Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

১২৩টি চার আর ৮৮টি ছক্কায় টি২০ বিশ্বকাপে ভয়ঙ্কর এই ব্যাটার বোলারদের দুঃস্বপ্ন

আইসিসি মেন্স টি২০ বিশ্বকাপ ২০২৬ শুরুর আগেই ভারতীয় দলের এই ব্যাটসম্যানকে ঘিরে তৈরি হয়েছে তুমুল আলোচনার ঝড়।

আইসিসি মেন্স টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬ শুরু হতে আর হাতে গোনা কয়েক দিন বাকি। ক্রিকেটবিশ্ব এখন উত্তেজনায় ফুটছে। কোন দল কতটা প্রস্তুত, কারা হবেন ম্যাচ উইনার, কোন ক্রিকেটার বদলে দিতে পারেন পুরো টুর্নামেন্টের গতিপথ এই সব প্রশ্ন ঘিরেই আলোচনা তুঙ্গে। ঠিক এই আবহেই ভারতীয় শিবিরে এক ব্যাটসম্যানকে নিয়ে তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বেশি কৌতূহল, প্রত্যাশা এবং ভয়। তিনি এমন একজন ক্রিকেটার, যাঁর ব্যাটিংয়ের সামনে দাঁড়াতে গিয়ে প্রতিপক্ষ দলের বোলাররা মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়ছেন। পেসার হোক বা স্পিনার, নতুন বল হোক কিংবা মাঝের ওভার খেলার প্রতিটি পর্যায়েই তাঁকে সামলানো ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।

এই ভয়ঙ্কর ব্যাটসম্যান আর কেউ নন, ভারতের বাঁহাতি বিস্ফোরক ওপেনার অভিষেক শর্মা। আধুনিক টি টোয়েন্টি ক্রিকেটে যে ধরনের ব্যাটসম্যানদের প্রয়োজন, অভিষেক ঠিক সেই ছাঁচেই তৈরি। আগ্রাসী মানসিকতা, নিখুঁত টাইমিং, বিশাল শট খেলার ক্ষমতা এবং পরিস্থিতি বুঝে ঝাঁপিয়ে পড়ার সাহস সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন ভারতের ব্যাটিং শক্তির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।

অভিষেক শর্মার ক্রিকেট যাত্রা একদিনে তৈরি হয়নি। পাঞ্জাবের মাটি থেকেই তাঁর ক্রিকেট জীবনের শুরু। ছোটবেলা থেকেই ব্যাট হাতে আগ্রাসী মানসিকতা ছিল তাঁর স্বভাবজাত। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে নিয়মিত ভালো পারফরম্যান্স তাঁকে দ্রুত নজরে এনে দেয়। কিন্তু যেটা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে, তা হল তাঁর মানসিক দৃঢ়তা এবং বড় মঞ্চে ভয় না পাওয়ার মানসিকতা। এই মানসিক গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছেন প্রাক্তন বিশ্বকাপজয়ী অলরাউন্ডার যুবরাজ সিং। যুবরাজের কাছে প্রশিক্ষণ নেওয়া অভিষেক শিখেছেন কীভাবে চাপের মুহূর্তে নিজেকে মুক্ত রাখা যায় এবং কীভাবে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলা যায়।

অভিষেকের ব্যাটিং দর্শন অত্যন্ত পরিষ্কার। তিনি প্রথম বল থেকেই আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে খেলতে ভালোবাসেন। তাঁর কাছে সময় নষ্ট করার কোনও জায়গা নেই। পাওয়ারপ্লে ওভারেই ম্যাচের রাশ নিজের হাতে তুলে নেওয়াই তাঁর লক্ষ্য। আধুনিক টি টোয়েন্টি ক্রিকেটে এই মানসিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ম্যাচের প্রথম ছয় ওভারেই অনেকটা নির্ধারিত হয়ে যায় কোন দল এগিয়ে থাকবে।

টি টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক শর্মার স্ট্রাইক রেট কার্যত অবিশ্বাস্য। এখন পর্যন্ত তাঁর ওভারঅল স্ট্রাইক রেট প্রায় ১৯৫। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় কেন তিনি বোলারদের কাছে আতঙ্কের নাম। পাওয়ারপ্লেতে তাঁর স্ট্রাইক রেট প্রায় ১৯০, যার অর্থ নতুন বল হাতে থাকা সেরা বোলারদেরও তিনি কোনও ছাড় দেন না। ইন সুইং হোক বা আউট সুইং, শর্ট বল হোক বা ইয়র্কার—সব কিছুরই জবাব দিতে প্রস্তুত অভিষেক।

দ্রুতগতির বোলারদের বিরুদ্ধেও অভিষেক সমান ভয়ঙ্কর। পেস বোলারদের বিপক্ষে তাঁর স্ট্রাইক রেট প্রায় ১৮৮। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে কেবল স্পিন নয়, গতির বিরুদ্ধেও তাঁর ব্যাট সমান কার্যকর। ভালো বাউন্স ব্যবহার করে তিনি পুল এবং কাট শটে নিয়মিত বাউন্ডারি আদায় করেন। আবার লেন্থে সামান্য ভুল হলেই সেই বল উড়ে যায় গ্যালারির দিকে।

তবে স্পিন বোলারদের বিরুদ্ধে অভিষেক যেন আরও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেন। স্পিনারদের বিপক্ষে তাঁর স্ট্রাইক রেট প্রায় ২১১। আধুনিক টি টোয়েন্টি ক্রিকেটে যেখানে মাঝের ওভারগুলোতে স্পিন দিয়ে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয়, সেখানে অভিষেক সেই পরিকল্পনাকেই ভেঙে দেন। লং অনের উপর দিয়ে মারকাটারি ছক্কা, কাভার অঞ্চলে ইনসাইড আউট শট, কিংবা রিভার্স সুইপ সব অস্ত্রই তাঁর ঝুলিতে রয়েছে।

অভিষেক শর্মার আন্তর্জাতিক টি টোয়েন্টি কেরিয়ার সময়ের হিসেবে এখনও তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও পরিসংখ্যানের দিক থেকে তা যথেষ্ট সমৃদ্ধ। এখন পর্যন্ত তিনি ভারতের হয়ে ৩৮টি টি টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন। ৩৭টি ইনিংসে ৩৭ এর বেশি গড়ে তিনি সংগ্রহ করেছেন প্রায় ১২৯৭ রান। তাঁর স্ট্রাইক রেট প্রায় ১৯৫, যা তাঁর ব্যাটিং স্টাইলের স্পষ্ট প্রতিফলন।

এই রানগুলোর মধ্যে রয়েছে ২টি শতরান এবং ৮টি অর্ধশতরান। আন্তর্জাতিক টি টোয়েন্টি ক্রিকেটে শতরান করাই যেখানে বিরল ঘটনা, সেখানে অল্প ম্যাচেই দুটি শতরান অভিষেকের প্রতিভার প্রমাণ দেয়। এছাড়াও তাঁর নামের পাশে রয়েছে ১২৩টি চার এবং ৮৮টি ছক্কা। এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং প্রতিপক্ষ দলের বোলারদের মানসিক অবস্থার ছবিও তুলে ধরে।

বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে অভিষেক শর্মার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এমন ব্যাটসম্যানের প্রয়োজন হয়, যিনি একা হাতে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। যিনি বিপর্যয়ের মাঝেও সাহস দেখাতে পারেন। অভিষেক ঠিক সেই ধরনের ক্রিকেটার। তাঁর ব্যাটে ঝড় উঠলে প্রতিপক্ষ দলের সব পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে বাধ্য।

ভারতীয় দলের টিম ম্যানেজমেন্টও অভিষেকের উপর ভরসা রাখছে। ওপেনিংয়ে তাঁর আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের ফলে মিডল অর্ডার কিছুটা স্বস্তি পায়। বড় লক্ষ্য তাড়া করার সময় বা আগে ব্যাট করে বিশাল স্কোর গড়ার ক্ষেত্রে অভিষেক হয়ে উঠতে পারেন মূল চাবিকাঠি।

news image
আরও খবর

বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিষেক শর্মার সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর মানসিক স্বাধীনতা। তিনি ভয় পান না। বড় নাম, বড় বোলার, বড় মঞ্চ কিছুই তাঁকে দমাতে পারে না। এই মানসিকতাই তাঁকে আলাদা করে তোলে। যুবরাজ সিংয়ের ছায়ায় বড় হওয়া অভিষেক জানেন কীভাবে বড় ম্যাচে নিজেকে মেলে ধরতে হয়।

আসন্ন আইসিসি মেন্স টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬ যদি অভিষেক শর্মা তাঁর বর্তমান ফর্ম ধরে রাখতে পারেন, তাহলে ভারতীয় দলের জন্য তিনি হতে পারেন সবচেয়ে বড় ম্যাচ উইনার। শুধু রান করা নয়, ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করা, প্রতিপক্ষের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেওয়া এবং দর্শকদের রোমাঞ্চিত করা সব দায়িত্বই তিনি একা হাতে সামলাতে সক্ষম।

সব মিলিয়ে বলা যায়, এই বিশ্বকাপে অভিষেক শর্মা শুধু একজন ওপেনার নন। তিনি ভারতের আক্রমণের প্রতীক। তাঁর ব্যাটিং মানেই ভয়, আগ্রাসন আর নির্ভীকতার গল্প। বিশ্বকাপের মঞ্চে তিনি কতটা ঝড় তুলতে পারেন, সেটাই এখন দেখার। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত অভিষেক শর্মার ব্যাট হাতে নামা মানেই প্রতিপক্ষ বোলারদের রাতের ঘুম উধাও হওয়া।

বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টে শুধু পরিসংখ্যান নয়, মানসিক দৃঢ়তা ও পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেয়। এই জায়গাতেই অভিষেক শর্মা অন্য অনেক ব্যাটসম্যানের থেকে এগিয়ে। তিনি কেবল আগ্রাসী নন, একই সঙ্গে ম্যাচের ছন্দ বুঝে নিজেকে মানিয়ে নিতে জানেন। শুরুতে দ্রুত রান তোলার পাশাপাশি প্রয়োজনে তিনি নিজের খেলায় সামান্য সংযমও আনতে পারেন, যা একজন আধুনিক টি টোয়েন্টি ব্যাটসম্যানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গুণ।

অভিষেকের আরেকটি বড় শক্তি হল তাঁর শট নির্বাচনের বৈচিত্র্য। তিনি শুধু শক্তির উপর নির্ভর করেন না। মাঠের ফাঁকা জায়গা খুঁজে নেওয়া, ফিল্ডারদের অবস্থান বুঝে শট খেলা এবং বোলারের হাত থেকে আগাম পরিকল্পনা পড়ে নেওয়ার ক্ষমতা তাঁর ব্যাটিংকে আরও ভয়ঙ্কর করে তোলে। অনেক সময় দেখা যায়, প্রতিপক্ষ অধিনায়ক ফিল্ড সাজাতে ব্যস্ত, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই অভিষেক একের পর এক বাউন্ডারি হাঁকিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নেন।

ভারতীয় দলে তাঁর উপস্থিতি তরুণ ক্রিকেটারদের মধ্যেও আলাদা আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে। একজন বাঁহাতি ওপেনার হিসেবে তিনি দলের ব্যাটিং কম্বিনেশনে ভারসাম্য এনে দিয়েছেন। ডানহাতি বামহাতি জুটির কারণে বোলারদের লাইন লেন্থ বারবার বদলাতে হয়, যা প্রতিপক্ষের পরিকল্পনাকে আরও জটিল করে তোলে। এই কৌশলগত সুবিধাটিও ভারতীয় দলের জন্য বড় প্লাস পয়েন্ট।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিশ্বকাপে বড় দলের বিরুদ্ধে ম্যাচগুলিতে অভিষেকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো শক্তিশালী বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে শুরুতেই যদি তিনি আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে খেলতে পারেন, তাহলে ম্যাচের মোড় দ্রুত ভারতের দিকে ঘুরে যেতে পারে। বড় ম্যাচে দ্রুত রান তোলার মানসিক চাপ অনেক সময় প্রতিপক্ষকে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে, আর সেখান থেকেই ম্যাচের ভাগ্য বদলে যায়।

দর্শকদের কাছেও অভিষেক শর্মা এক বিশেষ আকর্ষণ। তাঁর ব্যাটিং মানেই বিনোদন। গ্যালারিতে বসে থাকা সমর্থকরা জানেন, তিনি ক্রিজে থাকলে যে কোনও মুহূর্তে চার বা ছক্কা আসতে পারে। এই অনিশ্চয়তাই তাঁকে টি টোয়েন্টি ক্রিকেটের আদর্শ তারকা করে তুলেছে। বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন ক্রিকেটারই দর্শকদের টেনে আনে এবং টুর্নামেন্টের জনপ্রিয়তা বাড়ায়।

সবশেষে বলা যায়, আসন্ন টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অভিষেক শর্মা কেবল একজন প্রতিভাবান ব্যাটসম্যান নন, তিনি হয়ে উঠেছেন ভারতের আশা ও আক্রমণের প্রতীক। তাঁর ব্যাটে যদি ধারাবাহিকভাবে আগুন ঝরে, তাহলে ভারতীয় দলের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন আরও বাস্তবসম্মত হয়ে উঠবে। ক্রিকেটবিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে এই বাঁহাতি বিস্ফোরক ওপেনারের দিকে। বিশ্বকাপের মঞ্চে তিনি ঠিক কতটা ঝড় তুলতে পারেন, সেটাই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

 

 

Preview image