Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ড্যামফ্রাইস ও দ্য ব্রুইনের জোড়া আক্রমণ, বেলজিয়াম-ডাচদের জয়, এরিকসেনকে শ্রদ্ধা

ইউরো ২০২০-তে বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডস জিতেছে নাটকীয়ভাবে। মাঠে ফিরে আসা এরিকসেনকে শ্রদ্ধা জানাতে সমর্থকরা আয়োজিত করেছেন আবেগঘন জয়ধ্বনি।

ইউরো ২০২০-এর মঞ্চে বৃহস্পতিবারের রাতটা ফুটবলপ্রেমীদের কাছে হয়ে রইল আবেগ, প্রত্যাবর্তন আর নাটকীয়তায় ভরা এক স্মরণীয় অধ্যায়। এক দিকে ক্রিশ্চিয়ান এরিকসেনকে ঘিরে উদ্বেগ ও ভালোবাসার আবহ, অন্য দিকে কেভিন দ্য ব্রুইনের দুরন্ত প্রত্যাবর্তনে বেলজিয়ামের জয়। একই দিনে নেদারল্যান্ডস ও ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ জয় টুর্নামেন্টকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলল।

ডেনমার্কের কোপেনহাগেনে ম্যাচ শুরুর আগেই আবেগে ভাসে গোটা স্টেডিয়াম। ফিনল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে মাঠের মধ্যেই হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন ডেনমার্কের তারকা ক্রিশ্চিয়ান এরিকসেন। সেই ভয়ংকর মুহূর্ত এখনও বিশ্ব ফুটবলের স্মৃতিতে টাটকা। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা এই ফুটবলারের দ্রুত আরোগ্য কামনায় ম্যাচ শুরুর আগে মাঠে আনা হয় এরিকসেনের নাম ও ১০ নম্বর লেখা বিশাল জার্সি। গ্যালারি জুড়ে দেখা যায় ‘দ্রুত সেরে ওঠো এরিকসেন’ লেখা পোস্টার ও ব্যানার। ফুটবল যে শুধুই খেলা নয়, বরং আবেগের এক গভীর ভাষা, সেই ছবিই যেন ফুটে ওঠে কোপেনহাগেনের আকাশে।

এই আবেগঘন পরিবেশেই ম্যাচ শুরু করে ডেনমার্ক। ফিফা ক্রমতালিকায় শীর্ষে থাকা বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে তারা। ম্যাচের মাত্র দুই মিনিটের মাথায় বেলজিয়ামের ডিফেন্ডার জেসন দেনায়ারের ভুলের সুযোগ নিয়ে গোল করে ডেনমার্ককে এগিয়ে দেন ইউসুফ পলসেন। মুহূর্তের মধ্যে উল্লাসে ফেটে পড়ে গোটা স্টেডিয়াম। মনে হচ্ছিল, এরিকসেনের জন্যই যেন এই লড়াইয়ে অতিরিক্ত শক্তি পাচ্ছে ডেনিশ ফুটবলাররা।

প্রথমার্ধে কিছুটা অস্বস্তিতে ভুগতে থাকে বেলজিয়াম। দলের প্রধান তারকা কেভিন দ্য ব্রুইন তখনও মাঠের বাইরে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে নাকের হাড় ভেঙে যাওয়ার কারণে ইউরো কাপের প্রথম ম্যাচে খেলতে পারেননি ম্যাঞ্চেস্টার সিটির এই তারকা। তবে তিনি যে ডেনমার্ক ম্যাচে ফিরবেন, সেই ইঙ্গিত আগেই দিয়েছিলেন। তবুও কোচ রবের্তো মার্তিনেস তাঁকে প্রথম একাদশে রাখেননি। ০-১ পিছিয়ে পড়ার পর আর ঝুঁকি না নিয়ে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই দ্য ব্রুইনকে নামান তিনি।

