শীতে দুপুরের আগেই ঝিমুনি ভর করে পুষ্টিবিদের মতে প্রাতরাশে সামান্য পরিবর্তন আনলেই মিলবে সমাধান সারা দিন থাকা যাবে চনমনে ও কর্মচঞ্চল
মধ্য নভেম্বর থেকে শীতের আমেজ টের পাওয়া গেলেই শরীরের নানা রকম পরিবর্তন চোখে পড়ে। সকাল-সকাল ঘুম ভাঙতে কষ্ট, বিছানা ছাড়তে অনীহা, আর দুপুরের পর থেকেই শরীরে যেন একটা নিস্তেজ ভাব তৈরি হয়। অনেকেই বলেন, দুপুরের খাবার শেষ হওয়ার পর মাথাটা কোথাও রেখে একটু গড়িয়ে নেওয়ার ইচ্ছা চেপে বসে। কাজকর্মে আসে আলস্য, মনোযোগ কমে যায়, মনে হয় শরীর ভারী হয়ে যাচ্ছে। শীতকালের এই অবস্থাকে অনেকেই সাধারণ ক্লান্তি হিসেবে ধরলেও বিশেষজ্ঞরা বলেন, এর পিছনে থাকে ‘এনার্জি ক্র্যাশ’ নামের একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া।
দিনের মাঝামাঝি সময়ে, বিশেষ করে দুপুরের পর রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ কমে গেলে বা খাবার ঠিক মতো হজম না হলে শরীরে যে তীব্র ক্লান্তি, ঝিমুনি ও মন্থর ভাব দেখা দেয়, তাকেই এনার্জি ক্র্যাশ বলা হয়। শীতকালে এই অনুভূতি আরও বেশি দেখা যায় কারণ ঠান্ডায় শরীরকে উষ্ণ রাখতে অতিরিক্ত শক্তি খরচ হয়। তার সঙ্গে যদি প্রাতরাশে পুষ্টির ভারসাম্য ঠিক না থাকে, তবে শরীর দিনে মধ্য ভাগেই ভেঙে পড়ে।
কিন্তু সুখবর হল, মাত্র কয়েকটি পরিবর্তন এনে আপনি চাইলে একেই রুখে দিতে পারেন। আর এই সমস্যার সমাধান লুকিয়ে আছে সকালে খাওয়া প্রথম খাবারে প্রাতরাশে।
মুম্বইয়ের পুষ্টিবিদ রমিতা কৌর স্পষ্ট জানাচ্ছেন, “যদি আপনি সারাদিন শক্তিতে ভরপুর থাকতে চান, ঠান্ডায় ক্লান্তি এড়াতে চান, তবে প্রাতরাশের প্লেটে কিছু নির্দিষ্ট পুষ্টিগুণ থাকা জরুরি। এগুলি শরীরকে ধীরে ধীরে কিন্তু দীর্ঘ সময় শক্তি দেয়, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখে, এবং মস্তিষ্ককে চনমনে রাখে।”
এখন বিস্তারিত আলোচনা করা যাক কোন কোন খাবার রাখলে শীতের ‘এনার্জি ক্র্যাশ’ দূরে থাকবে।
ওটস
লাল আটার রুটি
মাল্টিগ্রেন ব্রেড
রাগি বা বাজরা
দানা শস্য
কার্বোহাইড্রেট হল শরীরের প্রধান শক্তির উৎস। কিন্তু সব কার্বোহাইড্রেট এক নয়। সাধারণ সাদা রুটি, মিষ্টি, পলিশ করা চাল ইত্যাদি শরীরে খুব দ্রুত শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, আবার দ্রুত কমিয়েও দেয়। ফলে অল্প সময় পরেই ক্লান্তি এসে পড়ে।
কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট ধীরে ধীরে ভাঙে, তাই রক্তে শর্করা স্থিতিশীল থাকে। এতে
মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে
শক্তি ধীরে ধীরে কিন্তু দীর্ঘ সময় জোগানো হয়
দুপুর পর্যন্ত শরীরে স্ফূর্তি বজায় থাকে
ওটস বা বাজরা দিয়ে তৈরি নাশতা শীতে বিশেষ উপকারী, কারণ এগুলি শরীরকে উষ্ণ রাখতেও সাহায্য করে।
ডিম
দই
অঙ্কুরিত ডাল
পনির
টোফু
প্রোটিন হজম হতে সময় নেয়। ফলে এটি
