স্মৃতি মন্ধনা ও প্রতিকা রাওয়ালের দুর্দান্ত শতরানে ভর করে ভারত নারী দল ২০২৫ সালের মহিলা ক্রিকেট বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা পাকা করল। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৫৩ রানে জয় এনে দেয় এই দুই তারকার অসাধারণ ব্যাটিং পারফরম্যান্স। স্বাগতিক ভারতীয় দল এখন আত্মবিশ্বাসে উজ্জ্বল আগামী ম্যাচের প্রস্তুতিতে।
২০২৫ সালের মহিলা ক্রিকেট বিশ্বকাপে এক নতুন ইতিহাস রচনা করল ভারত। স্বাগতিক দেশ হিসেবে ভারতীয় দল এবার দারুণ ছন্দে খেলছে, আর সেই ধারাবাহিকতাই বজায় রাখল নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চমকপ্রদ জয়ের মাধ্যমে। মুম্বইয়ের উজ্জ্বল আলোর নিচে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে স্মৃতি মন্ধনা ও প্রতিকা রাওয়াল খেললেন অসাধারণ ইনিংস, যা ভারতের সেমিফাইনালে ওঠার পথকে নিশ্চিত করে দিল। ম্যাচের শুরু থেকেই ভারতীয় ব্যাটাররা আত্মবিশ্বাসী ছন্দে ছিল। টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন ভারত অধিনায়ক হারমানপ্রীত কৌর, এবং সেই সিদ্ধান্ত যে কতটা সঠিক ছিল, তা প্রমাণ করে দিলেন ওপেনার স্মৃতি মন্ধনা ও প্রতিকা রাওয়াল। দু’জনই ধীরে-সুস্থে ইনিংস গড়ে তোলেন, নিউজিল্যান্ডের বোলারদের ওপর চাপে রাখেন এবং মাঠজুড়ে দুরন্ত শটের ঝড় তোলেন। মন্ধনা নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে ইনিংসকে স্থিতিশীল রাখেন, আর তরুণ প্রতিকা রাওয়াল তার আগ্রাসী ব্যাটিং দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেন।
মন্ধনা ১১২ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলে দলকে দৃঢ় ভিত গড়ে দেন, যেখানে ছিল ১৩টি চমৎকার বাউন্ডারি। অন্যদিকে প্রতিকা রাওয়াল মাত্র ৯৩ বলে করেন ১০১ রান, যার মধ্যে ছিল ছ’টি চার ও তিনটি ছক্কা। তাদের জুটিতে ভারত পায় ১৮৫ রানের বিশাল পার্টনারশিপ, যা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। নিউজিল্যান্ডের বোলাররা চেষ্টা করলেও ভারতীয় ব্যাটারদের দৃঢ় প্রতিরোধের সামনে অসহায় হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত ভারত নির্ধারিত ৫০ ওভারে করে ২৮৩ রান, যা এই টুর্নামেন্টে তাদের অন্যতম সেরা স্কোর।
লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে নিউজিল্যান্ডও শুরুটা ভালো করেছিল। ওপেনার সুজি বেটস ও মেলি কের সতর্ক ব্যাটিংয়ে কিছুটা আশার আলো জ্বালিয়েছিলেন কিউই সমর্থকরা। কিন্তু ভারতীয় বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিং দ্রুতই সেই আশা নিভিয়ে দেয়। পুনম যাদব, রেনুকা সিং ও রাজেশ্বরী গায়কোয়াড়ের নিখুঁত লাইন ও লেংথে একের পর এক উইকেট পড়তে থাকে। নিউজিল্যান্ড ৪৭ ওভার খেলেই ২৩০ রানে অলআউট হয়ে যায়, ফলে ভারত ৫৩ রানের বড় জয় তুলে নেয়।
এই জয়ের সঙ্গে সঙ্গেই ভারত গ্রুপ পর্যায়ের শেষ ম্যাচ না খেলেই সেমিফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করে ফেলে। স্মৃতি মন্ধনা ম্যাচ শেষে বলেন, “এই জয় আমাদের টিম স্পিরিটের ফল। প্রতিকা আজ যেভাবে ব্যাট করেছে, তা সত্যিই অনুপ্রেরণামূলক। আমরা একে অপরের খেলায় বিশ্বাস রাখি, সেটাই আমাদের শক্তি।” প্রতিকা রাওয়ালও বলেন, “এটি আমার জীবনের সবচেয়ে বিশেষ ইনিংস। দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ খেলছি — এর চেয়ে বড় গর্ব আর কিছু হতে পারে না।”
ভারতীয় বোলারদের পারফরম্যান্সও সমানভাবে প্রশংসনীয় ছিল। রেনুকা সিং তার নিখুঁত সুইং দিয়ে টপ অর্ডার ভেঙে দেন, আর পুনম যাদব মধ্য ওভারে গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়ে নিউজিল্যান্ডের আশা শেষ করে দেন। পুরো দলজুড়ে ছিল একতা, আত্মবিশ্বাস এবং জয়ের ক্ষুধা। মাঠে দর্শকরা যখন “ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া” স্লোগানে গর্জে উঠছিল, তখন মনে হচ্ছিল দেশ যেন এক মুহূর্তের জন্য একসঙ্গে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
এই জয়ের পর ভারতীয় দল এখন সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে বিজয়ী দলের। দল বর্তমানে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর, এবং কোচ রমেশ পাওয়ার জানিয়েছেন যে টিম ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং তিন বিভাগেই এখন পরিপূর্ণ ভারসাম্যে রয়েছে। টিমের তরুণ খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সও উল্লেখযোগ্য, যারা চাপের মুহূর্তেও শান্তভাবে ম্যাচ সামলাতে জানে।
ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট আজ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। যেখানে একসময় নারী ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ ছিল সীমিত, সেখানে এখন প্রতিটি ম্যাচে দর্শকদের উচ্ছ্বাস প্রমাণ করছে এই খেলাটির জনপ্রিয়তা কতটা বেড়েছে। স্মৃতি মন্ধনা, হারমানপ্রীত কৌর, প্রতিকা রাওয়ালদের মতো খেলোয়াড়রা শুধু ক্রিকেটার নন — তারা এক প্রজন্মের অনুপ্রেরণা। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে এই জয় তাই শুধুমাত্র সেমিফাইনালের টিকিট নয়, এটি ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতীক।