ধূমপান বেশি করলে চুল পড়ার সমস্যা বাড়ে? নতুন গবেষণায় কী দাবি করলেন বিজ্ঞানীরা?
টাক পড়তে শুরু করলে মন খারাপ হওয়াই স্বাভাবিক। বিশেষ করে অল্প বয়সে চুল পাতলা হয়ে যাওয়া বা কপালের দু’ধার ফাঁকা হয়ে যাওয়ার সমস্যা অনেকের আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, চুল পড়ার প্রধান কারণ বংশগত। অর্থাৎ পরিবারে যদি বাবা, দাদা বা কাকাদের টাক থাকে, তবে পরবর্তী প্রজন্মেও সেই প্রবণতা দেখা যেতে পারে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ— ধূমপান। ইংল্যান্ডের একদল বিজ্ঞানীর দাবি, অতিরিক্ত ধূমপান চুল পড়ার ঝুঁকি অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, কেন এমন হয়, তারও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন গবেষকেরা।
চুলের স্বাস্থ্যের সঙ্গে শরীরের সামগ্রিক রক্তসঞ্চালন ও হরমোনের ভারসাম্যের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মাথার ত্বকের নীচে অসংখ্য সূক্ষ্ম রক্তনালি (microvasculature) থাকে, যা চুলের ফলিকল বা গোড়ায় অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি পৌঁছে দেয়। চুলের প্রতিটি গোড়া একটি জীবন্ত কোষগুচ্ছ, যা নিয়মিত রক্তের মাধ্যমে পুষ্টি পায় বলেই চুল বৃদ্ধি পায়, ঘন ও শক্ত থাকে।
ধূমপানের ফলে শরীরে প্রবেশ করে নিকোটিনসহ বহু ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ। নিকোটিন রক্তনালিকে সঙ্কুচিত করে দেয়। যখন রক্তনালি সঙ্কুচিত হয়, তখন রক্তপ্রবাহ কমে যায়। ফলে চুলের গোড়ায় পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছতে পারে না। দীর্ঘদিন ধরে এই অবস্থা চলতে থাকলে চুলের ফলিকল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অকালেই চুল ঝরে যেতে শুরু করে।
তামাকের ধোঁয়ায় থাকে অসংখ্য ফ্রি র্যাডিক্যাল ও টক্সিন, যা শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি করে। অক্সিডেটিভ স্ট্রেস মানে শরীরের কোষে ক্ষতিকর রাসায়নিক বিক্রিয়ার আধিক্য, যা কোষের গঠন ও কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দিতে পারে। মাথার ত্বকের কোষ ও চুলের ফলিকলও এর বাইরে নয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ধূমপান চুলের কোষের ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হলে কোষের স্বাভাবিক বিভাজন ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে নতুন চুল গজানোর হার কমে যায় এবং পুরোনো চুল দ্রুত ঝরে পড়ে। এই প্রক্রিয়াই ধীরে ধীরে চুল পাতলা হয়ে যাওয়ার দিকে নিয়ে যায়।
ধূমপানের আর একটি প্রভাব হল প্রদাহ (inflammation)। তামাকের রাসায়নিক উপাদান মাথার ত্বকে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। প্রদাহ হলে ত্বকের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়। চুলের গোড়া দুর্বল হয়ে পড়ে এবং চুল পড়া বাড়তে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ধূমপায়ীদের মাথার ত্বক শুষ্ক হয়ে যায় বা অতিরিক্ত খুশকির সমস্যা দেখা দেয়, যা চুল পড়াকে আরও ত্বরান্বিত করে।
চুল পড়ার অন্যতম সাধারণ কারণ হল অ্যান্ড্রোজেনিক অ্যালোপেসিয়া, যা সাধারণ ভাষায় পুরুষ বা নারী প্যাটার্ন টাক নামে পরিচিত। এই অবস্থায় অ্যান্ড্রোজেন হরমোন, বিশেষ করে ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন (DHT), গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। এই হরমোনের প্রভাবে চুলের ফলিকল ধীরে ধীরে সঙ্কুচিত হতে থাকে। ফলে চুল পাতলা হয় এবং একসময় গজানো বন্ধ হয়ে যায়।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত ধূমপান রক্তে নিকোটিনের মাত্রা বাড়িয়ে হরমোনের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। নিকোটিন শরীরের বিভিন্ন হরমোনীয় প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে, যার ফলে DHT-এর কার্যকারিতা বাড়তে পারে। এর ফলেই অ্যান্ড্রোজেনিক অ্যালোপেসিয়ার প্রবণতা ত্বরান্বিত হতে পারে।
চুলের বৃদ্ধি একটি নির্দিষ্ট চক্র মেনে চলে— অ্যানাজেন (বৃদ্ধি), ক্যাটাজেন (রূপান্তর) ও টেলোজেন (বিশ্রাম) পর্যায়। সাধারণত বেশির ভাগ চুল অ্যানাজেন পর্যায়ে থাকে। কিন্তু ধূমপানের কারণে চুল দ্রুত টেলোজেন পর্যায়ে চলে যেতে পারে, অর্থাৎ বিশ্রাম অবস্থায় গিয়ে ঝরে পড়ে। এর ফলে মাথায় চুলের ঘনত্ব কমে যায়।
ধূমপান শুধু চুল পড়াই নয়, চুলের রং ও গুণগত মানেও প্রভাব ফেলে। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, ধূমপায়ীদের অকালপক্বতার (premature greying) প্রবণতা বেশি। এর কারণও অক্সিডেটিভ স্ট্রেস। শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের ঘাটতি হলে চুলের রঞ্জক কোষ (melanocytes) ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে চুল দ্রুত পেকে যায়।
অনেকে মনে করেন, চুল পড়ার সমস্যা মূলত পুরুষদের। কিন্তু বর্তমানে নারীদের মধ্যেও চুল পাতলা হয়ে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। অতিরিক্ত ধূমপান করলে নারীদের ক্ষেত্রেও হরমোনীয় ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে, যা চুলের স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত ধূমপান করেন এবং একই সঙ্গে মানসিক চাপ, অপুষ্টি বা হরমোনজনিত সমস্যায় ভোগেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।
