফতার ১০ জন

সিসি ক্যামেরার সূত্র ধরেই রাতভর পুলিশের তল্লাশি। গোলপার্ক কাণ্ডে গ্রেফতার ১০ জনের বাড়ি রবীন্দ্র সরোবর ও কসবা থানা এলাকায়।

কলকাতার দক্ষিণ অংশে রবিবার রাতের ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। গোলপার্ক এলাকায় গন্ডগোল, গুলি এবং বোমাবাজির অভিযোগে রবীন্দ্র সরোবর থানার পুলিশ ১০ জনকে গ্রেফতার করেছে। এই ঘটনায় শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় দুষ্কৃতীদের দাপট বাড়ছিল। রবিবার রাতের ঘটনা সেই আশঙ্কাকেই আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে।

রবিবার রাত সাড়ে আটটা নাগাদ গোলপার্কের কাঁকুলিয়া রোড সংলগ্ন এলাকায় হঠাৎ করেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই এলাকায় একটি ক্লাবের পিকনিক চলছিল। সেই পিকনিক ঘিরেই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে প্রথমে বচসা শুরু হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই তা ভয়াবহ আকার নেয়। অভিযোগ, প্রায় একশো থেকে দেড়শো জন দুষ্কৃতী দলবদ্ধভাবে এলাকায় ঢুকে পড়ে। অনেকের মুখে রুমাল বাঁধা ছিল যাতে সহজে চিহ্নিত করা না যায়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, দুষ্কৃতীরা প্রথমে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে। এরপর আচমকাই গুলি চালানো হয় বলে অভিযোগ। পাশাপাশি বোমাবাজির শব্দে কেঁপে ওঠে গোটা এলাকা। ধারালো অস্ত্র হাতে নিয়েও হামলা চালানো হয় বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন। রাস্তায় থাকা বাইক ভাঙচুর করা হয়। এমনকি পুলিশের একটি গাড়িতেও হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। ইট ছোড়ার ফলে এলাকায় তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়।

গোলমালের খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছোয় রবীন্দ্র সরোবর থানার পুলিশ। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে কলকাতার ডেপুটি পুলিশ কমিশনার ভোলানাথ পাণ্ডেও ঘটনাস্থলে যান। পুলিশের উপস্থিতিতেই ধীরে ধীরে দুষ্কৃতীরা এলাকা ছেড়ে পালাতে শুরু করে। তবে ততক্ষণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল বলে দাবি স্থানীয়দের।

ঘটনার পর রাতেই আশপাশের এলাকার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখা শুরু করে পুলিশ। একাধিক ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দুষ্কৃতীদের গতিবিধি চিহ্নিত করা হয়। কে কোন দিকে পালিয়েছে এবং কারা সরাসরি হামলায় যুক্ত ছিল, তা শনাক্ত করার চেষ্টা চলে। সেই সূত্র ধরেই শুরু হয় তল্লাশি অভিযান।

রবীন্দ্র সরোবর থানা এলাকার পাশাপাশি কসবা থানা এলাকাতেও রাতভর তল্লাশি চালায় পুলিশ। ওই অভিযানেই একে একে ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতদের বয়স ১৮ থেকে ৩৮ বছরের মধ্যে। ধৃতদের মধ্যে পাঁচ জন রবীন্দ্র সরোবর থানা এলাকার বাসিন্দা। বাকিদের বাড়ি কসবা থানা এলাকায়।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা যাচ্ছে, ধৃতদের মধ্যে কয়েক জন সরাসরি তাণ্ডব চালানোর সঙ্গে যুক্ত ছিল। কারা গুলি চালিয়েছে বা বোমা ছুড়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া গুলির খোল এবং বোমার সুতলি পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। অস্ত্র কোথা থেকে এল এবং কী উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হল, তা জানার চেষ্টা চলছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ অভিযোগ তুলেছেন, এই ঘটনায় দুষ্কৃতী সোনা পাপ্পুর দলবলের নাম উঠে এসেছে। তাঁদের দাবি, গত বছর গণেশপুজোর সময়েও ওই দল এলাকায় তাণ্ডব চালিয়েছিল। সেই সময়ও ভাঙচুর এবং মারধরের অভিযোগ উঠেছিল। তবে পুলিশ এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারেনি যে ধৃত প্রত্যেকেই সোনা পাপ্পুর দলের সঙ্গে যুক্ত কি না। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।

রবিবার রাতের ঘটনায় অন্তত দু জন আহত হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন গণেশ দাস। তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে খবর। অন্য জন সনৎ সিংহের মাথায় আঘাত লেগেছে। দু জনকেই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁদের শারীরিক অবস্থার উপর নজর রাখা হচ্ছে বলে হাসপাতাল সূত্রে খবর।

এই ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ এবং আতঙ্ক দুটোই দেখা যাচ্ছে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, এলাকায় বারবার এই ধরনের অশান্তি হলেও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। সন্ধ্যার পর বাইরে বেরোতে ভয় লাগছে বলে জানিয়েছেন অনেকে। বিশেষ করে শিশু এবং বয়স্কদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।

পুলিশের এক কর্তা জানিয়েছেন, এই ঘটনার সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা ভাঙার কোনও চেষ্টাকেই বরদাস্ত করা হবে না। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। রাতের টহলও বাড়ানো হয়েছে।

এই ঘটনায় রাজনৈতিক তরজাও শুরু হয়েছে। বিরোধী দলের একাংশ রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের দাবি, শহরের বুকে এই ধরনের ঘটনা প্রশাসনের ব্যর্থতাই তুলে ধরে। যদিও প্রশাসনের তরফে বলা হয়েছে, দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হয়েছে।

news image
আরও খবর

সব মিলিয়ে বলা যায়, গোলপার্কের রবিবার রাতের তাণ্ডব শুধুমাত্র একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং দুষ্কৃতীদের দাপট নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। তদন্ত শেষ হলে এই ঘটনার পেছনের আসল কারণ এবং জড়িত চক্রের বিস্তারিত চিত্র সামনে আসবে বলেই আশা করছে পুলিশ।

এখন নজর পুলিশের তদন্তের দিকে। ধৃতদের জেরা করে আরও কারা জড়িত, অস্ত্রের উৎস কোথায় এবং কেন এই হামলা, তার উত্তর খোঁজার চেষ্টা চলছে। কলকাতার বুকে ফের যাতে এই ধরনের ভয়াবহ রাত না নামে, সেটাই এখন শহরবাসীর একমাত্র প্রত্যাশা।

রবিবার রাতের ঘটনার পর গোলপার্ক এবং সংলগ্ন এলাকার চিত্র একেবারে বদলে যায়। রাতভর আতঙ্কে ঘরবন্দি হয়ে পড়েন বহু বাসিন্দা। দোকানপাট তড়িঘড়ি বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তা কার্যত ফাঁকা হয়ে পড়ে। ভাঙচুর হওয়া বাইক এবং ছড়িয়ে থাকা ইট পাথরের চিহ্ন রাতের তাণ্ডবের ভয়াবহতার কথা মনে করিয়ে দেয়।

সোমবার সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে এখনও আতঙ্ক কাটেনি। অনেকেই পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তাঁদের বক্তব্য, সময়মতো কড়া নজরদারি থাকলে হয়তো এত বড় ঘটনা ঘটত না। কেউ কেউ আবার পুলিশের দ্রুত অভিযানের প্রশংসাও করেছেন। তাঁদের মতে, রাতেই অভিযান চালিয়ে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করায় বড় ধরনের অশান্তি ছড়িয়ে পড়া থেকে রক্ষা পেয়েছে এলাকা।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতদের জেরা করে ঘটনার পেছনের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানার চেষ্টা চলছে। কে এই হামলার মূল চক্রী এবং কী উদ্দেশ্যে এত বড় দল নিয়ে এলাকায় তাণ্ডব চালানো হল, তা জানাই এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি অস্ত্র এবং বোমা কোথা থেকে এল, কারা সরবরাহ করল, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এই ঘটনায় রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও তীব্র হয়েছে। শাসক এবং বিরোধী দলের নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে দোষারোপ শুরু করেছেন। কেউ বলছেন, এলাকায় দুষ্কৃতীদের মদত দেওয়া হচ্ছে। আবার কেউ দাবি করছেন, প্রশাসন পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হয়েছে। রাজনৈতিক এই তরজায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।

স্থানীয় ক্লাব এবং বাসিন্দা সংগঠনগুলিও এই ঘটনার পর বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাঁদের দাবি, এলাকায় শান্তি ফেরাতে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে জন্য অতিরিক্ত সিসি ক্যামেরা বসানো এবং রাতে টহল বাড়ানোর দাবি উঠেছে।

আহতদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও উদ্বেগের ছবি স্পষ্ট। গুলিবিদ্ধ গণেশ দাসের পরিবার জানায়, এমন ঘটনা তাঁদের জীবনে কখনও ঘটেনি। অন্য আহত সনৎ সিংহের পরিবারের সদস্যরাও দ্রুত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এলাকায় নিরাপত্তা না থাকলে সাধারণ মানুষ কীভাবে স্বাভাবিক জীবনযাপন করবে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ঘটনায় দ্রুত চার্জশিট দাখিল এবং কঠোর শাস্তি হলে দুষ্কৃতীদের মনোবল ভাঙা সম্ভব। দীর্ঘদিন মামলা ঝুলে থাকলে অপরাধীরা ফের সক্রিয় হয়ে ওঠার সুযোগ পায়। তাই তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা অত্যন্ত জরুরি।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে কলকাতা পুলিশের তরফে সাধারণ মানুষের উদ্দেশে সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। কোনও অস্বাভাবিক গতিবিধি চোখে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে থানায় জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এলাকায় অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, গোলপার্কের এই ঘটনা শহরের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার উপর নতুন করে আলো ফেলেছে। একদিকে পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপ, অন্যদিকে দুষ্কৃতীদের দুঃসাহসী তাণ্ডব এই দুইয়ের সংঘাতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে পরিস্থিতির জটিলতা। এখন দেখার বিষয়, তদন্তের মাধ্যমে কত দ্রুত এই ঘটনার সম্পূর্ণ চিত্র সামনে আসে এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয়।

Preview image