বিজয় মাল্য বর্তমানে রয়েছেন ব্রিটেনে। বুধবার বম্বে হাই কোর্টে পলাতক শিল্পপতির হয়ে উপস্থিত ছিলেন তাঁর আইনজীবী।দেশে কবে ফিরতে পারবেন, তা নির্দিষ্ট ভাবে বলা সম্ভব নয়। আদালতে এমনটাই জানালেন করলেন পলাতক শিল্পপতি বিজয় মাল্য। ‘কিংফিশার’-এর প্রাক্তন কর্ণধার বর্তমানে ব্রিটেনের লন্ডনে রয়েছেন। বুধবার বম্বে হাই কোর্টের এক মামলায় আইনজীবী মারফত তিনি জানান, বর্তমানে তাঁর ইংল্যান্ড এবং ওয়েল্‌স ছেড়ে বেরোনোর অনুমতি নেই। তাই কবে ভারতে ফিরতে পারবেন, তা-ও বলা সম্ভব নয়।
মাল্যের বিরুদ্ধে পলাতক অর্থনৈতিক অপরাধী আইন-এর আওতায় মামলা চলছে। ওই মামলার বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে বম্বে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন শিল্পপতি। হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি শ্রী চন্দ্রশেখর এবং বিচারপতি গৌতম অঙ্খড়ের বেঞ্চে মামলাটি চলেছে। আদালত জানায়, মাল্য যদি চান যে তাঁর আবেদনটি বিবেচনা করে দেখা হোক, তবে তাঁকে দেশে ফিরে আসতে হবে।
আদালতের ওই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে বুধবার মাল্যের আইনজীবী জানান, তাঁর মক্কেল বর্তমানে দেশে ফেরার পরিস্থিতিতে নেই। পলাতক শিল্পপতির একটি লিখিত বক্তব্য তিনি এজলাসে পাঠ করেন। সেখানে মাল্য ভারতে ফিরতে না পারার কারণ হিসাবে আদালতে জানানো হয়, ২০১৬ সালে তাঁর ভারতীয় পাসপোর্ট বাতিল করে দেয় সরকার। ফলে তাঁর কাছে এখন কোনও ভারতীয় পাসপোর্ট নেই। তা ছাড়া ব্রিটিশ আদালতও তাঁর দেশত্যাগের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।মাল্যের আইনজীবী বলেন, “ইংল্যান্ড এবং ওয়েলস ছেড়ে যাওয়া বা ছাড়ার চেষ্টা করার কোনও অনুমতি নেই তাঁর (মাল্যের)। অন্য দেশে সফরের জন্য প্রয়োজনীয় নথির আবেদন করার বা নিজের কাছে রাখারও অনুমতি নেই। ফলে মাল্য কবে ভারতে ফিরবেন, তা নির্দিষ্ট ভাবে বলা যাচ্ছে না।” মাল্যের আইনজীবী সওয়াল করেন, পলাতক অর্থনৈতিক অপরাধী আইনের মামলাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য তাঁর মক্কেলের সশরীরে উপস্থিত থাকার প্রয়োজন নেই। পাশাপাশি, তাঁর মক্কেলকে নিম্ন আদালত যে পলাতক ঘোষণা করেছে, সেই নির্দেশকেও চ্যালেঞ্জ করে একটি মামলা দায়ের করেছেন আইনজীবী। এই মামলায় কেন্দ্রকে নিজেদের বক্তব্য জানানোর জন্য বলেছে বম্বে হাই কোর্ট। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে ফের এই মামলার শুনানির সম্ভাবনা রয়েছে।
ভারতের আর্থিক অপরাধ, ব্যাঙ্ক জালিয়াতি ও ঋণখেলাপি সংক্রান্ত আলোচিত নামগুলির মধ্যে অন্যতম বিজয় মাল্য। বহু বছর ধরে তাঁর প্রত্যর্পণ (extradition) নিয়ে আইনি লড়াই চলছে ভারত ও ব্রিটেনের আদালতে। সাম্প্রতিক শুনানিতে মাল্যের আইনজীবীর বক্তব্য ফের একবার এই মামলাকে শিরোনামে এনে দিয়েছে। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন—মাল্যের ইংল্যান্ড ও ওয়েলস ছেড়ে যাওয়ার কোনও অনুমতি নেই, এমনকি অন্য দেশে সফরের জন্য প্রয়োজনীয় নথিও তাঁর কাছে রাখা নিষিদ্ধ। ফলে মাল্য কবে ভারতে ফিরবেন, তা নির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব নয়।
এই বক্তব্য শুধু একটি আইনি তথ্য নয়; বরং তা প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার জটিলতা, আন্তর্জাতিক আইনের সীমাবদ্ধতা এবং ভারতীয় তদন্ত সংস্থাগুলির দীর্ঘ আইনি সংগ্রামের প্রতিফলন।