যদিও বংশগত কারণ পুরোপুরি এড়ানো যায় না, তবু জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে চুল পড়ার গতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। ধূমপান ত্যাগ করা এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ধূমপান ছাড়লে শরীরে রক্তসঞ্চালন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমে এবং কোষের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া উন্নত হয়।
এছাড়া সুষম আহার, পর্যাপ্ত প্রোটিন, আয়রন, ভিটামিন ডি ও বায়োটিন গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম, মানসিক চাপ কমানো— এই সব অভ্যাস চুলের স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়ক। প্রয়োজনে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ বা ট্রাইকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
চুল পড়া একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। বংশগত কারণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই জীবনযাত্রার অভ্যাসও বড় ভূমিকা নেয়। অতিরিক্ত ধূমপান শুধু ফুসফুস বা হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করে না; এটি চুলের স্বাস্থ্যেরও মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। নিকোটিন রক্তনালিকে সঙ্কুচিত করে, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়ায়, হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং চুলের বৃদ্ধি চক্রে বিঘ্ন ঘটায়। ফলে চুল পড়া ত্বরান্বিত হয় এবং অল্প বয়সেই টাকের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
সুস্থ চুল চাইলে শুধু প্রসাধনী বা বাহ্যিক যত্নই যথেষ্ট নয়। শরীরের ভেতরের সুস্থতাই আসল। তাই ধূমপান ত্যাগ করা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বেছে নেওয়া এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা— এই তিনটি পদক্ষেপই হতে পারে সুস্থ চুল ও সুস্থ জীবনের মূলমন্ত্র।
বিশেষ করে অ্যান্ড্রোজেনিক অ্যালোপেসিয়ার ক্ষেত্রে ধূমপান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। যখন শরীরে ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন (DHT) হরমোনের প্রভাব বাড়ে, তখন চুলের ফলিকল ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়। ধূমপান এই হরমোনীয় ভারসাম্যকে প্রভাবিত করে সমস্যাকে ত্বরান্বিত করতে পারে। অর্থাৎ যাঁদের জেনেটিক প্রবণতা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ধূমপান যেন আগুনে ঘি ঢালার কাজ করে।
তবে এই পুরো আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— এই ঝুঁকি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণযোগ্য। বংশগত কারণ বদলানো না গেলেও জীবনযাত্রার অভ্যাস বদলানো সম্ভব। ধূমপান ত্যাগ করলে শরীর ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে এগোয়। রক্তসঞ্চালন উন্নত হয়, কোষে অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়ে, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমে এবং হরমোনের ভারসাম্য কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করে। ফলে চুল পড়ার হার কমতে পারে এবং বিদ্যমান চুলের গুণগত মানও উন্নত হতে পারে।
এছাড়া সুষম খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত জরুরি। পর্যাপ্ত প্রোটিন, আয়রন, জিঙ্ক, ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স, ভিটামিন ডি এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড চুলের বৃদ্ধিতে সহায়ক। নিয়মিত ব্যায়াম রক্তসঞ্চালন বাড়ায়, যা চুলের গোড়ায় পুষ্টি পৌঁছাতে সাহায্য করে। মানসিক চাপ কমানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে চুল পড়া বাড়াতে পারে।
চুল পড়া কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়, এটি অনেক সময় শরীরের অভ্যন্তরীণ সমস্যারও ইঙ্গিত দেয়। তাই সমস্যাকে অবহেলা না করে প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে চুল পড়া রোধে বিভিন্ন থেরাপি ও ওষুধ রয়েছে, তবে তার পাশাপাশি জীবনযাত্রার পরিবর্তনই সবচেয়ে কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
সবশেষে বলা যায়, সুস্থ চুলের জন্য কেবল দামি শ্যাম্পু বা তেলই যথেষ্ট নয়। শরীরের ভেতর থেকে সুস্থতা গড়ে তুলতে হবে। ধূমপান ত্যাগ করা সেই পথের একটি বড় পদক্ষেপ। কারণ ধূমপানের ক্ষতি শুধু চোখে দেখা যায় না, এটি নীরবে শরীরের প্রতিটি কোষে প্রভাব ফেলে। চুল পড়া তারই একটি দৃশ্যমান প্রতিফলন।
অতএব, যদি টাক পড়া বা অতিরিক্ত চুল ঝরে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ থাকে, তবে কেবল বংশগতিকে দায়ী করে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। নিজের জীবনযাত্রার দিকে তাকাতে হবে। ধূমপান কমানো বা সম্পূর্ণ ছেড়ে দেওয়া, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম এবং মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা— এই কয়েকটি সচেতন সিদ্ধান্তই দীর্ঘমেয়াদে চুল ও শরীর দুটোকেই সুস্থ রাখতে সাহায্য করবে।
সুন্দর ও ঘন চুলের স্বপ্ন তখনই বাস্তব হতে পারে, যখন আমরা ভেতর থেকে সুস্থ থাকার প্রতিশ্রুতি নিই। আর সেই প্রতিশ্রুতির প্রথম ধাপ হতে পারে— ধূমপানমুক্ত জীবন।