Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

তোলাবাজি ও হুমকির অভিযোগে গ্রেপ্তার জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষ অজিত সাহা, ভাইয়ের বাড়ি থেকে উদ্ধার টাকা অস্ত্র ও কার্তুজ

তোলাবাজি, হুমকি ও ভোট পরবর্তী হিংসার অভিযোগে গ্রেপ্তার হলেন জেলা পরিষদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ কর্মাধ্যক্ষ অজিত সাহা। একই মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাঁর ভাই সুজিত কুমার সাহাকেও। পুলিশি তল্লাশিতে সুজিত সাহার বাড়ি থেকে বিপুল টাকা, কার্তুজ, অস্ত্র ও বিদেশি মদ উদ্ধার হওয়ায় গোবরডাঙা এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।

উত্তর ২৪ পরগনার গোবরডাঙা এলাকায় তোলাবাজি, হুমকি এবং ২০২১ সালের ভোট পরবর্তী হিংসা মামলাকে কেন্দ্র করে বড়সড় পুলিশি পদক্ষেপে গ্রেপ্তার হলেন জেলা পরিষদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ কর্মাধ্যক্ষ অজিত সাহা এবং তাঁর ভাই সুজিত কুমার সাহা। ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোটা এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষ, সকলের নজর এখন এই ঘটনার পরবর্তী তদন্ত এবং আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে। প্রকাশিত সংবাদপ্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, দুটি অভিযোগের ভিত্তিতে গোবরডাঙা থানার পুলিশ অজিত সাহা এবং তাঁর ভাই সুজিত কুমার সাহাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে তোলার প্রস্তুতি নেয়।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, চলতি মাসের ২৪ তারিখ দুটি অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়। অভিযোগের মধ্যে ছিল তোলাবাজি, হুমকি এবং ভোট পরবর্তী হিংসার মতো গুরুতর বিষয়। সেই তদন্তের সূত্র ধরেই গোবরডাঙা থানার পুলিশ অজিত সাহার বাড়িতে হানা দেয়। এরপর তাঁকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাঁর ভাই সুজিত কুমার সাহার বাড়ি এবং একটি অনুষ্ঠানগৃহেও তল্লাশি চালানো হয় বলে জানা যায়।

তল্লাশি অভিযানে সুজিত কুমার সাহার বাড়ি এবং সংশ্লিষ্ট জায়গা থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা, কার্তুজ, এয়ার রাইফেল, এয়ার গান এবং বিদেশি মদের বোতল উদ্ধার হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে দাবি করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ২৭ লক্ষ ৮ হাজার ২০০ টাকা, ৭ এমএম পিস্তলে ব্যবহারের কার্তুজ, স্পোর্টস এয়ার রাইফেল, এয়ার গান, বিদেশি মদ, খোলা কার্তুজ এবং মেটালিক প্যালেট। এই বিপুল পরিমাণ টাকা এবং অস্ত্রসামগ্রী কীভাবে এল, তার বৈধ উৎস কী, তা এখন তদন্তকারীদের অন্যতম প্রধান প্রশ্ন।

এই ঘটনার পর স্থানীয় মহলে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, সুজিত কুমার সাহা দীর্ঘদিন ধরে জমির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ নিয়ে জমি সংক্রান্ত ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকে। কম দামে জমি কেনা, পরে সেই জমি প্লট করে বিক্রি করা এবং জমি ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও সামনে এসেছে। যদিও এই অভিযোগগুলির সত্যতা আদালত এবং তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে।

অজিত সাহা উত্তর ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ কর্মাধ্যক্ষ পদে ছিলেন। ফলে তাঁর গ্রেপ্তার শুধু প্রশাসনিক ক্ষেত্রেই নয়, রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও বড় আলোড়ন তৈরি করেছে। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর প্রভাব নিয়ে আলোচনা ছিল। অভিযোগ উঠেছে, দলীয় প্রভাব এবং রাজনৈতিক পরিচিতির জোরে তিনি পঞ্চায়েত স্তর থেকে জেলা পরিষদ পর্যন্ত উঠে এসেছিলেন। তবে এই সমস্ত অভিযোগ বর্তমানে তদন্তাধীন এবং আদালতের পর্যবেক্ষণই শেষ কথা হবে।

ঘটনার সঙ্গে আরও একটি পুরনো অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। কয়েক মাস আগে মছলন্দপুরের এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর সঙ্গে বিএলআরও অমল রায় এবং অজিত সাহার মনোমালিন্যের কথা স্থানীয় মহলে চর্চায় ছিল। সেই সময় ওই স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। নতুন করে গ্রেপ্তারির পর সেই পুরনো অভিযোগগুলিও আবার আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। তদন্তকারীরা এই অভিযোগগুলির সঙ্গে বর্তমান মামলার কোনও যোগ আছে কি না, তাও খতিয়ে দেখতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।

এই গ্রেপ্তারির পর সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একদিকে কেউ কেউ পুলিশের পদক্ষেপকে স্বাগত জানাচ্ছেন, অন্যদিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপের প্রশ্নও তুলছেন অনেকে। তবে আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, পুলিশের হাতে কী ধরনের প্রমাণ রয়েছে এবং আদালতে সেই প্রমাণ কতটা গ্রহণযোগ্য হয়। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর হলেও, বিচার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের দোষী বলা যায় না।

