Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

সৌদিতে ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনা ৪২ জন ভারতীয় উমরাহ যাত্রীর মৃত্যু অধিকাংশই হায়দরাবাদের

মক্কা থেকে মদিনা যাওয়ার পথে উমরাহযাত্রীদের বাসটি মুফরিহাটের কাছে একটি ডিজেল ট্যাঙ্কারের সঙ্গে ভয়াবহ মুখোমুখি সংঘর্ষে পড়ে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রবিবার গভীর রাতে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনাতেই প্রাণ হারান বহু যাত্রী

সৌদি আরবে উমরাহযাত্রীদের ভয়াবহ বাসদুর্ঘটনা ৪২ ভারতীয়ের মৃত্যুতে শোকের ছায়া ঘুমন্ত অবস্থাতেই পুড়ে শেষ একাধিক পরিবার, ট্র্যাজেডির পিছনের সম্ভাব্য কারণ ও পরবর্তী করণীয়

সৌদি আরবের মক্কা মদিনা সড়কপথে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা মুহূর্তে মৃত্যু নিয়ে গেল ৪২ জন ভারতীয় উমরাহযাত্রীর। এমন মর্মান্তিক দৃশ্য এর আগে বহুবার দেখা গেছে মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি অঞ্চলের দীর্ঘ সড়কপথে তবু প্রতিবারই যেন এই যন্ত্রণা নতুন করে আঘাত হানে। রবিবার গভীর রাতে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা যেমন বহু পরিবারের ভবিষ্যৎ থমকে দিয়েছে, তেমনই তুলে ধরেছে উমরাহ মৌসুমে যাত্রী পরিবহনের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন

রিয়াধে ভারতীয় দূতাবাসের তরফে নিশ্চিত করা হয়েছে, দুর্ঘটনাগ্রস্ত বাসটিতে বেশির ভাগ যাত্রীই ছিলেন ভারতের তেলঙ্গনা রাজ্যের হায়দরাবাদ এবং আশপাশের এলাকার মানুষ। বহু বছর ধরে টানা সঞ্চয় করে, ঋণ নিয়ে বা পরিবারের সাহায্যে অনেকে এই ধর্মীয় সফরের পরিকল্পনা করেন। জীবনে একবার হলেও হজ বা উমরাহ করার স্বপ্ন নিয়েই তাঁরা সৌদি আরবের পথে রওনা হয়েছিলেন। কেউ কেউ ছিলেন স্বামী-স্ত্রী মিলে, কেউ আবার ছিলেন মা-ছেলে বা পুরো পরিবার। কিন্তু মক্কা থেকে মদিনার পথে সেই যাত্রাই হয়ে উঠল তাঁদের শেষ যাত্রা।

দুর্ঘটনার রাত মুহূর্তের মধ্যে আগুনে গ্রাস পুরো বাস

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, রবিবার গভীর রাতে মক্কা থেকে একটি প্রাইভেট ট্যুর অপারেটরের বাসে চেপে উমরাহযাত্রীরা মদিনার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। মরুভূমির দীর্ঘ, প্রায় জনবিরল সড়ক ধরে বাস চলছিল নিরবচ্ছিন্ন গতিতে। যাত্রীরা তখন অধিকাংশই ঘুমে আচ্ছন্ন। তীব্র ক্লান্তি নিয়ে যাঁরা সারাদিনের ইবাদাতে ছিলেন, তাঁরা নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়েছিলেন, পরের দিনের সফর আর ইবাদত নিয়ে পরিকল্পনা করে।

ঠিক সেই সময়, মুফরিহাট এলাকার কাছে একটি ডিজ়েল-ট্যাঙ্কার ট্রাক বিপরীত দিক থেকে আসছিল। কী ভাবে দুই গাড়ির সংঘর্ষ হল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। প্রাথমিক অনুমান বা তো বাসচালকের মুহূর্তের ভুল, বা ট্যাঙ্কারের গতিবিধিতে অনিয়ম, অথবা ঘন কুয়াশা ও রাতের অন্ধকারে দৃশ্যমানতা কমে আসার কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবে যাই হোক, মুখোমুখি সংঘর্ষের পর যা ঘটেছে, তা অকল্পনীয়।

সংঘর্ষের সঙ্গে সঙ্গেই বাসে আগুন ধরে যায়। ডিজ়েল-ট্যাঙ্কারের ধাক্কায় আগুন আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। যেহেতু দুর্ঘটনার সময় যাত্রীরা ঘুমিয়ে ছিলেন এবং দরজা–জানালা মুহূর্তে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তাই বাইরে বেরিয়ে আসার সুযোগ কারও ছিল না। আগুনের তীব্রতায় পুরো বাস কয়েক মিনিটের মধ্যে আগুনের গোলায় পরিণত হয়।

