শীতকালে ঠান্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়ার প্রভাবে পায়ে ফাটা, শুষ্কতা, অসাড়তা ও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। সঠিক জুতো-মোজা ব্যবহার, নিয়মিত ময়েশ্চারাইজিং এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে সহজেই পায়ের সুরক্ষা সম্ভব। শীতে পা সুস্থ রাখতে কী কী সতর্কতা জরুরি, তা নিয়েই এই প্রতিবেদন।
শীতকাল মানেই কুয়াশা, ঠান্ডা হাওয়া, শুকনো আবহাওয়া এবং শরীরের নানা সমস্যার বাড়বাড়ন্ত। এই সময়ে আমরা সাধারণত হাত, মুখ বা ঠোঁটের যত্নের কথা বেশি ভাবলেও পায়ের যত্ন অনেকটাই অবহেলিত থেকে যায়। অথচ শীতের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি পড়ে শরীরের নীচের অংশে, বিশেষ করে পায়ে। ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে পায়ের রক্ত সঞ্চালন কমে যেতে পারে, ত্বক হয়ে ওঠে শুষ্ক ও ফাটা, দেখা দিতে পারে অসাড়তা, সংক্রমণ কিংবা তীব্র ব্যথার মতো সমস্যা। বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতকালে পায়ের সঠিক যত্ন না নিলে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতাও দেখা দিতে পারে। মাটির সংস্পর্শে থাকা, দীর্ঘ সময় ঠান্ডা পরিবেশে থাকা এবং রক্ত সঞ্চালন তুলনামূলকভাবে কমে যাওয়ার কারণে শীতকালে পায়ের নানা জটিলতা দেখা দেয়।
শীতের সময় পায়ে সমস্যার অন্যতম কারণ হল তাপমাত্রা কমে যাওয়া। ঠান্ডায় শরীর স্বাভাবিকভাবেই তাপ ধরে রাখার চেষ্টা করে, যার ফলে হাত-পায়ে রক্ত প্রবাহ কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে ত্বক ও স্নায়ুর উপর। অনেকের ক্ষেত্রেই সকালে উঠে পা অসাড় লাগা বা ঠান্ডায় পায়ের আঙুল শক্ত হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়। এই সমস্যাকে হালকাভাবে নিলে চলবে না, কারণ দীর্ঘদিন চললে এটি স্নায়বিক সমস্যার ইঙ্গিতও হতে পারে।
শুষ্ক আবহাওয়ার আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে পায়ের ত্বকে। শীতকালে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ কমে যাওয়ায় ত্বক দ্রুত জল হারায়। এর ফলে পায়ের গোড়ালি ফেটে যাওয়া, ত্বক খসখসে হয়ে ওঠা কিংবা রক্তপাতের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এই ফাটা গোড়ালি থেকে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কাও থাকে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে বলে সতর্ক করছেন চিকিৎসকেরা।
শীতে পায়ের যত্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সঠিক জুতো ও মোজা ব্যবহার। অনেকেই ঠান্ডা থেকে বাঁচতে আঁটসাঁট মোজা বা শক্ত জুতো ব্যবহার করেন, যা উল্টো ক্ষতির কারণ হতে পারে। রক্ত সঞ্চালনে বাধা পড়লে পায়ে ব্যথা, অসাড়তা ও ফোলা দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতকালে উষ্ণ কিন্তু আরামদায়ক জুতো পরা উচিত, যাতে পা সহজে নড়াচড়া করতে পারে এবং রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে।
শীতের আরেকটি বড় সমস্যা হল পায়ের ত্বকের অতিরিক্ত শুষ্কতা। বাতাসে আর্দ্রতা কমে গেলে ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে পায়ের গোড়ালি শক্ত হয়ে যায়, চামড়া ফেটে যায় এবং অনেক সময় রক্তও বেরোতে পারে। এই ফাটা অংশ দিয়ে ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক শরীরে প্রবেশ করলে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতকালে পায়ের ত্বকের যত্ন না নিলে সাধারণ একটি ফাটা গোড়ালিও বড় সমস্যার রূপ নিতে পারে।
শীতকালে পায়ে ছত্রাক সংক্রমণের ঘটনাও কম নয়। অনেকেই মনে করেন, শীতে ঘাম কম হয় বলে ফাঙ্গাল ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বাস্তবে ঠিক উল্টোটা ঘটে। ঠান্ডার কারণে মোটা মোজা ও বন্ধ জুতো দীর্ঘ সময় পরে থাকলে পায়ের ভেতরে আর্দ্রতা জমে যায়। এই স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ ছত্রাকের বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এর ফলে আঙুলের ফাঁকে চুলকানি, লালচে দাগ ও দুর্গন্ধের সমস্যা দেখা দেয়।
ডাক্তারদের মতে, শীতকালে পায়ের যত্নের প্রথম ধাপ হল সঠিক জুতো ও মোজা বেছে নেওয়া। উষ্ণতা দেওয়ার পাশাপাশি জুতো যেন আরামদায়ক হয়, সেটাও জরুরি। খুব আঁটসাঁট জুতো বা মোজা পরলে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়। আবার খুব ঢিলা জুতো পরলে হাঁটার সময় ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। তাই শীতকালে পায়ের গঠন অনুযায়ী জুতো ব্যবহার করাই সবচেয়ে ভালো।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা শীতকালেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ঠান্ডার কারণে অনেকেই নিয়মিত পা ধোয়ার ব্যাপারে অনীহা দেখান। কিন্তু এতে পায়ে ঘাম জমে ছত্রাক সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। প্রতিদিন কুসুম গরম জলে পা ধোয়া এবং ভালোভাবে মুছে শুকিয়ে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ভেজা পা বা স্যাঁতসেঁতে মোজা দীর্ঘ সময় পরে থাকলে ফাঙ্গাল ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। কিন্তু এতে পায়ে জমে থাকা ধুলো, ঘাম ও জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। চিকিৎসকদের পরামর্শ, প্রতিদিন কুসুম গরম জলে পা ধুয়ে ভালোভাবে শুকিয়ে নেওয়া উচিত। বিশেষ করে আঙুলের ফাঁকে জল জমে থাকলে তা সংক্রমণের কারণ হতে পারে।
