Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

প্রেম প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান তরুণীকে খুনের পর ঝুলিয়ে দিয়ে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা নাগপুরে ধৃত পড়শি যুবক

পুলিশ জানিয়েছে, মৃত তরুণী কলাবিভাগের ছাত্রী। বুধবার সন্ধ্যায় ঘর থেকে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। প্রাচীর মায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে শেখরকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

বিশেষ প্রতিবেদন, নাগপুর: ভালোবাসার দাবি যখন উন্মাদনায় পরিণত হয়, তখন তা যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার এক জলজ্যান্ত এবং করুণ নিদর্শন হয়ে রইল মহারাষ্ট্রের নাগপুর। ২৩ বছর বয়সী এক প্রতিভাবান কলেজ ছাত্রী, প্রাচী হেমরাজকে পিটিয়ে এবং শ্বাসরোধ করে খুন করার পর তাঁর দেহকে ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠল তাঁরই প্রতিবেশী এক যুবকের বিরুদ্ধে। অপরাধীর নাম শেখর আজাবারো ধোরে। বুধবার বিকেলের এই ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ অপরাধ নয়, বরং এটি আমাদের সমাজব্যবস্থায় গেড়ে বসা এক গভীর ক্ষতের প্রতিচ্ছবি।

প্রাচী ছিলেন একজন কলাবিভাগের মেধাবী ছাত্রী, যাঁর চোখে ছিল হাজারো স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটল এক প্রতিবেশীর লালসা এবং প্রতিহিংসার আগুনে। পুলিশ ইতিমধ্যেই অভিযুক্ত শেখরকে গ্রেফতার করেছে, তবে এই ঘটনায় যে প্রশ্নগুলো উঠে আসছে, তা নাগপুর ছাড়িয়ে গোটা দেশের বিবেককে দংশন করছে।


১. ঘটনার প্রেক্ষাপট: একতরফা প্রেমের বিষবৃক্ষ

নাগপুরের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা প্রাচী হেমরাজ পড়াশোনায় অত্যন্ত মনোযোগী ছিলেন। কলেজের বন্ধুদের কাছে তিনি ছিলেন একজন হাসিখুশি এবং প্রাণবন্ত মেয়ে। তবে গত কয়েক মাস ধরে তাঁর এই হাসিখুশি জীবন বিষিয়ে তুলেছিল প্রতিবেশী যুবক শেখর।

পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে যে, শেখর দীর্ঘ দিন ধরেই প্রাচীর ওপর নজর রাখছিল। সে নিজেকে প্রাচীর প্রেমিক হিসেবে দাবি করত, যদিও প্রাচীর পক্ষ থেকে তেমন কোনো ইঙ্গিত বা সায় ছিল না। প্রাচী একাধিকবার শেখরকে বুঝিয়েছিলেন যে তিনি নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত এবং এই ধরণের কোনো সম্পর্কে তিনি আগ্রহী নন। কিন্তু শেখর ছিল অন্য ধাতুতে গড়া। তার কাছে 'না' শব্দটির কোনো অস্তিত্ব ছিল না।

অভিযোগ উঠেছে, শেখর কেবল প্রেমের প্রস্তাব দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, সে প্রাচীকে প্রতিনিয়ত ‘স্টক’ (Stalk) করত। প্রাচী যখন কলেজে যেতেন বা বাজার করতে বের হতেন, শেখর ছায়ার মতো তাঁর পিছু নিত। প্রাচী বিষয়টি তাঁর মা এবং দাদাকে জানিয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যরা কয়েকবার শেখরকে মৌখিকভাবে সতর্কও করেছিলেন। কিন্তু সেই সতর্কতা শেখরের জেদকে আক্রোশে পরিণত করে। সে মনে মনে স্থির করে, প্রাচী যদি তার না হয়, তবে তাকে অন্য কারোর হতে দেবে না।


২. সেই অভিশপ্ত বুধবার: যখন বাড়ি ছিল জনশূন্য

বুধবার দিনটি প্রাচীর পরিবারের জন্য আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। প্রাচীর বাবা, মা এবং তাঁর বড় দাদা বিশেষ কিছু কাজে বাড়ির বাইরে গিয়েছিলেন। প্রাচীর পরীক্ষা বা পড়াশোনার চাপের কারণে তিনি বাড়িতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দুপুরের পর বাড়ি যখন একদম নিস্তব্ধ, তখনই সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করার পরিকল্পনা করে শেখর।

সে জানত যে ওই সময়ে প্রাচী একা রয়েছেন। বিকেল নাগাদ শেখর প্রাচীদের বাড়ির কড়া নাড়ে। পুলিশ সূত্রে খবর, প্রাচী প্রথমে দরজা খুলতে চাননি। কিন্তু প্রতিবেশীদের মধ্যে জানাচেনা থাকার সুবাদে এবং শেখর হয়তো কোনো জরুরি কথা বলার অছিলায় দরজা খোলাতে বাধ্য করে। দরজা খুলতেই শেখর জোর করে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে এবং ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়।


