Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

সিবিআইয়ের ঘাড়ে তদন্তের পাহাড়! তবু নতুন মামলার ভার — আদালতের সিদ্ধান্ত নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

পশ্চিমবঙ্গে একাধিক মামলায় সিবিআইয়ের তদন্ত নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। সময়মতো তদন্ত শেষ না হওয়া, আদালতের ভর্ৎসনা, এমনকি তদন্তকারী দলের সদিচ্ছা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছে আদালত। তবু একের পর এক মামলা সিবিআইয়ের হাতে যাওয়ায় বাড়ছে চাপ ও বিতর্ক দু’ই।

পশ্চিমবঙ্গে এই মুহূর্তে সিবিআইয়ের হাতে ৫০০-রও বেশি মামলার তদন্তভার। অথচ কলকাতায় সংস্থার মোট কর্মীসংখ্যা ৩০০-রও কম। ফলে এক একজন তদন্তকারী আধিকারিককে একসঙ্গে পাঁচ-ছ’টি মামলা সামলাতে হচ্ছে। নিয়মিত হাজিরা, সাক্ষী হাজির করা, আদালতে সওয়াল-জবাবের পাশাপাশি ঘুষ, আর্থিক জালিয়াতি বা গোপন নজরদারির মতো দায়িত্বও থাকে তাঁদের কাঁধে। এর মধ্যে আবার যুক্ত হয়েছে একের পর এক রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মামলা, যেগুলির তদন্তের চাপ গোটা ব্যবস্থাকেই নাড়িয়ে দিচ্ছে।

কলকাতা হাই কোর্টের আইনজীবীদের একাংশের মতে, সিবিআইয়ের সীমিত জনবল ও কাজের ভার আদালতের সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি। প্রবীণ আইনজীবী অরুণাভ ঘোষ বলেন, “এত মামলার চাপ একসঙ্গে সামলানোর ক্ষমতা সিবিআইয়ের নেই, এটা বহুবার বলেছি।” পশ্চিমবঙ্গে একাধিক মামলায় সময়মতো তদন্ত শেষ না হওয়ায়, কিংবা তদন্তের গতি আশানুরূপ না হওয়ায় আদালতের ভর্ৎসনার মুখে পড়েছেন সিবিআই আধিকারিকেরা। কিছু ক্ষেত্রে তদন্তকারী দলের ‘সদিচ্ছা’ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে— যেমন আরজি কর কাণ্ডে নির্যাতিতার পরিবার এক মহিলা আধিকারিকের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ তুলেছিলেন, যা কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বক্তব্যেও প্রতিফলিত হয়।

সব পক্ষই স্বীকার করছে, সিবিআইয়ের কাজের চাপ ও জনবল সংকটই প্রধান অন্তরায়। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো অনুযায়ী রাজ্য পুলিশেরই অপরাধতদন্তের দায়িত্ব থাকা উচিত। কিন্তু রাজ্যের পুলিশ প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ পুরনো। বাম আমল থেকে তৃণমূল যুগ— দুই সময়েই পুলিশি নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জয়রামন বা দময়ন্তী সেনের মতো আধিকারিকেরা রাজনৈতিক রোষের শিকার হয়েছেন। ফলে হাই কোর্টে সিবিআই তদন্তের আবেদন বেড়েছে, যা পুলিশের প্রতি সাধারণের অনাস্থার প্রতিফলন।

তথ্য বলছে, আগে বছরে তিন-চারটি মামলায় আদালতের নির্দেশে সিবিআই তদন্ত হতো। কিন্তু ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে এ রাজ্যে অভূতপূর্ব হারে মামলার ভার পড়ছে সিবিআইয়ের কাঁধে। বর্তমানে রাজ্যের রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী অন্তত ১৮টি বড় মামলা সিবিআইয়ের হাতে— বগটুই গণহত্যা, সন্দেশখালি, গরু ও কয়লা পাচার, স্কুল নিয়োগ দুর্নীতি, আরজি কর কাণ্ড, নদিয়ার হাঁসখালি ধর্ষণ, ভোট-পরবর্তী হিংসা সহ আরও বহু মামলা। এগুলির সঙ্গে জেলায় জেলায় ছড়িয়ে থাকা পৃথক তদন্ত মিলিয়ে সংখ্যাটা প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ, নিয়মিত দায়িত্বের পাশাপাশি আরও ৩০-৩৫টি উচ্চ গুরুত্বের মামলা এখন সিবিআইয়ের ঘাড়ে।

news image

তবে এত মামলার মধ্যে সাফল্যের নজির হাতে গোনা। হাঁসখালি মামলায় কিছু অগ্রগতি মিললেও বগটুই তদন্ত এখনও নিষ্ফলা। আরজি কর কাণ্ডে সাজা ঘোষণা হলেও সেটিকে সিবিআইয়ের সাফল্য হিসেবে দেখছেন না অনেকেই। আদালতেরও একাংশ এখন নতুন তদন্তভার দিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। সম্প্রতি খেজুরির এক মৃত্যুর ঘটনায় বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ সিবিআই তদন্তের আবেদন খারিজ করে মন্তব্য করেন, “সিবিআই এখন শুধু গ্যালারি শো করছে, কাজের কাজ হচ্ছে না।”

তবে আদালতের ভর্ৎসনাও কতটা ন্যায্য, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সিবিআইয়ের একাংশের মতে, সংস্থার লোকবল বা সীমাবদ্ধতার দিক না ভেবে একের পর এক মামলা তাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। কলকাতা হাই কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন সভাপতি অরুণাভ ঘোষ বলেন, “হাই কোর্টেও তো লোকাভাব! ৭২ জন বিচারপতির কথা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে অর্ধেক সংখ্যক বিচারক নিয়ে কাজ চলছে। ফলে আদালতও মামলার দায় অন্যের কাঁধে চাপিয়ে স্বস্তি খোঁজে।”
ডেপুটি সলিসিটর জেনারেল রাজদীপ মজুমদার অবশ্য পাল্টা দাবি করেন, “আদালত সব দিক খতিয়ে দেখেই কেন্দ্রীয় তদন্তের নির্দেশ দেয়। পুলিশ কী ভাবে কাজ করেছে, তা যাচাই করে, তারপরই সিদ্ধান্তে পৌঁছয়।”

এই অবস্থাকে অনেকেই বলছেন বাস্তবের ‘শাঁখের করাত’— একদিকে রাজ্য পুলিশের প্রতি অনাস্থা, অন্যদিকে অতিভারাক্রান্ত সিবিআই। আইনজীবীদের মতে, বিচারপতির সংখ্যা বৃদ্ধি ও বিষয়ভিত্তিক মামলার বণ্টন এই অচলাবস্থা কিছুটা লাঘব করতে পারে। কিন্তু তত দিন পর্যন্ত আদালত, সিবিআই ও রাজ্য প্রশাসন— তিন পক্ষই যেন এক দমবন্ধ ভারসাম্যের খেলায় আটকে আছে।

Preview image