কোন থালায় খাওয়া সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর স্টিল কাঁসা কাচ নাকি প্লাস্টিক বদলে যাওয়া অভ্যাসের মাঝেও কোন পাত্রে খাবার খেলে শরীরের উপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে, তা নিয়েই বিশদ আলোচনা
রোগা হতে হোক বা সুগার কমাতে আজকাল খাদ্যাভ্যাস নিয়ে আলোচনা সর্বত্র। নেটমাধ্যম জুড়ে ভরে রয়েছে ডায়েট চার্ট, পরামর্শ, কোন খাবার কতটা খাওয়া উচিত, কোন খাবারের কী উপকারিতা এসব খুঁটিনাটি। কিন্তু একটা বিষয় আজও বহু মানুষের নজরের বাইরে, তা হল আমরা যেই থালায় খাই, সেই থালাও শরীরকে প্রভাবিত করে। শুধু খাবার নয়, খাবার রাখার পাত্র, থালা বা বাটির উপাদানও শরীরের ওপর দীর্ঘমেয়াদে বড় প্রভাব ফেলে। খাবারের গুণাগুণ বজায় রাখা, শরীরে বিষাক্ত উপাদান না ঢোকা, হজমশক্তি উন্নত হওয়া এই সব কিছুই নির্ভর করে খাদ্যপাত্রের গুণমানের ওপর।
বাঙালি বাড়িতে স্টিলের থালার চল সবচেয়ে বেশি। একসময় কাঁসা ছিল নিয়মিত ব্যবহারের অঙ্গ। পুজো থেকে দৈনন্দিন খাওয়া সবেতেই কাঁসার ব্যবহার ছিল সাধারণ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই কাঁসা সরে গেছে আলমারির ভিতরে, শুধুই অনুষ্ঠানের থালা হিসেবে রয়ে গেছে। বদলে এসেছে কাচের থালা, রঙিন প্লাস্টিকের থালা কিংবা মেলামাইনের বাহারি সেট। এসবই দেখতে আকর্ষণীয়, ব্যবহার করতে সুবিধাজনক। কিন্তু স্বাস্থ্যগত দিক থেকে সব থালাই যে সমান নিরাপদ, তা বলা যায় না।
এই দীর্ঘ আলোচনায় আমরা বিশদে জানব
কোন থালা কতটা নিরাপদ
কোন উপাদানে কী ধরনের রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া হয়
খাবার রাখলে কীভাবে পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়
কোন থালা প্রতিদিন ব্যবহার করা উচিত
কোন থালা থেকে দূরে থাকা ভালো
এবং সর্বোপরি স্বাস্থ্য বজায় রাখতে নিরাপদ থালা বাছার সঠিক উপায়
স্টিলের থালার জনপ্রিয়তা বহুদিনের। এর গুণাগুণও সত্যিই কার্যকর।
রাসায়নিকভাবে অত্যন্ত স্থিতিশীল খাবারের অম্ল, তেল বা লবণের সঙ্গে কোনও বিক্রিয়া করে না।
তাপ সহনশীল গরম খাবার রাখলে কোনও ক্ষতিকর রাসায়নিক বের হয় না
ব্যাক্টেরিয়া প্রতিরোধী ছত্রাক বা জীবাণু জমতে পারে না সহজে।
টেকসই ও নিরাপদ দীর্ঘদিন ব্যবহার করেও ক্ষতি নেই।
অনেকেই বলেন, স্টিলের থালায় খেলে শরীরের ভারসাম্য বজায় থাকে। কারণ এতে শরীরে ভারী ধাতুর প্রবেশের সম্ভাবনা নেই।
রোজ সাবান ও গরম জলে ধুতে হবে।
সপ্তাহে একবার ভিনিগার বা বেকিং সোডা মিশিয়ে ঘষে পরিষ্কার করলে দাগ কমে।
কড়া দাগ হলে লেবুর রস ব্যবহার করা যায়।
নিম্নমানের স্টিলে নিকেল বেশি থাকে যা সংবেদনশীল মানুষের ত্বকে সমস্যা করতে পারে।
তাই ভালো ব্র্যান্ডের স্টিল কেনাই নিরাপদ।
কাচের পাত্র রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয়। অর্থাৎ
খাবারের সঙ্গে কোনও বিক্রিয়া হয় না
গরম খাবারও সহজে রাখা যায়
ধোয়ার পর ব্যাক্টেরিয়া থাকে না
রঙিন বা ডিজাইনযুক্ত প্লেটে খাবার দেখতে আকর্ষণীয় লাগে
কাচের থালা আজকাল ক্যাফে, রেস্তরাঁ, বাড়ি সব জায়গায় ব্যবহার হচ্ছে। বিশেষ করে ট্রান্সপারেন্ট বা কালো কাচের থালা বেশ জনপ্রিয়।
ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি।
হঠাৎ অতিরিক্ত তাপমাত্রা পরিবর্তনে ফেটে যেতে পারে।
ভারী হওয়ায় ব্যবহার কিছুটা অসুবিধাজনক।
তবুও স্বাস্থ্যগত দিক দিয়ে কাচ অত্যন্ত নিরাপদ।
আজকাল প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই প্লাস্টিকের থালা-বাটি পাওয়া যায়। বিশেষ করে কালো রঙের প্লাস্টিক সেট, মেলামাইন, ট্রে সবই খুব জনপ্রিয়। দেখতে সুন্দর, ভাঙার ভয় নেই, ধোয়া সহজ তাই ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেশি।
কিন্তু এই ব্যবহারই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বিপজ্জনক হতে পারে।
