সোমবার রাতে পূর্ব বর্ধমানের ভাতার থানার সাহেবগঞ্জ গ্রামে বরযাত্রীবোঝাই একটি বাস দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। জানা যায়, সামনে হঠাৎ একটি টোটো চলে আসায় সেটিকে বাঁচাতে গিয়ে বাসটি উল্টে যায়। ঘটনায় বেশ কয়েকজন বরযাত্রী জখম হন। আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতাল ও গুরুতরদের বর্ধমান মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়েছে।
পূর্ব বর্ধমানের ভাতার থানার অন্তর্গত সাহেবগঞ্জ গ্রামে সোমবার গভীর রাতে ঘটে গেল এক মর্মান্তিক পথ দুর্ঘটনা। বিয়ের আনন্দে ভরা একটি বরযাত্রীবাহী বাস হঠাৎ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে উল্টে যায়। ঘটনায় বাসে থাকা একাধিক বরযাত্রী আহত হন। মুহূর্তের মধ্যে আনন্দঘন পরিবেশ রূপ নেয় আতঙ্ক, চিৎকার ও কান্নায়। স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রশাসনের তৎপরতায় আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। বরযাত্রীবোঝাই একটি বাস দুর্ঘটনার কবলে পড়ে উল্টে যাওয়ায় আহত হলেন বেশ কয়েকজন। এই ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং ফের একবার রাজ্যের গ্রামীণ এলাকায় রাস্তা নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র সামনে এনে দিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সাহেবগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা নির্মল ঘোষের ছেলের বিয়ে উপলক্ষে বরযাত্রী বোঝাই বাসটি সোমবার রাতে গোলসি থানার অন্তর্গত আদ্রাহাটি গ্রামের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল। বাসটিতে বরযাত্রীদের মধ্যে ছিলেন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিবারের ঘনিষ্ঠরা। হাসি, গল্প আর বিয়ের আনন্দে ভরা সেই যাত্রা যে এত দ্রুত ভয়াবহ মোড় নেবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেননি।
সাহেবগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা নির্মল ঘোষের পরিবারে সেদিন ছিল উৎসবের আমেজ। ছেলের বিয়ের জন্য সকাল থেকেই বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের ভিড়। সন্ধ্যা নামতেই বরযাত্রীদের নিয়ে বাসটি গোলসি থানার আদ্রাহাটি গ্রামের উদ্দেশে রওনা দেয়। কেউ গান গাইছিলেন, কেউ গল্পে মেতে ছিলেন, আবার কেউ মোবাইলে ভিডিও করছিলেন—সব মিলিয়ে এক আনন্দঘন পরিবেশ।প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, সাহেবগঞ্জ গ্রামের কাছাকাছি এলাকায় বাসটি পৌঁছনোর সময় হঠাৎ একটি টোটো বাসের সামনে চলে আসে। মুহূর্তের মধ্যে বড় দুর্ঘটনা এড়াতে বাসচালক টোটোটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। সেই সময়ই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি রাস্তার পাশে উল্টে যায়।
বাসটি উল্টে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভেতরে থাকা যাত্রীরা একে অপরের উপর পড়ে যান। বাসের কাচ ভেঙে যায়, ভেতরে আটকে পড়েন অনেকে। চারদিক থেকে ভেসে আসে আর্তনাদ ও সাহায্যের চিৎকার।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বাসটি মাঝারি গতিতে চলছিল। ঠিক সেই সময় হঠাৎ একটি টোটো সামনে চলে আসে। বড় দুর্ঘটনা এড়াতে বাসচালক দ্রুত ব্রেক কষেন ও স্টিয়ারিং ঘোরান। কিন্তু ভারসাম্য রাখতে না পেরে বাসটি রাস্তার পাশে উল্টে যায়।
দুর্ঘটনার বিকট শব্দে আশপাশের এলাকার মানুষ ছুটে আসেন ঘটনাস্থলে। রাতের নিস্তব্ধতা মুহূর্তেই ভেঙে যায়। অনেকেই মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে বাসের ভেতরে আটকে পড়া যাত্রীদের বের করার চেষ্টা শুরু করেন। কেউ কেউ ভাতার থানায় খবর দেন, আবার কেউ অ্যাম্বুলেন্স ডাকার উদ্যোগ নেন।
দুর্ঘটনার পর প্রথম উদ্ধারকাজে নামেন স্থানীয় বাসিন্দারাই। বাসের দরজা ও ভাঙা জানালা দিয়ে একে একে আহত যাত্রীদের বাইরে বের করে আনা হয়। কেউ হাতে আঘাত পেয়েছেন, কারও মাথায় চোট, আবার কেউ গুরুতরভাবে আহত অবস্থায় বাসের ভিতরে আটকে ছিলেন।
স্থানীয়দের এই দ্রুত পদক্ষেপে বহু মানুষের প্রাণ বাঁচে বলে মনে করছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় ভাতার থানার পুলিশ। পুলিশ ও স্থানীয়দের যৌথ উদ্যোগে উদ্ধারকাজ আরও জোরদার হয়। আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য স্থানীয় হাসপাতালে পাঠানো হয়। যাঁদের আঘাত গুরুতর, তাঁদের বর্ধমান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
পুলিশ পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে এবং যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে। দুর্ঘটনাস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত পুলিশও মোতায়েন করা হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, বেশ কয়েকজন বরযাত্রী আঘাত পেয়েছেন। অধিকাংশের আঘাত গুরুতর নয়, তবে কয়েকজনের মাথা ও শরীরে গুরুতর চোট রয়েছে। চিকিৎসকরা তাঁদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। আহতদের পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে ছুটে আসেন, তৈরি হয় আবেগঘন পরিস্থিতি।
