কলকাতা পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষায় নকলের ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পেল পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে টুকলি সামগ্রী উদ্ধার হওয়ার পরই একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সক্রিয়তার ইঙ্গিত মিলেছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতারণা করা হয়েছিল। ঘটনায় জড়িতদের খোঁজে জোরদার তদন্ত শুরু হয়েছে।
কলকাতা পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে ফের বড়সড় চাঞ্চল্য। নকল, প্রতারণা ও সংগঠিত টুকলি চক্রের হদিস পেয়ে তদন্তে নেমেছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে শুরু করে পরীক্ষার্থীদের ডিজিটাল ডিভাইস—সব দিক খতিয়ে দেখে তদন্তকারীরা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পেয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে। এই ঘটনায় রাজ্যের নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। রাজ্যে সরকারি চাকরি—বিশেষ করে পুলিশের চাকরি—এখন শুধু সম্মানের প্রতীক নয়, বহু তরুণ-তরুণীর কাছে জীবনের নিরাপত্তার শেষ ভরসা। সেই স্বপ্ন পূরণের পরীক্ষায় যদি নকল, প্রতারণা ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠে আসে, তবে শুধু একটি পরীক্ষা নয়—আঘাত লাগে গোটা ব্যবস্থার উপর। কলকাতা পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে সাম্প্রতিক নকলচক্রের হদিস তেমনই এক গভীর সংকেত দিচ্ছে।
কলকাতা পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষা শুধুমাত্র একটি চাকরির পরীক্ষা নয়। এটি রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ তৈরির প্রথম ধাপ। এই পরীক্ষার মাধ্যমে যাঁরা নির্বাচিত হন, ভবিষ্যতে তাঁরাই দায়িত্ব নেন নাগরিকদের নিরাপত্তা, শহরের শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার।
এই পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা তাই শুধু পরীক্ষার্থীদের জন্য নয়, গোটা সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি কলকাতা পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষার একটি কেন্দ্রে আচমকাই কয়েকজন পরীক্ষার্থীর কার্যকলাপ নজরে আসে পর্যবেক্ষকদের। পরীক্ষার সময় বারবার সন্দেহজনক নড়াচড়া, অস্বাভাবিক আত্মবিশ্বাস এবং নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্নে একাধিক পরীক্ষার্থীর হুবহু একই উত্তর—এই বিষয়গুলি পরীক্ষাকেন্দ্রের কর্তৃপক্ষের চোখে পড়ে।
এরপরই কয়েকজন পরীক্ষার্থীর তল্লাশি চালানো হলে উদ্ধার হয় টুকলি, ক্ষুদ্র কাগজে লেখা উত্তর, এমনকি প্রযুক্তিনির্ভর ডিভাইস ব্যবহারের প্রাথমিক প্রমাণ। সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি জানানো হয় ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্তৃপক্ষকে।
এই চক্রের কাজের ধরন সাধারণত এমন—
চাকরিপ্রার্থী চিহ্নিত করা
আর্থিক চুক্তি করা
পরীক্ষার আগে প্রশ্নের ধরণ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া
পরীক্ষার দিনে প্রযুক্তি সরবরাহ
বাইরে থেকে উত্তর পাঠানোর ব্যবস্থা
এই পুরো ব্যবস্থায় প্রত্যেকের আলাদা ভূমিকা থাকে, ফলে একজন ধরা পড়লেও পুরো চক্র ধরা পড়ে না সহজে।
এই চক্রের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হল—এরা পরীক্ষার্থীদের মানসিক দুর্বলতাকে কাজে লাগায়।
দীর্ঘদিন চাকরি না পাওয়া
পরিবারের চাপ
আর্থিক অনিশ্চয়তা
বয়সের সীমা শেষ হয়ে যাওয়ার ভয়
এই সবের সুযোগ নিয়েই চক্রের দালালরা আশ্বাস দেয়—“চাকরি নিশ্চিত।”
তদন্তে উঠে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। শুধু কাগজের টুকলি নয়, এই নকল চক্র আধুনিক প্রযুক্তিকেও কাজে লাগাচ্ছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে।
ব্লুটুথ ডিভাইস
ক্ষুদ্র ইয়ারপিস
মোবাইল ফোনের বিশেষ অ্যাপ
কোডেড মেসেজিং পদ্ধতি
এই সবের মাধ্যমে পরীক্ষার বাইরে বসে থাকা কেউ প্রশ্নের উত্তর পরীক্ষার্থীদের কানে পৌঁছে দিচ্ছিল বলে সন্দেহ তদন্তকারীদের।
পুলিশ সূত্রে খবর, এই ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন চেষ্টা নয়। বরং একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ পরীক্ষাকে টার্গেট করে এই ধরনের প্রতারণা চালাচ্ছে।
এই চক্রে থাকতে পারে—
প্রশ্নপত্র সংগ্রহকারী
প্রযুক্তি সরবরাহকারী
পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগকারী দালাল
বাইরে বসে থাকা ‘সাপোর্ট টিম’
তদন্তকারীরা মনে করছেন, শুধু কলকাতা নয়, রাজ্যের অন্য জেলাতেও এই চক্রের শাখা থাকতে পারে।
আগেকার দিনে নকল মানেই ছিল কাগজের টুকলি। কিন্তু এখন সেই জায়গা নিয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। তদন্তে উঠে আসছে—
মাইক্রো ব্লুটুথ ইয়ারপিস
স্মার্ট ওয়াচের মাধ্যমে সংকেত
কোডেড শব্দ ব্যবহার
প্রশ্নের নম্বর অনুযায়ী নির্দিষ্ট উত্তর
এই সবের ফলে সাধারণ নজরদারিতে নকল ধরা অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।
নকলের ঘটনায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও এখনও পর্যন্ত সরাসরি প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণ মেলেনি, তবে পরীক্ষার আগে নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর জানার বিষয়টি তদন্তকারীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশ্নপত্র ফাঁস না হলেও প্রশ্নের ধরণ বা সম্ভাব্য প্রশ্ন সম্পর্কে আগাম তথ্য দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
ইতিমধ্যেই কয়েকজন পরীক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাঁদের মোবাইল ফোন, কল ডিটেইলস, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট, ব্যাংক লেনদেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যাচ্ছে—
সন্দেহভাজন কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে
কিছু ডিজিটাল ডিভাইস বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে
আর্থিক লেনদেনের তথ্য মিলেছে
তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই এই চক্রের গভীরতা স্পষ্ট হচ্ছে বলে দাবি তদন্তকারীদের।
এটাই প্রথম নয়। গত কয়েক বছরে রাজ্যের একাধিক সরকারি নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বোর্ড ও দপ্তরের পরীক্ষায় নকল ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি চাকরির প্রতি প্রবল আকর্ষণ, বেকারত্ব এবং প্রতিযোগিতার চাপ—এই সব মিলিয়েই একাংশ অসাধু পথে পা বাড়াচ্ছে।
রাজ্যে অতীতে একাধিক নিয়োগ সংক্রান্ত বিতর্ক সামনে এসেছে। তবুও কেন বারবার একই ধরনের অভিযোগ উঠে আসে—এই প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাঁদের মতে—
“প্রতিবার ঘটনা ঘটার পর তদন্ত হয়, কিছুদিন আলোচনা চলে, তারপর সব ধামাচাপা পড়ে যায়। ফলে চক্রগুলি আরও সাহস পায়।”
এই ঘটনার পর সবচেয়ে ক্ষুব্ধ সৎ পরীক্ষার্থীরা। তাঁদের বক্তব্য—
“আমরা সারা বছর পড়াশোনা করি, শরীরচর্চা করি, মানসিক প্রস্তুতি নিই। কয়েকজন টাকার জোরে এগিয়ে গেলে সেটা শুধু অন্যায় নয়, অপরাধ।”
অনেকে আশঙ্কা করছেন, ফল বাতিল হলে আবার নতুন করে পরীক্ষা দিতে হবে—যা মানসিক ও আর্থিক দিক থেকে অত্যন্ত চাপের।
এই ঘটনার জেরে সৎ ও পরিশ্রমী পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেক পরীক্ষার্থীই আশঙ্কা করছেন, কয়েকজনের অসাধুতার কারণে গোটা পরীক্ষার ফল বাতিল হলে তাঁদের দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি বিফলে যাবে।
এক পরীক্ষার্থী বলেন,
“আমরা দিনের পর দিন পড়াশোনা করে পরীক্ষা দিই। কেউ যদি টুকলি করে চাকরি পায়, সেটা খুবই হতাশাজনক।”
পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনওরকম অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এক আধিকারিকের বক্তব্য,
“নিয়োগে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর। যারা প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
এই ঘটনার পর নিয়োগ পরীক্ষার নিরাপত্তা আরও জোরদার করার কথা ভাবছে প্রশাসন। সম্ভাব্য পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে—
পরীক্ষাকেন্দ্রে আরও বেশি নজরদারি
প্রযুক্তি-নির্ভর স্ক্যানিং ব্যবস্থা
বায়োমেট্রিক যাচাই
ডিজিটাল জ্যামার ব্যবহার
পরীক্ষার্থীদের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেই প্রযুক্তি-নির্ভর নকল রুখতে হবে।
এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। কেউ প্রশ্ন তুলছেন নিয়োগ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে, আবার কেউ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন।
অনেকেই দাবি করছেন—
“একবার নয়, বারবার একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। এবার স্থায়ী সমাধান দরকার।”
এই ইস্যু রাজনৈতিক রঙও নিতে শুরু করেছে। বিরোধী দলগুলি নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে রাজ্য সরকারকে আক্রমণ করেছে। পাল্টা শাসকদলের দাবি, প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং তদন্ত চলছে।
কলকাতা পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষায় নকল চক্রের হদিস ফের একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা রক্ষা করা কতটা জরুরি। এই ঘটনায় দোষীদের শাস্তি হলে যেমন আস্থা ফিরবে, তেমনই ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম ঠেকানোর পথ প্রশস্ত হবে।
এখন সকলের নজর তদন্তের দিকে—শেষ পর্যন্ত কতটা গভীরে পৌঁছতে পারে পুলিশ, আর কত বড় চক্রের পর্দাফাঁস হয়, সেটাই দেখার।