এর পরেই বদলে যেতে থাকে ম্যাচের গতিপথ। ৫৪ মিনিটে দ্য ব্রুইনের নিখুঁত পাস থেকে গোল করে বেলজিয়ামকে সমতায় ফেরান থোরগান অ্যাজার। সেই গোলের পর আত্মবিশ্বাস ফিরে পায় লাল শয়তানরা। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে চলে আসে তাদের দখলে। ৭১ মিনিটে নাটকীয় মুহূর্ত। পরিবর্ত হিসেবে নামা এডেন অ্যাজারের পাস থেকে দুর্দান্ত ফিনিশে গোল করে বেলজিয়ামকে ২-১ এগিয়ে দেন দ্য ব্রুইন নিজেই। পরিবর্ত হিসেবে নেমে গোল করানো ও গোল করা, দুই ভূমিকাতেই ম্যাচের নায়ক হয়ে ওঠেন তিনি।

শেষ পর্যন্ত এই ব্যবধানই বজায় থাকে। টানা দুই ম্যাচে জয় পেয়ে ছয় পয়েন্ট নিয়ে এক ম্যাচ বাকি থাকতেই ‘এ’ গ্রুপ থেকে শেষ ষোলোয় পৌঁছে যায় বেলজিয়াম। ম্যাচ শেষে উচ্ছ্বাস চাপা রাখতে পারেননি কোচ রবের্তো মার্তিনেস। ফিনল্যান্ডের বিরুদ্ধে গ্রুপের শেষ ম্যাচ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি হাসিমুখে বলেন, আপাতত জয়ের আনন্দ উপভোগ করতে দিন, ফিনল্যান্ড নিয়ে পরে ভাবা যাবে। ডেনমার্ক ম্যাচ নিয়ে তাঁর মন্তব্য ছিল, প্রথমার্ধে কিছুটা জড়তা থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে দল দারুণ ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, আর সেটাই এই দুরন্ত জয়ের মূল চাবিকাঠি।

বেলজিয়াম শিবিরেও খুশির আবহ। দলের স্ট্রাইকার রোমেলু লুকাকু জানান, দ্বিতীয়ার্ধে গোটা দলটাই নাটকীয় ভাবে ম্যাচ জেতার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। যদিও তিনি স্বীকার করেন, এখনও দল প্রত্যাশা অনুযায়ী সেরা পারফরম্যান্স দিতে পারেনি, তবে সঠিক সময়ে ফর্মে ফেরাই লক্ষ্য।

একই দিনে জয়ের হাসি হাসে নেদারল্যান্ডসও। দিনের তৃতীয় ম্যাচে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে শুরু থেকেই আধিপত্য বজায় রাখে ডাচরা। ম্যাচের ১১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন মেম্ফিস দেপাই। দ্বিতীয়ার্ধে ৬৭ মিনিটে ডেনজেল ডামফ্রাইসের গোল নেদারল্যান্ডসকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেয়। এই জয়ের ফলে বেলজিয়ামের মতোই নেদারল্যান্ডসও নিশ্চিত করে শেষ ষোলোয় জায়গা।

বৃহস্পতিবারের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ায় ইউক্রেন। বুখারেস্টে উত্তর ম্যাসিডোনিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে প্রথমে কিছুটা চাপেই ছিল তারা। তবে ২৯ মিনিটে বিপক্ষ রক্ষণের ভুলের সুযোগ নিয়ে গোল করে ইউক্রেনকে এগিয়ে দেন আন্দ্রি ইয়ারমোলেঙ্কো। মাত্র পাঁচ মিনিট পর রোমান ইয়ারেমচুকের গোলে ব্যবধান বেড়ে যায় ২-০। ৩৯ মিনিটে উত্তর ম্যাসিডোনিয়ার গোরান পান্ডেভের গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হয়ে যায়, যা তাদের জন্য বড় ধাক্কা ছিল।

