Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মুম্বইয়ের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে ‘স্কাই’-এর? আইপিএলে দলবদলের গুঞ্জন তুঙ্গে

সূর্যকুমার যাদবের টি-টোয়েন্টি অধিনায়কত্ব হারানোর পর এবার তাঁর আইপিএল ভবিষ্যৎ নিয়েও জল্পনা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক কিছু কর্মকাণ্ড ও ইঙ্গিত ঘিরে প্রশ্ন উঠছে, আসন্ন মরসুমে কি দলবদলের পথে হাঁটবেন সূর্য? যদিও এখনও কোনও সরকারি ঘোষণা হয়নি, তবু ক্রিকেট মহলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে।

ভারতীয় ক্রিকেটে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে সূর্যকুমার যাদব। কিছুদিন আগেও যিনি ছিলেন ভারতের টি-টোয়েন্টি দলের অন্যতম বড় মুখ, যাঁর ব্যাটিং স্টাইলকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল আলাদা উন্মাদনা, সেই ‘স্কাই’-কে ঘিরে এবার তৈরি হয়েছে নতুন জল্পনা। জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব হারানোর পর এবার কি আইপিএলেও বড় সিদ্ধান্ত নিতে চলেছেন তিনি? মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক কি শেষের পথে? নাকি সবটাই শুধুই সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরঞ্জিত আলোচনা? এই প্রশ্নগুলোই এখন ক্রিকেটমহলে ঘুরপাক খাচ্ছে।

ঘটনার সূত্রপাত সূর্যকুমারের ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইলকে ঘিরে। সোমবার সকালে তাঁর প্রোফাইলে মুম্বই ইন্ডিয়ান্স সম্পর্কিত পুরনো একাধিক পোস্ট দেখা যাচ্ছে না বলে দাবি ওঠে। মুম্বইয়ের জার্সি পরে তাঁর খুব কম ছবি চোখে পড়েছে। আরও বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে ফলো-আনফলো ঘিরে। দাবি করা হচ্ছে, সূর্যকুমার মুম্বই ইন্ডিয়ান্সকে আর ফলো করছেন না। পাল্টা মুম্বই ইন্ডিয়ান্সও তাঁকে ফলো করছে না বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় জল্পনা ছড়িয়েছে। যদিও কোনও পক্ষ থেকেই এখনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হয়নি। কিন্তু ক্রিকেটে অনেক সময় মাঠের বাইরের ছোট ইঙ্গিতও বড় আলোচনার জন্ম দেয়। সূর্যের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই হচ্ছে।

সূর্যকুমার যাদবের সঙ্গে মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের সম্পর্ক নতুন নয়। আইপিএলে তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম বড় উত্থান মুম্বইয়ের জার্সিতেই। মুম্বই ইন্ডিয়ান্স তাঁকে শুধু একজন ব্যাটার হিসেবে ব্যবহার করেনি, বরং দলের মধ্যক্রমের অন্যতম ভরসা হিসেবে তৈরি করেছে। রোহিত শর্মার অধীনে মুম্বই যখন সাফল্যের শিখরে, তখন সূর্য ছিলেন দলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর ৩৬০ ডিগ্রি ব্যাটিং, চাপের মধ্যে দ্রুত রান করার ক্ষমতা এবং মাঠে আক্রমণাত্মক মানসিকতা তাঁকে সমর্থকদের প্রিয় করে তোলে। মুম্বই সমর্থকদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ‘আপলা সূর্য দাদা’।

কিন্তু ক্রিকেটে সময় খুব দ্রুত বদলায়। এক সময় যে খেলোয়াড় দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে হয়, পরের মরসুমেই তাঁকে ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। মুম্বই ইন্ডিয়ান্সে হার্দিক পাণ্ড্যর অধিনায়ক হয়ে ফেরার পর থেকেই দলের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছিল। রোহিত শর্মার জায়গায় হার্দিককে অধিনায়ক করা মুম্বই সমর্থকদের একাংশ সহজভাবে নিতে পারেননি। সেই সময় থেকেই মুম্বইয়ের ড্রেসিংরুমে নেতৃত্ব, সিনিয়র খেলোয়াড়দের ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল।

এই পরিস্থিতিতে সূর্যকুমার যাদবের অবস্থানও নজরে ছিল। কারণ রোহিত শর্মার পর ভারতের টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়কত্ব পেয়েছিলেন তিনি। জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে তাঁর গুরুত্ব বাড়লেও মুম্বই ইন্ডিয়ান্সে তাঁকে অধিনায়ক করা হয়নি। বরং হার্দিক পাণ্ড্যই দলের নেতৃত্বে থাকেন। এখান থেকেই অনেকের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়, জাতীয় দলে যিনি অধিনায়ক, তিনি আইপিএলে নিজের ফ্র্যাঞ্চাইজিতে কেন নেতৃত্বের দায়িত্ব পেলেন না? যদিও আইপিএল এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সিদ্ধান্ত আলাদা, তবু এই তুলনা স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় আসে।

