মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব খর্ব করতে এবং ছায়াযুদ্ধ মোকাবিলায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে ঠিক কত কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে, তার একটি আনুমানিক হিসাব মার্কিন কংগ্রেসের কাছে জমা দিয়েছে পেন্টাগন। এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সামরিক উপস্থিতি, গোয়েন্দা নজরদারি এবং ড্রোন হামলার পেছনে ব্যয়ের এক বিশাল অঙ্ক, যা নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।
ভূমিকা: ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান নীতি ও সংঘাতের প্রেক্ষাপট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক এক নজিরবিহীন উত্তেজনার মধ্য দিয়ে গেছে। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ইরানের পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা এবং ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ তৈরির কৌশল গ্রহণ করেছিলেন। এই দীর্ঘ মেয়াদে সামরিক প্রস্তুতি এবং ইরানের বিরুদ্ধে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের পেছনে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তার একটি বিশদ খতিয়ান এখন সামনে এসেছে। পেন্টাগনের এই রিপোর্ট অনুযায়ী, ট্রাম্পের চার বছরের শাসনামলে ইরানকে দমনে ব্যয় করা হয়েছে কয়েক বিলিয়ন বা কয়েক হাজার কোটি ডলার।
পরমাণু চুক্তি ত্যাগ ও অর্থনৈতিক অবরোধের সূচনা ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন আনুষ্ঠানিকভাবে ওবামা আমলের ইরান পরমাণু চুক্তি (JCPOA) থেকে সরে দাঁড়ান, তখন থেকেই এই সংঘাতের আর্থিক বোঝা বাড়তে শুরু করে। ট্রাম্পের যুক্তি ছিল, ইরান এই চুক্তির আড়ালে তাদের ব্যালেস্টিক মিসাইল কর্মসূচি সচল রাখছে এবং সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন করছে। ফলস্বরূপ, ইরানের ওপর ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে এবং বিশ্বজুড়ে ইরানের তেলের বাজার বন্ধ করতে মার্কিন অর্থ দপ্তর ও পেন্টাগনকেও বড় অংকের প্রশাসনিক ও গোয়েন্দা অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।
পারস্য উপসাগরে সামরিক উপস্থিতি ও ব্যয় ইরানের পক্ষ থেকে কোনো সম্ভাব্য আক্রমণ রুখতে ট্রাম্প প্রশাসন পারস্য উপসাগর এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে কয়েক হাজার অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছিল। পেন্টাগনের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিমানবাহী রণতরী এবং বি-৫২ বোমারু বিমান মোতায়েনের পেছনে প্রতিদিনের পরিচালনা ব্যয় ছিল আকাশচুম্বী। একেকটি রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ পরিচালনা করতে দৈনিক কয়েক লক্ষ ডলার খরচ হয়। গত কয়েক বছরে হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা বজায় রাখার নামে মার্কিন নৌবাহিনীর যে বিশাল মহড়া চলেছিল, তার পুরো ভার বহন করতে হয়েছে মার্কিন করদাতাদের।
কাসেম সোলাইমানি হত্যাকাণ্ড এবং সামরিক সতর্কবার্তা ২০২০ সালের শুরুতে বাগদাদ বিমানবন্দরে ড্রোনের মাধ্যমে ইরানের কুদস ফোর্সের প্রধান জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার ঘটনা ছিল ট্রাম্পের মেয়াদের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ। এই অপারেশনের পর পুরো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো হাই অ্যালার্টে রাখা হয়েছিল। পেন্টাগনের হিসাবে, সেই সময় সম্ভাব্য ইরানি পাল্টা হামলা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতেই কয়েকশ কোটি ডলার অতিরিক্ত বরাদ্দ দিতে হয়েছিল। ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার, স্যাটেলাইট নজরদারি এবং সাইবার যুদ্ধের প্রস্তুতিতে পেন্টাগনের বিশেষ তহবিল থেকে এই টাকা খরচ করা হয়।
ছায়াযুদ্ধ ও আঞ্চলিক অস্থিরতার মূল্য ইরান সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও ইয়েমেন, লেবানন এবং সিরিয়ায় তাদের মদতপুষ্ট গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বড় বিনিয়োগ করতে হয়েছে। সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলার পর সেখানে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্যাট্রিয়ট মোতায়েন করার খরচও ছিল বিশাল। পেন্টাগন জানিয়েছে, ইরানের প্রভাব রুখতে মিত্র দেশগুলোকে সামরিক সহায়তা এবং অস্ত্র বিক্রির বাইরেও মার্কিন সামরিক বাজেটের একটি বড় অংশ ব্যয় হয়েছে এই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার নামে।
মার্কিন কংগ্রেসে বিতর্কের ঝড় পেন্টাগনের এই হিসাব জমা পড়ার পর মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান সদস্যদের মধ্যে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমালোচকদের মতে, ট্রাম্পের ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ বা সর্বোচ্চ চাপের নীতি ইরানকে দুর্বল করার বদলে মধ্যপ্রাচ্যকে আরও বেশি সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে এবং অকারণে কোটি কোটি ডলারের অপচয় হয়েছে। অন্যদিকে, ট্রাম্পের সমর্থকরা মনে করেন, এই ব্যয় ছিল মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ।
২০১৭ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প ওবামা আমলের ‘নরম’ নীতি বর্জন করে ইরানের বিরুদ্ধে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ (Maximum Pressure) প্রয়োগের কৌশল নেন। তার প্রশাসনের লক্ষ্য ছিল ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব শূন্যে নামিয়ে আনা। এই লক্ষ্য অর্জনে ট্রাম্প প্রশাসন যে কেবল কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পথ বেছে নিয়েছিল তা নয়, বরং সামরিক প্রস্তুতির পেছনেও ঢেলেছে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ। পেন্টাগনের সাম্প্রতিক রিপোর্টে দেখা গেছে, এই কৌশলের অর্থনৈতিক মূল্য ছিল অবিশ্বাস্য রকমের বেশি।
