Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

বেদানা ও আমলকি রসের মিশ্রণ শরীরের জন্য ৫ অদ্ভুত উপকারিতা যা আপনাকে জানতেই হবে

বেদানা এবং আমলকি দুটোই পুষ্টিকর ফল, যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। বেদানা এন্টিঅক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ, যা শরীরের ক্ষতিকারক টক্সিন দূর করতে সাহায্য করে, আর আমলকি ভিটামিন সি'তে ভরপুর, যা ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী করে এবং ত্বকের জন্য ভালো। এই দুই সুপারফুড একসঙ্গে খেলে পুষ্টিগুণ অনেক বাড়ে, কারণ তাদের মিশ্রণে শরীরের ভিতরকার ডিটক্সিফিকেশন প্রক্রিয়া আরও কার্যকর হয়। পুষ্টিবিদরা বলেন, এই দুটি ফল একসঙ্গে খেলে হজমের সমস্যা কমে, ত্বক সুন্দর হয় এবং শরীরে শক্তির পরিমাণও বেড়ে যায়। তবে, বেশি খাওয়ার থেকে পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত।

বেদানা এবং আমলকি—এই দুই ফলই অত্যন্ত উপকারী এবং পুষ্টিগুণে পরিপূর্ণ। একদিকে, বেদানায় রয়েছে অ্যান্থোসায়ানিন ও পুনিক্যালাজিনস নামক অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট, যা শরীরকে মুক্ত radicals থেকে রক্ষা করে, অন্যদিকে আমলকিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট, ফাইবার এবং খনিজ, যা শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই দুই ফলের রস একসঙ্গে মিশিয়ে খেলে কি তার পুষ্টিগুণ আরও বেড়ে যাবে? বিশেষ করে শীতের সময়, যেখানে আমাদের শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা বেশি। পুষ্টিবিদরা কি এর উপকারিতা সম্পর্কে কিছু বলেছেন? চলুন, এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করি।

বেদানা এবং আমলকির পুষ্টিগুণ:

বেদানা, এক ধরনের ফল যা শুধুমাত্র সুস্বাদু নয়, পুষ্টিগুণেও ভরপুর। এই ফলটি অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ, যা শরীরের কোষগুলোকে মুক্ত র‍্যাডিক্যালস থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। মুক্ত র‍্যাডিক্যালস শরীরের কোষে ক্ষতি করতে পারে এবং দ্রুত বয়স বাড়াতে সহায়ক হয়। তাই বেদানা শরীরের প্রাকৃতিক ডিটক্সিফিকেশন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করে, যা শরীরের ক্ষতিকর টক্সিন বের করতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

বেদানায় উপস্থিত আয়রন রক্তাল্পতা বা এনিমিয়া (anemia) দূর করতে অত্যন্ত সহায়ক। আয়রন রক্তের হিমোগ্লোবিনের উৎপাদন বাড়ায়, যা রক্তে অক্সিজেন পরিবহন করতে সাহায্য করে। ফলে রক্ত সঞ্চালন উন্নত হয় এবং শরীরের শক্তির স্তরও বাড়ে। এই কারণে, বেদানা নিয়মিত খাওয়া শরীরকে চাঙ্গা রাখতে সহায়ক।

এছাড়া, বেদানায় উপস্থিত ফাইবার অন্ত্রের স্বাস্থ্য বজায় রাখে এবং হজমের ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। এটি খাবারের পুষ্টিগুণ শোষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করে। বেদানা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক, কারণ এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং রক্তের লিপিড প্রোফাইল উন্নত করে।

আমলকির পুষ্টিগুণ:

অন্যদিকে, আমলকি একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ফল, যা ভিটামিন সি এবং ভিটামিন ই-এর দুর্দান্ত উৎস। ভিটামিন সি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে এবং শরীরকে সুস্থ রাখে। এই ভিটামিন ত্বক এবং চুলের জন্যও উপকারী, কারণ এটি কোলাজেন উৎপাদন বৃদ্ধি করে। কোলাজেন ত্বককে টানটান এবং উজ্জ্বল রাখে, ত্বকের ভেতরের কোষগুলিকে মেরামত করতে সাহায্য করে এবং বয়সের ছাপ দূর করতে সহায়ক।

