Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

নাইজেরিয়া ফুটবল কোচের দাবি, ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ কোয়ালিফায়ারের ম্যাচে কঙ্গোর খেলোয়াড় করেছে ভূত-প্রেত

নাইজেরিয়া ফুটবল কোচ অভিযোগ করেছেন ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ কোয়ালিফায়ারের ম্যাচে কঙ্গোর একটি খেলোয়াড় ভূত প্রেত অথবা ভূত বিদ্যা ব্যবহার করেছে, যা দলের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলেছে।

নাইজেরিয়ার কোচের চাঞ্চল্যকর দাবি: বিশ্বকাপ কোয়ালিফায়ারে কঙ্গোর খেলোয়াড় করেছে 'ভূত-প্রেত'—ফুটবল বিশ্বে ঝড়!

 

 

মহাদেশীয় ফুটবলের ইতিহাসে এক নতুন বিতর্ক; পারফরম্যান্সের অবনতির জন্য 'অশুভ শক্তিকে' দায়ী করল সুপার ঈগলসের কোচ

 

আবুজা/কিনশাসা: নাইজেরিয়া ফুটবল দলের প্রধান কোচ সম্প্রতি ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ কোয়ালিফায়ারের গুরুত্বপূর্ণ একটি ম্যাচকে ঘিরে এক অভূতপূর্ব অভিযোগ তুলে বিশ্ব ফুটবল মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। তার দাবি, প্রতিদ্বন্দ্বী কঙ্গো দলের একজন খেলোয়াড় মাঠে এমন কিছু 'অস্বাভাবিক আচরণ' প্রদর্শন করেছে, যা সাধারণ কৌশল বা খেলার অংশ ছিল না, বরং তা ছিল এক প্রকার 'ভূত-প্রেত' বা 'ভূত বিদ্যা'র ব্যবহার। কোচের মতে, এই 'অশুভ শক্তির' প্রভাবেই তার দলের খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে অস্বাভাবিক অবনতি ঘটেছিল। আফ্রিকার ফুটবল ইতিহাসে কুসংস্কার এবং মাঠের বাইরের শক্তির ব্যবহার নিয়ে বহু আলোচনা থাকলেও, বিশ্বকাপ কোয়ালিফায়ারের মতো মঞ্চে একটি দলের কোচের পক্ষ থেকে এমন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ নিঃসন্দেহে নজিরবিহীন।

 

অভিযোগের সূত্রপাত: ম্যাচের দিন কী ঘটেছিল?

 

কোচের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কঙ্গো দলের একজন নির্দিষ্ট খেলোয়াড়ের আচরণ। ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে নাইজেরিয়া কোচ দাবি করেন, প্রথমার্ধে বা ম্যাচের কিছু নির্দিষ্ট সময়ে ঐ খেলোয়াড় মাঠের বিভিন্ন কোণে 'অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি' করছিলেন এবং বারবার কিছু 'অপ্রচলিত চিহ্ন' তৈরি করছিলেন।

কোচের বক্তব্য: "আমাদের খেলোয়াড়রা মাঠে নেমে অবাক হয়ে গিয়েছিল যে, কেন তাদের স্বাভাবিক ছন্দ কাজ করছে না। তাদের গতি, পাসিং অ্যাক্যুরেসি, এমনকি গোল করার সহজ সুযোগগুলোও যেন কোনো এক অজানা কারণে ব্যর্থ হচ্ছিল। আমরা খেলায় সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করতে পারছিলাম না। আমি স্পষ্ট দেখেছি, একজন কঙ্গো খেলোয়াড় কিছু প্রথা বহির্ভূত কাজ করছিল। এটা কোনো কৌশল ছিল না; এটা ছিল মনোবলের ওপর আঘাত হানার জন্য 'ভূত বিদ্যা'র ব্যবহার।"

