অভিনেত্রী মধুবনী গোস্বামী আবারও বিতর্কের কেন্দ্রে। নিজের ব্যবসার প্রচার করতে গিয়ে এক ভিডিয়োয় তিনি বলেন, “বাপের পয়সা থাকলে এই ভিডিয়ো আপনার জন্য নয়।” এই মন্তব্যেই ক্ষুব্ধ নেটিজেনরা। অনেকে তাঁকে উদ্ধত বলে সমালোচনা করেছেন, কেউ বলেছেন শ্রদ্ধা কপূরের স্টাইল নকল করেছেন। বলিউডে এমন প্রচার কৌশলে বিতর্ক না হলেও টলিউডে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। আপাতত মধুবনী কোনও মন্তব্য করেননি; ব্যবসায় ব্যস্ত তিনি, আর স্বামী রাজা গোস্বামী কাজ করছেন ধারাবাহিকে ‘চিরসখা’। এখন দেখার বিষয়—এই বিতর্কে অভিনেত্রী নীরব থাকেন কি না।
অভিনেত্রী মধুবনী গোস্বামী যেন বিতর্কের অন্য নাম। টেলিভিশনের জনপ্রিয় মুখ হলেও তিনি প্রায়ই নানা মন্তব্য বা ঘটনার জন্য আলোচনায় চলে আসেন। সাম্প্রতিক সময়ে ফের তাঁর এক বক্তব্য ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল বিতর্কের ঝড় উঠেছে। একটি ভিডিওতে নিজের ব্যবসার প্রচার করতে গিয়ে তিনি বলেন— “বাপের পয়সা থাকলে এই ভিডিও আপনার জন্য নয়।” এই একটি বাক্যই যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে। কেউ বলছেন, “এমন উদ্ধতভাবে কথা বলার কী দরকার ছিল?” আবার কেউ কটাক্ষ করেছেন, “শ্রদ্ধা কপূরকে নকল করে লাভ কী হলো?”
কিন্তু আসলে কী ঘটেছিল? কেন এত তোলপাড় টলিউড মহল? আর এই বিতর্কের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সামাজিক মনোভাবটাই বা কেমন? চলুন বিশদে দেখা যাক।
মধুবনী গোস্বামী বাংলা টেলিভিশনের এক সুপরিচিত নাম। “ভালোবাসা.কম” ধারাবাহিক দিয়ে দর্শকদের মনে জায়গা করে নেন তিনি। সেই ধারাবাহিকেই সহ-অভিনেতা রাজা গোস্বামীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, পরে দু’জনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দীর্ঘদিন অভিনয়ে নিয়মিত ছিলেন মধুবনী, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি ধীরে ধীরে অভিনয় থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়ে মন দিয়েছেন নিজের নতুন উদ্যোগে— ব্যবসায়।
অভিনেত্রী হিসেবে তিনি যে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন, সেটিই আজ তাঁর ব্যবসায়িক পরিচয়ের শক্ত ভিত হিসেবে কাজ করছে। তিনি সম্প্রতি একটি ব্যাগ ও ফ্যাশন অ্যাকসেসরিজ ব্র্যান্ড চালু করেছেন, যার প্রচার করতে গিয়েই তৈরি হয়েছিল সেই ভিডিও, যা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
সবকিছুই শুরু হয় একটি প্রমোশনাল ভিডিও থেকে। সেখানে মধুবনী নিজের ব্যবসার প্রচার করতে গিয়ে হেসে বলেন,
“বাপের পয়সা থাকলে এই ভিডিও আপনার জন্য নয়।”
বক্তব্যটি শোনার পর অনেকের কাছে এটি ছিল শুধুমাত্র একটি মজার বা রসিক মন্তব্য। কিন্তু নেটিজেনদের একাংশ একে “অহঙ্কারী” এবং “উদ্ধত” বলে সমালোচনা শুরু করেন। মুহূর্তের মধ্যেই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। কেউ বললেন, “বাবা তুলে এমন কথা কেন বলবেন একজন জনপ্রিয় মুখ?” কেউ লিখলেন, “এমনভাবে বলছেন যেন তিনিই সবাইকে কাজ দেবেন!”
