রানির দ্বিতীয় সন্তান পৃথিবীর আলো দেখেনি। পাঁচ মাসেই গর্ভপাত হয় তাঁর। নিজের জীবনের এই দুর্ঘটনা নিয়ে মুখ খুললেন অভিনেত্রী।শুক্রবার মুক্তি পেয়েছে রানি মুখোপাধ্যায় অভিনীত ছবি ‘মর্দানি ৩’। এর আগে ‘মিসেস চ্যাটার্জি ভার্সেস নরওয়ে’ ছবিতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। সেই ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার আগে ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন। দ্বিতীয় বার মা হতে চলেছিলেন। কিন্তু, রানির দ্বিতীয় সন্তান পৃথিবীর আলো দেখেনি। পাঁচ মাসেই গর্ভপাত হয় তাঁর। নিজের জীবনের এই দুর্ঘটনা নিয়ে মুখ খুললেন অভিনেত্রী।
২০২০ সালে অতিমারির সময় দ্বিতীয় বার অন্তঃসত্ত্বা হন রানি। কিন্তু পাঁচ মাসের মাথায় সন্তানকে হারান। ঠিক তার পরেই শুরু হয় ‘মিসেস চ্যাটার্জি ভার্সেস নরওয়ে’ ছবির শুটিং। যখন ছবিটি মুক্তি পায়, সেই সময় সন্তান হারানোর যন্ত্রণার কথা কাউকে জানাননি। আশঙ্কা ছিল, সবাই ভাববেন ছবির প্রচারের স্বার্থেই এই ঘটনার কথা বলছেন!
তিনি ‘মিসেস চ্যাটার্জি ভার্সেস নরওয়ে’ ছবির প্রস্তাব পেয়েছিলেন গর্ভপাতের ১০ দিনের মাথায়। ছবির পরিচালক কিংবা প্রযোজক, কেউই জানতেন না অভিনেত্রীর এই যন্ত্রণার কথা। ছবিতে দেবিকা চট্টোপাধ্যায়ের চরিত্রে রানির অভিনয় দারুণ প্রশংসিত হয়। সেই ছবিতে সন্তানদের কাছে রাখতে এক মায়ের লড়াইয়ের গল্পই দেখানো হয়েছিল। মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন রানি। সম্প্রতি, ‘মর্দানি ৩’-এর প্রচারে এসে স্মৃতির পাতা উল্টে দেখলেন অভিনেত্রী। রানি বলেন, ‘‘ওই ছবিটা আমার জীবনে এমন সময়ে এসেছিল, যখন আমি সবেমাত্র দ্বিতীয় সন্তানকে হারিয়েছি। গল্পটা শোনামাত্রই যেন ছবির সঙ্গে জুড়ে যাই। হারানোর যন্ত্রণাটার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাই।’’
২০২০ সাল। গোটা বিশ্ব তখন কোভিড-১৯ অতিমারির আতঙ্কে স্তব্ধ। হাসপাতাল, লকডাউন, অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে জীবন যেন থমকে গিয়েছিল। সেই সময়ই দ্বিতীয় বার অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিলেন অভিনেত্রী রানি মুখোপাধ্যায়। ব্যক্তিগত জীবনে মাতৃত্বের আনন্দে ভেসে থাকার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে পাঁচ মাসের মাথায় সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। সন্তান হারানোর গভীর যন্ত্রণার মধ্যে দিয়েই যেতে হয় তাঁকে।
এই শোকের কথা তখন কাউকেই জানাননি রানি। না সংবাদমাধ্যমকে, না সহকর্মীদের, এমনকি ছবির টিমকেও নয়। কারণ একটাই—ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কা। তাঁর মনে হয়েছিল, যদি তিনি এই ব্যক্তিগত যন্ত্রণার কথা প্রকাশ করেন, তাহলে মানুষ ভাবতে পারেন, কোনও ছবির প্রচারের স্বার্থেই হয়তো এই বিষয়টি সামনে আনছেন। সেই ভয়েই নিজের দুঃখ নিজের মধ্যেই চেপে রেখেছিলেন অভিনেত্রী।
সন্তান হারানোর মাত্র ১০ দিনের মাথায় ‘মিসেস চ্যাটার্জি ভার্সেস নরওয়ে’ ছবির প্রস্তাব আসে রানির কাছে। তখন তিনি শারীরিক ও মানসিক—দু’দিক থেকেই বিপর্যস্ত। গর্ভপাতের পর শরীর এখনও সম্পূর্ণ সুস্থ হয়নি, মনও ছিল শোকগ্রস্ত। তবুও ছবির চিত্রনাট্য যখন তাঁর হাতে আসে, তখন যেন অদ্ভুত এক সংযোগ অনুভব করেছিলেন তিনি।