আমলকিতে থাকা অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট শরীরের অভ্যন্তরীণ ক্ষতিকর উপাদানগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং শরীরকে সুরক্ষিত রাখে। এটি শীতকালে বিশেষভাবে উপকারী, কারণ এই সময় সর্দি, কাশি এবং ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো সমস্যা বেড়ে যায়। আমলকি শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে, বিশেষ করে শীতকালে। এর পাশাপাশি, এটি অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি (pro-inflammatory) গুণাবলী সহকারী, যা প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে এবং শরীরকে সুস্থ রাখে।

আমলকি ভিটামিন সি-র পাশাপাশি ফাইবার এবং অন্যান্য খনিজেও সমৃদ্ধ, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্য ঠিক রাখে। এই ফলটি হজম ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সহায়তা করে। এর ফলস্বরূপ, শরীরের পুষ্টি শোষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

বেদানা এবং আমলকি উভয়ই ফাইবার সমৃদ্ধ, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্যকে সুস্থ রাখে এবং পাচনতন্ত্রের কার্যকারিতা বাড়ায়। এই ফল দুটি একসঙ্গে খেলে তাদের পুষ্টিগুণ বাড়ে এবং শরীরকে আরও শক্তিশালী, স্বাস্থ্যবান ও রোগমুক্ত রাখে।

বেদানা এবং আমলকি একসঙ্গে খাওয়ার উপকারিতা:

১. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি:

বেদানা এবং আমলকি উভয়েই ভিটামিন সি এবং অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টে পূর্ণ। দুই ফলের রস একসঙ্গে মিশিয়ে খেলে ভিটামিন সি এবং অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টের মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে শীতের সময় যখন ঠান্ডা, জ্বর, সর্দি-কাশির সমস্যাগুলো বেশি হয়, তখন এই মিশ্রণ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। আমলকি এবং বেদানার এই রস শরীরের শক্তি বাড়ায় এবং শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

২. ত্বকের জেল্লা বৃদ্ধি:

বেদানা এবং আমলকি উভয়েই অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে পরিপূর্ণ, যা আমাদের ত্বককে ক্ষতিকর ফ্রি র‍্যাডিক্যালস থেকে রক্ষা করে। অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ত্বকের সেলগুলোকে মেরামত করতে সাহায্য করে এবং ত্বকের বয়স বাড়ানোর প্রক্রিয়া ধীর করে দেয়। আমলকির রসে থাকা ভিটামিন সি ত্বকের প্রোটিন কোলাজেনের উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে, যা ত্বকের সজীবতা এবং সতেজতা বজায় রাখতে সহায়ক। নিয়মিত এই দুই ফলের রস খেলে ত্বকে সুন্দর এবং উজ্জ্বল ভাব আসে।

৩. লিভারের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী:

news image
আরও খবর

বেদানায় থাকা পলিফেনলস এবং ফ্ল্যাভেনয়েডস লিভারের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে এবং এটি লিভারের ক্ষতি রোধ করে। আমলকির রসে থাকা উপাদানগুলো লিভারে ফ্যাট জমতে বাধা দেয় এবং বিপাকক্রিয়াকে ঠিক রাখে। তাই, লিভারের স্বাস্থ্যের জন্য এই দুটি ফলের রস মিশিয়ে খাওয়া অত্যন্ত উপকারী।

৪. হার্টের স্বাস্থ্যের উন্নতি:

আমলকির রসে থাকা ভিটামিন সি, খনিজ এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান হার্টের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি লিপিড প্রোফাইলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, যা হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। বিশেষ করে, আমলকির অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট গুণাবলী হৃদপিণ্ডের কার্যক্রমকে সুরক্ষিত রাখে এবং রক্তের তরলতা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। এর ফলে হার্টের রোগের ঝুঁকি কমে এবং হৃদযন্ত্র সুস্থ থাকে।

