মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস ছাড়াও ডায়াবিটিস বৃদ্ধির অন্য কারণের ইঙ্গিত দিচ্ছে সমীক্ষা বিশ্বতালিকায় ভারতের অবস্থান চোখ কপালে তোলার মতো
দেশে ডায়াবিটিসের হার যে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, সে বিষয়ে বহু দিন আগেই সতর্ক করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। একাধিক সরকারি বক্তৃতা ও জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত আলোচনায় তিনি বারবার জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসে শৃঙ্খলার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। তবে সাম্প্রতিক একটি আন্তর্জাতিক সমীক্ষা নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—সমস্যার মূল কি শুধু অতিরিক্ত মিষ্টি, ভাজাভুজি বা অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসে সীমাবদ্ধ, নাকি এর নেপথ্যে আরও গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ লুকিয়ে রয়েছে?
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণা রিপোর্ট অনুযায়ী, ডায়াবিটিস আক্রান্ত জনসংখ্যার নিরিখে বিশ্বে ‘শ্রেষ্ঠ’ আসনে পৌঁছতে ভারতের আর খুব বেশি সময় লাগবে না। বর্তমানে ডায়াবিটিস রোগীর সংখ্যায় ভারত বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। এই তথ্য শুধু স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য নয়, গোটা দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর জন্যও এক ভয়াবহ সতর্ক সংকেত।
এই সমীক্ষাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মেডিক্যাল জার্নাল The Lancet Diabetes & Endocrinology-এ। ২০২৪ সালে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চালানো এই গবেষণায় একাধিক দেশের গবেষকের পাশাপাশি ভারতীয় গবেষকরাও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। বিশেষ করে ইন্ডিয়ান ডায়াবিটিস অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিরা এই গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
গবেষকেরা ২০০৫ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ২৪৬টি পৃথক গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। বিশ্বের মোট ২১৫টি দেশের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পরিসংখ্যানের উপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে এই বিস্তৃত রিপোর্ট। ফলে এই সমীক্ষার তথ্যকে হালকাভাবে দেখার কোনও সুযোগ নেই।
গবেষণালব্ধ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতের জনসংখ্যা প্রায় ১৪৬ কোটি। এর মধ্যে প্রায় ৯ কোটি মানুষ ডায়াবিটিস বা মধুমেহ রোগে আক্রান্ত। সহজ কথায়, রাস্তায় বেরোলে প্রতি ১৫ জনে অন্তত একজন ডায়াবিটিস রোগী চোখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই ডায়াবিটিস কোনও সাধারণ রোগ নয়। এটি এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি অসুখ, যার নির্দিষ্ট কোনও স্থায়ী প্রতিকার নেই। একবার শরীরে বাসা বাঁধলে আজীবন নিয়ন্ত্রণে রাখার লড়াই চালিয়ে যেতে হয়। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবিটিস ধীরে ধীরে হার্ট, কিডনি, চোখ, স্নায়ুতন্ত্র এবং লিভারের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রেই এটি স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক কিংবা অঙ্গ বিকল হওয়ার ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, ডায়াবিটিস আক্রান্তের সংখ্যায় বর্তমানে বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে চিন। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী সে দেশে ডায়াবিটিস রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৪ কোটি।
দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ভারত, যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৯ কোটি। তৃতীয় স্থানে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সেখানে ডায়াবিটিস রোগীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৯০ লক্ষ।
তবে গবেষকেরা ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও একটি উদ্বেগজনক পূর্বাভাস দিয়েছেন। তাঁদের মতে, আগামী ২৫ বছরে ডায়াবিটিস আক্রান্তের সংখ্যায় আমেরিকাকে পিছনে ফেলে দিতে পারে পাকিস্তান। দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলে ডায়াবিটিসের বৃদ্ধির হার এতটাই দ্রুত যে বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
ডায়াবিটিস নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে—অতিরিক্ত মিষ্টি খেলেই ডায়াবিটিস হয়। কিন্তু গবেষকেরা জানাচ্ছেন, বাস্তব চিত্র অনেক বেশি জটিল।
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, মানসিক চাপ, অনিয়মিত ঘুম, প্রক্রিয়াজাত খাবারের উপর নির্ভরতা এবং দ্রুত বদলে যাওয়া জীবনযাপন ডায়াবিটিস বৃদ্ধির বড় কারণ। পাশাপাশি শহরাঞ্চলে দ্রুত নগরায়ণ ও গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্যও এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে।
