Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

NEET-UG দুর্নীতি: কলকাতায় NTA বাতিলের দাবিতে AIDSO-র বিশাল ছাত্র মিছিল

NEET-UG পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস ও চরম দুর্নীতির প্রতিবাদে কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অল ইন্ডিয়া ডেমোক্রেটিক স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন (AIDSO)-এর নেতৃত্বে বিশাল ছাত্র বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হলো। আন্দোলনকারীদের মূল দাবি, দুর্নীতিগ্রস্ত ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA)-কে বাতিল করতে হবে এবং সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে এই কেলেঙ্কারির নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। কলেজ স্ট্রিট থেকে শুরু হওয়া এই মিছিলের জেরে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ও মহাত্মা গান্ধী রোড সংলগ্ন এলাকায় ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে পড়ুয়ারা এনটিএ-র কুশপুতুল দাহ করে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেয়।

NEET-UG কেলেঙ্কারিতে উত্তাল কলকাতা: NTA বাতিলের দাবিতে কলেজ স্ট্রিটে AIDSO-র মেগা মিছিল, অবরুদ্ধ সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ

কলকাতা: ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানে যোগদানের প্রধান প্রবেশিকা পরীক্ষা 'নিট' (NEET-UG)-কে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যে বিতর্কের আগুন জ্বলছে, তার আঁচ এবার এসে পড়ল কলকাতার রাজপথে। লাখ লক্ষ যোগ্য পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার প্রতিবাদে এবং পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থা 'ন্যাশনাল টেস্টিং एजेंसी' (NTA)-র চরম দুর্নীতির বিরুদ্ধে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা কেন্দ্র কলেজ স্ট্রিটে এক বিশাল প্রতিবাদী মিছিলের ডাক দেয় বামপন্থী ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া ডেমোক্রেটিক স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন (AIDSO)। সরাসরি কলেজ স্ট্রিটের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় সংলগ্ন এলাকা।

আন্দোলনের মূল প্রেক্ষাপট: নিট পরীক্ষার নজিরবিহীন কেলেঙ্কারি

এবারের NEET-UG পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই দেশজুড়ে সন্দেহ ও ক্ষোভের দানা বাঁধতে শুরু করে। একই সেন্টার থেকে একাধিক পরীক্ষার্থীর ফুল মার্কস (৭২০-তে ৭২০) পাওয়া, গ্রেস মার্কস দেওয়ার ক্ষেত্রে চরম অস্বচ্ছতা এবং বিভিন্ন রাজ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অকাট্য প্রমাণ সামনে আসায় চূড়ান্ত হতাশায় ডুবে যায় লক্ষ লক্ষ দিনরাত এক করা যোগ্য পড়ুয়ারা।

এদিনের মিছিলে শামিল হওয়া আন্দোলনকারী নিট পরীক্ষার্থী ও AIDSO নেতৃত্বের স্পষ্ট দাবি, এই পরীক্ষা ব্যবস্থা এখন আর মেধার মূল্যায়নের জায়গা নেই, এটি একটি কর্পোরেট ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এনটিএ-র মতো একটি জাতীয় স্তরের সংস্থার নজরদারিতে কীভাবে পরীক্ষার আগে কোটি কোটি টাকায় প্রশ্নপত্র বিক্রি হয়ে গেল, সেই প্রশ্ন তুলে এদিন স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয় কলকাতা।

শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ও coaching সেন্টারের সিন্ডিকেট

আন্দোলনকারী ছাত্রনেতারা অভিযোগ করেন, এনটিএ-র এই পরীক্ষা কাঠামোর আড়ালে আসলে কাজ করছে এক বিশাল কর্পোরেট ও কোচিং সেন্টারের সিন্ডিকেট। কোটি কোটি টাকার এই চক্রটি দেশের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মেধাবী পড়ুয়াদের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নকে টাকার জোরে বুটের তলায় পিষে দিচ্ছে। AIDSO-র দাবি, শিক্ষাকে যেভাবে পণ্যে রূপান্তরিত করা হয়েছে এবং জাতীয় স্তরের একটি সংস্থাকে যেভাবে কিছু নির্দিষ্ট বেসরকারি সংস্থার স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন কালো অধ্যায়। এই শিক্ষা ব্যবসার অবসান না घটালে আগামী দিনে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে।

যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোয় আঘাত ও রাজ্যের অধিকার খর্ব

