দু বছরের সম্পর্কের শুভ পরিণতি বিয়ে। ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের নিয়েই সেরেছেন প্রীতিভোজ। নতুন জীবনের অনুভূতি ভাগ করলেন অনুজয় ও দেবারতি
শনিবার জীবনের নতুন অধ্যায়ে পা রেখেছেন অনুজয় চট্টোপাধ্যায় ও দেবারতি চক্রবর্তী। আইনি বিয়ের মাধ্যমে সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছেন তাঁরা। সিঁদুরদানের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে আনুষ্ঠানিকতা। কোনও বড় আয়োজন নয়, কোনও অপ্রয়োজনীয় জাঁকজমকও নয়। দিনের শেষে রাতে খুব কাছের কিছু মঞ্চাভিনেতা বন্ধুকে নিয়ে ছোট পরিসরে প্রীতিভোজ। এইভাবেই নিজেদের মতো করে জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তকে উদযাপন করেছেন দুজনে।
রবিবার সকালটা ছিল আরও ব্যক্তিগত, আরও শান্ত। নিজের হাতে বানানো চায়ে চুমুক দিতে দিতে আনন্দবাজার ডট কমের সঙ্গে কথা বললেন অনুজয়। তাঁর গলায় ছিল স্বস্তি আর একরাশ তৃপ্তি। হাসতে হাসতে বললেন, বেশ ভাল লাগছে। আমি আর দেবারতি হাসিমুখে ঘুরে বেড়াচ্ছি। বিয়ের বয়স মাত্র একদিন হলেও এই নতুন সম্পর্কের উষ্ণতা যেন ঘরের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়েছে।
কলকাতার বাড়িতে এখন সদস্যসংখ্যা বেড়েছে। সেই বিষয়টিই অনুজয়ের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। তাঁর কথায়, সেটাই দেখেই মন ভরে যাচ্ছে। খুব সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হওয়া অনুজয়ের কাছে পরিবার মানে নিরাপত্তা, ভালোবাসা আর দায়িত্ব। সেই পরিবারের মধ্যেই দেবারতিকে আপন করে নেওয়ার মুহূর্তটা তাঁর কাছে নিঃশব্দ অথচ গভীর আনন্দের।
অনুজয় এবং দেবারতির পরিচয়ের সূত্র মঞ্চ। নাটকই তাঁদের কাছাকাছি এনেছে। দীর্ঘ সময় একসঙ্গে কাজ করতে করতে সম্পর্ক ধীরে ধীরে গাঢ় হয়েছে। দেবারতি পেশায় শিক্ষক। প্রথম সারির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান তিনি। পড়াশোনা, চিন্তাভাবনা আর বাস্তববোধের মিশেলে দেবারতির ব্যক্তিত্ব আলাদা করে চোখে পড়ে। অনুজয়ের জীবনে এই স্থিরতা এবং সংবেদনশীলতার জায়গাটিই বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
পর্দার অনুজয়কে দেখে অনেকেই ভাবেন তিনি রগচটা, দুষ্টু, একটু আগ্রাসী চরিত্রের মানুষ। অদিতি রায়ের লজ্জা সিরিজ হোক কিংবা সাম্প্রতিক ছবি বিজয়নগরের হীরে সেখানে অনুজয়ের চরিত্রে একটা রাফনেস স্পষ্ট। দর্শকের চোখে এই ছবিটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অথচ বাস্তবের অনুজয় একেবারেই অন্যরকম।
এই দ্বন্দ্ব নিয়েই অনুজয় নিজে মজা করে বলেন, পর্দায় আমার দুষ্টুমিটাই বেশি জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছে। বাস্তবে আমি প্রেমিক প্রকৃতির। আমার মনও বসন্তবাতাসে ছুঁয়ে যায়। ফোনের ওপার থেকে শোনা যায় তাঁর মৃদু হাসি। এই হাসির মধ্যেই ধরা পড়ে নতুন জীবনের উচ্ছ্বাস।
ব্যতিক্রম অবশ্য ছিল সিরিজ কালরাত্রি ২। সেখানে অনুজয়কে দেখা গিয়েছিল রাফ অ্যান্ড টাফ এক পুলিশ অফিসারের চরিত্রে। কঠোরতা, শৃঙ্খলা আর পেশাদারিত্বের প্রতীক সেই চরিত্র। কিন্তু অনুজয়ের কথায়, পছন্দের মানুষের সামনে আমি সব সময়ই রোম্যান্টিক। এই স্বীকারোক্তিতে কোনও দ্বিধা নেই, বরং রয়েছে আত্মবিশ্বাস।
বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েও অনুজয় ভীষণ স্পষ্ট। তাঁর কথায়, আমি খুবই সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছি। বাড়িতে মা রয়েছেন, পরিবারের অন্য সদস্যরাও আছেন। দেবারতি এবং আমি দুজনেই বিয়েতে বিশ্বাসী। আমাদের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক সম্মতি গুরুত্বপূর্ণ। সম্পর্ককে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি।
তবে সেই বিশ্বাসের সঙ্গে কোনও প্রদর্শন নেই। অহেতুক জাঁকজমকের বিরুদ্ধেই বরাবর ছিলেন অনুজয়। তাঁর মতে, বিয়ে মানে দায়িত্ব, বোঝাপড়া আর সম্মান। খরচ করে সেটা প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই। কাছের মানুষদের উপস্থিতিতেই এই আনন্দ ভাগ করে নেওয়াই যথেষ্ট।
দু বছরের প্রেমের পর এই সিদ্ধান্তে পৌঁছনো খুব সহজ ছিল না। কাজের চাপ, আলাদা পেশাগত ব্যস্ততা সব কিছুর মধ্যেই সময় বের করে সম্পর্ককে লালন করেছেন তাঁরা। এই সময়টা তাঁদের অনেক কিছু শিখিয়েছে বলেই মনে করেন অনুজয়। ধৈর্য, বিশ্বাস আর একে অপরের জায়গাকে সম্মান করা এই তিনটি বিষয়ই তাঁদের সম্পর্কের ভিত তৈরি করেছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে খুব বেশি বড় কথা বলতে চান না অনুজয়। বরং বর্তমানটাকেই পুরোপুরি উপভোগ করতে চান। আগামী দিনে সকালের দু কাপ চা বানানোর দায়িত্ব কি তাঁর কাঁধে পড়বে, এমন প্রশ্নে আবারও হাসি। বলেন, বিয়ের তো সবে একদিন। এখনও দায়িত্ব ভাগাভাগি পর্যন্তই পৌঁছোইনি। পুরো বিষয়টাই উপভোগ করছি।
এই স্বাভাবিকতা, এই সরল আনন্দই হয়তো অনুজয় দেবারতির সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি। তারকাখ্যাতির আড়ালে থাকা এই মানুষটা জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তেও থেকেছেন মাটির কাছাকাছি। কোনও হইচই নেই, কোনও বড় আয়োজন নেই। আছে শুধু ভালোবাসা, সম্মতি আর একসঙ্গে পথ চলার দৃঢ় সিদ্ধান্ত।
মঞ্চ এবং পর্দার আলোঝলমলের বাইরে এই নতুন জীবনে অনুজয় যেন আরও নিজের মতো। দেবারতির হাত ধরে এই নতুন যাত্রায় তাঁর চোখেমুখে যে প্রশান্তি, তা স্পষ্ট। বিয়ের মাত্র একদিন পরেই যে শান্ত হাসি, সেই হাসিই বলে দেয় এই সম্পর্কের ভিত কতটা দৃঢ়।
এই বিয়ের গল্পে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, তা হল সহজ থাকার ইচ্ছা। অনুজয় বারবারই বলছেন, তিনি আর দেবারতি এই সময়টাকে কোনও কাঠামোর মধ্যে বাঁধতে চান না। নতুন সম্পর্কে ঢুকে প্রথমেই দায়িত্বের তালিকা বানানোর চেয়ে অনুভূতিগুলোকে বুঝে নিতে চান। তাঁর কথায়, আমরা দুজনেই কাজ করি। কাজের চাপ থাকবে। কিন্তু তার মধ্যেই যেন একে অপরের জন্য জায়গা থাকে। সেটাই সবচেয়ে জরুরি।
দেবারতির ক্ষেত্রেও বিষয়টা আলাদা নয়। শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে তাঁর জীবনে শৃঙ্খলা আর সময়ের মূল্য আলাদা ভাবে ধরা পড়ে। সেই বাস্তববোধই অনুজয়ের কাছে খুব আকর্ষণীয় বলে মনে করেন তিনি। দেবারতি খুব স্থির। কথা কম বলেন, কিন্তু যা বলেন ভেবে বলেন। আমার কাজের অনিশ্চয়তা বা সময়ের এলোমেলো ভাবটা তিনি খুব স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করেছেন।
মঞ্চ থেকে পর্দা, এই যাত্রাপথে অনুজয় বহু মানুষের সঙ্গে কাজ করেছেন। পরিচিত হয়েছেন নানা স্বভাবের মানুষের সঙ্গে। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে কাউকে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি বরাবরই সাবধানী ছিলেন। সেই কারণেই দু বছরের সম্পর্ককে সময় দিয়েছেন। কোনও তাড়াহুড়ো করেননি। কাজের সূত্রে বাইরে শুটিং থাকলে দূরত্ব এসেছে, আবার ফিরে এসে সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।