ছবির গল্প ছিল এক মায়ের লড়াইয়ের কাহিনি। নিজের সন্তানদের কাছে ফিরে পাওয়ার জন্য একা বিদেশের মাটিতে প্রশাসন, আইনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পড়া এক নারীর গল্প। দেবিকা চট্টোপাধ্যায়ের চরিত্রে অভিনয় করার কথা ছিল রানির। মাতৃত্ব, হারানোর ভয়, সন্তানকে আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা—এই সব আবেগ যেন বাস্তব জীবনের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে যাচ্ছিল।
এই ছবির পরিচালক বা প্রযোজক—কেউই জানতেন না রানির ব্যক্তিগত জীবনের সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা। শুটিং শুরু হওয়ার সময়ও তিনি বিষয়টি গোপনই রাখেন। সেটে তিনি ছিলেন পেশাদার অভিনেত্রী, যাঁর চোখে মুখে কোনও দুর্বলতার ছাপ নেই। কিন্তু ক্যামেরার সামনে দেবিকা হয়ে ওঠার সময় সেই ব্যক্তিগত যন্ত্রণা অজান্তেই তাঁর অভিনয়ে ছাপ ফেলেছিল।
পরিচালক পরবর্তীতে বলেছিলেন,
“রানির অভিনয়ে একটা আলাদা গভীরতা ছিল। মনে হচ্ছিল, এই চরিত্রটা ও শুধু অভিনয় করছে না, অনুভব করছে।”
তখনও কেউ জানতেন না, সেই অনুভবের নেপথ্যে রয়েছে বাস্তব জীবনের এক গভীর ক্ষত।
২০২৩ সালে মুক্তি পায় ‘মিসেস চ্যাটার্জি ভার্সেস নরওয়ে’। ছবিটি মুক্তির পর দর্শক ও সমালোচকদের একাংশ রানির অভিনয়কে তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম সেরা বলে আখ্যা দেন। বিশেষ করে মায়ের চরিত্রে তাঁর সংযত আবেগ, চোখের ভাষা এবং সংলাপহীন দৃশ্যগুলিতে অভিনয় প্রশংসা কুড়োয়।
তবুও সেই সময়েও নিজের ব্যক্তিগত যন্ত্রণার কথা প্রকাশ করেননি রানি। প্রচারের সময় তিনি ছবির গল্প, আইনি লড়াই, মাতৃত্বের সার্বজনীন অনুভূতি—এসব নিয়েই কথা বলেছেন। সন্তান হারানোর প্রসঙ্গ এড়িয়েই গিয়েছেন।
কারণ তাঁর ভয় ছিল—
“মানুষ যদি ভাবে, আমি সহানুভূতি আদায়ের জন্য এই গল্প বলছি?”
সম্প্রতি ‘মর্দানি ৩’-এর প্রচারে এসে অবশেষে নিজের জীবনের সেই অধ্যায়ের কথা প্রথমবার প্রকাশ্যে আনলেন রানি মুখোপাধ্যায়। স্মৃতির পাতা উল্টে তিনি জানান, ‘মিসেস চ্যাটার্জি ভার্সেস নরওয়ে’ তাঁর জীবনে এসেছিল একেবারে ভেঙে পড়ার সময়ে।
রানি বলেন,
“ওই ছবিটা আমার জীবনে এমন একটা সময়ে এসেছিল, যখন আমি সবেমাত্র দ্বিতীয় সন্তানকে হারিয়েছি। গল্পটা শোনামাত্রই যেন ছবিটার সঙ্গে জুড়ে যাই। হারানোর যন্ত্রণার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাই।”
এই প্রথম তিনি স্বীকার করলেন, বাস্তব জীবনের শোকই তাঁকে সেই চরিত্রে ঢুকে পড়তে সাহায্য করেছিল।
মনোবিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই শিল্পচর্চা মানুষের কাছে থেরাপির মতো কাজ করে। রানির ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিল। ক্যামেরার সামনে দেবিকা হয়ে তিনি নিজের না বলা কষ্টগুলোকে পরোক্ষে প্রকাশ করতে পেরেছিলেন।
এক দৃশ্যে দেখা যায়, সন্তানদের থেকে বিচ্ছিন্ন এক মা নিঃশব্দে কান্না চেপে রাখছেন। সেই দৃশ্যের শুটিংয়ের সময় সেটে উপস্থিত এক সহকারী জানান,
“কাট বলার পরেও রানি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কারও দিকে তাকাননি। তখনই বুঝেছিলাম, এটা শুধু অভিনয় নয়।”
রানি বরাবরই মাতৃত্বকে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় বলে মনে করেন। কন্যা আদিরার জন্মের পর তিনি নিজের কাজের ধরনও বদলেছেন। কম ছবি করেছেন, কিন্তু বেছে নিয়েছেন শক্তিশালী চরিত্র।