এবার সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে সূর্যকুমারের সাম্প্রতিক জাতীয় দল পরিস্থিতি। ভারতের টি-টোয়েন্টি দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, শ্রেয়স আইয়ারকে নতুন টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক করা হয়েছে এবং সূর্যকুমারকে দল থেকেও বাদ দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পর অনেকেই মনে করছেন, ভারতীয় টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে। তরুণদের সুযোগ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং নতুন নেতৃত্ব—এই তিন বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিচ্ছে নির্বাচক কমিটি।

কিন্তু প্রশ্ন হল, জাতীয় দলে নেতৃত্ব হারানোর প্রভাব কি আইপিএল ভবিষ্যতের উপরও পড়বে? সাধারণত একজন বড় ক্রিকেটারের ফ্র্যাঞ্চাইজি ভবিষ্যৎ নির্ভর করে কয়েকটি বিষয়ের উপর—তার ফর্ম, বাজারমূল্য, দলের পরিকল্পনা, নেতৃত্বের প্রয়োজন এবং ড্রেসিংরুমে তাঁর ভূমিকা। সূর্যকুমারের ক্ষেত্রে এই সবকটি বিষয়ই এখন আলোচনায়। তিনি নিঃসন্দেহে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের বড় নাম। কিন্তু সাম্প্রতিক ফর্ম তাঁর পক্ষে খুব শক্তিশালী কথা বলছে না। চলতি আইপিএল মরসুমে ১৩ ম্যাচে ২৭০ রান, গড় ২০.৭৭ এবং স্ট্রাইক রেট ১৪৭.৫৪—পরিসংখ্যান তাঁর মানের তুলনায় অনেকটাই কম।

এই সংখ্যাগুলো খারাপ নয়, কিন্তু সূর্যকুমার যাদবের মতো ব্যাটারের কাছে প্রত্যাশা অনেক বেশি। তিনি এমন একজন খেলোয়াড় যাঁর কাছে শুধু রান নয়, ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আশা করা হয়। তিনি যখন ব্যাট করতে নামেন, সমর্থকরা ৩০ বলে ৬০ বা ২৫ বলে ৫০ ধরনের ইনিংস আশা করেন। সেই জায়গায় ধারাবাহিকতা না থাকলে সমালোচনা আসবেই। জাতীয় দলে বাদ পড়া এবং আইপিএলে প্রত্যাশামতো পারফরম্যান্স না হওয়া—দুই মিলিয়ে তাঁর কেরিয়ারের এই মুহূর্তটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

news image
আরও খবর

তবে সূর্যকে শুধুমাত্র সাম্প্রতিক খারাপ ফর্ম দিয়ে বিচার করা ঠিক হবে না। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে তিনি ভারতের অন্যতম সফল ব্যাটার। মাঠের চারদিকে শট খেলার ক্ষমতা, স্পিন ও পেস দু’ধরনের বোলিংয়ের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং, ডেথ ওভারে স্কোর বাড়ানোর দক্ষতা—সব মিলিয়ে তিনি যে কোনও দলের জন্য সম্পদ। তাই যদি সত্যিই তিনি আইপিএলের ছোট নিলামে নামেন, তাহলে একাধিক ফ্র্যাঞ্চাইজি তাঁকে নেওয়ার জন্য আগ্রহ দেখাতে পারে।

এই জায়গায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসছে কলকাতা নাইট রাইডার্সের নাম। কারণ সূর্যকুমারের সঙ্গে কেকেআরের পুরনো সম্পর্ক রয়েছে। তিনি একসময় কলকাতার জার্সিতে খেলেছেন। তখনও তিনি প্রতিভাবান ব্যাটার হিসেবে পরিচিত ছিলেন, যদিও মুম্বইয়ে গিয়ে তাঁর ব্যাটিং নতুন মাত্রা পায়। কেকেআর যদি ভবিষ্যতে অভিজ্ঞ ভারতীয় মিডল অর্ডার ব্যাটার এবং সম্ভাব্য নেতৃত্বের মুখ খোঁজে, তাহলে সূর্যকুমার একটি বড় বিকল্প হতে পারেন। বিশেষ করে ভারতীয় ব্যাটারদের বাজারমূল্য আইপিএলে সবসময়ই বেশি থাকে। তার উপর যদি সেই ব্যাটার নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হন, তাহলে তাঁর দাম আরও বেড়ে যায়।

কেকেআর ছাড়াও আরও কয়েকটি দল সূর্যকুমারের দিকে নজর দিতে পারে। যে দলগুলির মিডল অর্ডারে অভিজ্ঞতা কম, যারা একজন ভারতীয় ম্যাচউইনার খুঁজছে, অথবা যাদের ভবিষ্যৎ অধিনায়ক প্রয়োজন—তাদের কাছে সূর্য আকর্ষণীয় নাম হতে পারেন। টি-টোয়েন্টিতে বিদেশি খেলোয়াড়ের সংখ্যা সীমিত থাকায় একজন শক্তিশালী ভারতীয় ব্যাটারের মূল্য সবসময় বেশি। সূর্য সেই দিক থেকে এখনও বড় সম্পদ।

তবে মুম্বই ইন্ডিয়ান্স কি তাঁকে এত সহজে ছাড়বে? সেটাই বড় প্রশ্ন। মুম্বই সাধারণত নিজেদের মূল খেলোয়াড় ধরে রাখতে চায়। রোহিত শর্মা, জসপ্রীত বুমরাহ, হার্দিক পাণ্ড্য, সূর্যকুমার যাদব—এই নামগুলো শুধু ক্রিকেটীয় শক্তি নয়, ব্র্যান্ড ভ্যালুর অংশও। সূর্যকে ছেড়ে দিলে মুম্বইয়ের মিডল অর্ডারে বড় শূন্যতা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সমর্থকদের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে মুম্বই সমর্থকদের আবেগের সঙ্গে সূর্যের নাম জড়িয়ে আছে।

অন্যদিকে, যদি দলের অভ্যন্তরে সত্যিই মতপার্থক্য থাকে, তাহলে ফ্র্যাঞ্চাইজি এবং খেলোয়াড় উভয়ের জন্য আলাদা পথ বেছে নেওয়াই কখনও কখনও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত হতে পারে। আইপিএলে এর আগেও বড় বড় দলবদল দেখা গিয়েছে। হার্দিক পাণ্ড্য নিজেই গুজরাট টাইটান্স থেকে মুম্বইয়ে ফিরেছিলেন। রোহিত শর্মার অধিনায়কত্ব থেকে সরানোর সিদ্ধান্তও একসময় অসম্ভব মনে হয়েছিল, কিন্তু সেটাই বাস্তব হয়েছে। তাই সূর্যকুমারের দলবদলও একেবারে অসম্ভব নয়।

হার্দিক পাণ্ড্যর সঙ্গে সূর্যকুমারের সম্পর্ক নিয়েও জল্পনা বাড়ছে। কারণ মুম্বইয়ের নেতৃত্ব প্রশ্নে দু’জনের নাম বারবার পাশাপাশি এসেছে। হার্দিক অধিনায়ক, সূর্য সিনিয়র ভারতীয় ব্যাটার—এই সমীকরণ ড্রেসিংরুমে কীভাবে কাজ করছে, তা বাইরে থেকে বোঝা কঠিন। সোশ্যাল মিডিয়ার ফলো-আনফলো দেখে কোনও সম্পর্কের অবনতি নিশ্চিত বলা যায় না। কিন্তু ক্রিকেটপ্রেমীদের আলোচনায় এই বিষয়গুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে যখন কোনও বড় খেলোয়াড় জাতীয় দল থেকে বাদ পড়েন এবং একই সময়ে তাঁর ফ্র্যাঞ্চাইজি সংক্রান্ত সোশ্যাল মিডিয়া কার্যকলাপ নজরে আসে, তখন জল্পনা আরও বেড়ে যায়।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—ইনস্টাগ্রাম পোস্ট সরানো বা কাউকে আনফলো করা মানেই দলবদল নিশ্চিত নয়। অনেক সময় খেলোয়াড়রা নিজেদের প্রোফাইল নতুনভাবে সাজান, পুরনো পোস্ট আর্কাইভ করেন, অথবা ব্যক্তিগত কারণে ফলোয়িং তালিকা বদলান। কিন্তু পেশাদার খেলাধুলার জগতে এই ধরনের পদক্ষেপ অনেক সময় বার্তা হিসেবেও দেখা হয়। তাই সূর্যকুমারের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন উঠছে—এটা কি শুধুই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, নাকি বড় কোনও পরিবর্তনের আগাম ইঙ্গিত?

সূর্যকুমারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ফর্মে ফেরা। জাতীয় দল হোক বা আইপিএল, একজন ব্যাটারের সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তর আসে ব্যাট হাতে। যদি তিনি আগামী ম্যাচগুলিতে বা ঘরোয়া ক্রিকেটে বড় রান করেন, তাহলে সমালোচনা অনেকটাই কমে যাবে। তাঁর বয়স, অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা এখনও তাঁকে ভারতীয় ক্রিকেটের গুরুত্বপূর্ণ নাম করে রাখে। কিন্তু বর্তমান ক্রিকেটে প্রতিযোগিতা এত বেশি যে শুধুমাত্র পুরনো সাফল্য দিয়ে জায়গা ধরে রাখা কঠিন। তরুণ ক্রিকেটাররা সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে সূর্যকে আবার নিজের সেরা ফর্মে ফিরতেই হবে।

Preview image