শীতকালে পায়ের ত্বক আর্দ্র রাখতে ময়েশ্চারাইজারের ভূমিকা অপরিসীম। স্নানের পর বা রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে পায়ে ভালো মানের ময়েশ্চারাইজার বা তেল লাগালে ত্বক নরম থাকে এবং ফাটা পড়ার ঝুঁকি কমে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পায়ের গোড়ালি ও আঙুলের ফাঁকে আলাদা করে যত্ন নেওয়া উচিত, কারণ এই অংশগুলোতেই বেশি সমস্যা দেখা যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বক পাতলা হয়ে যায় এবং রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিকের তুলনায় কমে যায়। এর ফলে ঠান্ডায় পা দ্রুত অসাড় হয়ে পড়ে, হাঁটার সময় ব্যথা অনুভূত হয়। অনেক সময় ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। তাই বয়স্কদের ক্ষেত্রে শীতকালে পায়ের যত্নে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
ঠান্ডার কারণে অনেকের পায়ে ফ্রস্টবাইটের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে যাঁরা দীর্ঘ সময় খোলা জায়গায় কাজ করেন। ফ্রস্টবাইট হলে ত্বক প্রথমে লাল হয়ে যায়, পরে সাদা বা নীলচে রঙ ধারণ করে এবং অসাড়তা বাড়তে থাকে। এই অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসা না করালে ত্বক ও টিস্যুর স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। তাই দীর্ঘ সময় ঠান্ডায় থাকার ক্ষেত্রে পা ভালোভাবে ঢেকে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
বয়স্ক মানুষদের ক্ষেত্রে শীতকালে পায়ের সমস্যা আরও গুরুতর আকার নিতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্ত সঞ্চালন এমনিতেই কিছুটা কমে যায়। তার উপর শীতের প্রভাব পড়লে হাঁটাচলায় সমস্যা, ভারসাম্যহীনতা ও পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। চিকিৎসকেরা বলছেন, এই সময়ে বয়স্কদের আরামদায়ক জুতো ব্যবহার করা এবং বাড়ির ভেতরেও পা ঢেকে রাখা উচিত।
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য শীতকাল বিশেষ সতর্কতার সময়। ডায়াবেটিক ফুট একটি পরিচিত সমস্যা, যা শীতে আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। পায়ে সামান্য কাটা বা ফাটা থেকেও বড় সংক্রমণ হতে পারে। তাই নিয়মিত পা পরীক্ষা করা, কোনও ক্ষত বা লালচে ভাব দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শীতকালে পায়ের রক্ত সঞ্চালন ভালো রাখতে হালকা ব্যায়াম উপকারী হতে পারে। ঘরের ভেতরে সহজ স্ট্রেচিং, হাঁটা কিংবা পায়ের আঙুল নাড়ানোর মতো ছোট ব্যায়াম রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে না থেকে মাঝে মাঝে উঠে হাঁটাচলা করা উচিত।
খাদ্যাভ্যাসও পায়ের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে। পর্যাপ্ত জল পান করা, ভিটামিন ও খনিজ সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া ত্বক ও স্নায়ুর স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি। শীতকালে জল পানের প্রবণতা কমে যায়, যা ত্বক শুষ্ক হওয়ার অন্যতম কারণ। চিকিৎসকেরা বলছেন, শীতকালেও পর্যাপ্ত জল পান করা উচিত।
শিশুদের ক্ষেত্রেও শীতকালে পায়ের যত্ন জরুরি। খেলাধুলার সময় তারা অনেক সময় ভেজা মোজা পরে থাকে বা ঠান্ডা মেঝেতে খালি পায়ে হাঁটে। এতে ঠান্ডা লেগে অসুখ হওয়ার পাশাপাশি পায়ের ত্বকে সমস্যা দেখা দিতে পারে। অভিভাবকদের উচিত শিশুদের উষ্ণ মোজা পরানো এবং বাইরে থেকে ফিরেই পা পরিষ্কার করে দেওয়া।
শীতকালে ঘরের মেঝে অত্যন্ত ঠান্ডা হয়ে যায়। অনেকেই বাড়ির ভেতরে খালি পায়ে হাঁটার অভ্যাস রাখেন, যা এই সময়ে ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাড়ির ভেতরেও হালকা চপ্পল বা স্লিপার ব্যবহার করলে পা ঠান্ডা থেকে রক্ষা পায়।
সব মিলিয়ে শীতকালীন পায়ের যত্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য বিষয়। অবহেলা করলে ছোট সমস্যা বড় আকার নিতে পারে। সঠিক জুতো-মোজা ব্যবহার, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার মাধ্যমে শীতকালেও পা সুস্থ রাখা সম্ভব। শীতের আনন্দ উপভোগ করতে হলে শরীরের প্রতিটি অংশের যত্ন নেওয়া জরুরি, আর তার শুরুটা হওয়া উচিত পা থেকেই।