এই সময়ের মধ্যে তাঁরা একে অপরকে শুধুই প্রেমিক প্রেমিকা হিসেবে দেখেননি। বরং বন্ধু হিসেবেই বেশি চিনেছেন। অনুজয়ের কথায়, দেবারতির সঙ্গে আমি সব কথা বলতে পারি। আমার ভয়, আমার দ্বিধা, আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা সব কিছুই ও জানে। এই জায়গাটাই আমাকে সাহস দিয়েছে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে।
বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরও সেই বন্ধুত্বের জায়গাটা যেন অটুট থাকে, সেটাই তাঁদের দুজনের চাওয়া। অনুজয়ের মতে, সম্পর্কের শুরুতেই যদি প্রত্যাশার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে ধীরে ধীরে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। আমরা চাই একে অপরের সঙ্গে বড় হতে। আলাদা মানুষ হিসেবে থাকতেই চাই।
অনুজয়ের পরিবারও এই বিয়েতে খুশি। খুব সাধারণ ভাবে তাঁরা দেবারতিকে গ্রহণ করেছেন। কোনও আড়ম্বর নেই, কোনও জাঁকজমক নেই। ঘরের মানুষ হিসেবে ধীরে ধীরে মিশে যাওয়াটাই এখানে সবচেয়ে বড় বিষয়। অনুজয়ের কথায়, আমার মা খুব শান্ত মানুষ। ওঁর কাছে এই বিয়ে মানে ঘরে আর একজন আপন মানুষের আসা। সেটুকুই যথেষ্ট।
তারকা জীবনের বাইরের এই অনুজয়কে খুব কম মানুষই চেনেন। ক্যামেরার সামনে যে মানুষটিকে দেখা যায়, বাস্তবে তিনি অনেক বেশি সংযত। নতুন বিয়ের পরও তিনি কোনও উচ্ছ্বাসে ভেসে যেতে চান না। বরং খুব সচেতন ভাবে প্রতিটি মুহূর্তকে অনুভব করতে চান। সকালে চা বানানো, জানলার ধারে দাঁড়িয়ে আলো দেখা, ঘরের মধ্যে নিঃশব্দে হাঁটা এই ছোট ছোট বিষয়গুলোই এখন তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
দেবারতির সঙ্গে এই নতুন জীবনে তিনি কোনও রোল মডেল হতে চান না। বরং খুব সাধারণ একজন মানুষ হিসেবেই থাকতে চান। তাঁর কথায়, আমাদের জীবন অন্যদের মতোই। শুধু আমাদের কাজটা একটু চোখে পড়ে। সেটুকু ছাড়া বাকি সব অনুভূতি খুব সাধারণ।
এই বিয়ের মাধ্যমে অনুজয় কোনও বার্তা দিতে চান কি না, এমন প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট। বলেন, কোনও উপদেশ দেওয়ার জায়গায় আমি নেই। তবে যদি কিছু বলতেই হয়, তাহলে বলব নিজের মতো করে বাঁচুন। সমাজ কী বলল, লোকে কী ভাবল এই সব ভেবে জীবনের সিদ্ধান্ত নিলে কখনও শান্তি পাওয়া যায় না।
দু বছরের প্রেম, তার পর বিয়ে এই পথচলাটা তাঁদের কাছে খুব স্বাভাবিক। কোনও নাটক নেই, কোনও গোপন রহস্য নেই। আছে শুধু সময় দেওয়া, বোঝাপড়া আর একে অপরকে সম্মান করার ইচ্ছা। এই সরলতাই তাঁদের সম্পর্কের মূল শক্তি।
ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁরা খুব বেশি দূরে তাকাতে চান না। কাজ থাকবে, ব্যস্ততা থাকবে। হয়তো কখনও মতের অমিলও হবে। কিন্তু সেই সব কিছুর মধ্যেই যেন হাসিমুখে একসঙ্গে হাঁটা যায়, সেটাই তাঁদের কামনা।
বিয়ের বয়স এখনও একদিন পেরিয়েছে মাত্র। কিন্তু এই অল্প সময়েই অনুজয়ের চোখেমুখে যে শান্ত আনন্দ, তা বলে দিচ্ছে এই সিদ্ধান্ত তাঁর জীবনে কতটা সঠিক। দেবারতির হাত ধরে এই নতুন যাত্রা শুরু করেই তিনি যেন নিজের ভিতরের মানুষটাকেই নতুন করে চিনতে শুরু করেছেন।