ভারতের সাম্প্রতিক ব্যর্থতার পর প্রাক্তন ক্রিকেটার তথা নির্বাচক প্রধান কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত তীব্র সমালোচনায় সরব হয়েছেন। ম্যাচ শেষে সরাসরি দল নির্বাচনের সিদ্ধান্ত, ব্যাটিং অর্ডার এবং খেলোয়াড়দের মনোভাব নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য নিতিশ রেড্ডি কি সত্যিই অলরাউন্ডার? অক্ষর প্যাটেল কেন খেলছে না? পন্ত কেন এমন সময়ে স্লগ করতে গেল? একই সঙ্গে তিনি কঠোর ভাষায় জানিয়েছেন, গম্ভীর কী বলছে তাতে আমার কিছু যায় আসে না। ভারতের এই পারফরম্যান্স লজ্জাজনক। শ্রীকান্তের মতে, দল নির্বাচনে অদূরদর্শিতা, ম্যাচ পরিস্থিতি না বোঝা এবং অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি নেওয়া ভারতের পরাজয়ের প্রধান কারণ। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের ভুল শট নির্বাচন তাঁকে ক্ষুব্ধ করেছে। তিনি মনে করেন, ম্যাচ পড়তে ব্যর্থতা এবং পরিকল্পনার অভাব ভারতকে ম্যাচ থেকে সরিয়ে দিয়েছে। অক্ষর প্যাটেলের মতো ফর্মে থাকা অলরাউন্ডারকে বাদ দেওয়া এবং ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী ফিল্ডিং বোলিং কৌশলের অভাবও তাঁর সমালোচনার মূল কেন্দ্র। শ্রীকান্ত সতর্ক করে বলেছেন, ভারত যদি দ্রুত নিজেদের ভুল না বোঝে, তাহলে বড় টুর্নামেন্টে এমন ব্যর্থতা আরও বাড়বে। তাঁর মতে, এখনই সময় বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়ার।
ভূমিকা:
ভারতীয় ক্রিকেট দল সাম্প্রতিক অতীতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় ক্রিকেট মহল এবং সমর্থকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছিল। এই পরিস্থিতিতে, সাবেক ক্রিকেটার এবং ভারতীয় দলের সাবেক নির্বাচক প্রধান কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত (Krishnamachari Srikkanth) সরাসরি আক্রমণের পথ বেছে নিলেন। তাঁর আক্রমণ ছিল বহু-মাত্রিক—নিশানা করেছেন খেলোয়াড় নির্বাচন, মাঠের কৌশলগত প্রয়োগ, সিনিয়র খেলোয়াড়দের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এবং টিম ম্যানেজমেন্টের অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তকে। শ্রীকান্তের বক্তব্য আর কেবল সমালোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা পরিণত হয়েছে এক বিস্ফোরক অভিযোগে, যেখানে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন—“ভারতের এই পারফরম্যান্স লজ্জাজনক। এইভাবে খেলে বড় মঞ্চে জেতা সম্ভব নয়।” এই বিশদ প্রতিবেদনে আমরা শ্রীকান্তের এই তীব্র সমালোচনার প্রতিটি দিক, তার পেছনের যুক্তি এবং ভারতীয় ক্রিকেটে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিশ্লেষণ করব।
শ্রীকান্ত, যিনি নিজের সময়ে ছিলেন একজন লড়াকু ওপেনার এবং পরবর্তীতে বিশ্বকাপজয়ী দলের নির্বাচক প্রধান, তাঁর কথায় ভারতীয় দলের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স তাঁকে হতাশ করেছে। তিনি মনে করেন, ভারতীয় দলের যে প্রতিভা ও দক্ষতা রয়েছে, তার তুলনায় মাঠে যে খেলাটা দেখা যাচ্ছে তা অনেক নিম্নমানের।
স্পষ্ট বার্তা: তাঁর মূল বার্তাটি ছিল আপসহীন—মাঠের পারফরম্যান্সের কোনো অজুহাত চলে না। তিনি মনে করেন, এই ধরনের গড়পড়তা পারফরম্যান্স কোনোভাবেই বিশ্বসেরা হওয়ার পথে সহায়ক নয়।
