Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

জনস্বাস্থ্যে বড় ধাক্কা তামাক শিল্পে! পড়শি রাজ্যে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি

ওড়িশা সরকার গুটখা ও তামাকজাত পানমশলার উৎপাদন, মজুত ও বিক্রির উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, নিকোটিনযুক্ত কোনো খাদ্যপণ্য উৎপাদন বা বিক্রি করা যাবে না। তবে বিড়ি ও সিগারেটকে নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখায় সিদ্ধান্তটি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে

 


ওড়িশায় গুটখা ও তামাকজাত পণ্যে নিষেধাজ্ঞা শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি ভারতের তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দীর্ঘদিন ধরেই দেশে তামাক ব্যবহারের বিরুদ্ধে নানা আইন ও নির্দেশিকা থাকলেও বাস্তবে গুটখা, জর্দা এবং তামাকজাত পানমশলার বাজার কখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ২০১১ সালে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের পর বিভিন্ন রাজ্যে গুটখা নিষিদ্ধ হলেও, বিকল্প পথে এই পণ্যের ব্যবহার চলতেই থাকে। দোকানগুলো আলাদাভাবে মশলা ও জর্দা বিক্রি করত এবং সাধারণ মানুষ সেগুলি মিশিয়ে নিজেরাই গুটখার মতো পণ্য তৈরি করত। ওড়িশাতেও এই প্রবণতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল।

এই পরিস্থিতির অবসান ঘটাতেই ওড়িশা সরকার এবার আরও কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, রাজ্যে গুটখা, তামাকজাত পানমশলা, জর্দা এবং নিকোটিনযুক্ত খাদ্যপণ্যের উৎপাদন, মজুত ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি মশলা ও জর্দা আলাদাভাবে বিক্রির পথও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সরকারের দাবি, জনস্বাস্থ্য রক্ষার জন্যই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা থাকবে।

তবে এই সিদ্ধান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নিষেধাজ্ঞা থেকে বিড়ি ও সিগারেটকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এখানেই শুরু হয়েছে বিতর্ক। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, তামাকের কোনো রূপই নিরাপদ নয়। তাহলে গুটখা নিষিদ্ধ করে বিড়ি ও সিগারেটকে ছাড় দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

তামাক শিল্পের অর্থনৈতিক দিক ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের তামাক শিল্প বহু মানুষের জীবিকা নির্ভর একটি বড় খাত। তামাক চাষ, বিড়ি শিল্প, সিগারেট কারখানা, পরিবহন, পাইকারি ব্যবসা এবং খুচরো বিক্রি মিলিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে তামাক চাষ বহু কৃষকের প্রধান আয়ের উৎস। বিড়ি শিল্পে কাজ করেন অসংখ্য শ্রমিক, যাদের বড় অংশই নারী ও শিশু শ্রমিক।

সরকারের রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রেও তামাক শিল্প একটি বড় ভূমিকা পালন করে। সিগারেট এবং তামাকজাত পণ্যের উপর কর থেকে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পায়। তাই সম্পূর্ণভাবে তামাক নিষিদ্ধ করা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে সহজ সিদ্ধান্ত নয়। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, বিড়ি ও সিগারেটকে নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখার পেছনে এই অর্থনৈতিক বাস্তবতাই একটি বড় কারণ।

কিন্তু অর্থনৈতিক লাভের বিপরীতে তামাক ব্যবহারের সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতি আরও ভয়াবহ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ভারতে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মুখগহ্বর ক্যানসার, ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদরোগ, স্ট্রোকসহ বহু মারাত্মক রোগের প্রধান কারণ তামাক। গুটখা ও জর্দা বিশেষভাবে মুখগহ্বর ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।

স্বাস্থ্য খাতে সরকারের ব্যয়ও তামাক ব্যবহারের কারণে বিপুলভাবে বেড়ে যায়। তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য যে অর্থ ব্যয় হয়, তা অনেক ক্ষেত্রে তামাক শিল্প থেকে পাওয়া রাজস্বের চেয়েও বেশি। ফলে অর্থনৈতিক লাভ ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতির মধ্যে একটি গভীর দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।

আইনি দিক থেকে ভারতের তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতি বহু স্তরবিশিষ্ট। Cigarettes and Other Tobacco Products Act বা COTPA আইন অনুযায়ী, তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন, বিক্রি এবং ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হয়। স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশেপাশে তামাক বিক্রি নিষিদ্ধ, প্রকাশ্যে ধূমপান নিষিদ্ধ এবং প্যাকেটে স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে নানা সমস্যা রয়েছে।

গুটখা নিষিদ্ধ হওয়ার পর অবৈধ বাজার আরও শক্তিশালী হয়েছে। অনেক জায়গায় গোপনে গুটখা উৎপাদন ও বিক্রি চলছে। সীমান্তবর্তী রাজ্য থেকে নিষিদ্ধ পণ্য চোরাপথে প্রবেশ করছে। ছোট ছোট দোকানে গোপনে তামাকজাত পণ্য বিক্রি হচ্ছে। ফলে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বাজার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।