ট্রাম্পের আমলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো হয় বহুগুণ। বাহরাইন, কাতার এবং সৌদি আরবের মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে অত্যাধুনিক মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম এবং যুদ্ধবিমান দিয়ে সজ্জিত করা হয়। পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী:
অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন: হাজার হাজার অতিরিক্ত সৈন্য মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাতে তাদের আবাসন, খাদ্য এবং নিরাপত্তার পেছনে কয়েকশ কোটি ডলার খরচ হয়েছে।
রণতরী মোতায়েন: ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বা ইউএসএস নিমিৎজের মতো বিমানবাহী রণতরীগুলোকে দীর্ঘ সময় সমুদ্রের স্পর্শকাতর এলাকায় মোতায়েন রাখতে দৈনিক জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ যে ব্যয় হয়েছে, তা মার্কিন সামরিক বাজেটের একটি বড় অংশ দখল করে আছে।
ইরানের প্রতিটি পদক্ষেপ এবং তাদের পরমাণু কেন্দ্রগুলোর ওপর নজর রাখতে পেন্টাগন এবং সিআইএ (CIA) তাদের গোয়েন্দা বাজেট বাড়িয়ে দিয়েছিল। ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার এখানে ছিল মুখ্য। আরকিউ-৪ গ্লোবাল হক (RQ-4 Global Hawk) ড্রোন যখন ইরান ভূপাতিত করে, তখন কেবল একটি ড্রোনের আর্থিক ক্ষতিই ছিল প্রায় ১৩ কোটি ডলার। এ ধরনের আধুনিক ড্রোনের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালানোর খরচ অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যা এই রিপোর্টে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার সিদ্ধান্তটি ছিল ট্রাম্পের মেয়াদের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল ঘটনা। এই একক অপারেশনের পর পুরো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থের ওপর ইরানি হামলার আশঙ্কায় কয়েক মাস ধরে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি ছিল। এই সময়কালে কুয়েত, ইরাক এবং জর্ডানে মোতায়েন থাকা সেনাদের সরঞ্জামের ব্যাকআপ এবং প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা তৈরি করতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের জরুরি তহবিল ব্যবহার করা হয়েছিল। পেন্টাগন উল্লেখ করেছে যে, ইরাকের আইন আল-আসাদ ঘাঁটিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর সেখানে অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি মেরামত এবং নতুন রাডার সিস্টেম বসাতে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন পড়ে।
আধুনিক যুগে যুদ্ধ কেবল জল, স্থল বা আকাশে সীমাবদ্ধ নয়। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের অভ্যন্তরীণ কম্পিউটার নেটওয়ার্ক এবং অবকাঠামোয় আক্রমণ চালানোর জন্য সাইবার কমান্ডকে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছিল। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং বিদ্যুৎ গ্রিডে সাইবার হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের জন্য ডজন ডজন উচ্চ দক্ষ সাইবার বিশেষজ্ঞ নিয়োগ এবং সফটওয়্যার তৈরিতে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হয়। পেন্টাগনের রিপোর্টে এই ‘অদৃশ্য যুদ্ধের’ ব্যয়ের হিসাবটিও প্রথমবারের মতো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রাম্পের ইরান নীতির একটি বড় অংশ ছিল মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নি মুসলিম দেশগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ করা। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্যাট্রিয়ট মিসাইল এবং থাড (THAAD) সিস্টেমের মতো ব্যয়বহুল অস্ত্র মোতায়েন করা হয়। যদিও এই দেশগুলো অস্ত্র ক্রয়ের জন্য অর্থ প্রদান করেছে, কিন্তু তাদের প্রশিক্ষণ এবং অপারেশনাল সহায়তার পেছনে মার্কিন বাহিনীকে নিজেদের পকেট থেকেই বিশাল অংকের ভর্তুকি দিতে হয়েছে।
পেন্টাগনের এই হিসাব পেশ করার পর মার্কিন হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং সেনেটে তোলপাড় শুরু হয়েছে। অনেক আইনপ্রণেতা প্রশ্ন তুলেছেন যে, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করার পর ইরান কি সত্যিই দুর্বল হয়েছে? তারা যুক্তি দিচ্ছেন যে, এত ব্যয় সত্ত্বেও ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ছায়াযোদ্ধাদের নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী হয়েছে। অর্থাৎ, বিনিয়োগের তুলনায় প্রাপ্তি বা 'রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট' খুব একটা সন্তোষজনক নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এই বিশাল সামরিক ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও অসন্তোষ রয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার যদি শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা অবকাঠামো খাতে ব্যয় করা হতো, তবে মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান আরও উন্নত হতে পারত। পেন্টাগনের এই রিপোর্টটি এখন ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ ভোটাররা এখন বুঝতে পারছেন যে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি আদতে কতটা ব্যয়বহুল ছিল।
পেন্টাগন কর্তৃক মার্কিন কংগ্রেসকে দেওয়া এই হিসাব কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির আর্থিক প্রতিফলন। ট্রাম্প প্রশাসনের এই ব্যয়বহুল অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান এবং ভবিষ্যতের মার্কিন প্রশাসনগুলো হয়তো সরাসরি সামরিক সংঘাতের চেয়ে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের পথ বেছে নেবে। ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের এই দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অবস্থানের ফলে সৃষ্ট আর্থিক বোঝার ক্ষত মার্কিন অর্থনীতিতে আরও অনেকদিন থেকে যাবে।