এই অভিযোগটি সেই সময় এসেছে, যখন নাইজেরিয়া (সুপার ঈগলস) বিশ্বকাপের মূলপর্বে স্থান নিশ্চিত করার জন্য তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন। ম্যাচের ফলাফল নাইজেরিয়ার প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ার পরই এই চাঞ্চল্যকর মন্তব্য প্রকাশ্যে আসে। কোচের এই বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে দলটির হতাশ পারফরম্যান্সের ব্যাখ্যা হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, এটি ফুটবলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

 

কঙ্গোর প্রতিক্রিয়া: তীব্র প্রত্যাখ্যান ও স্বাভাবিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার দাবি

 

নাইজেরিয়া কোচের এই বিস্ফোরক অভিযোগের পর কঙ্গো ফুটবল ফেডারেশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসতে কিছুটা সময় লেগেছিল। তবে, যখন তারা মুখ খুললেন, তখন অভিযোগটিকে সম্পূর্ণরূপে এবং দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করা হলো।

কঙ্গো দলের একজন মুখপাত্র মন্তব্য করেছেন: "আমরা এই অভিযোগ শুনে হতবাক এবং অত্যন্ত হতাশ। আন্তর্জাতিক ফুটবল মঞ্চে একটি দল যখন ব্যর্থ হয়, তখন এমন ভিত্তিহীন এবং হাস্যকর অভিযোগ তুলে নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা করা খুবই দুঃখজনক। আমাদের খেলোয়াড়রা কেবল মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, কৌশল এবং শারীরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে খেলেছেন। আমরা কোনো অশুভ কাজ বা অস্বাভাবিক আচরণে লিপ্ত ছিলাম না। প্রতিযোগিতা কঠিন ছিল এবং আমরা জয় বা ড্রয়ের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছি। আমরা পুরোপুরি নিয়ম মেনে খেলার জন্য প্রস্তুত ছিলাম এবং এর বাইরে কোনো শক্তিকে বিশ্বাস করি না।"

কঙ্গো কর্তৃপক্ষের দাবি, নাইজেরিয়া কোচের এই মন্তব্য ফুটবলের স্পিরিট এবং আফ্রিকান ফুটবলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে। তারা ফিফা এবং আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনকে (CAF) এই ধরনের 'অনৈতিক ও ভিত্তিহীন' অভিযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে।

 

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: আফ্রিকান ফুটবলে 'জাদুকরী' কুসংস্কার

 

নাইজেরিয়া কোচের এই দাবিটি আধুনিক ফুটবলের দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্ভট মনে হলেও, সাব-সাহারান আফ্রিকান ফুটবলে মাঠের ভেতরের এবং বাইরের কর্মকাণ্ডে 'জাদুকরী' বা 'কুসংস্কারের' প্রভাবের ধারণাটি নতুন নয়। অনেক দেশেই দল বা খেলোয়াড়রা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে 'টোটকা' বা 'মন্ত্র'-এর মতো বিভিন্ন প্রথাগত আচার-অনুষ্ঠানে বিশ্বাস করে।

তবে, আন্তর্জাতিক কোয়ালিফায়ারে একজন হাই-প্রোফাইল কোচের পক্ষ থেকে ক্যামেরার সামনে এভাবে সরাসরি প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে 'ভূত বিদ্যার' অভিযোগ আনা নিঃসন্দেহে এই বিতর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল।

 

ফুটবল দুনিয়ায় সাড়া এবং ফিফার নীরবতা

 

নাইজেরিয়া কোচের এই মন্তব্যের পর বিশ্বব্যাপী ফুটবল বিশ্লেষক এবং সমর্থকরা বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

  • বিশ্লেষকদের মত: বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক এই দাবিকে হাস্যকর এবং অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের মতে, এটি কেবল খারাপ পারফরম্যান্সের জন্য একটি 'সুবিধাজনক অজুহাত' মাত্র। প্রখ্যাত ফুটবল সমালোচক ইব্রাহিম সানকোফা (ছদ্মনাম) মন্তব্য করেন, "ফুটবল একটি বিজ্ঞান, কৌশল, প্রস্তুতি এবং মনোবলের খেলা। 'ভূত বিদ্যার' জন্য গোলপোস্টে বল ঢুকতে না পারা—এটা কেবলই কাল্পনিক। আফ্রিকান ফুটবলকে এই ধরনের কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।"

  • সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। নাইজেরিয়ান সমর্থকরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। কেউ কেউ কোচের প্রতি সহানুভূতি জানিয়েছেন, আবার অনেকে তাকে 'অবাস্তব অভিযোগ' করার জন্য সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে, কঙ্গোর সমর্থকরা কোচের অভিযোগকে 'অপমানজনক' আখ্যা দিয়েছেন।

এই মুহূর্তে, ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা (FIFA) বা সিএএফ (CAF) এই অভিযোগের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। সাধারণত, ম্যাচ রেফারি বা ম্যাচ কমিশনারের প্রতিবেদনে অস্বাভাবিক আচরণের উল্লেখ না থাকলে, এমন অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো তদন্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, ম্যাচ চলাকালীন কেবল ডোপিং, ম্যাচ ফিক্সিং বা বর্ণবাদী আচরণের মতো গুরুতর বিষয়গুলোই আনুষ্ঠানিক তদন্তের আওতায় আসে। 'ভূত বিদ্যা'র মতো অভিযোগ খেলার নিয়মের (Laws of the Game) মধ্যে পড়ে না।

 

মনোবিজ্ঞান বনাম অতিপ্রাকৃত শক্তি

 

এই ঘটনাটি খেলাধুলায় মানসিকতার গুরুত্বের ওপর আলোকপাত করেছে। ফুটবলের মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, একজন খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স অনেকাংশে তার আত্মবিশ্বাস এবং মনোবলের ওপর নির্ভরশীল।

নাইজেরিয়া কোচের বক্তব্য যদি সত্য নাও হয়, তবুও তার এই অভিযোগ দলের খেলোয়াড়দের মনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কোনো খেলোয়াড় যদি বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, প্রতিপক্ষ কোনো 'অশুভ শক্তি' ব্যবহার করছে, তবে সেই বিশ্বাস নিজেই তাদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিতে এবং পারফরম্যান্স খারাপ করতে যথেষ্ট। কঙ্গো দলের খেলোয়াড়ের অস্বাভাবিক আচরণ, যদি তা কেবলই মানসিক চাপ দেওয়ার একটি কৌশল হয়ে থাকে, তবে নাইজেরিয়ার খেলোয়াড়দের ওপর তার প্রভাব পড়েছে বলেই কোচের মন্তব্য থেকে বোঝা যায়। এটি মানসিক যুদ্ধের একটি নতুন কৌশল হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

 

উপসংহার: ফুটবলের ভবিষ্যতের নতুন চ্যালেঞ্জ

 

নাইজেরিয়া কোচের এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ফুটবলের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে একটি নতুন অধ্যায় যোগ করেছে। যদিও কঙ্গো দল এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলি এর ভিত্তিতে কোনো ব্যবস্থা নেবে বলে মনে হয় না, তবে এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ফুটবল খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স এবং মনোবলের ওপর 'অতিপ্রাকৃত শক্তি' সম্পর্কিত আলোচনা আগামীতেও চলতে থাকবে।

এই ঘটনাটি কেবল একটি বিতর্কের জন্ম দেয়নি, বরং এটি আফ্রিকান ফুটবলের প্রতি বিশ্বব্যাপী দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এটি কোচ, খেলোয়াড় এবং ফুটবল কর্মকর্তাদের জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে—কীভাবে কুসংস্কার এবং অপ্রচলিত বিশ্বাসকে আধুনিক পেশাদার খেলার মঞ্চ থেকে দূরে রাখা যায়। আপাতত, ফুটবল দুনিয়ার নজর থাকবে কোয়ালিফায়ারের পরবর্তী ম্যাচগুলোর দিকে, এবং নাইজেরিয়া কোচ তার দল নিয়ে এই বিতর্ক কীভাবে সামাল দেন, সেটাই দেখার বিষয়।

Preview image