দ্বিতীয়ার্ধে ৫৫ মিনিটে উত্তর ম্যাসিডোনিয়া পেনাল্টি পায়। এজগিয়ান আলিয়োস্কির প্রথম শট ইউক্রেনের গোলরক্ষক গ্রেগরি বুশচান বাঁচালেও বল তাঁর হাত ফসকে বেরিয়ে যায়। রিবাউন্ড থেকে আর ভুল করেননি আলিয়োস্কি। যদিও এরপর আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি উত্তর ম্যাসিডোনিয়া। এই জয়ের ফলে ‘সি’ গ্রুপে দুই ম্যাচে তিন পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে থাকে ইউক্রেন, আর সমসংখ্যক ম্যাচে খেলা উত্তর ম্যাসিডোনিয়ার পয়েন্ট থাকে শূন্য।

সব মিলিয়ে ইউরো ২০২০-এর এই দিনটি ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে নানা কারণে। এরিকসেনের জন্য গোটা বিশ্বের একাত্মতা, দ্য ব্রুইনের দুরন্ত প্রত্যাবর্তন, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের শেষ ষোলো নিশ্চিত করা এবং ইউক্রেনের ঘুরে দাঁড়ানো জয়— সব কিছু মিলিয়ে বৃহস্পতিবার প্রমাণ করে দিল, ফুটবল শুধু নব্বই মিনিটের খেলা নয়, এটি আবেগ, লড়াই আর ফিরে আসার গল্পের নাম।                                                                                             

news image
আরও খবর

বেলজিয়াম ফুটবলারেরাও প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করায় খুশি। দলের স্ট্রাইকার রোমেলু লুকাকু বলেন, ‘‘আমাদের গোটা দলটা দ্বিতীয়ার্ধে নাটকীয় ভাবে ম্যাচ জেতার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এখনও প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফরম্যান্স করতে পারিনি আমরা।’’

বৃহস্পতিবার জিতল ইউক্রেনও। আন্দ্রি ইয়ারমোলেঙ্কো ও রোমান ইয়ারেমচুকের যুগলবন্দিতে উত্তর ম্যাসিডোনিয়াকে হারিয়ে তারা ঘুরে দাঁড়ায় এবং শেষ ষোলোয় যোগ্যতা অর্জনের আশা বজায় রাখে। বুখারেস্টে ম্যাচের ২৯ মিনিটে বিপক্ষ রক্ষণের ভুলে গোল করে ইউক্রেনকে এগিয়ে দেন ইয়ারমোলেঙ্কো। পাঁচ মিনিট পরে রোমান ইয়ারেমচুক ব্যবধান আরও বাড়ান। ৩৯ মিনিটে গোরান পান্ডেভের গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হয়। ৫৫ মিনিটে উত্তর ম্যাসিডোনিয়া পেনাল্টি পায়, যা প্রথমে ইউক্রেনের গোলরক্ষক গ্রেগরি বুশচান রুখলেও শেষ পর্যন্ত এজ়গিয়ান আলিয়োস্কি গোল করতে সক্ষম হন। এই জয়ের ফলে ‘সি’ গ্রুপে দুই ম্যাচে তিন পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে থাকে ইউক্রেন, সমসংখ্যক ম্যাচ খেলা উত্তর ম্যাসিডোনিয়ার পয়েন্ট শূন্য।

UEFA ইউরো ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত বিবরণ:

ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ বা UEFA ইউরো হলো ইউরোপের সর্বোচ্চ জাতীয় দলের ফুটবল প্রতিযোগিতা। প্রথম ইউরো কাপ অনুষ্ঠিত হয় ১৯৬০ সালে, যেখানে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম চ্যাম্পিয়ন হয়। শুরুতে এই প্রতিযোগিতা মাত্র চারটি দলের ফাইনাল টুর্নামেন্ট নিয়ে শুরু হলেও পরে ১৯৮০ সালে ৮ দল এবং ১৯৯৬ সালে ১৬ দল অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রসার লাভ করে। সর্বশেষ সংস্করণে ২৪ দল অংশগ্রহণ করছে।