মানসিকতার প্রশ্ন: তিনি মূলত ভারতের খেলার মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বড় টুর্নামেন্ট বা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ভারতীয় দল কেন বারবার চাপের কাছে ভেঙে পড়ছে, কেন আগ্রাসী মনোভাবের অভাব দেখা যাচ্ছে—সেটাই তাঁর প্রধান জিজ্ঞাসা।
শ্রীকান্তের সমালোচনার প্রথম আঘাত আসে তরুণ ক্রিকেটার নিতিশ রেড্ডিকে কেন্দ্র করে। টিম ম্যানেজমেন্ট যেভাবে তাঁকে আন্তর্জাতিক স্তরে একজন পূর্ণাঙ্গ অলরাউন্ডারের ভূমিকায় খেলাচ্ছে, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
“নিতিশ রেড্ডি কি সত্যিই অলরাউন্ডার? আপনি তাকে কোন ভিত্তিতে এই ভূমিকায় খেলাচ্ছেন?”—শ্রীকান্তের এই প্রশ্ন নির্বাচকদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ।
শ্রীকান্তের যুক্তি ছিল পরিষ্কার:
অপরিণত ভূমিকা: নিতিশ রেড্ডি নিঃসন্দেহে প্রতিভাবান ক্রিকেটার, কিন্তু আন্তর্জাতিক স্তরে একজন ম্যাচ-জয়ী অলরাউন্ডারের যে পরিপক্বতা এবং ধারাবাহিকতা দরকার, তা এখনও তাঁর মধ্যে আসেনি।
কম্বিনেশনের ভুল: শ্রীকান্তের মতে, ডানহাতি-বাঁহাতি কম্বিনেশন বা দলের 'ব্যালেন্স' রক্ষার অজুহাতে একজন কাঁচা ক্রিকেটারকে তার স্বাভাবিক ভূমিকা থেকে সরিয়ে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
ক্রিকেট জ্ঞানের অভাব: তাঁর মতে, টিম ম্যানেজমেন্ট কাকে কোথায় খেলাবে তা বোঝার ন্যূনতম ক্রিকেট জ্ঞান থাকা উচিত। পরীক্ষানিরীক্ষা করতে গিয়ে দলের মূল শক্তি নষ্ট করা হচ্ছে।
শ্রীকান্তের দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে তীব্র আক্রমণ ছিল ফর্মে থাকা স্পিন অলরাউন্ডার অক্ষর প্যাটেলকে (Axar Patel) প্রথম একাদশ থেকে বাদ দেওয়া নিয়ে। এই সিদ্ধান্তকে তিনি 'অযৌক্তিক' বলে অভিহিত করেন।
“অক্ষর প্যাটেল দারুণ ফর্মে ছিল। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং—সব দিক থেকেই সে ম্যাচ-উইনার। তাকে না খেলানো সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।”
অক্ষরকে বাদ দেওয়ায় শ্রীকান্ত যে সমস্যাগুলি তুলে ধরেন:
ভারসাম্য নষ্ট: অক্ষরের মতো নির্ভরযোগ্য অলরাউন্ডার, যিনি ব্যাট হাতে লোয়ার অর্ডারে গুরুত্বপূর্ণ রান করতে পারেন এবং বল হাতে রানের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তাঁকে বাদ দেওয়ায় টিমের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়েছে।
ধারাবাহিকতার বার্তা: শ্রীকান্তের প্রশ্ন—ফর্মে থাকা খেলোয়াড়কে ড্রপ করে টিম ম্যানেজমেন্ট কী বার্তা দিচ্ছে? ক্রিকেটে ধারাবাহিকতার পুরস্কার দেওয়া উচিত, শাস্তি নয়।
আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত: তাঁর মতে, ভালো ফর্মে থাকা খেলোয়াড়কে বাদ দিয়ে দল নিজেরাই নিজেদের সমস্যায় ফেলেছে এবং জয়ের সুযোগ কমিয়েছে।
রিশভ পন্ত (Rishabh Pant) তাঁর সহজাত আক্রমণাত্মক খেলার জন্য পরিচিত হলেও, ম্যাচ পরিস্থিতি না বুঝে তাঁর স্লগ করার সিদ্ধান্ত শ্রীকান্তকে সবচেয়ে বেশি হতাশ করেছে।
“পন্ত কেন এমন সময়ে স্লগ করবে? ম্যাচ ওই সময় ভারতীয় দলের হাতে ছিল। ওর মাথায় কী চলছিল?”