BPA (বিসফেনল এ)
ফথালেটস
স্টাইরিন
গরম খাবার প্লাস্টিকে রাখলেই এই রাসায়নিকগুলো খাবারে মিশে যায়।
শরীরের নানা হরমোনের কাজ ব্যাহত করে
বন্ধ্যত্বের ঝুঁকি বাড়ায়
শিশুদের বৃদ্ধির সমস্যা
রক্তচাপ বৃদ্ধি
ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি
লিভার-কিডনি ক্ষতি
সাধারণত ৫০°C র বেশি তাপমাত্রাতেই প্লাস্টিক থেকে রাসায়নিক বের হতে শুরু করে।
গরম ভাত প্লাস্টিকের থালায় রাখা
রান্নার কড়াইতে প্লাস্টিকের স্প্যাচ্যুলা ব্যবহার
গরম তরকারি প্লাস্টিকের বাটিতে ঢালা
এসব অভ্যাস দিনে দিনে শরীরে বিষ জমাতে পারে
অনেকেই ভাবেন কাগজের থালায় খাওয়া অত্যন্ত নিরাপদ। কিন্তু বাস্তবে তা পুরোপুরি ঠিক নয়।
বেশিরভাগ কাগজের থালার উপরে থাকে মোম বা প্লাস্টিকের আস্তরণ।
গরম খাবারের সংস্পর্শে এলে সেই আস্তরণ গলে গিয়ে খাবারে মেশে।
রাসায়নিক আস্তরণ শরীরের জন্য বিষাক্ত।
সুতরাং
এক-আধ দিন, পিকনিক বা জরুরি পরিস্থিতিতে খাবার খাওয়ার জন্য ঠিক আছে।
প্রতিদিন ব্যবহার করবেন না।
আগেকার সময়ে কাঁসার থালাই বাংলার ঘরে ঘরে ব্যবহৃত হত আজও চিকিৎসকরা কাঁসাকে নিরাপদ বলে মানেন
রাসায়নিকমুক্ত
খাবারের স্বাদ বজায় রাখে
হজমশক্তি উন্নত করে
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বৈশিষ্ট্য থাকে
অনেকেই বিশ্বাস করেন, কাঁসা শরীরের তিন দোষ বাত, পিত্ত, কফ নিয়ন্ত্রণ করে।
লেবু
টক ডাল
তেঁতুল
টক আচার
খুব বেশি অম্লযুক্ত খাবার
কারণ এগুলির সঙ্গে কাঁসার রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। খাবারের স্বাদও নষ্ট হয়।
সপ্তাহে কয়েকবার লেবু, ছাই বা টমেটো দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করুন।
টক জাতীয় পদ দূরে রাখুন।
কাঠের পাত্র এখন ট্রেন্ড। ক্যাফে, রেস্তরাঁ, হোমডেকর সব জায়গায় জনপ্রিয়।
সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক
প্লাস্টিকমুক্ত
দৃষ্টিনন্দন
পরিবেশবান্ধব
ঠিকমতো শুকালে না ব্যাক্টেরিয়া জন্মাতে পারে
কাঠ ফেটে গেলে ক্ষতিকর জীবাণু বসবাস করতে পারে
খুব গরম খাবার রাখলে কাঠ নষ্ট হয়
গরম জল দিয়ে ধুলে কাঠ ফুলে যেতে পারে
নরম স্পঞ্জ দিয়ে ধুতে হবে
ধোয়ার পর সম্পূর্ণ শুকিয়ে নিতে হবে
কখনোই খুব গরম খাবার ঢালা যাবে না
মাঝে মাঝে তেল মেখে নিতে হবে যাতে কাঠ শুকিয়ে না যায়
স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের মতে
স্টেনলেস স্টিল
কাচ
কাঁসা (কিছু খাদ্য সতর্কতা রেখে)
কাঠ (পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার শর্তে)
প্লাস্টিকের থালা
গরম খাবারের জন্য মেলামাইন
রোজ কাগজের থালা
১. গরম খাবার কখনও প্লাস্টিকে রাখবেন না
২. স্টিল বা কাচ দুটোই নিরাপদ ও সাশ্রয়ী।
৩. টক খাবার কাঁসায় রাখবেন না।
৪. শিশুদের জন্য কাচ বা স্টিলই শ্রেয়।
৫. কাঠের থালা ভিজে রাখবেন না।
৬. থালা সবসময় সাবান ও গরম জলে ধুবেন।
৭. রাসায়নিকযুক্ত রঙিন প্লাস্টিক সেট থেকে দূরে থাকুন।
৮. কালো প্লাস্টিকের থালা সবচেয়ে ক্ষতিকর।
৯. রেস্টুরেন্টে প্লাস্টিক ট্রেতে গরম খাবার পেলে, বদলাতে বলুন।
১০. BPA-free লেখা থাকলেও প্লাস্টিক পুরোপুরি নিরাপদ নয়।
খাবার শুধু পেট ভরানোর জন্য নয় শরীরকে পুষ্টি দেওয়ার জন্য। কিন্তু সেই পুষ্টি বজায় রাখতে হলে থালার গুণমানও সমান গুরুত্বপূর্ণ স্টিল, কাচ এবং কাঁসা এগুলি শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত, পরীক্ষিত, নিরাপদ বিকল্প। অন্যদিকে প্লাস্টিক যতই সুন্দর হোক, স্বাস্থ্যের জন্য তা অত্যন্ত ক্ষতিকর
তাই আজ থেকেই থালা বদলান। আপনার পরিবার, বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের জন্য স্টিল বা কাচ-এর থালাই সবচেয়ে নিরাপদ। খাবারের গুণাগুণ বজায় রাখতে এবং ভবিষ্যতের জটিল রোগ প্রতিরোধ করতে থালার সঠিক নির্বাচন অত্যন্ত জরুরি।