অভিনেতা জিতু কমল ধান্যকুড়িয়ায় এরাও মানুষ ছবির শ্যুটিং চলাকালীন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আপাতত তিনি স্থিতিশীল। সোশ্যাল মিডিয়ায় জিতু জানান, মানব শরীরও এক যন্ত্র, মাঝে মাঝে সার্ভিসিং দরকার হয় তাই উদ্বেগের কিছু নেই। তাঁর পোস্টে অনুরাগীরা জানিয়েছেন দ্রুত আরোগ্য কামনা।
বাংলা টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ জিতু কমল। শান্ত স্বভাব, পরিমিত উচ্চারণ, এবং চরিত্রের গভীরতায় ডুবে যাওয়ার ক্ষমতা তাঁকে আলাদা করে তুলেছে। সম্প্রতি এই প্রতিভাবান অভিনেতা খবরের শিরোনামে এসেছেন তাঁর অভিনয় নয়, বরং হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে।
২০২৫ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে, তিনি ধান্যকুড়িয়ায় নিজের নতুন ছবি এরাও মানুষ-এর শ্যুটিং করছিলেন। ছবিটি পরিচালনা করছেন সৌরদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায়। দীর্ঘ শুটিং-সূচি, রাত-দিন কাজ, ক্রমাগত শারীরিক ও মানসিক চাপ—এই সবের মাঝেই হঠাৎ শরীরে অস্বস্তি অনুভব করেন জিতু। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন সাধারণ ক্লান্তি, কিন্তু পরে তা জ্বর, মাথা ঘোরা এবং তীব্র দুর্বলতায় পরিণত হয়। সেটে উপস্থিত ইউনিট-সদস্যরা বুঝতে পারেন, বিষয়টি সাধারণ নয়। তড়িঘড়ি তাঁকে ধান্যকুড়িয়া থেকে কলকাতার বাইপাস সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়।
চিকিৎসকরা প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। হৃদ্যন্ত্রের কার্যকলাপ, রক্তচাপ, ইলেকট্রোলাইটের মাত্রা—সবকিছু খুঁটিয়ে দেখা হয়। প্রথম দিন বেশ উদ্বেগজনক অবস্থায় থাকলেও, দ্বিতীয় দিনে তাঁর শারীরিক অবস্থা কিছুটা উন্নত হয়। এসময় থেকেই তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি দীর্ঘ পোস্ট লেখেন, যা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।
জিতুর সেই পোস্টে প্রথমেই ছিল এক অনন্য তুলনা। তিনি লেখেন,
“দেখুন, গাড়ি সার্ভিস সেন্টারে নিয়ে যাওয়া মানেই গাড়ি খারাপ হয়ে গিয়েছে এমন নয়। অথবা ভয়াবহ অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে বলেই গাড়ি সার্ভিস সেন্টারে গিয়েছে, এমনও নয়। মানব শরীরও তো একটা যন্ত্র। যন্ত্র তো মাঝে মাঝে খারাপ হবেই বা বিকল হবে। তাকেও সার্ভিস সেন্টারে নিয়ে আসতে হবে।”
এই কয়েকটি বাক্যে যেন তিনি নিজের অসুস্থতার মধ্যেও জীবন-দর্শনের এক মর্মস্পর্শী পাঠ দিয়ে ফেললেন। তাঁর এই ভাবনা মানুষের মন ছুঁয়ে যায়—কারণ আজকের ব্যস্ত জীবনযাত্রায় অনেকেই নিজের শরীরকে অবহেলা করেন, যতক্ষণ না শরীর নিজেই “সার্ভিস সেন্টার”-এ নিয়ে যেতে বাধ্য করে।
জিতু আরও লেখেন,
“হসপিটালে এসেছি, আবার ফিরে যাব। এটা অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা। আমাকে নিয়ে এত হাহুতাশ করার দরকার নেই। আমি সমাজের এত বড় মানুষ নই, বা আমার সমাজের প্রতি এত অবদান নেই যে আমাকে নিয়ে এতটা সময় নষ্ট করবেন।”
এই বিনয়, এই সহজ-সরল ভাষা যেন তাঁর বাস্তব জীবনদর্শনের প্রতিফলন। খ্যাতি সত্ত্বেও নিজের অবস্থানকে তিনি সাধারণ মানুষের মতোই দেখেন।