অনেকেই আবার মন্তব্য করেন যে, এই ধরনের প্রচারমূলক কৌশল বলিউডে আগেও দেখা গেছে — শ্রদ্ধা কপূরও একবার গয়নার ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে একই ধরনের বাক্য ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু সেখানে তেমন বিতর্ক হয়নি। তাহলে টলিউডে কেন এত আলোড়ন?
এ প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে দর্শকের মানসিকতায় এবং শিল্পীদের প্রতি সমাজের প্রত্যাশায়।
বলিউডের শিল্পীরা সাধারণত তাঁদের পিআর টিম ও ব্র্যান্ড ম্যানেজারের মাধ্যমে এমন কনটেন্ট পরিকল্পনা করেন। সেই কারণে সেখানে মজার টোনে করা মন্তব্যগুলোকেও “ব্র্যান্ড মার্কেটিং” হিসেবে দেখা হয়।
কিন্তু টলিউডে দর্শকের সঙ্গে সম্পর্ক অনেক বেশি ব্যক্তিগত, অনেকটাই ঘরোয়া। মধুবনীর মতো জনপ্রিয় টেলি অভিনেত্রীদের মানুষ নিজের “চেনা মেয়ে” বা “পরিবারের কেউ” হিসেবে দেখেন। ফলে যখন সেই পরিচিত মুখ হঠাৎ এমনভাবে বলেন, “বাপের পয়সা থাকলে...”, তখন অনেকেই মনে করেন যেন তাঁদের ছোট করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, শ্রদ্ধা কপূরের ভিডিওয় ছিল স্পষ্ট পেশাদারি প্রেক্ষাপট— সেখানে উদ্দেশ্য ছিল শুধুমাত্র ব্র্যান্ড প্রচার। কিন্তু মধুবনীর বক্তব্য এসেছে একেবারে ব্যক্তিগত টোনে, যেন তিনি নিজেই সরাসরি দর্শকদের উদ্দেশে কথা বলছেন। এই পার্থক্যই আসলে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিতর্ক ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় মিম, রিল, ও ব্যঙ্গাত্মক পোস্টের বন্যা।
একজন ব্যবহারকারী লেখেন, “এমনভাবে বলছেন যেন তিনিই সবাইকে চাকরি দেবেন।”
অন্য এক নেটিজেন মন্তব্য করেন, “শ্রদ্ধা কপূরকে নকল করতে গিয়ে নিজেকে হাস্যকর বানালেন।”
তৃতীয়জনের বক্তব্য, “যাঁরা পরিশ্রম করে উঠে এসেছেন, তাঁরা কখনও এমন কথা বলবেন না।”
অবশ্য কিছু মানুষ আবার মধুবনীর পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের মতে, “ওটা তো শুধু মজা করে বলা কথা, সবাই কেন এত সিরিয়াস হচ্ছে?” আবার কেউ লিখেছেন, “একজন নারী নিজের ব্যবসা শুরু করলে সেটাকে ইতিবাচকভাবে দেখা উচিত। একটুখানি কথার জন্য এত হইচই কেন?”