বুদ্ধির অভাব: শ্রীকান্ত মনে করেন, পন্ত প্রতিভাবান হলেও তাঁর শট সিলেকশনে প্রচণ্ড সমস্যা আছে। কঠিন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ও বুদ্ধির অভাব বারবার দেখা যায়।
ফরম্যাট ও পরিস্থিতির জ্ঞান: তিনি মনে করিয়ে দেন যে স্লগিং সব সময় সমাধান নয়। টেস্ট, ওডিআই, টি২০—ফরম্যাট আলাদা, পরিস্থিতি আলাদা। একজন আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়ের উচিত পরিস্থিতি বুঝে খেলা।
দায়িত্বহীনতা: তাঁর মতে, এমন সময়ে একটি উইকেট ছুঁড়ে দেওয়া সম্পূর্ণ দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়। দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাঁর উইকেটে থাকা জরুরি ছিল।
যখন গৌতম গম্ভীর (Gautam Gambhir) ভারতীয় দলের এই পারফরম্যান্সকে সমর্থন করে বা কিছু ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেন, তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন শ্রীকান্ত। তাঁর এই মন্তব্য ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের অভ্যন্তরে সিনিয়র খেলোয়াড়দের মধ্যেও যে মতভেদ রয়েছে, তা স্পষ্ট করে।
“গম্ভীর কী বলছে তাতে আমার কিছু যায় আসে না। মাঠে যা হয়েছে, তা লজ্জাজনক। এটার কোনো অজুহাত নেই।”
এই মন্তব্যের মাধ্যমে শ্রীকান্ত বোঝাতে চেয়েছেন যে, ব্যর্থতাকে ঢাকার জন্য কৃত্রিম সাফাই বা অজুহাত দেওয়া উচিত নয়। বরং বাস্তবতা স্বীকার করে নিয়ে কঠোরভাবে ভুলগুলো সংশোধন করা জরুরি।
শ্রীকান্ত কেবল ব্যাটিং বা নির্বাচন নিয়েই ক্ষোভ প্রকাশ করেননি, ভারতের বোলিং কৌশল নিয়েও তিনি সমান তীব্র সমালোচনা করেন।
বোলিং কৌশলে ত্রুটি:
বোলাররা পিচের সাহায্য নিতে পারেনি।
বিভিন্ন ফেজে সঠিক ফিল্ড সেটিং ছিল না।
আক্রমণাত্মক মনোভাবের অভাব ছিল।
বোলিংয়ের পরিকল্পনা পুরো ম্যাচেই অনুপস্থিত ছিল।
দল নির্বাচনে বিশৃঙ্খলা:
শ্রীকান্ত মনে করেন এই ব্যর্থতার মূল দায়িত্ব টিম ম্যানেজমেন্ট এবং নির্বাচক কমিটির।
ফর্মে থাকা খেলোয়াড়কে বাদ দেওয়া।
অভিজ্ঞতার বদলে পরীক্ষানিরীক্ষা—যা ম্যাচের চাপ সামলাতে ব্যর্থ।
অলরাউন্ডারের ভূমিকা ভুলভাবে নির্ধারণ করা এবং ব্যাটিং অর্ডারে ধারাবাহিকতার অভাব।
শ্রীকান্তের মতে, ভারতের খেলার মধ্যে এখন জেতার সেই তীব্র ক্ষুধা বা 'আগুন' আর দেখা যাচ্ছে না, যা অতীতে ভারতকে বড় ম্যাচ জিততে সাহায্য করত।
“মাঠে নেমে যে আগ্রাসনটা দরকার, সেটা কোথায়? খেলোয়াড়রা যেন খুব বেশি চাপমুক্ত। ক্রিকেটে একটু আগুন থাকা দরকার।”
তাঁর বক্তব্যে এই ইঙ্গিত মেলে যে ভারত বারবার বড় ম্যাচে মানসিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে এবং নিজেদের সেরা পারফরম্যান্স দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাঁর মতে, খেলোয়াড়রা যেন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি চাপমুক্ত থাকার চেষ্টা করছে, যা তাদের আগ্রাসনকে কমিয়ে দিচ্ছে।
শ্রীকান্ত স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, এই ভুলগুলি শুধরানো না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।
“ভারত যদি এখনই ভুল বুঝে সংশোধন না করে, বড় টুর্নামেন্টে আরও বাজে পরিস্থিতি তৈরি হবে।”
তাঁর মতে, এই ব্যর্থতা শুধুমাত্র একটি ম্যাচের সমস্যা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও পরিকল্পনার ব্যর্থতা। দল নির্বাচনের মূল দর্শন এবং টিম ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে সামগ্রিক পর্যালোচনার সময় এসেছে।
উপসংহার:
ভারতীয় ক্রিকেট দলকে নিয়ে কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্তের এই বিস্ফোরক সমালোচনা আসলে ক্রিকেটপ্রেমীদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভেরই প্রতিফলন। তাঁর মতে, সঠিক দল নির্বাচন, ম্যাচ পরিস্থিতি বোঝা, সঠিক কৌশল প্রয়োগ এবং খেলোয়াড়দের দায়িত্ববান আচরণ—এই চারটি বিষয়ে দ্রুত পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। শ্রীকান্তের মন্তব্য টিম ইন্ডিয়াকে এক কঠোর বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, টিম ম্যানেজমেন্ট এবং নির্বাচকরা কি এই তীব্র সমালোচনা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের পুনর্গঠন করতে পারে, নাকি একই ভুল চলতে থাকবে এবং বড় টুর্নামেন্টে ভারতীয় ক্রিকেটের বিপদ আরও বাড়বে।