পুলিশ ১০ দিনের হেফাজত চেয়ে অভিযুক্তদের বারাসত আদালতে তোলার আবেদন করেছে বলে জানা গিয়েছে। পুলিশ হেফাজত মঞ্জুর হলে তদন্তকারীরা উদ্ধার হওয়া টাকা, অস্ত্র, কার্তুজ এবং অন্যান্য সামগ্রীর উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন। পাশাপাশি অভিযোগকারীদের বক্তব্য, স্থানীয় সাক্ষ্য, জমি ব্যবসার নথি এবং আর্থিক লেনদেনের দিকও খতিয়ে দেখা হতে পারে।

news image
আরও খবর

এই ধরনের ঘটনা শুধু একটি ব্যক্তিগত বা পারিবারিক মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। যখন কোনও নির্বাচিত প্রতিনিধি বা প্রশাসনিক পদে থাকা ব্যক্তির বিরুদ্ধে তোলাবাজি, হুমকি বা অস্ত্র উদ্ধারের মতো অভিযোগ ওঠে, তখন তা সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশাসনের স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তাই গোবরডাঙার এই ঘটনা এখন উত্তর ২৪ পরগনার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে অজিত সাহা ও সুজিত কুমার সাহার গ্রেপ্তারি, বিপুল টাকা ও অস্ত্রসামগ্রী উদ্ধারের দাবি এবং জমি ব্যবসা ঘিরে ওঠা অভিযোগ গোটা ঘটনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। তদন্ত এগোলে স্পষ্ট হবে, অভিযোগের ভিত্তি কতটা মজবুত, উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর উৎস কী এবং এর পেছনে আরও বড় কোনও চক্র রয়েছে কি না। আপাতত নজর থাকবে আদালতের সিদ্ধান্ত, পুলিশের তদন্ত এবং অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে কী ব্যাখ্যা সামনে আসে তার দিকে।

এই ঘটনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, সাধারণ মানুষের মনে জমি ব্যবসা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং স্থানীয় প্রশাসনিক নজরদারি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অনেক সময় অভিযোগ ওঠে, গ্রামীণ ও শহরতলির এলাকায় জমি কেনাবেচার ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এক ধরনের প্রভাবশালী চক্র তৈরি হয়। সেই চক্রের সঙ্গে যদি রাজনৈতিক ক্ষমতা বা প্রশাসনিক যোগাযোগ জড়িয়ে পড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষ আরও অসহায় হয়ে পড়েন। গোবরডাঙার এই ঘটনার পর সেই প্রশ্নই আবার সামনে এসেছে। এলাকাবাসীর একাংশের দাবি, জমি সংক্রান্ত লেনদেন, প্লট বিক্রি, দখল বা চাপ সৃষ্টি করার মতো অভিযোগ বহুদিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল। যদিও এই অভিযোগগুলির সত্যতা এখনও তদন্তসাপেক্ষ, তবু অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারির পর বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে।

তদন্তকারীদের সামনে এখন একাধিক বড় প্রশ্ন রয়েছে। উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ নগদ টাকার উৎস কী, সেই টাকা কোনও বৈধ ব্যবসায়িক লেনদেনের অংশ, নাকি অন্য কোনও আর্থিক কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া কার্তুজ, এয়ার রাইফেল, এয়ার গান এবং অন্যান্য সামগ্রীর বৈধ লাইসেন্স বা নথি ছিল কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। বিশেষ করে এত সংখ্যক কার্তুজ উদ্ধার হওয়ার দাবি সামনে আসায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। সাধারণ মানুষ জানতে চাইছেন, এই ধরনের সামগ্রী কী উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছিল এবং এর সঙ্গে কোনও বড় চক্রের যোগ রয়েছে কি না।

রাজনৈতিকভাবে এই ঘটনা আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ অভিযুক্ত অজিত সাহা জেলা পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। স্বাস্থ্য ও পরিবেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠা প্রশাসনিক ভাবমূর্তির উপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বিরোধীরা স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনাকে হাতিয়ার করে শাসকদলের বিরুদ্ধে সরব হতে পারে। অন্যদিকে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকেও আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করার সুযোগ থাকবে। তাই এখনই কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। আদালতের বিচার এবং পুলিশের তদন্তই এই ঘটনার প্রকৃত সত্য সামনে আনবে।

স্থানীয় মানুষ এখন চাইছেন, তদন্ত যেন নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে হয়। অভিযোগকারী, সাক্ষী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং জমি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নথিপত্র সব দিক খতিয়ে দেখা দরকার। যদি অভিযোগ সত্যি হয়, তাহলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠবে। আবার যদি অভিযোগের পেছনে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থাকে, তাহলেও সেটি সামনে আসা জরুরি। কারণ আইনকে কোনওভাবেই রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার করা উচিত নয়।

সব মিলিয়ে গোবরডাঙার এই ঘটনা শুধু একটি গ্রেপ্তারির খবর নয়, বরং স্থানীয় রাজনীতি, জমি ব্যবসা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং আইনশৃঙ্খলার বড় প্রশ্নকে সামনে এনে দিয়েছে। আগামী দিনে আদালতের পর্যবেক্ষণ, পুলিশের তদন্ত রিপোর্ট এবং উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর ফরেনসিক বা আইনি যাচাই এই মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। এখন নজর থাকবে, তদন্ত কতদূর এগোয় এবং এই ঘটনার পেছনে আর কারও নাম সামনে আসে কি না।

Preview image