এই দুর্ঘটনায় মানসিকভাবে সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েছেন বর ও তাঁর পরিবার। বিয়ের আনন্দের দিনে এমন দুর্ঘটনা তাঁদের কাছে ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। পরিবারের এক সদস্য জানান, “সব কিছু ঠিকঠাক চলছিল। হঠাৎ এমন দুর্ঘটনা আমাদের সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।”
এই দুর্ঘটনায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন বর ও তাঁর পরিবার। বিয়ের দিন এমন ঘটনা যে কতটা মানসিক আঘাত দেয়, তা চোখে দেখা যায়। পরিবারের এক প্রবীণ সদস্য বলেন,
“ছেলের বিয়েতে এমন দুর্ঘটনা হবে, ভাবতেই পারিনি। এখন শুধু চাই সবাই সুস্থ হয়ে উঠুক।”
দুর্ঘটনার পর বিয়ের অনুষ্ঠান আদৌ ঠিক সময়ে হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে দুই পরিবারের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। মানবিকতার দিক বিবেচনা করে অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গিয়েছে। দুর্ঘটনার পর বিয়ের অনুষ্ঠান নিয়ে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। অনেক বরযাত্রী আহত হওয়ায় অনুষ্ঠান পিছিয়ে দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলে। শেষ পর্যন্ত দুই পরিবারের আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ভাতার থানার পুলিশ দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে পুলিশের অনুমান, টোটোকে বাঁচাতে গিয়ে হঠাৎ ব্রেক ও স্টিয়ারিং ঘোরানোর ফলেই বাসটি উল্টে যায়। তবে বাসের গতি, রাস্তার অবস্থা ও চালকের ভূমিকা—সব দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বাসচালককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তৈরি করা হচ্ছে।
এই দুর্ঘটনার পর স্থানীয় রাস্তাঘাটের নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনেক বাসিন্দার অভিযোগ, রাতে এই রাস্তায় টোটো ও বড় গাড়ির চলাচল যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। পর্যাপ্ত আলো ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ না থাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। দুর্ঘটনাস্থলের কাছে পর্যাপ্ত রাস্তার আলো নেই বলেও অভিযোগ। অন্ধকারে হঠাৎ সামনে ছোট যান চলে এলে বড় গাড়ির চালকের পক্ষে সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে আহতদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এই ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। রাস্তার নিরাপত্তা বাড়ানো ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার বিষয়েও আলোচনা চলছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আহতদের চিকিৎসার সবরকম ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি রাস্তার নিরাপত্তা ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পুনরায় পর্যালোচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এই দুর্ঘটনায় এলাকায় শোক ও উদ্বেগের আবহ তৈরি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, বিয়ের মতো আনন্দের দিনে এমন ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। আবার কেউ কেউ চালকদের আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এই দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, এক মুহূর্তের অসতর্কতা কীভাবে বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের দ্রুত সাহায্য ও প্রশাসনের তৎপরতা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তাও স্পষ্ট হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে—
রাতে বড় গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ
টোটো ও ছোট যানবাহনের নির্দিষ্ট লেন
রাস্তার আলো ও সিসিটিভি বৃদ্ধি
চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ
এই বিষয়গুলিতে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
পূর্ব বর্ধমানের ভাতার সাহেবগঞ্জে বরযাত্রীবাহী বাস দুর্ঘটনা একদিকে যেমন বহু মানুষকে আহত করেছে, তেমনই পুরো এলাকাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বিয়ের আনন্দ মুহূর্তেই আতঙ্কে বদলে যাওয়ার এই ঘটনা প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের জন্য বড় শিক্ষা হয়ে থাকল।
আশা করা হচ্ছে, আহতরা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন এবং প্রশাসন ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল—জীবনের চেয়ে বড় কিছু নেই, আর নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনও আপস চলতে পারে না।