দীর্ঘ সময় পেট ভরিয়ে রাখে
রক্তে শর্করার ওঠা-নামা নিয়ন্ত্রণ করে
পেশির শক্তি বাড়ায়
ক্লান্তি কমায়
শীতকালে যখন শরীর খানিক ভারী ও অলস লাগে, তখন প্রোটিনই আপনাকে সারাদিন এক্টিভ রাখতে পারে।
প্রাতরাশে দু’টো সেদ্ধ ডিম, দই-ওটস বোল, বা পনিরের পরোটা থাকলে দুপুরের আগের ক্লান্তি অনেক কমে।
কাঠবাদাম
আখরোট
চিনাবাদাম
তিল
ঘি বা বাটার (সীমিত পরিমাণে)
চর্বি শুনলেই অনেকের মনে হয় তা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু সব চর্বি সমান নয়। বাদাম ও বীজে থাকা ভালো ফ্যাট
শরীর গরম রাখে
মস্তিষ্ক সক্রিয় রাখে
দীর্ঘ সময় এনার্জি ধরে রাখতে সাহায্য করে
হরমোন নিয়ন্ত্রণে রাখে
এক মুঠো বাদাম, দুই চামচ তিল, বা রুটিতে সামান্য ঘি শীতকালে বিশেষভাবে প্রয়োজনীয়।
শীতকালীন সবজি (গাজর, মেথি, পালং)
ফল (পেয়ারা, আপেল, কলা)
দানা শস্য
ওটস
ফাইবার খাবারকে ধীরে হজম করতে সাহায্য করে। এতে
রক্তে শর্করা হঠাৎ বাড়ে না
পেট পরিষ্কার থাকে
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে
কোষ্ঠকাঠিন্য দূর থাকে
শীতে কোষ্ঠকাঠিন্য বেশি দেখা যায়, ফলে ফাইবারযুক্ত খাবার অত্যন্ত উপকারি।
কমলালেবু
লেবু
ব্রকলি
পালং শাক
গাজর
শীতে সর্দি-কাশি, ভাইরাল জ্বর ও নানা সংক্রমণ বাড়ে। তাই
ভিটামিন C রোগ প্রতিরোধ বাড়ায়
ভিটামিন A চোখের ও ত্বকের স্বাস্থ্য বজায় রাখে
ভিটামিন E অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে
অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট শরীরে জমা ‘অক্সিডেটিভ স্ট্রেস’ কমায়, ফলে ক্লান্তিও কমে
কমলালেবুর রস, লেবু-জল, বা গাজরের স্মুদি প্রাতরাশে রাখতে পারেন
যেমন
ওটস + দই
রুটি + ডিম
পোহা + বাদাম
উপমা + অঙ্কুরিত ডাল
এতে খাবার ধীরে ভাঙে এবং দুপুরে ‘এনার্জি ক্র্যাশ’ হয় না।
শীতে বিপাক কমে গেলে শরীর ক্লান্ত হয়। তাই প্রাতরাশে
আদা
হলুদ
দারচিনি
গোলমরিচ
লবঙ্গ
মেশালে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে, শরীর গরম থাকে, সারা দিন মনোযোগ বাড়ে।
শীতে তৃষ্ণা কম পায়, কিন্তু শরীরের জলাভাব বেশি হয়। ডিহাইড্রেশনই অনেকসময় দুপুরের ক্লান্তির কারণ।
সকালে হালকা গরম জল
আদা-লেবু চা
গ্রিন টি
স্যুপ
হার্বাল চা
এগুলি শরীরকে হাইড্রেট রাখে এবং ক্লান্তি কমায়।
শীতকালে প্রাতরাশে যেসব খাবার এনার্জি দ্রুত বাড়িয়ে আবার দ্রুত কমিয়ে দেয়, সেগুলি এড়িয়ে চলাই ভালো। যেমন—
সাদা পাউরুটি
অতিরিক্ত মিষ্টি
ডিপ ফ্রাই খাবার
অতিরিক্ত চিনি দেওয়া চা বা কফি
ইনস্ট্যান্ট নুডলস
এগুলি খেলে দুপুর নাগাদ শরীর ভেঙে পড়ে ও মাথা ঝিমঝিম করে।
প্রাতরাশই দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাবার। বিশেষ করে শীতে। কারণ এই সময়ে শরীরের বিপাক, শক্তির ব্যবহার, ও হরমোনগত পরিবর্তন অন্য ঋতুর তুলনায় আলাদাভাবে কাজ করে।
যদি প্রাতরাশে
কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট
প্রোটিন
ফাইবার
স্বাস্থ্যকর ফ্যাট
ভিটামিন
এর সুষম উপস্থিতি থাকে, তবে
দুপুরে ক্লান্তি কমবে
মনোযোগ বাড়বে
শরীর উষ্ণ থাকবে
কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়বে
ঘুম ঘুম ভাব দূর হবে
অর্থাৎ, সারাদিন হবেন চনমনে ও শক্তিতে ভরপুর।
শীতকালে দিনের মাঝামাঝি সময়ে যে অতিরিক্ত ক্লান্তি ঘিরে ধরে, তাকে অনেকেই অবহেলা করেন। কিন্তু শরীরের এই ঝিমুনি আসলে আপনার খাবারের ধরন এবং দৈনন্দিন অভ্যাসের সঙ্গেই গভীরভাবে জড়িত। এনার্জি কমে যাওয়ার কারণে দুপুরের পর মনোযোগ কমে যায়, কাজের গতি নেমে আসে এবং কোনও কিছু করতে ইচ্ছা করে না। তাই সারাদিন কর্মক্ষম থাকতে হলে সকালের খাবার অর্থাৎ প্রাতরাশকে যতটা সম্ভব সুষম এবং পরিকল্পিত রাখতেই হবে।
প্রাতরাশে কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি, ভিটামিন এবং অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট রাখলে শরীর দীর্ঘ সময় ধরে শক্তি ধরে রাখতে পারে। ওটস, রুটি, ডিম, দই, অঙ্কুরিত ডাল, বাদাম, বীজ, মৌসুমি ফল এসব খাবার রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ ওঠা–নামা করতে দেয় না। ফলে দুপুরে ক্লান্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে। তাছাড়া, শীতকালে শরীর স্বাভাবিক ভাবে বেশি তাপ উৎপাদনের চেষ্টা করে। স্বাস্থ্যকর ফ্যাট যেমন কাঠবাদাম, তিল বা আখরোট সেই উষ্ণতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
এ ছাড়া ফাইবার ও অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট সমৃদ্ধ খাবার হজমশক্তি বাড়ায় এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে। ফল, শাকসবজি, বিশেষ করে গাজর, পালং, ব্রকলি এগুলি শরীরকে ভিতর থেকে পুষ্ট রাখে। আর দিনের শুরুতে এক গ্লাস হালকা গরম জল বা মসলা চা খেলে রক্তসঞ্চালন ভালো থাকে এবং শরীর জেগে ওঠে দ্রুত।
মশলার ভূমিকা শীতে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আদা, দারচিনি, গোলমরিচ বা লবঙ্গ শরীরের বিপাকক্রিয়া বাড়ায়, যার ফলে সারা দিন ধরে শক্তি উৎপন্ন হয় সমানভাবে। এটি শরীর উষ্ণ রাখার পাশাপাশি মস্তিষ্কের সতর্কতাও বাড়ায়। ফলে দুপুর হওয়ার আগেই মাথা ঘুরে যাওয়া বা একবারেই মন বসাতে না পারার সমস্যাগুলি কমতে থাকে।
সবশেষে, জলপান শীতে কম জল খাওয়ার অভ্যাস অনেকের থাকে। এতে শরীরে লুকিয়ে ডিহাইড্রেশন তৈরি হয়, যা ক্লান্তি ও মাথাব্যথার প্রধান কারণ। নিয়মিত গরম জল, স্যুপ, হার্বাল চা বা গ্রিন টি খেলে শরীর আর্দ্র থাকে এবং প্রাণবন্ত অনুভব হয় সারাদিন।
সুতরাং, প্রাতরাশে সামান্য বদল, একটি সঠিক খাদ্যসংগঠন এবং সচেতন জলপানের অভ্যাস আপনার দিনটিকে করে তুলতে পারে অনেক বেশি প্রাণবন্ত ও কর্মক্ষম। শীতেও দুপুর-পরবর্তী ক্লান্তি আর আপনাকে ছুঁতে পারবে না