Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

বালি ও কয়লা পাচার মামলায় বড়সড় অভিযান কলকাতা দিল্লি আসানসোল দুর্গাপুরে একযোগে ইডির তল্লাশি

কয়লা ও বালি পাচার মামলার তদন্তে মঙ্গলবার সকাল থেকে কলকাতা, দুর্গাপুর ও আসানসোলে একাধিক ঠিকানায় তল্লাশি চালাচ্ছে ইডি। মামলার সূত্রে দিল্লির কয়েকটি ঠিকানাতেও চলছে অভিযান।

বালি ও কয়লা পাচার মামলায় ফের তৎপর ইডি, রাজ্য–রাজধানী জুড়ে একযোগে তল্লাশি

বালি ও কয়লা পাচার সংক্রান্ত আর্থিক দুর্নীতির মামলায় ফের সক্রিয় হল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। মঙ্গলবার ভোর থেকেই পশ্চিমবঙ্গের একাধিক শহর এবং দিল্লির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানায় একযোগে তল্লাশি অভিযান শুরু করেন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকেরা। কলকাতা, দুর্গাপুর, আসানসোলের পাশাপাশি দিল্লিতে চলা এই তল্লাশি ঘিরে নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে।

ইডি সূত্রে জানা গিয়েছে, বালি ও কয়লা পাচার মামলায় আর্থিক লেনদেনের জাল কতটা গভীর এবং কোন কোন ব্যক্তি ও সংস্থা এর সঙ্গে যুক্ত, তা খতিয়ে দেখতেই এই সমন্বিত অভিযান। তদন্তকারীদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সশস্ত্র জওয়ানদের উপস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে, অভিযানকে ঘিরে ইডি কতটা সতর্ক এবং গুরুত্ব দিয়ে এগোচ্ছে।


ভোর সাড়ে ছ’টায় জামুড়িয়ায় পৌঁছয় ইডির দল

মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ছ’টা নাগাদ কলকাতা থেকে তিনটি আলাদা গাড়িতে করে ইডির একটি বিশেষ দল পশ্চিম বর্ধমান জেলার জামুড়িয়ায় পৌঁছয়। তার পর থেকেই শুরু হয় ধারাবাহিক তল্লাশি। প্রথমেই জামুড়িয়া বাজার সংলগ্ন পাঞ্জাবি মোড় এলাকায় ব্যবসায়ী রমেশ বনসলের আবাসনে হানা দেন তদন্তকারীরা। দীর্ঘ সময় ধরে চলে নথি যাচাই ও জিজ্ঞাসাবাদ।

এর পাশাপাশি রমেশ বনসলের দুই পুত্র—সুমিত বনসল ও অমিত বনসলের বাড়িতেও একযোগে তল্লাশি চালানো হচ্ছে বলে ইডি সূত্রে খবর। পরিবারের বিভিন্ন সদস্যদের আলাদা আলাদা ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং মোবাইল ফোন, ডিজিটাল ডিভাইস ও আর্থিক নথিপত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

দোকান, গুদাম ও হার্ডঅয়্যার ব্যবসার যোগসূত্র খতিয়ে দেখছে ইডি

বালি–কয়লা পাচার মামলায় আর্থিক লেনদেনের জাল উন্মোচনে তদন্ত জোরদার

বালি ও কয়লা পাচার সংক্রান্ত আর্থিক দুর্নীতির মামলায় তদন্তের পরিসর আরও বিস্তৃত করল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। শুধুমাত্র আবাসন নয়, এবার তদন্তের আওতায় এসেছে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, গুদাম এবং হার্ডঅয়্যার ব্যবসা। পশ্চিম বর্ধমান জেলার জামুড়িয়া এলাকায় একাধিক হার্ডঅয়্যার দোকান ও সংলগ্ন গুদামে হানা দিয়ে আর্থিক লেনদেনের সূত্র খতিয়ে দেখছেন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকেরা।

ইডি সূত্রে খবর, বালি ও কয়লা পাচারের সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক চক্র শুধুমাত্র খনি বা পরিবহণ স্তরেই সীমাবদ্ধ নয়। পাচারের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ কোথায় বিনিয়োগ হচ্ছে, কীভাবে সাদা টাকার রূপ দেওয়া হচ্ছে এবং কোন কোন ব্যবসার আড়ালে সেই অর্থ ঘোরানো হচ্ছে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তদন্তকারীরা এবার নজর দিয়েছেন হার্ডঅয়্যার ব্যবসা ও গুদামগুলির দিকে।