পোস্টের সবচেয়ে আবেগময় অংশ ছিল, তাঁর হাসপাতাল অভিজ্ঞতা। তিনি জানান, তাঁর পাশের বিছানায় রয়েছেন এক বৃদ্ধ, যিনি জীবনের অনেকটা সময় জঙ্গল সাফারিতে গাড়ি চালিয়ে কাটিয়েছেন। অসুস্থ শরীরেও সেই মানুষটির মুখে হাসি, অতীতের গল্পে ভরা এক রোমাঞ্চ।
জিতু লেখেন,
“এই মানুষটিকে দেখে মনে হচ্ছে, জীবন যত কঠিনই হোক না কেন, প্রতিদিন কিছু না কিছু আনন্দ লুকিয়ে রাখে। ওনার গল্প শুনে মনে হলো, আমি যাদের নিয়ে গল্প বলি, তারা আসলে এমনই—ভাঙা, কিন্তু জীবন্ত।”
অন্যদিকে, তাঁর পাশে ছিলেন ‘বাবাই’ নামে এক তরুণ, যিনি হাসপাতালের কর্মী নন, বরং তাঁর এক শুভানুধ্যায়ী, যিনি নিঃস্বার্থভাবে দেখাশোনা করছিলেন। জিতু লিখেছেন,
“এই ছেলেটা সারাক্ষণ আমার ওষুধ, খাবার, রিপোর্ট নিয়ে ছোটাছুটি করছে। আমার নিজের আত্মীয়ের থেকেও বেশি যত্ন নিচ্ছে।”
এমন মানবিক মুহূর্তগুলোই তাঁর পোস্টকে আরও উষ্ণ ও গভীর করে তোলে।
জিতুর অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়তেই, টলিউড জগতের বহু তারকা ও সহকর্মী তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করে সোশ্যাল মিডিয়ায় বার্তা দেন। অভিনেত্রী দিতিপ্রিয়া রায় লেখেন, “দাদা, খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন। তোমাকে সেটে ফিরে পেতে চাই।” অভিনেতা গৌরব চট্টোপাধ্যায় মন্তব্য করেন, “তুমি যে এভাবে ইতিবাচকভাবে বিষয়টাকে দেখছ, সেটাই তোমার শক্তি।”
ভক্তরাও নানা শুভেচ্ছা বার্তায় ভরিয়ে দেন জিতুর পেজ। কেউ লেখেন, “আপনি শুধু একজন অভিনেতা নন, আপনি একজন অনুপ্রেরণা।” আবার কেউ লিখেছেন, “আপনার মতো মানুষরা আমাদের শেখান—কঠিন সময়েও কীভাবে হাসতে হয়।”
গত কয়েক বছর ধরে জিতু কমল একের পর এক প্রজেক্টে কাজ করছেন। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে—
অপরাজিত (যেখানে তিনি সত্যজিৎ রায়ের ভূমিকায় প্রশংসা পান)
মন ফাগুন, গ্যাংস্টার গিরিশ গার্গি, রক্তরহস্য ইত্যাদি ধারাবাহিক ও সিনেমা
এর পাশাপাশি বিভিন্ন ওয়েব সিরিজ এবং মঞ্চনাটকেও তিনি যুক্ত রয়েছেন। শুটিং, প্রচার, ইভেন্ট—সব মিলিয়ে টানা কাজের চাপে বিশ্রামের সুযোগ কমই পেয়েছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, অতিরিক্ত ক্লান্তি, অনিয়মিত ঘুম এবং ডিহাইড্রেশন থেকেও শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
এই ঘটনার পরই তাঁর ভক্তরা অনুরোধ করেছেন, কিছুদিন যেন সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকেন তিনি।
জিতুর পোস্টে যেমন বিনয়, তেমনি দার্শনিক চিন্তাও ছিল। তিনি লিখেছেন,
“মানুষের শরীরের মতোই মনও সার্ভিসের প্রয়োজন হয়। আমরা যন্ত্রপাতিকে যত্ন করি, কিন্তু নিজেদের করি না। আমি এখন বুঝছি, বিশ্রামও এক ধরণের কাজ।”
এই কথাগুলো আজকের ব্যস্ত পেশাজীবনের এক গভীর সত্য তুলে ধরে। সমাজে সাফল্য মানে ক্রমাগত উৎপাদন, ক্রমাগত পরিশ্রম—এই ভাবনাকে ভেঙে দিয়ে তিনি বোঝালেন, “থেমে যাওয়া” মানেই ব্যর্থতা নয়, বরং পুনর্জাগরণের সময়।
যে ছবির শ্যুটিং চলাকালীন তিনি অসুস্থ হলেন, সেই এরাও মানুষ ছবির নামটিও যেন এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ছবির গল্প মূলত সমাজের প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে, যারা সমাজের চোখে তুচ্ছ, অথচ তারাই সমাজের সত্যিকারের প্রতিচ্ছবি। জিতু নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “এই ছবিতে আমি এমন এক চরিত্রে অভিনয় করছি, যে জীবনের ছোট ছোট সুখকে বড় করে দেখে।”