গবেষণার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল মেটাবলিক ডিজ়অর্ডার বা বিপাকজনিত সমস্যার প্রসার। ২০২৪ সালে বিশ্বের ২০ থেকে ৭৯ বছর বয়সি মানুষের প্রায় ১১ শতাংশের মধ্যে এই সমস্যা দেখা গিয়েছে।
মেটাবলিক ডিজ়অর্ডার একা কোনও রোগ নয়। এটি একাধিক সমস্যার সমষ্টি—যার মধ্যে রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে অতিরিক্ত শর্করা, অস্বাভাবিক কোলেস্টেরল এবং পেটের মেদ বৃদ্ধি। এই সমস্যাগুলি একত্রে ডায়াবিটিস, থাইরয়েড, হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
গবেষকেরা আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, ২০৫০ সালে বিশ্বজুড়ে মেটাবলিক ডিজ়অর্ডারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ১৩ শতাংশে পৌঁছতে পারে। সংখ্যার হিসাবে যা প্রায় ৮৫ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ।
এই গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হল—ডায়াবিটিস বৃদ্ধির বোঝা সবচেয়ে বেশি পড়ছে গরিব, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির উপর। ২০২৪ সালে যে সমস্ত দেশ ও অঞ্চলে ডায়াবিটিসের প্রকোপ দ্রুত বেড়েছে, সেখানে এই শ্রেণির মানুষের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।
গবেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালে বিশ্বজুড়ে ডায়াবিটিস আক্রান্তের যে বৃদ্ধি হবে, তার প্রায় ৯৫ শতাংশই ঘটবে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলিতে। অর্থাৎ যেসব দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ইতিমধ্যেই চাপের মুখে, সেখানেই এই রোগ আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।
ভারতের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি আরও জটিল। একদিকে বিশাল জনসংখ্যা, অন্যদিকে শহর ও গ্রামের মধ্যে স্বাস্থ্য পরিষেবার বৈষম্য। অনেক ক্ষেত্রেই ডায়াবিটিস ধরা পড়ে দেরিতে, যখন শরীরের একাধিক অঙ্গ ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
সরকারি ও বেসরকারি স্তরে সচেতনতা কর্মসূচি থাকলেও বাস্তবে তা এখনও পর্যাপ্ত নয়। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং দৈনন্দিন শরীরচর্চাকে জীবনের অংশ করে তোলা—এই তিনটি বিষয়ের উপর জোর না দিলে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
ডায়াবিটিস আজ আর শুধু একটি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সমস্যা নয়। এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের রূপ নিচ্ছে। চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে, কর্মক্ষমতা কমছে এবং পরিবারগুলির উপর আর্থিক চাপ ক্রমশ বাড়ছে।
গবেষকেরা মনে করছেন, এখনই যদি জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যনীতিতে বড় পরিবর্তন না আনা যায়, তবে আগামী কয়েক দশকে ডায়াবিটিস এক প্রকার নীরব মহামারিতে পরিণত হবে। ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে এই বিপদ আরও গভীর।
ডায়াবিটিসের বিরুদ্ধে লড়াই আজ আর কেবল চিকিৎসকের চেম্বার বা হাসপাতালের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে একটি সামাজিক সংকটে পরিণত হচ্ছে—যার প্রভাব পড়ছে ব্যক্তি, পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং জাতীয় অর্থনীতির উপর। চিকিৎসাবিজ্ঞান যতই আধুনিক হোক না কেন, কেবল ওষুধের উপর নির্ভর করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন সচেতনতা, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং সামাজিক স্তরে দীর্ঘমেয়াদি ও সুপরিকল্পিত উদ্যোগ। নচেৎ ডায়াবিটিস আক্রান্তের সংখ্যায় জগৎসভার ‘শ্রেষ্ঠ’ আসন যে খুব দ্রুত ভারতের দখলে চলে আসবে, সে আশঙ্কা আর অমূলক বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ডায়াবিটিস এমন একটি রোগ, যা ধীরে ধীরে শরীরের ভেতরে বাসা বাঁধে। শুরুতে এর লক্ষণ অনেক সময় এতটাই অস্পষ্ট থাকে যে বহু মানুষ বুঝতেই পারেন না তিনি এই রোগে আক্রান্ত। ক্লান্তি, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব, চোখে ঝাপসা দেখা—এই লক্ষণগুলোকে অনেকেই দৈনন্দিন ব্যস্ততার ফল বলে এড়িয়ে যান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অবহেলা ভয়াবহ রূপ নেয়।
ডায়াবিটিস একবার শরীরে প্রবেশ করলে তা শুধু রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে থেমে থাকে না। এটি ধীরে ধীরে হার্ট, কিডনি, চোখ, স্নায়ুতন্ত্র এবং রক্তনালির উপর আঘাত হানে। বহু ক্ষেত্রেই হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি ফেলিওর কিংবা দৃষ্টিশক্তি হারানোর মূল কারণ হয়ে ওঠে এই রোগ।
ভারতের ক্ষেত্রে ডায়াবিটিস সমস্যাটি আরও জটিল। বিশাল জনসংখ্যা, দ্রুত নগরায়ণ, গ্রাম থেকে শহরে মানুষের ঢল এবং জীবনযাপনের দ্রুত পরিবর্তন—সব মিলিয়ে ডায়াবিটিস এখানে যেন উর্বর জমি পেয়েছে।
এক সময় ধারণা ছিল, ডায়াবিটিস মূলত শহুরে, উচ্চবিত্ত মানুষের রোগ। কিন্তু সাম্প্রতিক সমীক্ষা সেই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। আজ গ্রামাঞ্চল, মফস্সল শহর এমনকি নিম্ন আয়ের পরিবারগুলিতেও ডায়াবিটিস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, সস্তা কিন্তু পুষ্টিহীন খাবারের সহজলভ্যতা এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এই বিস্তারের অন্যতম কারণ।