জামুড়িয়া পাঞ্জাবি মোড়ে একযোগে হানা

মঙ্গলবার সকাল থেকে জামুড়িয়া পাঞ্জাবি মোড় এলাকায় একটি হার্ডঅয়্যার দোকান এবং তার সংলগ্ন একটি গুদামে তল্লাশি শুরু করেন ইডির আধিকারিকেরা। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের সঙ্গে নিয়ে ইডির দল এলাকায় পৌঁছনোর পর থেকেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দোকান ও গুদামের প্রবেশপথ ঘিরে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়, যাতে কোনও নথি বা সামগ্রী বাইরে সরানো না যায়।

তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, এই হার্ডঅয়্যার ব্যবসার মাধ্যমে বালি ও কয়লা পাচার সংক্রান্ত বেআইনি অর্থের লেনদেন হয়েছে। নির্মাণসামগ্রী, সিমেন্ট, বালি, লোহার রড ও অন্যান্য কাঁচামালের আড়ালে বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন হতে পারে বলে মনে করছেন ইডির আধিকারিকেরা। সেই কারণেই দোকানের হিসাববই থেকে শুরু করে ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট, ইনভয়েস এবং জিএসটি সংক্রান্ত সমস্ত নথি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে।


বনসাল হার্ডঅয়্যারে তল্লাশি, নজরে হিসাববই ও ডিজিটাল ডেটা

জামুড়িয়া হাটতলা এলাকার ‘বনসাল হার্ডঅয়্যার’ নামের দোকানেও তল্লাশি অভিযান চালানো হচ্ছে। ইডি সূত্রে দাবি, এই দোকানের আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে পাচারচক্রের যোগসূত্র থাকতে পারে। দোকানের দীর্ঘদিনের বিক্রয়–ক্রয় সংক্রান্ত হিসাব, নগদ লেনদেনের পরিমাণ এবং বিভিন্ন অ্যাকাউন্টের মধ্যে অর্থ স্থানান্তরের তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ডিজিটাল ডেটার উপর। দোকানের কম্পিউটার, ল্যাপটপ, পেন ড্রাইভ এবং অন্যান্য স্টোরেজ ডিভাইস বাজেয়াপ্ত করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হতে পারে বলে জানা গিয়েছে। ইডির এক আধিকারিক জানান, আধুনিক পাচারচক্র এখন আর শুধুমাত্র কাগজের হিসাবের উপর নির্ভর করে না। ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেন, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট, ই-মেল এবং ক্লাউড স্টোরেজে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লুকিয়ে রাখা হয়।


গুদামের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

হার্ডঅয়্যার দোকানের পাশাপাশি যে গুদামে তল্লাশি চালানো হচ্ছে, সেটির ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীদের ধারণা, এই গুদামটি শুধুমাত্র পণ্য সংরক্ষণের জায়গা নয়, বরং পাচার সংক্রান্ত লেনদেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হতে পারে। কোন সময়ে কী পরিমাণ মাল ঢুকেছে ও বেরিয়েছে, সেই তথ্যের সঙ্গে আর্থিক হিসাবের মিল খুঁজে দেখা হচ্ছে।

ইডি সূত্রে জানা গিয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে বেআইনি কয়লা বা বালি সরাসরি গুদামে এনে সেখান থেকে বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করা হয়ে থাকতে পারে। আবার কোথাও কোথাও গুদামকে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে নগদ অর্থ লুকোনোর জায়গা হিসেবে। এই সমস্ত সম্ভাবনা মাথায় রেখেই তদন্ত চলছে।


আবাসন থেকে ব্যবসা—তদন্তের পরিধি বাড়ছে

এর আগে জামুড়িয়া এলাকায় ব্যবসায়ী রমেশ বনসল এবং তাঁর পরিবারের একাধিক আবাসনে তল্লাশি চালানো হয়েছে। তাঁর দুই পুত্রের বাড়িতেও তল্লাশি চলে। এবার সেই তদন্তের পরবর্তী ধাপে এসে ইডি নজর দিয়েছে তাঁদের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলির দিকে। তদন্তকারীদের মতে, পাচার থেকে আসা অর্থ সাধারণত একাধিক স্তর ঘুরে ব্যবসায়িক বিনিয়োগের মাধ্যমে সাদা করা হয়।

হার্ডঅয়্যার ব্যবসা এই ধরনের অর্থ সঞ্চালনের জন্য তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক ক্ষেত্র। এখানে নগদ লেনদেনের পরিমাণ বেশি, পণ্যের দাম পরিবর্তনশীল এবং স্টক ম্যানেজমেন্টে অস্পষ্টতা থাকলে বড় অঙ্কের অর্থ লুকোনো সম্ভব।