৩. খুনের নীল নকশা: ঘর যখন কসাইখানা

তদন্তকারীদের অনুমান, ঘরের ভেতরে শেখর আবারও প্রাচীকে তাঁর প্রেমের প্রস্তাব গ্রহণ করার জন্য চাপ দিতে থাকে। প্রাচী আবারও অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এর পরেই শুরু হয় শেখরের তাণ্ডব।

শারীরিক নির্যাতন: অভিযুক্ত যুবক প্রথমে প্রাচীকে এলোপাথাড়ি চড়-থাপ্পড় মারতে শুরু করে। প্রাচী নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন, যার প্রমাণ ময়নাতদন্তের রিপোর্টে পাওয়া স্ক্র্যাচ মার্ক বা আঁচড়ের দাগ। কিন্তু গায়ের জোরে প্রাচী পেরে ওঠেননি। পুলিশ জানিয়েছে, শেখর প্রাচীর মাথা দেওয়ালে বা কোনো শক্ত ভোঁতা বস্তুর ওপর ঠুকে দেয়, যার ফলে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

শ্বাসরোধ করে হত্যা: তরুণী যখন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন বা অচৈতন্য ছিলেন, তখনই শেখর তাঁকে শ্বাসরোধ করে খুন করার সিদ্ধান্ত নেয়। অভিযোগ অনুযায়ী, হাত দিয়ে বা কোনো কাপড় ব্যবহার করে প্রাচীর শ্বাসনালী টিপে ধরা হয় যতক্ষণ না তাঁর প্রাণবায়ু বেরিয়ে যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটি উজ্জ্বল জীবনের দীপ নিভে যায়।


৪. অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার কৌশল: আত্মহত্যার নাটক

প্রাচীকে খুনের পর শেখর বুঝতে পেরেছিল যে ধরা পড়লে তার কঠোর সাজা হবে। ঠান্ডা মাথায় সে প্রমাণ লোপাটের পরিকল্পনা করে। সে জানত, গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলিয়ে দিলে সাধারণ মানুষ এবং পুলিশ একে আত্মহত্যার ঘটনা বলে ভুল করবে।

প্রাচীর নিজের ওড়নাটিকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে শেখর। মৃতদেহটিকে টেনে নিয়ে গিয়ে ঘরের সিলিং ফ্যানের সাথে ওড়না দিয়ে পেঁচিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এরপর খুব সতর্কভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের বাড়িতে চলে যায় শেখর, যেন কিছুই ঘটেনি। সে হয়তো ভেবেছিল, ময়নাতদন্ত ছাড়াই এই মৃত্যু ‘ব্যর্থ প্রেমের কারণে আত্মহত্যা’ হিসেবে গণ্য হবে।


৫. রহস্য উন্মোচন: পুলিশের তৎপরতা ও ময়নাতদন্ত

বুধবার সন্ধ্যায় যখন প্রাচীর মা এবং দাদা বাড়ি ফেরেন, তাঁরা দেখেন ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ নয়, বরং ভেজানো। ভেতরে ঢুকে মেয়ের ঝুলন্ত দেহ দেখে তাঁদের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। খবর দেওয়া হয় থানায়।

নাগপুর পুলিশ এসে দেহ উদ্ধার করে এবং প্রথম দেখায় একে আত্মহত্যা বলেই মনে করেছিল। কিন্তু প্রাচীর মায়ের কান্নাভেজা বয়ান এবং শেখরের ওপর তাঁদের সন্দেহের কথা শুনে পুলিশ নড়েচড়ে বসে। দেহটি দ্রুত ময়নাতদন্তের (Post-mortem) জন্য পাঠানো হয়।

ময়নাতদন্তের বিস্ফোরক তথ্য: ময়নাতদন্তের রিপোর্টে দেখা যায়, মৃত্যুর কারণ কেবল ঝুলে পড়া নয়। বরং ঝুলে থাকার আগে তাঁর শরীরের ওপর প্রচণ্ড শারীরিক বল প্রয়োগ করা হয়েছিল। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়:

এই রিপোর্ট পাওয়ার সাথে সাথেই আত্মহত্যার মামলাটি খুনের (Section 302 of IPC) মামলায় রূপান্তরিত হয়।


৬. অভিযুক্ত শেখরের গ্রেফতারি ও পুলিশের বক্তব্য

প্রাচীর মায়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্টের ভিত্তিতে পুলিশ দ্রুত শেখরকে আটক করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে সব অস্বীকার করলেও, পুলিশের কড়া জেরার মুখে সে ভেঙে পড়ে। পুলিশ জানতে পেরেছে, শেখর প্রাচীর ওপর এক ধরণের অধিকারবোধ (Obsession) তৈরি করেছিল।

নাগপুর পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, "অভিযুক্ত শেখর আজাবারো ধোরে একজন মানসিকভাবে অস্থির এবং হিংস্র যুবক। সে পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। প্রাচীর বাড়ির গতিবিধির ওপর সে নজর রাখছিল। আমরা ঘটনাস্থল থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করেছি এবং ফরেনসিক রিপোর্ট আসার অপেক্ষা করছি।"


৭. সমাজ ও সংস্কৃতির অবক্ষয়: গভীর বিশ্লেষণ

প্রাচীর মৃত্যু ভারতের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে কয়েকটি অত্যন্ত গুরুতর প্রশ্ন তুলে ধরেছে। কেন একজন শিক্ষিত বা আধুনিক পরিবেশে বড় হওয়া যুবক একটি মেয়ের প্রত্যাখ্যান সহ্য করতে পারছে না?

