Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

জয়ের লড়াইয়ের মাঝেই সতর্ক ইংল্যান্ড অধিনায়ক, অ্যাশেজে খেলোয়াড়দের সুস্থতা নিয়ে ভাবনায় স্টোকস

অ্যাশেজ ২০২৫-২৬ সিরিজ়কে সামনে রেখে ইংল্যান্ড অধিনায়ক বেন স্টোকস দলের খেলোয়াড়দের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। দীর্ঘ সফর, টানা ম্যাচ, চোটের ঝুঁকি এবং অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপ এই সব মিলিয়ে ক্রিকেটারদের ওপর যে মানসিক ও শারীরিক ধকল তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে তিনি স্পষ্টভাবে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। স্টোকসের মতে, শুধুমাত্র জয় বা সিরিজ়ের ফলের দিকেই নজর দিলে চলবে না; খেলোয়াড়রা যাতে মানসিকভাবে স্থিতিশীল ও শারীরিকভাবে সুস্থ থাকে, সেটাই দলের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের চাবিকাঠি। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অ্যাশেজ বরাবরই কঠিন পরীক্ষা। সেখানে পরিবেশ, দর্শকের চাপ এবং মিডিয়ার নজর ক্রিকেটারদের উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। এই পরিস্থিতিতে খেলোয়াড়দের বিশ্রাম, সঠিক ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট এবং মানসিক সহায়তা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন স্টোকস। তিনি জানিয়েছেন, প্রয়োজনে দল নির্বাচনে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেও প্রস্তুত টিম ম্যানেজমেন্ট, যাতে কোনও খেলোয়াড় অতিরিক্ত চাপের শিকার না হন। বেন স্টোকসের এই অবস্থান আধুনিক ক্রিকেটে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে সাফল্যের জন্য শুধু দক্ষতা নয়, খেলোয়াড়দের সুস্থতাই সবচেয়ে বড় সম্পদ।

 

অ্যাশেজ ২০২৫–২৬: খেলোয়াড়দের সুস্থতাকে অগ্রাধিকার, মানবিক নেতৃত্বে নতুন দৃষ্টান্ত গড়ছেন বেন স্টোকস

স্পোর্টস ডেস্ক | লন্ডন ও মেলবোর্ন

অ্যাশেজ—ক্রিকেট বিশ্বের এমন এক নাম যা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে শতাব্দীপ্রাচীন এক আভিজাত্য, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার সম্মানের লড়াই। ১৮৮২ সাল থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ আজও তার জৌলুস হারায়নি। বরং সময়ের সাথে সাথে এর উত্তাপ বেড়েছে। কিন্তু ২০২৫–২৬ মৌসুমের অ্যাশেজ সিরিজ শুরুর আগেই মাঠের লড়াই ছাপিয়ে এক নতুন আলোচনা জন্ম দিয়েছেন ইংল্যান্ডের টেস্ট অধিনায়ক বেন স্টোকস। তাঁর এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রান বা উইকেট নয়, বরং আধুনিক ক্রিকেটের সবচেয়ে উপেক্ষিত বিষয়—‘ক্রিকেটারদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা’

স্টোকস স্পষ্ট করে দিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ছাইদানির লড়াইয়ে জয় নিশ্চিত করা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি জরুরি তাঁর দলের প্রতিটি সদস্যের সুস্থ শরীর ও সুস্থ মন। মানবিক নেতৃত্বের এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করে তিনি বুঝিয়ে দিচ্ছেন, আধুনিক ক্রিকেটের গ্ল্যাডিয়েটররা রোবট নন, তাঁরাও মানুষ।


১. আধুনিক ক্রিকেটের মরণফাঁদ: অলিখিত ক্লান্তির দীর্ঘশ্বাস

বর্তমান যুগে একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের ক্যালেন্ডারের দিকে তাকালে আতঙ্কিত হতে হয়। দ্বিপাক্ষিক সিরিজ, আইসিসি ইভেন্ট, এবং তার সাথে বিশ্বের আনাচে-কানাচে গজিয়ে ওঠা ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ—সব মিলিয়ে বিশ্রামের ছিটেফোঁটাও নেই।

  • তিন ফরম্যাটের চাপ: এখনকার ক্রিকেটারদের একই সঙ্গে লাল বল, সাদা বল এবং পিংক বলের ক্রিকেটে মানিয়ে নিতে হয়।

  • আইপিএল ও গ্লোবাল লিগ: আইপিএল-এর মতো টুর্নামেন্টগুলোতে শারীরিক নিংড়ানো পারফরম্যান্সের পর দেশের হয়ে টেস্ট খেলা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।

  • বায়ো-বাবল পরবর্তী প্রভাব: করোনাকালের বায়ো-বাবল বা জৈব সুরক্ষা বলয় অনেক ক্রিকেটারের মানসিক স্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করেছে।

বেন স্টোকস নিজে এই চাপের ভুক্তভোগী। তিনি জানেন, টানা খেলার ফলে একজন ক্রিকেটারের স্নায়বিক চাপ কোন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। তাই ২০২৫–২৬ অ্যাশেজে তিনি কোনো তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিতে নারাজ। তাঁর মতে, অতিরিক্ত চাপের ফলে শুধু ইনজুরি নয়, ‘বার্ন-আউট’ বা মানসিক অবসাদ একজন খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ার অকালে শেষ করে দিতে পারে।


২. অস্ট্রেলিয়ার কঠিন কন্ডিশন: এক অগ্নিপরীক্ষা

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অ্যাশেজ জেতা যেকোনো বিদেশি দলের জন্য হিমালয় জয়ের সমান। কেন এই সফর ক্রিকেটারদের জন্য এত কঠিন?