ওড়িশার নতুন সিদ্ধান্তের ফলে অবৈধ বাজার আরও সক্রিয় হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। নিষিদ্ধ পণ্যের চাহিদা পুরোপুরি কমে না গেলে, অবৈধ ব্যবসা বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে প্রশাসনের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে।

আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নজরদারি এবং শাস্তির কার্যকর বাস্তবায়ন। শুধু আইন তৈরি করলেই হবে না, মাঠ পর্যায়ে তার কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন। দোকান, গুদাম, কারখানা এবং পরিবহন ব্যবস্থায় নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

news image
আরও খবর

সামাজিক দিক থেকেও তামাক একটি জটিল বিষয়। বহু মানুষ তামাককে অভ্যাস হিসেবে গ্রহণ করেছে। গ্রামীণ সমাজে গুটখা ও জর্দা দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। তাই হঠাৎ করে নিষেধাজ্ঞা জারি করলে তা সমাজে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

ওড়িশার সিদ্ধান্ত তাই শুধু প্রশাসনিক নয়, সামাজিক সংস্কারের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। যদি এই সিদ্ধান্ত সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা অন্যান্য রাজ্যের জন্য একটি উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।

রাজনৈতিক দিক থেকেও এই সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিজেপি সরকারের নেতৃত্বে নেওয়া এই পদক্ষেপ একদিকে জনস্বাস্থ্য রক্ষার বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক বিতর্কও উসকে দিচ্ছে। বিরোধীদের প্রশ্ন, যদি সরকার সত্যিই তামাকমুক্ত সমাজ গড়তে চায়, তবে বিড়ি ও সিগারেটকে কেন ছাড় দেওয়া হলো।

অনেকে মনে করছেন, এটি একটি ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞার কৌশল হতে পারে। প্রথমে গুটখা ও জর্দা নিষিদ্ধ, পরে ধীরে ধীরে অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের উপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, এটি রাজনৈতিক ভারসাম্যের ফল। কারণ বিড়ি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের ভোটব্যাংক এবং তামাক শিল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্ব সরকারকে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা থেকে বিরত রেখেছে।

ভবিষ্যতের দিক থেকে ওড়িশার এই সিদ্ধান্ত তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতিতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পারে। যদি প্রশাসন কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে পারে এবং অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, তবে গুটখা ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।

একই সঙ্গে প্রয়োজন বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। তামাক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের জন্য বিকল্প জীবিকা তৈরি না হলে, নিষেধাজ্ঞা সামাজিক সমস্যার জন্ম দিতে পারে। কৃষকদের জন্য বিকল্প ফসলের ব্যবস্থা, শ্রমিকদের জন্য নতুন শিল্পে প্রশিক্ষণ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য পুনর্বাসন পরিকল্পনা অপরিহার্য।

সর্বোপরি বলা যায়, ওড়িশার গুটখা নিষেধাজ্ঞা তামাক নিয়ন্ত্রণে একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অসম্পূর্ণ পদক্ষেপ। এটি জনস্বাস্থ্য রক্ষার পথে একটি বড় উদ্যোগ হলেও, অর্থনীতি, আইন, সমাজ এবং রাজনীতির জটিল বাস্তবতার কারণে এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তব প্রয়োগের উপর।

যদি সরকার কেবল আইন ঘোষণা করেই থেমে যায়, তবে এই সিদ্ধান্তও অতীতের অনেক নিষেধাজ্ঞার মতো কাগজে সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে। কিন্তু যদি প্রশাসন কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করে, অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণ করে এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে পারে, তবে ওড়িশার এই সিদ্ধান্ত ভারতের তামাকবিরোধী আন্দোলনে একটি নতুন দিশা দেখাতে পারে।

এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে তামাক নিয়ন্ত্রণ শুধু একটি স্বাস্থ্যনীতি নয়, বরং এটি অর্থনীতি, আইন, সমাজ এবং রাজনীতির সমন্বিত লড়াই। ওড়িশার পথ কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলবে। তবে এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তামাকমুক্ত সমাজ গড়ার পথে এই উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।                     

সব মিলিয়ে বলা যায়, ওড়িশার গুটখা ও তামাকজাত পণ্যে নিষেধাজ্ঞা শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি ভারতের তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতিতে এক নতুন মোড়। একদিকে জনস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য সরকারের কঠোর অবস্থান, অন্যদিকে অর্থনীতি ও শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার বাস্তবতা—এই দুইয়ের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে তামাকবিরোধী লড়াই।

যদি এই আইন শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবে কার্যকর হয়, যদি অবৈধ বাজার দমন করা যায় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব হয়, তবে এই সিদ্ধান্ত সত্যিই একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যদি বিড়ি ও সিগারেটকে ছাড় দেওয়ার মতো দ্বিচারিতা চলতেই থাকে, তবে তামাকমুক্ত সমাজ গড়ার স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যাবে।

ওড়িশার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে অন্যান্য রাজ্যকেও একই পথে হাঁটতে উৎসাহিত করতে পারে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—ভারত কি সত্যিই তামাকমুক্ত সমাজের দিকে এগোতে পারবে, নাকি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কাছে আবারও হার মানবে? সময়ই দেবে তার উত্তর।

Preview image