এবারের ঘটনার পরও মধুবনী এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি। তবে এটা প্রথম নয়— এর আগেও নানা সময় বিভিন্ন মন্তব্য বা ঘটনার জন্য বিতর্কে জড়িয়েছেন তিনি ও তাঁর স্বামী রাজা গোস্বামী।
কখনও সামাজিক ইস্যু নিয়ে মন্তব্য করে, কখনও ব্যক্তিগত জীবনের পোস্টের কারণে তাঁরা ট্রোলড হয়েছেন। তবু প্রতিবারই মধুবনী বেশিরভাগ সময় নীরব থেকেছেন বা খুব সংযতভাবে উত্তর দিয়েছেন। তাই এইবারও অনেকেই মনে করছেন, হয়তো তিনি কোনও প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে সময়ের সঙ্গে বিতর্ককে থিতিয়ে যেতে দেবেন।
এই পুরো ঘটনা আসলে এক বড় সামাজিক বাস্তবতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে—
আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে একজন জনমানুষের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি ভঙ্গি কতটা সংবেদনশীলভাবে বিশ্লেষিত হয়।
একদিকে শিল্পীরা নিজেদের ব্র্যান্ড গড়তে চান, অন্যদিকে দর্শক তাঁদের থেকে “সরলতা” ও “সংযম” প্রত্যাশা করেন। এই দ্বন্দ্বই প্রায়ই এমন বিতর্কের জন্ম দেয়।
আরও একটি দিক হলো, নারী শিল্পীদের ক্ষেত্রে সমাজের প্রত্যাশা এখনো ভিন্ন। একজন অভিনেতা ব্যবসা শুরু করলে তা ‘স্মার্ট পদক্ষেপ’ বলে প্রশংসিত হয়, কিন্তু একজন অভিনেত্রী করলে তাকে অনেকে “অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী” বা “গর্বিত” বলে সমালোচনা করেন। মধুবনীর ঘটনাতেও সেই মানসিকতা পরোক্ষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
বিতর্ক যাই হোক, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে মধুবনী নতুন কিছু করার সাহস দেখিয়েছেন। টেলিভিশন দুনিয়া থেকে বেরিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। অনেকেই অভিনয়ের বাইরে অন্য পেশায় গেলে সেটাকে “ফেল” হিসেবে দেখেন, কিন্তু মধুবনী বলছেন অন্য গল্প— তিনি কাজের বৈচিত্র্য খুঁজছেন।
তাঁর এক ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, “মধুবনী সবসময় নিজের মতো করে কাজ করতে ভালোবাসেন। তিনি জানেন, সবাইকে খুশি রাখা সম্ভব নয়। তাই নিজের মতো করে এগিয়ে চলেছেন।”
তবে সমালোচকরা বলছেন, “জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের আরও সচেতন থাকা উচিত, কারণ তাঁদের প্রতিটি কথা প্রভাব ফেলতে পারে হাজার হাজার মানুষে।”
সোশ্যাল মিডিয়া এখন যেমন সুযোগ, তেমনি বিপদও। একদিকে এটি তারকাদের দর্শকের আরও কাছে নিয়ে আসে, অন্যদিকে সামান্য ভুল শব্দচয়নেও তাঁদের ঘিরে তীব্র ট্রোলিং শুরু হয়।
টলিউডের অনেক তারকাই এর আগেও এই ফাঁদে পড়েছেন—
কখনও মতামত প্রকাশের জন্য, কখনও পোশাক বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের কারণে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, “সেলিব্রেটিদের এখন পেশাদারি সোশ্যাল মিডিয়া টিম থাকা উচিত। কারণ, তাদের পোস্ট মানে কেবল ব্যক্তিগত কথা নয়— তা একেকটা জনসমাজের বার্তা।”
মধুবনীর ক্ষেত্রেও হয়তো এই অভাবটাই বোঝা গেল। তাঁর ভিডিওটি হয়তো পেশাদার প্রচারণার চেয়ে অনেক বেশি ব্যক্তিগত টোনে তৈরি হয়েছিল, যার ফলেই ভুল ব্যাখ্যা তৈরি হয়।
বাংলার দর্শক সাধারণত প্রিয় তারকাদের সঙ্গে আবেগের বন্ধনে যুক্ত। ফলে তাঁরা কখনও কখনও অভিনেতাদের বাস্তব জীবনকেও ধারাবাহিকের চরিত্রের মতো করেই বিচার করেন। মধুবনী দীর্ঘদিন “গৃহবধূ” বা “মিষ্টি মেয়ে” চরিত্রে দেখা গিয়েছেন, তাই বাস্তবে তাঁকে একইরকম নম্র ও বিনয়ী দেখার প্রত্যাশাই হয়তো মানুষ করেছে।
যখন সেই ইমেজের বাইরে গিয়ে তিনি কিছু বলেন, তখন তা “ক্যারেক্টার ভাঙা” হিসেবে মনে হয়।
অর্থাৎ, মানুষ বাস্তব মধুবনী ও পর্দার মধুবনীকে গুলিয়ে ফেলছে— যা অনেক তারকারই ক্ষেত্রে ঘটে।
বর্তমানে মধুবনী তাঁর ব্যবসায় মনোযোগী, অন্যদিকে রাজা গোস্বামী ব্যস্ত রয়েছেন ‘চিরসখা’ ধারাবাহিকে। নিকট সূত্রের খবর, এই বিতর্কে এখনই কোনও মন্তব্য না করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন অভিনেত্রী।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, তিনি যদি শান্তভাবে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন— যেমন, “আমি আসলে মজা করেই বলেছিলাম, কাউকে ছোট করতে নয়”— তাহলে পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত হতে পারে।
একইসঙ্গে এই ঘটনা হয়তো তাঁর কাছে শেখার জায়গা হিসেবেও কাজ করবে— ভবিষ্যতে তিনি আরও সতর্কভাবে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করবেন।
আজকের সোশ্যাল মিডিয়া যুগে “একটি বাক্য” পুরো ক্যারিয়ারকেও প্রভাবিত করতে পারে।
আগে যেখানে দর্শক শিল্পীর কাজের উপর ভিত্তি করে মত দিতেন, এখন তাঁরা ব্যক্তিগত আচরণকেও বিচার করেন।
এর ফলে শিল্পীরা এক অদ্ভুত মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন— জনপ্রিয় থাকতে হলে তাঁদের একদিকে “রিয়েল” থাকতে হয়, আবার অন্যদিকে “পারফেক্ট”ও হতে হয়।
এই দুইয়ের টানাপোড়েনে হয়তো অনেক সময় অনিচ্ছাকৃত ভুল মন্তব্য বেরিয়ে আসে।
মধুবনীর ঘটনাটি তাই শুধু এক ব্যক্তির বিতর্ক নয়, বরং আমাদের সময়ের এক প্রতিচ্ছবি— যেখানে জনপ্রিয়তা যেমন আশীর্বাদ, তেমনি অভিশাপও।
অভিনেত্রী মধুবনী গোস্বামীর “বাপের পয়সা” মন্তব্য যে এত বড় আলোচনার জন্ম দেবে, তা হয়তো তিনিও কল্পনা করেননি। কিন্তু এই ঘটনাই আবার মনে করিয়ে দিল— জনসমক্ষে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দের আলাদা ওজন থাকে।
তবে এটাও সত্য, একজন নারী শিল্পী নিজের উদ্যোগে ব্যবসা শুরু করলে তাকে সাহসী পদক্ষেপ বলাই উচিত। ভুল বোঝাবুঝি হলে সেটি ব্যাখ্যা করা যায়, কিন্তু সেই উদ্যোগকে অস্বীকার করা যায় না।
মধুবনীর সামনে এখন দুটি পথ— এক, নীরব থেকে সময়ের সঙ্গে বিতর্ক থামিয়ে দেওয়া; দুই, প্রকাশ্যে এসে নিজের বক্তব্য স্পষ্ট করা।
যেভাবেই হোক, এই বিতর্ক তাঁর জন্য শিক্ষা হিসেবে কাজ করবে, আর আমাদের জন্যও— যে, সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে “বাক্য” কখনও শুধু বাক্য নয়, সেটি একেকটি বার্তা, একেকটি প্রতিচ্ছবি।