  • ভৌগোলিক ও আবহাওয়া চ্যালেঞ্জ: পার্থের অসহ্য গরম থেকে শুরু করে মেলবোর্নের অনিশ্চিত আবহাওয়া—সবই শারীরিক ধকল বাড়ায়।

  • পিচের আচরণ: অস্ট্রেলিয়ার পিচে বাড়তি গতি এবং বাউন্স থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে ফিল্ডিং করা বা দ্রুতগতির বোলারদের সামলানো শরীরের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে।

  • অজি দর্শকদের স্লেজিং: অস্ট্রেলিয়ার গ্যালারি প্রতিপক্ষের জন্য নরক সমান। মানসিকভাবে অত্যন্ত শক্ত না হলে সেখানে টিকে থাকা অসম্ভব।

স্টোকস তাঁর সতীর্থদের আশ্বস্ত করেছেন যে, এই প্রতিকূল পরিবেশে কেউ যদি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন বা শারীরিক অস্বস্তি বোধ করেন, তবে তাকে জোর করে মাঠে নামানো হবে না।


৩. ‘ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট’: বিজ্ঞানের সাথে মানবিকতার সমন্বয়

বেন স্টোকসের নেতৃত্বে ইংল্যান্ড দল এখন ডেটা সায়েন্স এবং মানবিক বোধকে এক সুতোয় গেঁথেছে। বিশেষ করে পেস বোলারদের ক্ষেত্রে ‘রোটেশন পলিসি’ বা আবর্তন নীতি কঠোরভাবে অনুসরণের কথা ভাবা হচ্ছে।

জেেমস অ্যান্ডারসন বা স্টুয়ার্ট ব্রড পরবর্তী যুগে ইংল্যান্ডের বর্তমান পেস আক্রমণ অনেকটা তরুণদের ওপর নির্ভরশীল। মার্ক উড বা জফ্রা আর্চারের মতো গতিদানবদের ইনজুরি প্রবণতা মাথায় রেখে স্টোকস জানিয়েছেন, "আমরা পাঁচ টেস্টের সিরিজে একই বোলিং আক্রমণ ধরে রাখার চেয়ে সুস্থ ও সতেজ বোলারদের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খেলাতে বেশি আগ্রহী।" এটি হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে দল নির্বাচনে বিতর্ক তৈরি করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি ইংল্যান্ডের শক্তি বাড়াবে।

news image
আরও খবর

৪. ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা: স্টোকসের বিবর্তন

বেন স্টোকস আজ যা বলছেন, তা তাঁর জীবনবোধ থেকে আসা। ২০২১ সালে তিনি নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের কারণে ক্রিকেট থেকে অনির্দিষ্টকালের বিরতি নিয়েছিলেন। সেই সময় তিনি খোলাখুলি বলেছিলেন যে, ক্রিকেটই সবকিছু নয়। এই উপলব্ধি তাঁকে একজন একনায়ক অধিনায়কের বদলে একজন ‘সহমর্মী নেতা’ হিসেবে গড়ে তুলেছে।

ড্রেসিংরুমে স্টোকস এখন শুধু ‘ক্যাপ্টেন’ নন, তিনি একজন বড় ভাই বা মেন্টর। তিনি হ্যারি ব্রুক বা জ্যাক ক্রলির মতো তরুণদের ব্যক্তিগত সমস্যার কথা শোনেন। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন খেলোয়াড় যখন জানেন যে তাঁর দলনেতা তাঁকে বিপদে আগলে রাখবেন, তখন তিনি মাঠে নিজের ২০০ শতাংশ দিতে দ্বিধা করেন না।


৫. ‘বাজবল’ ও মানবিকতার ভারসাম্য

ব্রেন্ডন ম্যাককুলাম এবং বেন স্টোকসের জুটিতে ইংল্যান্ড খেলছে ‘বাজবল’ ক্রিকেট—যেখানে ভয়ডরহীন ব্যাটিংই মূল কথা। তবে এই আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলার জন্য প্রয়োজন অদম্য মানসিক সাহস।

"যদি মন ভারাক্রান্ত থাকে, তবে ব্যাটে তেজ আসে না।"—স্টোকসের এই দর্শনই এখন ইংল্যান্ডের মূল মন্ত্র।

স্টোকস চান তাঁর খেলোয়াড়রা যেন অ্যাশেজকে একটি যুদ্ধ হিসেবে না দেখে একটি 'উৎসব' হিসেবে দেখে। তিনি চান গ্যালারির চাপ যেন তাঁর খেলোয়াড়দের গ্রাস করতে না পারে। এই মানসিক মুক্তিই বাজবল ক্রিকেটের সাফল্যের চাবিকাঠি।


৬. নেতৃত্বের নতুন সংজ্ঞা এবং সমালোচনার ঝুঁকি

ক্রিকেট ইতিহাসে বড় বড় অধিনায়করা অনেক সময় জয়ের নেশায় খেলোয়াড়দের সুস্থতাকে তুচ্ছ জ্ঞান করেছেন। কিন্তু স্টোকস এখানে ব্যতিক্রম। তিনি জানেন, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে কোনো তারকা খেলোয়াড়কে বিশ্রাম দিলে সমালোচনার ঝড় উঠবে। মিডিয়া এবং সাবেক ক্রিকেটাররা হয়তো বলবেন, "অ্যাশেজের মতো ম্যাচে কেন সেরা একাদশ নেই?"

স্টোকস এই প্রশ্নের উত্তর তৈরি করে রেখেছেন। তাঁর কাছে ট্রফির চেয়েও তাঁর ‘পরিবার’ (দল) বড়। তিনি হারতে রাজি আছেন, কিন্তু কোনো খেলোয়াড়ের স্থায়ী শারীরিক ক্ষতি করতে রাজি নন। এটি নেতৃত্বের এক পরম সাহসিকতা।


৭. ক্রিকেট বিশ্বের জন্য একটি বার্তা

স্টোকসের এই পদক্ষেপ ক্রিকেট বিশ্বের বড় দেশগুলোর জন্য এক বিশেষ বার্তা। ভারত, পাকিস্তান বা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলোও এখন ওয়ার্কলোড নিয়ে সমস্যায় জর্জরিত। স্টোকস দেখিয়ে দিচ্ছেন যে, সাফল্যের পেছনে অন্ধভাবে না ছুটে সিস্টেমকে মানবিক করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্টোকসের এই ‘হিউম্যানিস্টিক অ্যাপ্রোচ’ বা মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি যদি অ্যাশেজে সফল হয়, তবে তা বিশ্ব ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ ক্যালেন্ডার পুনর্নির্ধারণে সাহায্য করবে। এটি বোর্ডগুলোকে মনে করিয়ে দেবে যে, খেলোয়াড়রা পণ্য নন।


৮. ২০২৫–২৬ অ্যাশেজ: কী অপেক্ষা করছে?

অস্ট্রেলিয়া দল বরাবরই আগ্রাসী। প্যাট কামিন্সের দল নিশ্চয়ই স্টোকসের এই মানবিক অবস্থানকে দুর্বলতা হিসেবে দেখবে না। মাঠের লড়াই হবে শেয়ানে শেয়ানে। তবে ইংল্যান্ডের তফাৎটা হবে তাদের মনস্তত্ত্বে। তারা মাঠে নামবে কোনো বোঝা ছাড়াই।

ভবিষ্যতের অ্যাশেজ হয়তো রেকর্ডের পাতায় লেখা থাকবে কে কত রান করলো বা কে কয়টি উইকেট পেল। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় ২০২৫–২৬ অ্যাশেজ স্মরণীয় হয়ে থাকবে বেন স্টোকসের এক নতুন বিপ্লবের জন্য—যেখানে ক্রিকেটকে মানুষের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়নি।


উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, বেন স্টোকস এক নতুন আধুনিক ক্রিকেটের মশাল বাহক। অ্যাশেজ ২০২৫–২৬ হবে এমন এক মঞ্চ যেখানে লড়াই হবে পেশাদারিত্ব বনাম মানবিকতার মেলবন্ধনের। স্টোকস আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, গ্লাভস আর হেলমেটের ভেতরে যে মানুষটি আছেন, তার হৃদস্পন্দন অনুভব করাটাই নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা।

জয় বা পরাজয় সময়ের হাতে, কিন্তু স্টোকস যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন, তা ক্রিকেটকে আরও দীর্ঘস্থায়ী এবং সুন্দর করে তুলবে। অ্যাশেজ আসবে, অ্যাশেজ যাবে—কিন্তু খেলোয়াড়দের সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এই সংস্কৃতি থেকে যাবে এক অনন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে।

বেন স্টোকসের উদ্বেগ কোনও দুর্বলতার প্রকাশ নয়, বরং একজন পরিণত নেতার পরিচয়। অ্যাশেজের মতো ঐতিহ্যবাহী সিরিজে দাঁড়িয়ে তিনি মনে করিয়ে দিচ্ছেন—ক্রিকেট মানুষের জন্য, মানুষ ক্রিকেটের জন্য নয়। জয় আসবে বা যাবে, ট্রফি উঠবে বা নামবে, কিন্তু খেলোয়াড়দের সুস্থতা নিশ্চিত করা গেলে তবেই ক্রিকেট সত্যিকারের সাফল্যের পথে এগোবে।

অ্যাশেজ ২০২৫–২৬ তাই শুধু ব্যাট-বলের লড়াই নয়, বরং নেতৃত্ব, মানবিকতা এবং আধুনিক ক্রিকেট দর্শনের এক বড় পরীক্ষা।

Preview image