ডায়াবিটিস নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হল—অতিরিক্ত মিষ্টি খেলেই এই রোগ হয়। বাস্তবে চিনি এর একটি অংশ মাত্র। সমস্যার শিকড় আরও গভীরে।
দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, মোবাইল ও স্ক্রিন নির্ভর জীবন, অনিয়মিত ঘুম, মানসিক চাপ, ধূমপান ও মদ্যপান—সব মিলিয়ে শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। এর ফলেই তৈরি হয় ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, যা ডায়াবিটিসের মূল ভিত্তি।
আধুনিক জীবনের আর এক বড় অভিশাপ হল মানসিক চাপ। চাকরির অনিশ্চয়তা, আর্থিক চাপ, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ এবং সামাজিক প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে মানুষের উপর মানসিক চাপ বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি স্ট্রেস শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়ায়, যা রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে।
ভারতের মতো দেশে, যেখানে বহু মানুষ একাধিক দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বাঁচেন, সেখানে মানসিক চাপ ডায়াবিটিস বৃদ্ধির এক বড় কারণ হয়ে উঠছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল—ডায়াবিটিস এখন আর শুধু বয়স্কদের রোগ নয়। শিশু ও তরুণদের মধ্যেও টাইপ ২ ডায়াবিটিসের সংখ্যা বাড়ছে। এর প্রধান কারণ ছোট বয়স থেকেই অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা।
ফাস্ট ফুড, চিনিযুক্ত পানীয়, দীর্ঘ সময় মোবাইল বা কম্পিউটারের সামনে বসে থাকা—এই অভ্যাসগুলি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অকালেই রোগাক্রান্ত করে তুলছে।
ডায়াবিটিসের বিস্তার সরাসরি প্রভাব ফেলছে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উপর। সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি ক্লিনিক—সব জায়গাতেই ডায়াবিটিস ও তার জটিলতার চিকিৎসায় বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
অনেক পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হতে হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের কাছে ডায়াবিটিস এক প্রকার আজীবন বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ডায়াবিটিস শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক সমস্যাও। অসুস্থ কর্মী মানেই উৎপাদনশীলতা হ্রাস, কর্মঘণ্টা নষ্ট এবং চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবিটিস ও তার জটিলতার জন্য আগামী কয়েক দশকে ভারতের অর্থনীতিতে বিপুল ক্ষতি হতে পারে। কর্মক্ষম বয়সে মানুষের অসুস্থতা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে ধীর করে দিতে পারে।
চিকিৎসকেরা একবাক্যে স্বীকার করছেন—ডায়াবিটিসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হল প্রতিরোধ। নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এই রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে।
প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, চিনি ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট কমানো, শাকসবজি ও ফলের পরিমাণ বাড়ানো—এই সাধারণ অভ্যাসগুলিই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
ডায়াবিটিস মোকাবিলায় ভারতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল সচেতনতার অভাব। বহু মানুষ এখনও জানেন না যে তিনি প্রিডায়াবিটিস অবস্থায় রয়েছেন। নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা না করানোর ফলে রোগ ধরা পড়ে অনেক দেরিতে।
স্কুল, কলেজ এবং কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য শিক্ষা বাধ্যতামূলক না হলে এই সমস্যা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ডায়াবিটিস মোকাবিলায় ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সামাজিক স্তরে উদ্যোগ জরুরি। স্থানীয় স্তরে স্বাস্থ্য শিবির, বিনামূল্যে রক্তে শর্করা পরীক্ষা এবং সচেতনতা কর্মসূচি চালু করতে হবে।
শহর পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন প্রয়োজন। হাঁটার পথ, পার্ক এবং খেলার মাঠ বাড়ানো না গেলে মানুষকে শারীরিকভাবে সক্রিয় রাখা সম্ভব নয়।
সরকারি স্তরে একাধিক প্রকল্প থাকলেও বাস্তবায়নে আরও গতি আনার প্রয়োজন রয়েছে। জনস্বাস্থ্য নীতিতে ডায়াবিটিস প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজেও একাধিকবার সুস্থ জীবনযাপনের বার্তা দিয়েছেন। তবে সেই বার্তাকে তৃণমূল স্তরে বাস্তবায়ন করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ডায়াবিটিসের ভবিষ্যৎ চিত্র ভয়াবহ হলেও এখনও সব শেষ হয়ে যায়নি। সময় থাকতেই যদি জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যনীতিতে পরিবর্তন আনা যায়, তবে এই নীরব মহামারিকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
ডায়াবিটিসের বিরুদ্ধে লড়াই তাই কেবল চিকিৎসকের নয়—এটি সমাজের প্রতিটি স্তরের লড়াই। ব্যক্তি থেকে পরিবার, প্রতিষ্ঠান থেকে সরকার—সবাইকে একসঙ্গে এগোতে হবে। নচেৎ জগৎসভার ‘শ্রেষ্ঠ’ আসনে ভারতের বসা যে খুব দূরের নয়, সেই আশঙ্কা ভবিষ্যতে বাস্তব রূপ নিতেই পারে।