অসমে বেআইনি অনুপ্রবেশ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। কয়েক দশক ধরে এই ইস্যু রাজ্যের রাজনীতি, সমাজ ও জনজীবনে গভীর প্রভাব ফেলে এসেছে। ভাষা, সংস্কৃতি ও ভূমির অধিকার রক্ষার প্রশ্নে একাধিকবার গণআন্দোলন গড়ে উঠেছে, যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল আশির দশকের অসম আন্দোলন। সেই আন্দোলনের সময় বহু মানুষের প্রাণহানিও ঘটে। ফলে বেআইনি অনুপ্রবেশের প্রশ্নটি অসমে কেবল প্রশাসনিক বা আইনগত বিষয় নয়, বরং এটি আবেগ, পরিচয় ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই প্রেক্ষাপটে নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল। এনআরসি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজ্যে কে বৈধ নাগরিক আর কে নন, তা চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়। তবে এই প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তর বিতর্ক, আইনি জটিলতা এবং প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা সামনে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ উঠেছে যে প্রকৃত নাগরিকেরা বাদ পড়ছেন, আবার কেউ কেউ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন। এই অভিজ্ঞতার পর রাজ্য সরকার এনআরসি-র পরিবর্তে ভিন্ন একটি পথ বেছে নিচ্ছে। বর্তমানে অসমে ‘নিবিড়’ বা সম্পূর্ণ নতুন কোনো গণনাভিত্তিক প্রক্রিয়ার বদলে বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য হলো বিদ্যমান নথি, তালিকা ও তথ্যের মধ্যে থাকা ত্রুটি সংশোধন করা এবং নির্দিষ্ট অভিযোগ বা সন্দেহের ভিত্তিতে যাচাই প্রক্রিয়া চালানো। সরকারের দাবি, এই পদ্ধতিতে অযথা সাধারণ মানুষকে হয়রানি না করে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে।
অসমে বেআইনি অনুপ্রবেশ নিয়ে বিতর্ক নতুন কোনো বিষয় নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই এই প্রশ্নটি রাজ্যের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে এসেছে। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণ, দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতার ফলে অসমে অভিবাসনের প্রবাহ বহু দশক ধরে অব্যাহত। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অভিবাসন বেআইনি অনুপ্রবেশ বিতর্কে রূপ নেয় এবং তা রাজ্যের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। ভাষা, সংস্কৃতি, ভূমি ও পরিচয়ের প্রশ্নে স্থানীয় মানুষের উদ্বেগ ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে, যার পরিণতিতে একাধিক আন্দোলন ও সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে।
বিশেষ করে আশির দশকের অসম আন্দোলন রাজ্যের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিদেশি বিতাড়নও ভোটার তালিকা সংশোধনের দাবিতে দীর্ঘ ছয় বছর ধরে চলা এই আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। সেই সময় রাজ্যের বহু এলাকায় অচলাবস্থা তৈরি হয়, প্রশাসনিক কাজকর্ম ব্যাহত হয় এবং দুঃখজনকভাবে বহু মানুষের প্রাণহানিও ঘটে। এই আন্দোলনের স্মৃতি আজও অসমের সামাজিক মনস্তত্ত্বে জীবন্ত, যা বেআইনি অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তোলে।
অসম চুক্তির মাধ্যমে আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলেও বেআইনি অনুপ্রবেশ প্রশ্নের স্থায়ী সমাধান হয়নি। চুক্তিতে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চকে কাট-অফ তারিখ হিসেবে নির্ধারণ করা হয় এবং এর পর যাঁরা অসমে প্রবেশ করেছেন বলে চিহ্নিত হবেন, তাঁদের অবৈধ হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে এই চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়া জটিল, দীর্ঘসূত্রতা পূর্ণ এবং বিতর্কিত হয়ে ওঠে। প্রশাসনিক দুর্বলতা, নথিপত্রের অভাব এবং আইনি জটিলতার কারণে বিষয়টি বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি বা এনআরসি আপডেট করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এনআরসির লক্ষ্য ছিল অসমের প্রতিটি বাসিন্দার নাগরিকত্বের অবস্থান নির্ধারণ করা এবং বৈধ ও অবৈধ বাসিন্দাদের আলাদা করে চিহ্নিত করা। সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই প্রক্রিয়া দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। একদিকে অনেকেই এটিকে বেআইনি অনুপ্রবেশ সমস্যার সমাধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছিলেন, অন্যদিকে বহু মানুষ আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকরাও বাদ পড়ে যেতে পারেন।
এনআরসি আপডেটের সময় সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত চাপপূর্ণ। বহু পরিবারকে পুরনো নথিপত্র খুঁজে বের করতে হয়েছে, কখনো কয়েক দশক আগের দলিল সংগ্রহ করতে হয়েছে। গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এই কাজ ছিল আরও কঠিন, কারণ তাঁদের অনেকের কাছেই জন্মসনদ, জমির কাগজ বা শিক্ষাগত নথির মতো প্রমাণপত্র সংরক্ষিত ছিল না। ফলস্বরূপ, চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর দেখা যায়, লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছে, যার মধ্যে বিভিন্ন সম্প্রদায় ও ধর্মের মানুষই অন্তর্ভুক্ত।