বিজয় মাল্য একসময় ভারতের অন্যতম পরিচিত শিল্পপতি ছিলেন। কিংফিশার এয়ারলাইন্সের মালিক, ইউনাইটেড ব্রিউয়ারিজ গ্রুপের কর্ণধার এবং আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে যুক্ত এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল আন্তর্জাতিক স্তরেও। বিলাসবহুল জীবনযাপন, কর্পোরেট প্রভাব এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন মিডিয়ার আলোচিত মুখ।
কিন্তু ২০১২ সালে কিংফিশার এয়ারলাইন্স ভেঙে পড়ার পর থেকেই শুরু হয় তাঁর আইনি জটিলতা। বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের কাছ থেকে নেওয়া হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ অনাদায়ী থেকে যায়। ভারতীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলি অভিযোগ তোলে—ঋণ জালিয়াতি, মানি লন্ডারিং এবং তহবিল তছরুপের।
২০১৬ সালে মাল্য ভারত ছেড়ে যুক্তরাজ্যে চলে যান। এরপরই তাঁকে “পলাতক অর্থনৈতিক অপরাধী” (Fugitive Economic Offender) হিসেবে ঘোষণা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
ভারত সরকার ‘Fugitive Economic Offenders Act, 2018’ আইনের আওতায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করে। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য—যারা আর্থিক অপরাধ করে দেশ ছেড়ে পালায়, তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা এবং আইনের মুখোমুখি করা।
নিম্ন আদালত মাল্যকে পলাতক ঘোষণা করে। এই ঘোষণাই পরবর্তীতে তাঁর আইনি লড়াইয়ের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
মাল্যের আইনজীবীর সাম্প্রতিক বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন—
মাল্য ইংল্যান্ড ও ওয়েলস ছাড়তে পারবেন না
দেশত্যাগের অনুমতি নেই
অন্য দেশে সফরের নথি আবেদনও করতে পারবেন না
পাসপোর্ট সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে
অর্থাৎ তিনি মুক্ত নন, আবার সম্পূর্ণ বন্দিও নন—বরং কঠোর আইনি নজরদারির মধ্যে আছেন।
এটি প্রত্যর্পণ মামলার সাধারণ প্রক্রিয়ার অংশ। আদালত নিশ্চিত করতে চায় অভিযুক্ত ব্যক্তি বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে পালিয়ে না যান।
ভারত বহু বছর ধরে ব্রিটেনের আদালতে মাল্যের প্রত্যর্পণ চেয়ে আসছে। যুক্তরাজ্যের নিম্ন আদালত ইতিমধ্যেই প্রত্যর্পণের পক্ষে রায় দিয়েছিল। পরবর্তীতে হাইকোর্টেও মাল্য আবেদন করেন, কিন্তু সেখানেও বড়সড় স্বস্তি পাননি।
এরপর তিনি বিভিন্ন আইনি পথে—মানবাধিকার, জেল পরিবেশ, স্বাস্থ্য, বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা—ইত্যাদি যুক্তি তুলে ধরেন। প্রত্যর্পণ মামলায় এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ব্রিটিশ আদালত দেখে—
অভিযুক্ত দেশে বিচার কতটা ন্যায্য হবে
জেলের পরিবেশ মানবাধিকারসম্মত কি না
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আছে কি না
এই সব কারণেই মামলাটি দীর্ঘায়িত হয়েছে।
মাল্যের আইনজীবী সওয়াল করেছেন—পলাতক অর্থনৈতিক অপরাধী আইনের মামলাকে চ্যালেঞ্জ করতে তাঁর মক্কেলের ভারতে সশরীরে উপস্থিত থাকার প্রয়োজন নেই।
এই যুক্তি আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ—
অভিযুক্ত বিদেশে থাকলেও আইনি চ্যালেঞ্জ করতে পারেন
ভার্চুয়াল বা প্রতিনিধির মাধ্যমে মামলা লড়া যায়
আদালত কখনও কখনও শারীরিক উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করে না
আইনজীবীর এই বক্তব্যের লক্ষ্য—ভারতে না ফিরেও আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া।
আইনজীবী আরও জানিয়েছেন—মাল্যকে পলাতক ঘোষণা করার নিম্ন আদালতের নির্দেশও চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