স্থানীয় উদ্ধারকর্মীরা পৌঁছতে পৌঁছতেই বাস প্রায় সম্পূর্ণ দগ্ধ হয়ে যায়। বাঁচানোর মতো কিছুই আর ছিল না শুধু পোড়া দেহ, ভস্মীভূত জিনিসের স্তূপ এবং অশেষ আর্তনাদ।

মৃতদের মধ্যে নারী ও শিশু বেশি দেহ শনাক্তকরণ চলছে

খলিজ টাইমস-সহ একাধিক স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, মৃতদের মধ্যে রয়েছে বহু মহিলা এবং শিশু। অনেকেই পরিবার সহ এই সফরে গিয়েছিলেন। আগুনে দেহগুলি সম্পূর্ণ দগ্ধ হয়ে যাওয়ায় শনাক্তকরণে প্রচণ্ড সমস্যা তৈরি হয়েছে। ময়নাতদন্তের পর ডিএনএ মিলিয়ে দেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে সৌদি প্রশাসন জানিয়েছে।

ভারতীয় দূতাবাস তথা কনস্যুলেট কর্তৃপক্ষও দ্রুত বিষয়টি হাতে নিয়েছে। দেহগুলি কখন দেশে ফেরানো যাবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। শনাক্ত হওয়ার পরই তা নির্দিষ্ট হবে।

একজন মাত্র যাত্রী বেঁচে গেছেন  অবস্থা সংকটজনক

অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনায় বাসের একমাত্র জীবিত ব্যক্তি গুরুতর জখম অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছেন। সংঘর্ষের সময় তিনি জেগে ছিলেন কি না, বা কী ভাবে তিনি আগুন থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন, তা এখনও অজানা। তাঁর অবস্থাও আশঙ্কাজনক। চিকিৎসকেরা বলছেন, তাঁর বয়ানই অনেক তথ্য স্পষ্ট করতে সাহায্য করবে।

ভারতীয় সরকারের প্রতিক্রিয়া জয়শঙ্করের শোকবার্তা

দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরই ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর রিয়াধে ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি টুইটে শোকপ্রকাশ করে লিখেছেন যে, নিহত পরিবারগুলিকে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সবরকম সাহায্য করা হবে। উমরাহযাত্রীদের মৃত্যু তাঁকে অত্যন্ত মর্মাহত করেছে।

বিদেশমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন, আহতদের চিকিৎসা, মৃতদেহ দেশে ফেরানো, এবং পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা সব ক্ষেত্রেই ভারত সরকার পাশে থাকবে।

হায়দরাবাদে শোকের ছায়া পরিবারের আর্তি

হায়দরাবাদের মাল্লেপল্লি এলাকা বিশেষভাবে শোকাহত। স্থানীয় সূত্র বলছে, মৃতদের বেশির ভাগই এই অঞ্চল এবং পুরনো হায়দরাবাদের অন্য কয়েকটি এলাকার বাসিন্দা। তেলঙ্গানার তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ডি শ্রীধর বাবুও জানিয়েছেন প্রাথমিক তথ্য বলছে, মৃতেরা অধিকাংশই এই অঞ্চলের। যদিও শনাক্তকরণ না হওয়া পর্যন্ত কিছুই নিশ্চিত নয়।

তেলঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডি শোকপ্রকাশ করে নিহতদের পরিবারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রাজ্য সরকার দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে দেহ আনার ব্যবস্থা করবে বলে জানানো হয়েছে।

অল ইন্ডিয়া মজলিস এ ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (AIMIM) এর নেতা ও হায়দরাবাদের সাংসদ আসাদউদ্দিন ওয়েইসিও বিষয়টি নিয়ে তৎপর। তিনি জানান,
“রিয়াধে ভারতীয় দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অফ মিশন আবু মাথেন জর্জের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছি। আমরা দুইটি ট্র্যাভেল এজেন্সির সঙ্গে সমস্ত তথ্য ভাগ করেছি। কেন্দ্রকে অনুরোধ করেছি যাতে দেহগুলি দ্রুত দেশে ফেরানো যায়।”

পরিবারগুলি এখন শুধু একটি জিনিস চাইছে প্রিয়জনদের দেহ যেন দ্রুত দেশে আনা হয়, যাতে ধর্মীয় নিয়মে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা যায়।