এই পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করে। যাঁদের নাম বাদ পড়ে, তাঁদের অনেকেই নিজেদের ভারতীয় নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হন। আইনি লড়াই, আর্থিক চাপ ও সামাজিক চাপ মিলিয়ে একটি মানবিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়। একই সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে, এনআরসি তালিকার ভবিষ্যৎ কী হবে এবং এটি আদৌ বেআইনি অনুপ্রবেশ সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে পারবে কি না।
এই সব অভিজ্ঞতার পর রাজ্য ও কেন্দ্রীয় স্তরে এনআরসি নিয়ে আগ্রহ অনেকটাই কমে আসে। প্রশাসনিক বাস্তবতা ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে অসমে নতুন করে নিবিড় বা সর্বাত্মক কোনো গণনাভিত্তিক প্রক্রিয়া চালানোর পরিবর্তে ভিন্ন একটি পথ বেছে নেওয়ার আলোচনা শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় সামনে আসে ‘বিশেষ সংশোধন’ প্রক্রিয়ার ধারণা।
বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া মূলত লক্ষ্যভিত্তিক ও সীমিত পরিসরের একটি উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো বিদ্যমান ভোটার তালিকা, নাগরিক নথি বা অন্যান্য সরকারি রেকর্ডে যেসব অসঙ্গতি, ত্রুটি বা নির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, সেগুলি সংশোধন করা। অর্থাৎ, পুরো রাজ্যজুড়ে নতুন করে সব মানুষের নাগরিকত্ব যাচাই না করে, নির্দিষ্ট ক্ষেত্র ও নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিষয়ে যাচাই-বাছাই করা হবে। সরকারের মতে, এই পদ্ধতিতে অযথা সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না করে প্রশাসনিক কার্যকারিতা বজায় রাখা সম্ভব।
এই বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়াকে অনেকেই এনআরসির অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে গৃহীত একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। এতে করে প্রশাসনিক ব্যয় ও মানবসম্পদের চাপ কমবে এবং আইনি জটিলতাও তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি, রাজ্যের সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকত্ব প্রশ্নে যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া তা কিছুটা হলেও প্রশমিত করতে পারে বলে মত প্রকাশ করছেন অনেকে।
তবে এই উদ্যোগ নিয়ে সমালোচনাও কম নয়। সমালোচকদের একটি অংশের আশঙ্কা, বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হবে, তা স্পষ্ট নয়। যদি রাজনৈতিক প্রভাব বা প্রশাসনিক পক্ষপাত এই প্রক্রিয়ায় ঢুকে পড়ে, তবে তা নতুন করে বিতর্ক ও অসন্তোষের জন্ম দিতে পারে। এছাড়া, বেআইনি অনুপ্রবেশের মতো একটি দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল সমস্যার সমাধান কি কেবল সীমিত সংশোধনের মাধ্যমে সম্ভব, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
অসমে বেআইনি অনুপ্রবেশ বিতর্কের সঙ্গে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অসমীয়া ভাষা ও সংস্কৃতির সুরক্ষা দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় জনগণের একটি প্রধান দাবি। তাঁদের আশঙ্কা, অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনের ফলে জনসংখ্যার ভারসাম্য বদলে গেলে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় হুমকির মুখে পড়তে পারে। এই কারণেই নাগরিকত্ব সংক্রান্ত যেকোনো নীতি বা প্রক্রিয়া অসমে কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হয় না, বরং তা পরিচয় রাজনীতির অংশ হয়ে ওঠে।
একই সঙ্গে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহু মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অসমে বসবাস করছেন, অথচ নথিপত্রের অভাবে নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে সমস্যায় পড়ছেন। তাঁদের জন্য বেআইনি অনুপ্রবেশ বিতর্ক মানে শুধু একটি রাজনৈতিক ইস্যু নয়, বরং জীবনের অনিশ্চয়তা, সামাজিক বর্জন এবং আইনি লড়াইয়ের আশঙ্কা। বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া এই মানবিক দিকটি কতটা বিবেচনায় নেবে, সেটিও ভবিষ্যতের একটি বড় প্রশ্ন।
অসমে বেআইনি অনুপ্রবেশের প্রশ্নটি কয়েক দশক ধরে রাজ্যের রাজনীতি, সমাজ ও প্রশাসনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এটি কোনো একক সময়ের সমস্যা নয়, বরং ইতিহাস, ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং উপনিবেশ-পরবর্তী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দীর্ঘ ধারাবাহিকতার ফল। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা ও বরাক উপত্যকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল, দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত এবং নদীভাঙনজনিত বাস্তুচ্যুতি এই সব মিলিয়ে অসমে মানুষের আগমন ও বসবাসের একটি জটিল ইতিহাস তৈরি হয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আগমন যখন ‘বেআইনি অনুপ্রবেশ’ হিসেবে চিহ্নিত হতে শুরু করে, তখন তা কেবল প্রশাসনিক প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না থেকে পরিচয়, অধিকার ও অস্তিত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়।