এর প্রভাব অত্যন্ত বড় হতে পারে। যদি উচ্চ আদালত নিম্ন আদালতের ঘোষণাকে খারিজ করে—
সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত প্রক্রিয়া প্রভাবিত হবে
আইনি অবস্থান বদলাবে
প্রত্যর্পণ মামলার রাজনৈতিক চাপ কমতে পারে
অর্থাৎ এটি শুধু একটি টেকনিক্যাল চ্যালেঞ্জ নয়; বরং বৃহত্তর কৌশল।
এই মামলায় বম্বে হাই কোর্ট কেন্দ্র সরকারকে নিজেদের বক্তব্য জানাতে বলেছে। অর্থাৎ আদালত উভয় পক্ষের যুক্তি শুনে সিদ্ধান্ত নেবে।
ভারত সরকারের পক্ষে মূল যুক্তিগুলি হতে পারে—
তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে দেশত্যাগ করেছেন
তদন্ত এড়াতে বিদেশে অবস্থান
বিপুল ব্যাঙ্ক জালিয়াতির অভিযোগ
আইনের মুখোমুখি হওয়া প্রয়োজন
আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে মামলার পরবর্তী শুনানির সম্ভাবনা রয়েছে।
এই শুনানি গুরুত্বপূর্ণ কারণ—
পলাতক তকমা বৈধ কি না
উপস্থিতি বাধ্যতামূলক কি না
সম্পত্তি সংক্রান্ত পদক্ষেপ
এসব বিষয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যৎ আইনি পথ নির্ধারণ করবে।
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—রায় হয়ে গেলে মাল্য এখনও ভারতে ফিরছেন না কেন?
কারণগুলি বহুস্তরীয়:
প্রত্যেক অভিযুক্তের একাধিক স্তরে আপিলের অধিকার আছে।
বিদেশি আদালত অভিযুক্তের নিরাপত্তা বিবেচনা করে।
ভারতের জেলব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
কিছু ধাপ জনসমক্ষে আসে না।
ভারত সরকার ইতিমধ্যেই মাল্যের বহু সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে। ব্যাঙ্কগুলিও ঋণ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া চালিয়েছে।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী—
কিছু ঋণ উদ্ধার হয়েছে
সম্পত্তি নিলাম হয়েছে
আইনি লড়াই চলমান
তবে সম্পূর্ণ অর্থ এখনও উদ্ধার হয়নি।
মাল্য মামলাটি কেবল আইনি নয়; এটি রাজনৈতিক ও জনমতের বিষয়ও।
জনগণের প্রশ্ন:
এত বড় ঋণখেলাপি কীভাবে দেশ ছাড়লেন?
ব্যাঙ্ক কেন ঋণ দিল?
দায় কার?
এই প্রশ্নগুলি আর্থিক নীতির স্বচ্ছতা নিয়েও বিতর্ক তৈরি করেছে।
প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও তাৎক্ষণিক প্রত্যর্পণ সম্ভব নয়। কারণ—
দ্বিপাক্ষিক আইনি যাচাই
প্রমাণের মানদণ্ড
মানবাধিকার মূল্যায়ন
রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা
এই কারণেই প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া বহু বছর ধরে চলতে পারে।
মাল্যের পক্ষের প্রধান কৌশলগুলি:
প্রত্যর্পণ বিলম্বিত করা
মানবাধিকার যুক্তি
স্বাস্থ্যগত কারণ
জেল পরিবেশ প্রশ্ন
পলাতক তকমা চ্যালেঞ্জ
যদি মাল্য ভারতে প্রত্যর্পিত হন:
সিবিআই ও ইডি জিজ্ঞাসাবাদ করবে
মানি লন্ডারিং মামলা চলবে
ব্যাঙ্ক জালিয়াতি ট্রায়াল শুরু হবে
সম্পত্তি বাজেয়াপ্তি চূড়ান্ত হতে পারে
মাল্যের আইনজীবীর সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে স্পষ্ট—আইনি জটিলতা এখনও কাটেনি। তিনি ইংল্যান্ড ছাড়তে পারছেন না, আবার ভারতে ফেরার সময়সীমাও নির্দিষ্ট নয়।
পলাতক তকমা চ্যালেঞ্জ, প্রত্যর্পণ মামলা, মানবাধিকার যুক্তি—সব মিলিয়ে এটি আন্তর্জাতিক আইনের এক জটিল দৃষ্টান্ত।
মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহের শুনানি নতুন দিক দেখাতে পারে, কিন্তু তাতেও দ্রুত প্রত্যর্পণের সম্ভাবনা নিশ্চিত নয়।
বহু কোটি টাকার আর্থিক অপরাধের এই মামলা এখন শুধু একজন ব্যবসায়ীর বিচার নয়—বরং এটি ভারতের আর্থিক শৃঙ্খলা, আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতা এবং বিচারব্যবস্থার ধৈর্যের পরীক্ষাও বটে।