উমরাহ মৌসুমে বারবার দুর্ঘটনা কোথায় নিরাপত্তার ঘাটতি

মক্কা মদিনা সড়কটি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ধর্মীয় যাত্রাপথ। বছরে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই পথে যাতায়াত করেন। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে এই রুটে বহু দুর্ঘটনা ঘটেছে।
সম্ভাব্য কারণগুলির মধ্যে রয়েছে

দুর্ঘটনার রাতে চালক ক্লান্ত ছিলেন কি না, বা কোনও প্রযুক্তিগত ত্রুটি ছিল কি না তা এখনও তদন্তাধীন। তেলঙ্গানা ও ভারত সরকার এই বিষয়ে সৌদি সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে।

উদ্ধারকাজে সৌদি প্রশাসনের ভূমিকা

দুর্ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স, রেড ক্রিসেন্ট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। কিন্তু আগুনের তীব্রতার কারণে যাত্রীদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি। মরুভূমির বাতাস আগুন ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করে, ফলে বাস সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।

উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে রাতে ভারী যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ ও যাত্রীবাহী বাসের নিয়মিত পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি।

মক্কা থেকে মদিনার যাত্রাপথ পবিত্র কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ

মক্কা মদিনা মহাসড়ক একটি চওড়া, কিন্তু প্রধানত জনবিরল রাস্তা। রাতের বেলায় চালকের ক্লান্তি, যানবাহনের বেশি গতি এবং দু’দিক থেকে আসা আলো চোখ ধাঁধিয়ে দেয় যার ফলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বাড়ে।

উমরাহ মৌসুমে অনেক ট্যুর অপারেটরই অল্প খরচে বেশি যাত্রী পরিবহনের চেষ্টা করেন। এতে নিরাপত্তা নিয়ম ভাঙা হয়, বাসের রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা থাকে, চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়া হয় না। এসবই দুর্ঘটনার পরপরই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

দুর্ঘটনার সামাজিক প্রভাব  একাধিক পরিবারে শোকের ছায়া

এক বাসে ৪২ প্রাণহানি মানে ৪২ পরিবারে স্থায়ী অসহায়তা নেমে আসা। মৃতরা ছিলেন

  • কেউ শ্রমিক

  • কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী

  • কেউ গৃহবধূ

  • কেউ ছিলেন বৃদ্ধ, যাঁরা জীবনের শেষ প্রান্তে গিয়ে মনোকামনা পূরণ করতে চেয়েছিলেন

অনেক পরিবারে রোজগারের প্রধান সদস্যই মারা গেছেন। অনেক সন্তান পিতাহারা বা মাতৃহারা হয়েছেন। তেলঙ্গানার শুধু একটি এলাকায় দশাধিক পরিবার একই সঙ্গে শোকে নিমজ্জিত এমন আতঙ্কজনক পরিণতি তাদের ভবিষ্যতের উপর চরম প্রভাব ফেলবে।

পরিবারের আকুতি দেহ দ্রুত দেশে ফেরানোর দাবি

মৃতদেহগুলির অবস্থা দেখে শনাক্তকরণ কঠিন। অনেক পরিবার DNA নমুনা পাঠানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সবাই চাইছেন যেন দ্রুত দেহ দেশে পাঠানো হয়।

ভারত সরকারের সহযোগিতা বিশেষ বিমানের সম্ভাবনা

দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, শনাক্তকরণ শেষ হলেই দেহগুলি বিশেষ বিমানে বা কার্গো বিমানের মাধ্যমে ভারতে পাঠানো হবে। এই প্রক্রিয়া কয়েক দিন লাগতে পারে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সমস্ত ব্যয়ভার বহনের সম্ভাবনা রয়েছে।

উপসংহার অতলান্ত শোকের মাঝেও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে

এই দুর্ঘটনা শুধু একটি বার্তা দিয়েছে ধর্মীয় যাত্রা যতই পবিত্র হোক, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে প্রতিটি সফরই মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে থাকে। ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এড়াতে

  • পর্যাপ্ত যানবাহন পরীক্ষা

  • চালকের বিশ্রাম নিশ্চিত করা

  • রাতের যাত্রায় সতর্কতা

  • নিরাপত্তাবিধি শক্ত করা

  • ট্যুর অপারেটরদের জন্য কঠোর নিয়ম
    এসব জারি করা অত্যন্ত জরুরি

৪২টি প্রাণ হারানোর এই ঘটনা বহু পরিবারকে চিরকালের জন্য শোকের অন্ধকারে নিমজ্জিত করল ধর্মীয় সফর করতে এসে যাঁরা আর ঘরে ফিরলেন না তাঁদের স্মৃতি আজ শুধু পরিবার নয়, গোটা দেশকে ব্যথিত করছে

Preview image