অদ্ভুতভাবে, তাঁর হাসপাতাল অভিজ্ঞতাও যেন এই দর্শনকে নতুন রূপে ফুটিয়ে তুলল। পাশের বৃদ্ধ মানুষটির গল্প, বাবাইয়ের নিঃস্বার্থ যত্ন—সবই “এরাও মানুষ” ছবির বাস্তব সংস্করণ।
পোস্টের শেষে জিতু স্পষ্ট ভাষায় লিখেছিলেন,
“আমাকে নিয়ে এত চিন্তা করবেন না। আমি দ্রুত সুস্থ হয়ে কাজে ফিরব। আমি ঠিক আছি, আপনারা নিজের খেয়াল রাখুন।”
এই বার্তাটি ছিল একদিকে আশ্বাস, অন্যদিকে জীবনের এক অনুপ্রেরণাদায়ক শিক্ষা। নিজের অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে তৈরি আতঙ্ককে তিনি শান্ত ভাষায় দূর করতে চেয়েছেন।
অনেকে বলছেন, তাঁর এই মানসিক দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাসই তাঁকে দ্রুত সেরে উঠতে সাহায্য করছে।
চিকিৎসকেরা প্রায়ই বলেন—শুধু শরীর নয়, মানসিক ভারসাম্যও সুস্থতার মূল উপাদান। জিতুর পোস্টে সেই দিকটিই সবচেয়ে স্পষ্ট। তাঁর কথাগুলো যেন এক থেরাপির মতো কাজ করছে অনেকের জন্য, বিশেষ করে যাঁরা কর্মজীবনের চাপে মানসিকভাবে ক্লান্ত।
তাঁর উদাহরণ আমাদের শেখায়—
অসুস্থতা কোনো ব্যর্থতা নয়, বরং নিজেকে নতুন করে বোঝার সুযোগ।
শরীর ও মনের যত্ন নেওয়া প্রয়োজন, বিশেষত যখন আমরা অন্যদের জন্য সৃষ্টিশীল কাজ করি।
“থেমে যাওয়া” মানে হাল ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া।
সূত্র অনুযায়ী, তাঁর স্ত্রী নবমিতা চট্টোপাধ্যায় প্রায় সারাদিন হাসপাতালেই তাঁর পাশে থাকছেন। নবমিতা নিজেও একজন অভিনেত্রী এবং জিতুর দীর্ঘদিনের সঙ্গিনী। তিনি সংবাদমাধ্যমে বলেন, “ও খুব ইতিবাচক মানুষ। শরীর খারাপ থাকলেও মন ভাঙে না। ওর হাসিই এখন সবার সবচেয়ে বড় প্রেরণা।”
পরিবারের এই সঙ্গ ও ভালোবাসাই হয়তো তাঁর দ্রুত সুস্থতার মূল চাবিকাঠি।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, অন্তত আরও কয়েকদিন বিশ্রামে থাকবেন জিতু। শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে ধীরে ধীরে কাজের জগতে ফিরবেন। এরাও মানুষ-এর বাকি অংশের শ্যুটিং কিছুদিনের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে।
তবে, তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল জানাচ্ছে—এই সময়টা তিনি লেখালিখি ও পড়াশোনায় কাটাচ্ছেন। জিতু আগেও বলেছিলেন, “অভিনয় শুধু ক্যামেরার সামনে নয়, জীবনেও শেখার বিষয়।” হয়তো এই বিরতিটাও তাঁর জীবনের আরেকটি “অভিনয় স্কুল” হয়ে উঠছে।
জিতু কমলের এই সামান্য অসুস্থতা হয়তো চিকিৎসাবিজ্ঞানের চোখে সাধারণ, কিন্তু মানসিকভাবে এটি আমাদের সকলের জন্য এক বিশাল শিক্ষা। তাঁর পোস্ট শুধু একটি অসুস্থ শরীরের গল্প নয়, বরং এক সচেতন, দার্শনিক মননের প্রকাশ।
তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন—
“জীবন মানে শুধুই দৌড় নয়। মাঝে মাঝে থামা, বিশ্রাম নেওয়া, এবং নিজের ভেতর তাকানোও জরুরি।”
আজ তাঁর হাজারো অনুরাগী এই বার্তাই বুকে ধারণ করেছেন। তাঁরা জানেন, জিতু আবার ফিরবেন—নতুন উদ্যমে, নতুন শক্তিতে, নতুন গল্প নিয়ে। কারণ তিনি যেমন পর্দায় বাস্তবকে ফুটিয়ে তোলেন, তেমনি বাস্তব জীবনেও এক অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছেন।