ব্যক্তিগত জীবন বরাবরই আড়ালে রাখেন Parineeti Chopra। তবে প্রথমবার নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘরের দরজা খুলে দিলেন অভিনেত্রী। কেমন সেই অন্দরসজ্জা, আর কোন ঘরেই খুঁজে পান নিরবচ্ছিন্ন শান্তি জানুন বিস্তারিত।
অন্দরমহলের শান্তির ঠিকানা: নীরের নার্সারি ঘর খুলে দেখালেন Parineeti Chopra
ব্যক্তিগত জীবনকে বরাবরই আড়ালে রাখতেই স্বচ্ছন্দ Parineeti Chopra। সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় হলেও তিনি কখনওই অন্দরমহলের অন্তরঙ্গ মুহূর্ত সহজে ভাগ করে নেন না। বাড়ির ভেতর, ব্যক্তিগত সময়, এমনকি গাড়ির ভিতরের ছবিও সচরাচর প্রকাশ্যে আনেন না অভিনেত্রী। কিন্তু মা হওয়ার পর যেন বদলে গেছে অনেক কিছু। প্রথমবার নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক ঘরের দরজা খুলে দিলেন তিনি—তাঁর ও Raghav Chadhaর সদ্যোজাত পুত্র নীরের নার্সারি।
এই ঘর শুধু একটি শিশুর ঘুমোনোর জায়গা নয়; এটি এক নতুন পরিবারের আবেগ, প্রত্যাশা, ভালবাসা এবং শান্তির প্রতীক। নিজের ইউটিউব ভ্লগে পরিণীতি যে ভাবে এই ঘরটির অন্দরসজ্জা, ভাবনা এবং অনুভূতির কথা জানিয়েছেন, তাতে বোঝা যায়—এটি তাঁদের কাছে নিছক একটি ‘রুম’ নয়, বরং একটি মানসিক আশ্রয়।
ব্যক্তিগত থেকে সর্বজনীন: কেন এত বিশেষ এই ঘর?
অধিকাংশ বাড়িতেই এমন একটি কোণ থাকে, যা পরিবারকে একসূত্রে বাঁধে। কারও কাছে সেটি ছাদ, কারও কাছে বাগান, কারও কাছে বইয়ের ঘর। কিন্তু মা হওয়ার পর পরিণীতির কাছে সেই জায়গা হয়ে উঠেছে তাঁর সন্তানের নার্সারি। দিনের প্রায় ৯৯ শতাংশ সময় এখন এই ঘরেই কাটান তিনি। তাই বলা যায়, এই ঘরটি নীরের জন্য যেমন, তেমনই মায়ের জন্যও।
পরিণীতির ভাষায়, “নীর এখনই এই ঘরের নান্দনিকতা বুঝবে না। কিন্তু আমি বুঝি। আর এই জায়গাটাই আমাকে শান্ত রাখে।”
এই স্বীকারোক্তি থেকেই স্পষ্ট—এটি শুধুই সাজসজ্জার প্রদর্শনী নয়, বরং মানসিক সুস্থতার একটি পরিসর।
জেন দর্শনের ছোঁয়া: নীরবতার নান্দনিকতা
এই নার্সারির মূল ভাবনা ছিল ‘শান্তি’। দম্পতি চেয়েছিলেন এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে, যেখানে অযথা চোখ ধাঁধানো রং বা ভারী সজ্জা থাকবে না। বরং থাকবে মৃদু, নিরপেক্ষ, আরামদায়ক রঙের প্যালেট।
পরিণীতি জানিয়েছেন, তাঁরা জেন বৌদ্ধধর্মের শান্ত, সাদামাটা, বাহুল্যবর্জিত নান্দনিকতা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন। জেন দর্শনের মূল কথা—সরলতা, শূন্যতার সৌন্দর্য, এবং মনের স্থিরতা। সেই ভাবনাই প্রতিফলিত হয়েছে ঘরের প্রতিটি কোণে।
এই দর্শন অনুযায়ী, একটি ঘরে যত কম অপ্রয়োজনীয় জিনিস থাকবে, তত বেশি জায়গা পাবে মন। আর শিশুর ঘরের ক্ষেত্রে তো এই ভাবনাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিশুর প্রথম দিকের অভিজ্ঞতা তার চারপাশের পরিবেশ থেকেই তৈরি হয়। নরম রং, কম শব্দ, এবং সুশৃঙ্খল বিন্যাস শিশুর স্নায়ুকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে—এমনটাই মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
রঙের ব্যবহার: চোখে আরাম, মনে প্রশান্তি
শিশুর ঘরে সাধারণত উজ্জ্বল, রংবেরঙের সাজসজ্জা দেখা যায়। কিন্তু নীরের ঘরে সেই প্রচলিত ধারণা থেকে সরে এসেছেন তাঁরা।
নরম বেইজ
হালকা ক্রিম
অফ-হোয়াইট
মৃদু প্যাস্টেল শেড
এই রঙগুলি ঘরে এনে দিয়েছে প্রশান্ত আবহ। কোনও নিয়ন বা অতিরিক্ত উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার নেই। কারণ তাঁদের মতে, শিশুর ঘুম, নিরাপত্তা এবং মায়ের মানসিক শান্তিই এখানে অগ্রাধিকার।
মনোবিজ্ঞান বলছে, হালকা রং মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। বিশেষ করে নতুন মায়েদের ক্ষেত্রে, পরিবেশের প্রশান্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই রঙের প্যালেট শুধুই নান্দনিক নয়—এটি কার্যকরও।
আলো-হাওয়ার খেলা
ঘরে লম্বা, সাদা, স্বচ্ছ পর্দা টাঙানো হয়েছে। জানলা দিয়ে প্রাকৃতিক আলো ঢোকে, আবার সেই আলো পর্দার ভেতর দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে নরম আভায়। এতে ঘর উজ্জ্বল হলেও চোখে লাগে না।
প্রাকৃতিক আলো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ—এই ধারণা মাথায় রেখেই এই ডিজাইন। কৃত্রিম আলোতেও রাখা হয়েছে উষ্ণ টোন, যাতে রাতের সময়ও ঘর থাকে আরামদায়ক।
শিশুর ঘুমের চক্র বজায় রাখতে আলো নিয়ন্ত্রণ একটি বড় বিষয়। অতিরিক্ত উজ্জ্বল আলো শিশুর ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তাই এখানে ব্যবহার করা হয়েছে ডিমেবল লাইট—যার উজ্জ্বলতা প্রয়োজন অনুযায়ী কমানো-বাড়ানো যায়।
ব্রিটিশ ও পারসিক প্রভাব
জানলার নীচে প্যানেলিংয়ে রয়েছে ব্রিটিশ স্থাপত্যের ছোঁয়া। আবার মেঝেতে পাতা কার্পেটটি পারসিক নকশা থেকে অনুপ্রাণিত।
এই সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ঘরটিকে দিয়েছে এক আন্তর্জাতিক সৌন্দর্য। তবে কোথাও অতিরিক্ত ভারী বা জমকালো মনে হয় না। বরং সবকিছুই সংযত। ডিজাইনে বৈচিত্র থাকলেও মূল সুরটি একই—সরলতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভিন্ন সংস্কৃতির নান্দনিক উপাদান মিলিয়ে তৈরি করা এমন ঘর ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেয়। এটি শুধু ফ্যাশন নয়; এটি একটি গল্প বলে—এক পরিবারের রুচি, ভ্রমণ, অভিজ্ঞতার গল্প।
আসবাবপত্র: কার্যকারিতা ও সৌন্দর্যের মেলবন্ধন
ঘরের বেবি কটটি অত্যন্ত সাদামাটা নকশার। কাঠের রং নরম, প্রাকৃতিক। কটের উপরে ঝোলানো খেলনাগুলিও বেছে নেওয়া হয়েছে হালকা রঙে—ডোরাকাটা, পোলকা ডটের নকশা।
বেত দিয়ে তৈরি আলমারির ধারগুলি আর্চ আকারে। এতে রয়েছে গ্রামীণ শিল্পের ছোঁয়া, আবার আধুনিকতারও উপস্থিতি।
প্রতিটি আসবাব এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে চলাফেরায় কোনও বাধা না হয়। কারণ শিশুকে কোলে নিয়ে ঘোরাফেরা করার সময় জায়গা খালি থাকা জরুরি। ধারালো কোণ এড়িয়ে চলা হয়েছে। ব্যবহৃত হয়েছে গোলাকার প্রান্ত—যা নিরাপত্তার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
মায়ের মানসিক আশ্রয়
মা হওয়ার পর জীবনের ছন্দ বদলে যায়। নিদ্রাহীন রাত, শিশুর যত্ন, নতুন দায়িত্ব—সব মিলিয়ে মানসিক চাপও থাকে। সেই প্রেক্ষাপটে এই ঘরটি যেন পরিণীতির কাছে এক শান্ত আশ্রয়।
তিনি জানিয়েছেন, এই ঘরে ঢুকলেই তাঁর মনে হয় সময় ধীরে বয়ে যাচ্ছে। বাইরের ব্যস্ততা, ক্যামেরা, কাজ—সব যেন দূরে সরে যায়।