স্বাধীনতার পর পরই অসমে জনসংখ্যাগত পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। বিশেষ করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ থেকে মানুষের আগমন স্থানীয় সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে। ভূমি, চাকরি, শিক্ষা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকে। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয় যে, অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনের ফলে তাঁদের ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই আশঙ্কা থেকেই ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সংগঠন ও ছাত্র আন্দোলনের উত্থান ঘটে, যা পরবর্তীতে বৃহত্তর গণআন্দোলনের রূপ নেয়।
আশির দশকের অসম আন্দোলন ছিল এই দীর্ঘ বিতর্কের সবচেয়ে তীব্র বহিঃপ্রকাশ। বিদেশি শনাক্তকরণ, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং বেআইনি অভিবাসীদের বিতাড়নের দাবিতে রাজ্য জুড়ে যে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, তা অসমের ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত রেখে গেছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই আন্দোলনে প্রশাসনিক অচলাবস্থা তৈরি হয়, সামাজিক বিভাজন বাড়ে এবং বহু নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এই অভিজ্ঞতা অসমের মানুষের মনে একটি স্থায়ী ছাপ ফেলে, যার প্রভাব আজও নাগরিকত্ব সংক্রান্ত যেকোনো আলোচনায় অনুভূত হয়।
অসম চুক্তির মাধ্যমে আন্দোলনের রাজনৈতিক সমাপ্তি ঘটলেও বাস্তব সমস্যার সমাধান সহজ হয়নি। ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চকে কাট অফ তারিখ হিসেবে নির্ধারণ করা হলেও, কে তার আগে এসেছেন আর কে পরে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা প্রশাসনিকভাবে অত্যন্ত জটিল হয়ে ওঠে। নথিপত্রের অভাব, সাক্ষ্যপ্রমাণের দুর্বলতা এবং আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিষয়টি বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। ফলে বেআইনি অনুপ্রবেশ প্রশ্নটি অসমে একটি অমীমাংসিত ক্ষত হিসেবেই রয়ে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি বা এনআরসি আপডেট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা অনেকের কাছে দীর্ঘদিনের সমস্যার একটি সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে আশা ও আতঙ্ক দুইই দেখা যায়। একদিকে বলা হচ্ছিল, এনআরসি শেষ হলে অবৈধ অভিবাসনের প্রশ্নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। অন্যদিকে, বহু মানুষ ভয় পাচ্ছিলেন যে নথিপত্রের অভাবে তাঁরা নিজের দেশেই পরবাসী হয়ে পড়তে পারেন।
এনআরসি প্রক্রিয়া অসমের গ্রাম ও শহরের মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। বহু পরিবার দিনের পর দিন সরকারি দপ্তরে ঘুরেছেন, পুরনো দলিল খুঁজেছেন, কখনো পূর্বপুরুষের নাম প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে দরিদ্র, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এই প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। অনেকের কাছেই জন্মসনদ বা জমির নথির মতো প্রয়োজনীয় কাগজ ছিল না, আবার অনেক নথি বন্যা বা নদীভাঙনের কারণে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এই বাস্তবতায় এনআরসি একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার চেয়ে অনেক বেশি মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অসম সরকার স্পষ্টভাবে জানাতে চাইছে যে রাজ্যে নতুন করে এনআরসি চালানোর কোনো পরিকল্পনা নেই। বরং বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যে থেকেই সংশোধন ও যাচাইয়ের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খোঁজা হবে। এই অবস্থান একদিকে যেমন অতীতের বিতর্কিত অভিজ্ঞতা থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে তা একটি মধ্যপন্থী রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেও দেখা যেতে পারে। রাজ্যের বিভিন্ন সম্প্রদায় ও স্বার্থগোষ্ঠীর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা অসমের রাজনীতিতে সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, অসমে বেআইনি অনুপ্রবেশ বিতর্ক এখনও শেষ হয়ে যায়নি। এনআরসি অধ্যায় রাজ্যের ইতিহাসে একটি গভীর ছাপ রেখে গেছে, যার প্রভাব আজও নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হচ্ছে। এনআরসি নয়, বিশেষ সংশোধনের পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেও এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং মানবিক সংবেদনশীলতার ওপর। এই প্রক্রিয়া যদি আস্থা অর্জন করতে পারে, তবে তা হয়তো দীর্ঘদিনের বিতর্কিত এই ইস্যুতে কিছুটা হলেও স্থিতি আনতে সক্ষম হবে। তবে যদি তা ব্যর্থ হয় বা নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়, তাহলে অসমে বেআইনি অনুপ্রবেশ বিতর্ক আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।