ভারতের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দলে জায়গা হয়নি শুভমন গিলের। তবে জাতীয় দলের বাইরে থাকলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে দূরে যাচ্ছেন না তিনি। আগামী মাসে নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারতের এক দিনের সিরিজ়ে খেলতে নামবেন শুভমন। তার আগে নিজের ফর্ম ও প্রস্তুতিকে আরও শান দিতে ঘরোয়া ক্রিকেটেই মন দিয়েছেন এই তরুণ ব্যাটার।
রোহিত শর্মা ও বিরাট কোহলির দেখানো পথেই ধীরে ধীরে নিজের ক্রিকেটজীবনের রূপরেখা গড়ে তুলছেন শুভমন গিল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করার লক্ষ্যে ফের একবার ঘরোয়া ক্রিকেটকে হাতিয়ার করতে চলেছেন এই প্রতিভাবান তরুণ ব্যাটার। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দল থেকে বাদ পড়েছেন শুভমন, যা ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই ক্রিকেট মহলে তৈরি হয়েছে বিস্তর আলোচনা ও বিতর্ক। তবে এই বাদ পড়া যে তাঁর কেরিয়ারের বড় ধাক্কা নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি নতুন প্রস্তুতির অধ্যায়—সেই ইঙ্গিতই মিলছে তাঁর পরবর্তী সূচি ও নির্বাচনী সিদ্ধান্তে।
ভারতীয় ক্রিকেটে রোহিত শর্মা ও বিরাট কোহলি দীর্ঘদিন ধরেই উদাহরণ তৈরি করেছেন—জাতীয় দলে জায়গা হারালেও ঘরোয়া ক্রিকেটে ফিরে গিয়ে নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করার। সেই একই পথে হাঁটছেন শুভমন গিল। বিশ্বকাপের দলে সুযোগ না পেলেও নিজের ছন্দ ও আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে তিনি মনোযোগ দিচ্ছেন ঘরোয়া ক্রিকেটে। পঞ্জাবের হয়ে বিজয় হজারে ট্রফিতে খেলার সিদ্ধান্ত সেই মনোভাবেরই প্রতিফলন। এই টুর্নামেন্টে ভালো পারফরম্যান্সই যে ফের জাতীয় দলে ফেরার রাস্তা প্রশস্ত করতে পারে, তা ভালোভাবেই জানেন শুভমন।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দলে বাদ পড়ার পর অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, শুভমনের ফর্ম ও সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স আদৌ নির্বাচকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে কি না। যদিও পরিসংখ্যান বলছে, একদিনের ক্রিকেটে তিনি এখনও ভারতের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ওপেনার। তবে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে নিজেকে আরও মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা যে রয়েছে, তা স্বীকার করছেন খোদ শুভমনও। আর সেই ঘাটতি পূরণের জন্যই ঘরোয়া মঞ্চকে বেছে নেওয়া—যেখানে চাপ তুলনামূলক কম, কিন্তু শেখার সুযোগ অনেক বেশি।
ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড এবং নির্বাচকরাও শুভমনকে ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবেই দেখছেন। বিশ্বকাপের দলে না থাকলেও আসন্ন নিউ জিল্যান্ডের বিরুদ্ধে এক দিনের সিরিজে তাঁর নাম রয়েছে, যা স্পষ্ট করে দেয় যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় শুভমন এখনও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অর্থাৎ, বিশ্বকাপের দল থেকে বাদ পড়া মানেই দৌড় শেষ হয়ে যাওয়া নয়; বরং এটি একটি সাময়িক বিরতি, যেখানে নিজের খেলার কিছু দিক ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ঘরোয়া ক্রিকেটে ফিরে গিয়ে নিজের ব্যাটিং টেকনিক, স্ট্রাইক রেট এবং মানসিক দৃঢ়তা আরও উন্নত করতে চান শুভমন। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে দ্রুত রান করার সক্ষমতা এবং চাপের মুহূর্তে ম্যাচ শেষ করার দক্ষতা—এই বিষয়গুলিতেই বেশি জোর দিচ্ছেন তিনি। বিজয় হজারে ভালো পারফরম্যান্স মানেই শুধু রান করা নয়, বরং দায়িত্বশীল ইনিংস খেলে দলকে জেতানো—এই বার্তাটাই দিতে চান তিনি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, শুভমন গিলের এই পর্বটি তাঁর কেরিয়ারের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। রোহিত শর্মা ও বিরাট কোহলির মতো অভিজ্ঞদের দেখানো পথ অনুসরণ করে ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার এই প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে তাঁকে আরও পরিণত ও পরিশীলিত ব্যাটার হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। ভারতীয় ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ যে এখনও অনেকাংশে শুভমনের কাঁধেই ভরসা রাখছে, তা তাঁর প্রতি নির্বাচক ও টিম ম্যানেজমেন্টের আস্থাতেই স্পষ্ট। এখন দেখার, ঘরোয়া ক্রিকেটে তাঁর পারফরম্যান্স তাঁকে কত দ্রুত ফের আন্তর্জাতিক মঞ্চের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে পারে।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দল ঘোষণার পরই জানা যায়, আগামী মাসে নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারতের এক দিনের সিরিজ়ে খেলবেন শুভমন গিল। শুধু তাই নয়, সেই সিরিজ়ে তাঁকেই অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, ছোট ফরম্যাটে আপাতত কিছুটা পিছিয়ে পড়লেও এক দিনের ক্রিকেটে বোর্ডের আস্থা এখনও অটুট রয়েছে শুভমনের উপর। তবে নিউ জ়িল্যান্ড সিরিজ়ের আগে নিজের ফর্ম ও ছন্দ ফিরে পেতে ঘরোয়া ক্রিকেটেই মন দিয়েছেন তিনি।
সেই লক্ষ্যেই পঞ্জাবের হয়ে বিজয় হজারে ট্রফিতে নাম লেখাচ্ছেন শুভমন। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক দিনের ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁর কাছে শুধু ম্যাচ খেলার সুযোগ নয়, বরং নিজেকে আবার নতুন করে প্রমাণ করার এক বড় মঞ্চ। শুভমনের সঙ্গে পঞ্জাব দলে রয়েছেন ভারতীয় দলের আরও দুই ক্রিকেটার—অভিষেক শর্মা ও অর্শদীপ সিংহ। তিন জনই বর্তমানে জাতীয় দলের নিয়মিত মুখ এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পঞ্জাবের বিজয় হজারে ট্রফির দল এবার যথেষ্ট শক্তিশালী। শুভমন, অভিষেক ও অর্শদীপের পাশাপাশি দলে রয়েছেন প্রভসিমরন সিংহ, নমন ধির, অনমোলপ্রীত সিংহ, রমনদীপ সিংহ ও হরপ্রীত ব্রারের মতো অভিজ্ঞ ও প্রতিভাবান ক্রিকেটাররা। ব্যাটিং ও বোলিং—দুই বিভাগেই ভারসাম্য রেখে দল গঠন করেছে পঞ্জাব ক্রিকেট সংস্থা। ফলে এ বারের প্রতিযোগিতায় তাদের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে ধরা হচ্ছে।
২৪ ডিসেম্বর মহারাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে বিজয় হজারে অভিযান শুরু করবে পঞ্জাব। গ্রুপ পর্বে তারা মোট সাতটি ম্যাচ খেলবে জয়পুরে। মহারাষ্ট্র ছাড়াও ছত্তীসগড়, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ, সিকিম, গোয়া ও মুম্বইয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে শুভমনদের। গ্রুপ পর্ব শেষ হবে ৮ জানুয়ারি। তার ঠিক তিন দিন পর, অর্থাৎ ১১ জানুয়ারি থেকেই শুরু ভারতের নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে এক দিনের সিরিজ়।
এই সূচির কারণেই একটা বড় প্রশ্ন উঠছে—পঞ্জাবের হয়ে শুভমন, অভিষেক ও অর্শদীপ আসলে কয়টি ম্যাচ খেলতে পারবেন? কারণ এক দিনের সিরিজ়ের প্রস্তুতির জন্য তাঁদের আগেভাগেই জাতীয় দলে যোগ দিতে হতে পারে। বিশেষ করে শুভমন যেহেতু এক দিনের দলের অধিনায়ক, তাই তাঁর উপস্থিতি আরও বেশি জরুরি। ক্রিকেট মহলের ইঙ্গিত অনুযায়ী, পঞ্জাবের হয়ে হয়তো সব ম্যাচ নয়, তবে টুর্নামেন্টের শুরুর দিকের কয়েকটি ম্যাচে শুভমনকে দেখা যেতে পারে।
নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে এক দিনের সিরিজ়ের পরই রয়েছে পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ়। সেই সিরিজ়ে শুভমন নেই, তবে অভিষেক শর্মা ও অর্শদীপ সিংহকে দেখা যাবে। এরপর ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। অর্থাৎ, নিউ জ়িল্যান্ড সিরিজ়ই বিশ্বকাপের আগে ভারতের শেষ বড় প্রস্তুতির মঞ্চ। সেই কারণেই এই সিরিজ়কে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড।