মাতৃত্বের প্রথম পর্যায়ে অনেক নারী ‘পোস্টপার্টাম ব্লুজ’-এর মধ্য দিয়ে যান। তাই মানসিকভাবে আরামদায়ক পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নীরের এই ঘর সেই দিক থেকেও সচেতন পরিকল্পনার ফল।
ছোট ছোট ডিটেইলে বড় ভাবনা
ঘরের প্রতিটি কোণে রয়েছে যত্নের ছাপ—
দেওয়ালে ভিন্টেজ গাড়ির ফ্রেম
বেবি কটের চাদরে সূক্ষ্ম নকশা
খেলনায় অতিরিক্ত শব্দ বা আলো নেই
কার্পেট নরম ও আরামদায়ক
বই রাখার ছোট তাক
দুধ খাওয়ানোর জন্য আরামদায়ক রকিং চেয়ার
সব মিলিয়ে ঘরটি যেন এক ‘মিনিমালিস্ট’ শিল্পকর্ম।
ঐশ্বর্য নয়, আবেগ
তারকাসন্তানের ঘর মানেই হয়তো অনেকের কল্পনায় বিলাসিতা। কিন্তু এখানে নেই সোনালি চাকচিক্য বা ঝলমলে সাজ। বরং রয়েছে সংযম, ব্যক্তিগত রুচি ও আবেগের ছাপ।
এই ঘরটি প্রমাণ করে—আসল ঐশ্বর্য বাহুল্যে নয়, অনুভূতিতে।
সামাজিক বার্তা
পরিণীতির এই পদক্ষেপ অনেকের কাছে অনুপ্রেরণাও হতে পারে। শিশুর ঘর সাজাতে অতিরিক্ত খরচ বা উজ্জ্বল রঙের প্রয়োজন নেই। বরং শান্ত, নিরাপদ, আরামদায়ক পরিবেশই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এটি এক ধরনের সচেতন প্যারেন্টিংয়ের উদাহরণ। যেখানে ট্রেন্ডের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় শিশুর স্বস্তি।
কাজ ও পরিবার: নতুন ভারসাম্য
অভিনেত্রী হিসেবে তাঁর ব্যস্ত সময়সূচি থাকলেও এখন অগ্রাধিকার পরিবার। নীরের জন্মের পর জীবনের গতি বদলেছে।
এই নার্সারি যেন সেই নতুন অধ্যায়ের প্রতীক—যেখানে আলো, রং, স্থিরতা আর মাতৃত্ব মিলেমিশে একাকার। শুটিং সেটের কোলাহল আর ক্যামেরার ঝলকানি থেকে দূরে, এই ঘর তাঁর ব্যক্তিগত জগতের কেন্দ্র।
অন্দরসজ্জা বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে
ইন্টিরিয়র ডিজাইনের দৃষ্টিকোণ থেকেও এই ঘরটি উল্লেখযোগ্য। কারণ—
ন্যাচারাল ম্যাটেরিয়ালের ব্যবহার
সীমিত রঙের প্যালেট
নরম আলো
স্পেসের সঠিক ব্যবহার
সিমেট্রিক্যাল বিন্যাস
কম ক্লাটার, বেশি ফাংশন
এগুলি আধুনিক মিনিমাল ডিজাইনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বিশেষজ্ঞরা বলেন, শিশুর ঘরে অতিরিক্ত খেলনা বা রঙিন পোস্টার না রেখে, ধীরে ধীরে বয়স অনুযায়ী জিনিস যোগ করাই ভালো।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা
পরিণীতি জানিয়েছেন, নীর বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘরের কিছু পরিবর্তন আনা হবে। এখন যেখানে রয়েছে শান্ত, নিরপেক্ষ পরিবেশ—ভবিষ্যতে সেখানে যুক্ত হতে পারে বইয়ের তাক, ছোট্ট পড়ার টেবিল, আর্ট কর্নার।
অর্থাৎ ঘরটি সময়ের সঙ্গে বদলাবে। যেমন বদলায় মানুষ, সম্পর্ক, জীবন।
একটি ঘর কখনও কখনও শুধু ইট-কাঠ-সিমেন্টের গাঁথুনি নয়। সেটি হয়ে ওঠে অনুভূতির আশ্রয়, সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
পরিণীতি চোপড়ার এই নার্সারি তারই প্রমাণ। ব্যক্তিগত পরিসরকে আড়ালেই রাখতে চেয়েছিলেন তিনি। তবুও এই একান্ত কোণ খুলে দিয়ে যেন জানালেন—মাতৃত্বই এখন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
নীরের ঘরটি তাই শুধু এক শিশুর ঘর নয়; এটি এক নতুন পরিবারের শান্তির ঠিকানা—যেখানে প্রতিটি সকাল শুরু হয় নরম আলোয়, আর প্রতিটি রাত শেষ হয় মায়ের নিঃশব্দ লোরিতে।