ইউরো কাপের ইতিহাসে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা রয়েছে। ১৯৭৬ সালে চেকোস্লোভাকিয়া ও পশ্চিম জার্মানির ফাইনালে পেনাল্টি শুটআউটে চেকোস্লোভাকিয়া জয়ী হয়েছিল, যা এখনও ফুটবল ইতিহাসের স্মরণীয় মুহূর্ত। ১৯৯২ সালে ডেনমার্ক ইউরো কাপ জয় করে নাটকীয়ভাবে, কারণ তারা মূল টুর্নামেন্টে সরাসরি যোগ্যতা পায়নি; এটি তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে যাওয়ার পর ডেনমার্ককে হঠাৎ যোগ্যতা দেয়ার কারণে সম্ভব হয়।

ইউরো কাপের মাধ্যমে ইউরোপীয় ফুটবলের ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তি ফুটবলারের জন্ম হয়েছে। মিশেল প্লাটিনি, মার্কো ভ্যান বাস্টেন, ফ্রাঙ্কো বারেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি, ও টিয়ারি হেনরি সহ অসংখ্য তারকা এই টুর্নামেন্টের মঞ্চে তাদের প্রতিভা প্রদর্শন করেছেন।

টুর্নামেন্টের ফরম্যাটও সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে। প্রথমে ছোট একটি ফাইনাল টুর্নামেন্টের পর, এখন গোষ্ঠী পর্ব এবং নকআউট পর্বের মাধ্যমে চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণ করা হয়। UEFA ইউরো শুধু ফুটবলের প্রতিযোগিতা নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও, যেখানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সমর্থকরা মিলিত হয়ে ফুটবলকে কেন্দ্র করে ঐক্য ও উদ্দীপনা প্রকাশ করেন।

ইউরো কাপের গুরুত্ব শুধু ক্রীড়া নয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবও ব্যাপক। টুর্নামেন্টের সময় অনুষ্ঠিত শহরগুলো পর্যটক ও দর্শক সমাগমে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে, অর্থনীতি লাভবান হয় এবং দেশের ফুটবল সংস্কৃতির প্রসার ঘটে।

সাম্প্রতিক ইউরো সংস্করণগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তি যেমন VAR (Video Assistant Referee) ব্যবহার করে ম্যাচের সঠিকতা নিশ্চিত করা হচ্ছে। ফলে ফুটবলের গেমপ্লে আরও সুষ্ঠু ও নির্ভুল হচ্ছে। এছাড়া খেলোয়াড়দের ফিটনেস ও স্কাউটিং ব্যবস্থাও উন্নত হওয়ায় টুর্নামেন্টের মান দিনে দিনে বেড়েছে।

ইউরো ২০২০ এই ধারাবাহিকতাকে আরও এগিয়ে নিয়ে গেছে। আবেগ, নাটক, প্রত্যাবর্তন ও অপ্রত্যাশিত ফলাফলের মিশ্রণে টুর্নামেন্টটি ফুটবলপ্রেমীদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও ইউক্রেনের জয় এই সংস্করণে দলগুলোর শক্তি ও সম্ভাবনাকে তুলে ধরেছে। এই টুর্নামেন্ট প্রমাণ করে, ফুটবল কেবল খেলা নয়, এটি সাহস, একতা এবং মানুষের আবেগের প্রকাশ।

পরবর্তী ম্যাচগুলো দর্শকদের জন্য আরও উত্তেজনা বয়ে আনবে। শেষ ষোলো থেকে ফাইনাল পর্যন্ত প্রতিটি ম্যাচ হবে নতুন নাটক, নতুন উত্তেজনা এবং নতুন ইতিহাসের জন্মদাতা। UEFA ইউরো ২০২০ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি ফুটবলের ভক্তদের জন্য এক অনন্য উৎসব, যা দীর্ঘদিন মনে থাকবে।

Preview image