এই পরিস্থিতিতে ঘরোয়া ক্রিকেটে ফেরার সিদ্ধান্ত শুভমনের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে—২০২৭ সালের এক দিনের বিশ্বকাপের দলে জায়গা পাকা করতে হলে ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত অংশ নিতে হবে। সেই নির্দেশ মেনেই এ বার মুম্বইয়ের হয়ে বিজয় হজারে খেলবেন রোহিত শর্মা এবং দিল্লির হয়ে মাঠে নামবেন বিরাট কোহলি। দীর্ঘদিন পর দেশের দুই সিনিয়র তারকাকে ঘরোয়া এক দিনের প্রতিযোগিতায় দেখা যাবে, যা নিঃসন্দেহে ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য বড় বার্তা।
শুধু রোহিত ও কোহলি নন, বিজয় হজারে ট্রফিতে দেখা যাবে ঋষভ পন্থকেও। দীর্ঘ চোট কাটিয়ে ফেরার পর নিজের ফর্ম ও আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতেই ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলছেন তিনি। এই সিনিয়র ও অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের পথেই হাঁটছেন শুভমন গিল। আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাময়িক ধাক্কা এলেও, নিজের ঘাটতি শুধরে নিতে তিনি ঘরোয়া ক্রিকেটকেই বেছে নিয়েছেন।
এশিয়া কাপের আগে ভারতের টি-টোয়েন্টি দলের সহ-অধিনায়ক করা হয়েছিল শুভমনকে। সেই সময় বোর্ডের তরফে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছিল—ছোট ফরম্যাটেও তাঁকে ভবিষ্যতের নেতা হিসেবে ভাবা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে শুভমনের ব্যাট থেকে প্রত্যাশিত রান আসেনি। একাধিক ম্যাচে শুরু পেলেও বড় ইনিংসে রূপ দিতে ব্যর্থ হন তিনি। তার উপর লখনউয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে চতুর্থ টি-টোয়েন্টি ম্যাচের আগে পায়ে চোট পান শুভমন। সেই চোটের কারণে শেষ ম্যাচে মাঠে নামতে পারেননি তিনি।
এই সবকিছুর ফল হিসেবেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দল ঘোষণার সময় দেখা যায়, শুভমন গিলের নাম নেই। যদিও বোর্ডের তরফে জানানো হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে দলের ভারসাম্য বজায় রাখার কথা ভেবেই। নির্বাচকদের মতে, বর্তমান টি-টোয়েন্টি দলে এমন কিছু ক্রিকেটারের প্রয়োজন ছিল, যারা নিচের দিকে দ্রুত রান তুলতে পারেন এবং নির্দিষ্ট ভূমিকায় আরও কার্যকর। সেই যুক্তিতেই শুভমনের বদলে দলে সুযোগ পেয়েছেন রিঙ্কু সিংহ। দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ়ে ব্রাত্য থাকা রিঙ্কু তাঁর ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের সুবাদে ফের জাতীয় দলে ফিরেছেন। পাশাপাশি সুযোগ পেয়েছেন ঈশান কিশনও।
তবে শুভমনের ক্ষেত্রে এই বাদ পড়া শেষ কথা নয়। বরং অনেকের মতে, এই বিরতি তাঁকে আরও পরিণত করে তুলবে। এক দিনের ক্রিকেটে অধিনায়কত্বের দায়িত্ব, ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত ম্যাচ খেলা এবং নিজের ফর্মে ফিরে আসা—এই তিনটি বিষয় মিলিয়ে শুভমন আবারও নিজেকে নতুন করে মেলে ধরার সুযোগ পাবেন।
রোহিত শর্মা ও বিরাট কোহলির কেরিয়ারের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাঁরাও একাধিকবার আন্তর্জাতিক দলে জায়গা হারিয়েছেন বা সমালোচনার মুখে পড়েছেন। কিন্তু প্রতিবারই ঘরোয়া ক্রিকেটে ফিরে গিয়ে নিজেদের শক্তি বাড়িয়েছেন, টেকনিক শানিয়েছেন এবং আরও শক্তিশালী হয়ে জাতীয় দলে ফিরেছেন। শুভমন গিলও সেই পথেই হাঁটছেন। বয়স তাঁর পক্ষে, প্রতিভা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। এখন প্রয়োজন শুধু ধারাবাহিকতা ও মানসিক দৃঢ়তা।
বিজয় হজারে ট্রফিতে শুভমনের পারফরম্যান্সের দিকেই এখন নজর থাকবে ক্রিকেটপ্রেমীদের। এই প্রতিযোগিতায় ভালো ছন্দে থাকলে এক দিনের সিরিজ়ে তার প্রভাব পড়বে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আর সেখান থেকে আবার টি-টোয়েন্টি দলে ফেরার দরজাও খুলে যেতে পারে ভবিষ্যতে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দল থেকে বাদ পড়া শুভমনের কেরিয়ারে বড় ধাক্কা হলেও, তা তাঁর যাত্রার শেষ নয়। বরং ঘরোয়া ক্রিকেটকে ভিত্তি করে আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হতে চলেছে। রোহিত–কোহলির পথে হাঁটতে গিয়ে শুভমন গিল যে আরও পরিণত, আরও দায়িত্বশীল এক ক্রিকেটার হয়ে উঠবেন, সে আশাই করছে ভারতীয় ক্রিকেট মহল।