অন্যদিকে, বেদানায় থাকা আয়রন রক্ত সঞ্চালন ও অক্সিজেন পরিবহন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। আয়রন রক্তের হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়ায়, যা রক্তে অক্সিজেনের সরবরাহ বৃদ্ধি করে এবং সঠিকভাবে শরীরের কোষগুলোতে অক্সিজেন পৌঁছায়। এটি হার্টের কার্যক্ষমতা বাড়ায় এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।

এই দুই ফল একসঙ্গে খেলে হার্ট সুস্থ থাকে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। বেদানা এবং আমলকির পুষ্টিগুণ একে অপরকে সমর্থন করে, ফলে হৃদযন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখার জন্য এটি একটি শক্তিশালী এবং প্রাকৃতিক উপায়। নিয়মিত এই রস খাওয়া হার্ট এবং রক্তচাপের জন্য উপকারী হতে পারে।

৫. মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বৃদ্ধি:

বেদানায় থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট মস্তিষ্কের সেলগুলিকে রক্ষা করে এবং মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। এটি বিশেষভাবে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক এবং অ্যালঝাইমার বা মেমরি লস সম্পর্কিত সমস্যাগুলো প্রতিরোধে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। আমলকি স্নায়ুতন্ত্রের সুস্থতার জন্য উপকারী, কারণ এটি মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে।

কীভাবে বানাবেন বেদানা এবং আমলকির রস?

বেদানা এবং আমলকির রস তৈরি করা খুবই সহজ এবং এটি শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। পুষ্টিবিদ অঞ্জলি মুখোপাধ্যায় তার পরামর্শে বলেছেন, ‘‘এই রস তৈরি করতে আপনাকে এক কাপ বেদানা, একটি আমলকি, সামান্য সৈন্ধব নুন এবং চাটমশলা দরকার। প্রথমে বেদানা থেকে দানা বের করে নিন এবং আমলকিকে ছেঁকে রস বের করুন। এরপর একটি মিক্সার বা ছাকনি দিয়ে রসটি ভালোভাবে ছেঁকে নিন। তারপর এই রসে সামান্য সৈন্ধব নুন এবং চাটমশলা যোগ করে মিশিয়ে নিন।’’

এই রসটি নিয়মিত খেলে শরীর থাকবে সতেজ এবং শক্তিশালী। বেদানা এবং আমলকি একসঙ্গে খাওয়ার ফলে ভিটামিন সি, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং খনিজের মাত্রা বেড়ে যায়, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। বিশেষ করে শীতকালীন সময়ে, যখন সর্দি, কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো সমস্যা বাড়ে, তখন এই রস অত্যন্ত উপকারী।

বেদানার আয়রন রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে এবং আমলকির ভিটামিন সি ত্বক এবং চুলের সৌন্দর্য বাড়ায়। তাই, এই রস খেলে শরীরের অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং ত্বকও উজ্জ্বল থাকে। নিয়মিত এই রস খাওয়ার অভ্যাস শরীরকে সুস্থ ও শক্তিশালী রাখতে সাহায্য করে।

শেষ কথা:

বেদানা এবং আমলকি—এই দুটি ফলই একে অপরের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে বেশ কিছু স্বাস্থ্য উপকারে আসে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, ত্বক এবং চুলের সৌন্দর্য বৃদ্ধি, লিভার এবং হার্টের স্বাস্থ্য রক্ষা, এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এই ফলের রস অত্যন্ত উপকারী। তবে, এটি খাওয়ার সময় পরিমাণের প্রতি সচেতন থাকা উচিত এবং পুষ্টিবিদের পরামর্শ মেনে খাওয়া উচিত।

এই দুটি ফলের রস মিশিয়ে খাওয়ার অভ্যাস শুরু করলে, শীতের সময় শরীর আরো সতেজ এবং স্বাস্থ্যবান থাকবে।

Preview image