আন্দোলনের মঞ্চ থেকে এনটিএ-র একাধিপত্যের বিরুদ্ধেও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। ছাত্র নেতাদের বক্তব্য, একটি মাত্র কেন্দ্রীয় এজেন্সির হাতে গোটা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ তুলে দেওয়ার ফলেই এই বিপর্যয় ত্বরান্বিত হয়েছে। ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে প্রতিটি রাজ্যের নিজস্ব শিক্ষা পরিকাঠামো রয়েছে। জোর করে সবার ওপর একটি প্রশ্নপত্র চাপিয়ে দেওয়া এবং সেই সংস্থায় দুর্নীতি হওয়া প্রমাণ করে যে কেন্দ্রীকরণ ব্যবস্থার গলদ কতখানি গভীর। AIDSO দাবি তুলেছে, রাজ্যগুলোর নিজস্ব মেডিকেল এন্ট্রান্স পরীক্ষা নেওয়ার যে অধিকার আগে ছিল, তা অবিলম্বে ফিরিয়ে দেওয়া হোক, যাতে স্থানীয় মেধাবী পড়ুয়ারা কেন্দ্রীয় দুর্নীতির শিকার না হন।

কলেজ স্ট্রিট থেকে শুরু মিছিল, পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি

দুপুরের পর থেকেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে প্ল্যাকার্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে জড়ো হতে থাকেন শয়ে শয়ে ছাত্রছাত্রী। মিছিলের মূল স্লোগান ছিল— "শিক্ষা বিক্রির কর্পোরেট চক্রান্ত রুখে দিন", "দুর্নীতিগ্রস্ত NTA দূর হটো", "যোগ্য পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ফিরিয়ে দাও"।

মিছিলটি কলেজ স্ট্রিট থেকে মহাত্মা গান্ধী রোডের দিকে এগোতে চাইলে পুলিশি বাধার মুখে পড়ে। আন্দোলনকারীদের আটকানোর জন্য পুলিশ আগে থেকেই বিশাল ব্যারিকেড তৈরি করে রেখেছিল। কিন্তু উত্তেজিত ছাত্রছাত্রীরা সেই ব্যারিকেড ভেঙে এগোনোর চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে তীব্র ধস্তাধস্তি শুরু হয়। ছাত্রীদের ওপর পুরুষ পুলিশ বলপ্রয়োগ করছে এই অভিযোগে বিক্ষোভের মাত্রা আরও দ্বিগুণ হয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়।

এনটিএ-র কুশপুতুল দাহ ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ

পুলিশি ব্যারিকেডের সামনেই রাস্তায় বসে পড়ে অবস্থান বিক্ষোভ শুরু করেন পড়ুয়ারা। এরপরই পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থা NTA এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রকের কুশপুতুল তৈরি করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা কুশপুতুলকে সামনে রেখে ছাত্রনেতারা কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষানীতি এবং এনটিএ-র শীর্ষ কর্তাদের তীব্র সমালোচনা করেন।

news image
আরও খবর

AIDSO-র রাজ্য নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বলা হয়, "এনটিএ একটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ ও দুর্নীতিগ্রস্ত সংস্থায় পরিণত হয়েছে। শুধু নিট নয়, ইউজিসি-নেট (UGC-NET) থেকে শুরু করে সমস্ত জাতীয় স্তরের পরীক্ষাতেই এরা কেলেঙ্কারি ছড়াচ্ছে। এই সংস্থাকে অবিলম্বে ভেঙে দিতে হবে এবং রাজ্যগুলোর হাতে নিজস্ব পরীক্ষা নেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।"

সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে তদন্তের দাবি

আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো, কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো নিজস্ব বা পকেট তদন্তকারী সংস্থার ওপর তাদের ভরসা নেই। কারণ এই দুর্নীতির শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত এবং এর সাথে অনেক রাঘববোয়াল যুক্ত। তাই সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান বিচারপতির এজলাসে বা শীর্ষ আদালতের प्रत्यक्ष তত্ত্বাবধানে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের সঠিক বিচার না পাওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন সারা দেশ জুড়ে আরও তীব্র আকারে ছড়িয়ে দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