আর্থিক লেনদেনের জাল খোলার চেষ্টা

ইডি সূত্রে দাবি, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে বেশ কিছু অসঙ্গতি নজরে এসেছে। যদিও তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি, তবে সূত্রের খবর অনুযায়ী—

এই সমস্ত বিষয় মিলিয়ে ইডির সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে।


বালি–কয়লা পাচার ও হার্ডঅয়্যার ব্যবসার সংযোগ কেন গুরুত্বপূর্ণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, বালি ও কয়লা পাচার শুধু পরিবেশগত বা প্রশাসনিক অপরাধ নয়, এটি একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক অপরাধ। পাচার থেকে অর্জিত অর্থ কোথায় যাচ্ছে এবং কীভাবে অর্থনীতির মূল স্রোতে মিশে যাচ্ছে, তা চিহ্নিত করাই তদন্তের মূল লক্ষ্য।

হার্ডঅয়্যার ব্যবসা নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আর নির্মাণ শিল্প আবার বালি ও কয়লার অন্যতম বৃহৎ ব্যবহারকারী ক্ষেত্র। ফলে এই তিনটির মধ্যে একটি স্বাভাবিক সংযোগ রয়েছে। সেই সংযোগ যদি বেআইনি পাচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তবে তা আরও বড় অপরাধচক্রের ইঙ্গিত দেয়।


স্থানীয় মহলে প্রতিক্রিয়া

ইডির এই তল্লাশি অভিযান ঘিরে জামুড়িয়া ও আশপাশের এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলে কয়লা ও বালি পাচার নিয়ে নানা অভিযোগ শোনা যাচ্ছিল। তবে এত বড় আকারে তদন্ত হবে, তা অনেকেই কল্পনা করেননি।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের একাংশ অবশ্য দাবি করেছেন, নির্দোষ ব্যবসায়ীদের যেন অযথা হয়রানি না করা হয়। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের একাংশের মত—যদি সত্যিই বেআইনি লেনদেন হয়ে থাকে, তবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।


আগের মামলার সূত্র ও নতুন তদন্ত

উল্লেখ্য, কয়লা পাচার সংক্রান্ত একাধিক মামলার তদন্ত করছে ইডি। ২০২০ সালে আসানসোল ও দুর্গাপুর-সহ ইস্টার্ন কোলফিল্ডসের বিভিন্ন খনি থেকে বেআইনি ভাবে কয়লা তোলার অভিযোগে যে মামলা হয়েছিল, তার তদন্ত এখনও চলছে। সেই মামলায় একাধিক প্রাক্তন আধিকারিক ও ব্যবসায়ীর নাম উঠে আসে।

সম্প্রতি কলকাতা সংলগ্ন এলাকায় নতুন করে কয়লা পাচার সংক্রান্ত মামলা দায়ের হওয়ার পরই তদন্তে নতুন গতি এসেছে। সেই মামলার সূত্র ধরেই এবার জামুড়িয়া ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলিতে হানা দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।


তদন্তের পরবর্তী ধাপ কী

ইডি সূত্রে ইঙ্গিত, তল্লাশি অভিযান শেষ হওয়ার পর বাজেয়াপ্ত নথি ও ডিজিটাল ডেটা বিশ্লেষণ করা হবে। তার ভিত্তিতে—

  • সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আবার জিজ্ঞাসাবাদ

  • প্রয়োজনে সমন জারি

  • বেআইনি সম্পত্তি চিহ্নিত করে বাজেয়াপ্তি

  • এবং প্রয়োজনে গ্রেফতারির পথেও এগোতে পারে ইডি

সব মিলিয়ে স্পষ্ট, বালি ও কয়লা পাচার মামলায় তদন্ত এখন নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে।


শেষ কথা

দোকান, গুদাম ও হার্ডঅয়্যার ব্যবসার দিকে তদন্তের নজর ঘোরানো ইডির কৌশলগত পদক্ষেপ বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। এর মাধ্যমে পাচারচক্রের আর্থিক ভিত কতটা বিস্তৃত এবং সমাজের কোন কোন স্তরে তার শিকড় ছড়িয়েছে, তা স্পষ্ট হতে পারে।

এই তল্লাশি অভিযান শুধু একটি নির্দিষ্ট মামলার তদন্ত নয়, বরং রাজ্যে বালি ও কয়লা পাচার সংক্রান্ত বৃহত্তর অর্থনৈতিক অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সংস্থার কঠোর বার্তা হিসেবেও দেখছেন অনেকে। তদন্ত যত এগোবে, ততই সামনে আসতে পারে নতুন নাম, নতুন তথ্য এবং নতুন চাঞ্চল্য।

Preview image