‘মিসেস চ্যাটার্জি ভার্সেস নরওয়ে’ যেন সেই যাত্রারই একটি আবেগঘন অধ্যায়। সন্তান হারানোর যন্ত্রণার মধ্যেও এক মায়ের লড়াইয়ের গল্প পর্দায় তুলে ধরতে পারা তাঁর কাছে ব্যক্তিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
এই ছবির মাধ্যমে আবারও প্রমাণ হয়, বলিউডে নারীকেন্দ্রিক গল্পের ক্ষেত্রে রানি এক অনন্য নাম। ‘ব্ল্যাক’, ‘নো ওয়ান কিলড জেসিকা’, ‘মর্দানি’ সিরিজ়ের পর এই ছবিতে তিনি দেখিয়েছেন—মা মানেই দুর্বল নন, বরং প্রয়োজনে সবচেয়ে শক্তিশালী যোদ্ধা।
সমালোচকদের মতে,
“এই ছবিতে রানির অভিনয়ের আবেগ এত বাস্তব ছিল যে, দর্শকরা শুধু গল্প দেখেননি, মায়ের যন্ত্রণাও অনুভব করেছেন।”
আজ, বহুদিন পর সেই যন্ত্রণার কথা প্রকাশ্যে আনার সাহস দেখিয়েছেন রানি। এই স্বীকারোক্তি শুধু একজন অভিনেত্রীর নয়, একজন মায়েরও। যাঁরা একই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন, তাঁদের কাছে রানির এই কথা হয়তো কিছুটা হলেও সাহস জোগাবে।
তিনি নিজেই বলেন,
“এই ধরনের ক্ষতি খুব ব্যক্তিগত। সবাই সেটা প্রকাশ্যে বলতে পারেন না। আমি তখন পারিনি। আজ বলছি, কারণ এখন মনে হয়—এই কথাগুলো বলাও দরকার।”
‘মিসেস চ্যাটার্জি ভার্সেস নরওয়ে’ শুধু একটি ছবি নয়, রানির জীবনের এক নীরব আর্তনাদ। যে যন্ত্রণা তিনি প্রকাশ্যে আনেননি, সেটাই অজান্তেই তাঁর অভিনয়ের গভীরতা বাড়িয়ে দিয়েছিল। বাস্তব আর পর্দার জীবন সেখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।
আজ যখন তিনি সেই অধ্যায়ের কথা বলছেন, তখন তা আর প্রচারের অংশ নয়—বরং এক পরিণত, সাহসী স্বীকারোক্তি। একজন অভিনেত্রী, একজন মা এবং একজন নারী হিসেবে রানি মুখোপাধ্যায়ের এই যাত্রা মনে করিয়ে দেয়—কখনও কখনও সবচেয়ে শক্তিশালী অভিনয়ের জন্ম হয় সবচেয়ে নীরব কষ্ট থেকে।
এই অভিজ্ঞতা রানি মুখোপাধ্যায়কে ব্যক্তি ও শিল্পী—দু’ভাবেই আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, সন্তান হারানোর পর জীবনের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গিয়েছিল। ছোট ছোট বিষয়ও তখন নতুন অর্থ পেতে শুরু করে। শুটিংয়ের ফাঁকে একা বসে থাকা, চুপচাপ স্ক্রিপ্টের সংলাপগুলো পড়ে নেওয়া—এসবই ছিল নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলার সময়। সহকর্মীরা হয়তো বুঝতে পারেননি, কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেই তিনি নিজের কষ্ট সামলে নিচ্ছিলেন।
ছবির প্রতিটি দৃশ্যে মায়ের যে যন্ত্রণা ও অদম্য জেদ দেখা যায়, তা নিছক অভিনয়ের ফল নয় বলেই মনে করেন অনেকে। বাস্তবের ক্ষতই পর্দায় সত্যিকারের আবেগ এনে দিয়েছিল। বিশেষ করে আদালতের দৃশ্য কিংবা সন্তানদের সঙ্গে দেখা হওয়ার মুহূর্তগুলোতে রানির চোখের ভাষা দর্শকদের নাড়িয়ে দিয়েছিল গভীরভাবে।
আজ, এই অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে এনে রানি এক ধরনের সামাজিক বার্তাও দিয়েছেন। গর্ভপাত বা সন্তান হারানোর মতো ঘটনা এখনও অনেক নারীর কাছেই নিঃশব্দ কষ্ট হয়ে থাকে। সেই যন্ত্রণা নিয়ে কথা বলার সাহস খুব কম মানুষই পান। একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রীর এই স্বীকারোক্তি হয়তো বহু মাকে বোঝাবে—এই কষ্ট একার নয়, আর নীরব থাকাই একমাত্র পথ নয়।