মেধাবী পড়ুয়াদের মানসিক চাপ ও সামাজিক সংকট

এই দুর্নীতির ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেই সমস্ত ছাত্রছাত্রীরা, যারা বছরের পর বছর ঘরের কোণে বসে কঠোর পরিশ্রম করেছে। পরীক্ষায় ভালো ফল করেও দুর্নীতিবাজদের টাকার গরমে তারা র‍্যাঙ্কিংয়ে কয়েক হাজার পিছিয়ে গেছে। এই নজিরবিহীন জاليةতি দেশের তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক আঘাত হেনেছে। অনেক পড়ুয়াই চরম হতাশার শিকার হচ্ছে। এদিনের মিছিলে বক্তারা বারবার উল্লেখ করেন যে, এই লড়াই কেবল খাতা-কলমের লড়াই নয়, এটি লক্ষ লক্ষ যুবকের বেঁচে থাকার এবং মর্যাদা রক্ষার লড়াই।

যানজটে অচল কলকাতার একাংশ

কলেজ স্ট্রিট ও মহাত্মা গান্ধী রোড (MG Road) সংযোগস্থলে দীর্ঘক্ষণ ধরে ছাত্র বিক্ষোভ চলার কারণে উত্তর ও মধ্য কলকাতার বিস্তীর্ণ অংশে যান চলাচল সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ, শিয়ালদহ গামী রাস্তা এবং হাওড়া গামী রাস্তায় মাইলের পর মাইল গাড়ির লাইন লেগে যায়। office ফেরত সাধারণ মানুষ ও যাত্রীরা চরম ভোগান্তির শিকার হন। তবে নিট দুর্নীতির মতো একটি সংবেদনশীল ও ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের বিষয়ে আন্দোলন হওয়ায় অনেক সাধারণ মানুষ ও পথচলতি অভিভাবকদেরও ছাত্রদের এই আন্দোলনকে মৌখিকভাবে সমর্থন করতে দেখা গেছে।

অভিভাবকদের উদ্বেগ ও ভবিষ্যৎ

মিছিলে কেবল ছাত্রছাত্রীরাই নয়, বহু উদ্বিগ্ন ও চোখে জল নিয়ে আসা অভিভাবককেও পা মেলাতে দেখা গেছে। এক আন্দোলনকারী অভিভাবক ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, "ঘটিবাটি বেচে, জমি বন্ধক রেখে বা লোন নিয়ে সন্তানদের এই সর্বভারতীয় পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য পাঠিয়েছিলাম। দিনরাত না ঘুমিয়ে তারা পড়াশোনা করল। আর পরীক্ষার দিন দেখা গেল যারা কোটি টাকা দিয়েছে, তারা প্রশ্ন আগে থেকেই পেয়ে গেছে। এই দেশে সততা ও মেধার কি কোনো দাম নেই? আমরা এর শেষ দেখে ছাড়ব।"

ভবিষ্যৎ আন্দোলনের রূপরেখা

AIDSO নেতৃত্বের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কলকাতার এই রাজপথের লড়াই আসলে এক দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলনের সূচনা মাত্র। আগামী দিনে রাজ্যের প্রতিটি জেলায়, মহকুমায় এবং ব্লকে ব্লকে এই নিয়ে স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান এবং জনমত গঠনের কাজ চালানো হবে। যদি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রক অবিলম্বে NTA-র কাঠামো সংস্কার বা এটি বাতিলের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেয়, তবে দিল্লির জন্তর মন্তর চত্বরে অল ইন্ডিয়া স্তরে বৃহত্তর ঘেরাও কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন ছাত্র প্রতিনিধিরা।

উপসংহার

কলেজ স্ট্রিটের রাজপথ থেকে সরাসরি পরিচালিত AIDSO-র এই বিক্ষোভ মিছিল স্পষ্ট প্রমাণ করে দিল যে, নিট দুর্নীতি নিয়ে দেশের ছাত্র ও যুব সমাজের ক্ষোভের আগুন সহজে নিভবার নয়। দিল্লি থেকে কলকাতা—দেশের প্রতিটি প্রান্তেই এখন একটাই আওয়াজ, 'শিক্ষা ক্ষেত্রে কর্পোরেট রাজ ও দুর্নীতি মানছি না, মানব না'। এখন দেখার, সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী কড়া পদক্ষেপ এবং ছাত্র সমাজের এই লাগাতার আন্দোলনের চাপে পড়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও এনটিএ শেষ পর্যন্ত কী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। তবে যোগ্য ও সৎ ডাক্তার তৈরির এই বুনিয়াদি প্রবেশিকা পরীক্ষাতেই যদি এমন গলদ থাকে, তবে তা সমগ্র দেশের আগামী দিনের চিকিৎসা ব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য এক অপূরণীয় বিপর্যয় ডেকে আনবে।

Preview image