পৌরুষের ভুল ধারণা (Toxic Masculinity): আমাদের সমাজে অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষদের শেখানো হয় যে 'না' মানে সরাসরি প্রত্যাখ্যান নয়, বরং জেদ করে কিছু আদায় করে নেওয়াই হলো পুরুষত্ব। শেখরের মতো যুবকরা মনে করে, নারীরা তাদের সম্পত্তি। যখন সেই সম্পত্তি তাদের অধিকার থেকে বেরিয়ে যেতে চায়, তখন তারা ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে।

সিনেমার প্রভাব: জনপ্রিয় সংস্কৃতি বা অনেক ক্ষেত্রে বলিউডের সিনেমাগুলোতে দেখানো হয় যে, একজন যুবক কোনো মেয়ের পিছু নিলে বা বারবার তাকে বিরক্ত করলে শেষ পর্যন্ত মেয়েটি রাজি হয়ে যায়। বাস্তব জীবনে যখন এর উল্টোটা ঘটে, তখন সেই যুবকরা বাস্তবতাকে মেনে নিতে পারে না।

আইনি সুরক্ষার অভাব: প্রাচীকে যখন শেখর উত্ত্যক্ত করছিল, তখন যদি দ্রুত পুলিশি হস্তক্ষেপ হতো বা শেখরকে কোনোভাবে কাউন্সিলিং করানো যেত, তবে হয়তো আজ প্রাচী আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকতেন। ভারতে 'স্টকিং' বা উত্ত্যক্তকরণকে অনেক সময় গুরুত্ব দেওয়া হয় না, যা পরে এই ধরণের বড় অপরাধের রূপ নেয়।


৮. শোক ও ক্ষোভের আবহ

প্রাচী হেমরাজের মৃত্যুতে নাগপুরের ছাত্রসমাজ স্তব্ধ। তাঁর কলেজের সহপাঠীরা বৃহস্পতিবার একটি শোক মিছিলের আয়োজন করেন। সবার মুখেই এক দাবি— ‘জাস্টিস ফর প্রাচী’। তাঁদের মতে, প্রাচী কেবল একজন ছাত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন হাজারো মেয়ের লড়াইয়ের প্রতীক যারা প্রতিদিন রাস্তায় বা কর্মক্ষেত্রে শেখরের মতো অপরাধীদের দ্বারা উত্ত্যক্ত হয়।

তৃণমূল কংগ্রেস সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁরা মহারাষ্ট্র সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন যাতে এই মামলাটি ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ আদালতে বিচার করা হয় এবং অপরাধীকে ফাঁসির সাজা দেওয়া হয়।


৯. পরিবার যখন নিঃস্ব

প্রাচীর মা এখন বাকরুদ্ধ। তিনি কেবল এইটুকু বলতে পারছেন, "আমি আমার মেয়েকে বলেছিলাম শেখরকে এড়িয়ে চলতে। কিন্তু ও যে ঘরের ভেতরে এসে আমার মেয়েকে শেষ করে দেবে, তা স্বপ্নেও ভাবিনি। আমি ওর ফাঁসি চাই।"

একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সবটুকু সম্বল ছিল এই মেয়েটি। তাঁর পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পাওয়ার কথা ছিল, পরিবারের অভাব মেটানোর কথা ছিল। কিন্তু একটি অন্ধ প্রতিহিংসা সব শেষ করে দিল। প্রাচীর বাবার করুণ মুখ আজ গোটা দেশের কাছে বিচার চাইছে।


১০. উপসংহার: সচেতনতা ও আগামীর পথ

প্রাচী হেমরাজের খুনের ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, দেওয়াল তুলে বা ঘরে আটকে রেখে মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। যতক্ষণ না পুরুষদের মানসিকতা এবং দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের দেশের মেয়েরা অনিরাপদই থেকে যাবে।

নাগপুর পুলিশ জানিয়েছে, তারা খুব শীঘ্রই চার্জশিট পেশ করবে। শেখর আজাবারো ধোরের মতো অপরাধীদের এমন শাস্তি হওয়া উচিত যা সমাজের অন্যান্য সম্ভাব্য অপরাধীদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করবে।

প্রাচী আর ফিরবে না, কিন্তু তাঁর এই মৃত্যু যেন বৃথা না যায়। প্রতিটি প্রাচীকে রক্ষা করার দায়িত্ব সমাজের প্রতিটি স্তরের। প্রত্যাখ্যান মানে যুদ্ধ নয়, প্রত্যাখ্যান মানে অপমান নয়—এটি একটি মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। এই সত্যটি যেদিন শেখরদের মতো যুবকরা বুঝতে শিখবে, সেদিনই হয়তো দেশ প্রকৃত অর্থে নারী সুরক্ষায় সফল হবে।

Preview image