Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

খুদেদের মুখে হাসি ফেরাতে মুর্শিদাবাদের বইমেলায় উদয় থানার বড়বাবুর মানবিক উদ্যোগ

টাকার অভাবে বই কিনতে না পেরে হতাশ খুদেরাদের মুখে হাসি ফেরালেন কান্দি থানার আইসি

বইমেলা মানেই শুধু বই কেনাবেচার জায়গা নয়। বইমেলা আসলে স্বপ্ন দেখার জায়গা। নতুন গল্পের খোঁজ, অজানা জগতের সঙ্গে পরিচয়, আর নিজের মতো করে ভাবার স্বাধীনতা শেখার এক অনন্য ক্ষেত্র। ছোট থেকে বড় সকল বয়সের মানুষই বইমেলায় এসে কিছু না কিছু খুঁজে পান। কেউ খোঁজেন প্রিয় লেখকের নতুন বই, কেউ আবার প্রথমবারের মতো নিজের পছন্দের বইয়ের স্বাদ নিতে চান। কিন্তু এই আনন্দের জগতেও কখনও কখনও বাস্তবের কঠিন সত্য এসে দাঁড়ায় অর্থের অভাবে।

ঠিক তেমনই একটি ছবি উঠে এল কান্দি মহকুমা বইমেলায়। কয়েকজন খুদে পড়ুয়া বইয়ের স্টল থেকে স্টলে ঘুরছেন। চোখে আগ্রহ, মুখে বিস্ময়, হাতে বই উল্টে দেখা। কিন্তু সেই বই কেনার মতো টাকা নেই পকেটে। অনেকক্ষণ ধরেই তাঁরা বই দেখছিলেন, ইচ্ছে হচ্ছিল কিনবেন, কিন্তু সাধ্য ছিল না। বাড়িতে জানালেও বই কেনার জন্য আলাদা করে টাকা দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে মন খারাপ নিয়েই বইমেলায় ঘোরাফেরা করছিল তারা।

এই খুদেদের মধ্যে ছিলেন কান্দি শহরের বিজয়নগরের সপ্তম শ্রেণির পড়ুয়া রামকৃষ্ণ মণ্ডল এবং কল্যাণপুর এলাকার অষ্টম শ্রেণির ছাত্র রূপঙ্কর মণ্ডল। তাঁদের সঙ্গে আরও কয়েকজন ছাত্রও ছিল। সকলেরই চোখে ছিল বই কেনার আগ্রহ, কিন্তু পকেট ছিল শূন্য। বইমেলার আনন্দ যেন তাঁদের কাছে অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছিল।

ঠিক সেই সময়েই ঘটে যায় এক মানবিক ঘটনা। বইমেলার মধ্যেই খুদেরা সাহস করে গিয়ে হাজির হয় পুলিশের কাছে। এলাকার মানুষ যাঁকে স্নেহ করে পুলিশ জেঠু বলে ডাকেন, সেই মানুষটি আর কেউ নন, কান্দি থানার আইসি মৃণাল সিনহা। পড়ুয়ারা সরাসরি তাঁর কাছে গিয়ে জানায় যে তারা বই কিনতে চায়, কিন্তু টাকার অভাবে পারছে না।

খুদেদের কথা শুনে কোনও দ্বিধা না করেই আইসি মৃণাল সিনহা তাঁদের সঙ্গে নিয়ে যান বইয়ের স্টলে। তিনি নিজে হাতে বেছে বেছে বই কিনে দেন। একটি বা দুটি নয়, এক ডজন করে বই কিনে দেওয়া হয় কয়েকজন পড়ুয়াকে। যে বইগুলোর দিকে এতক্ষণ ধরে তাকিয়ে ছিল তারা, সেগুলিই এবার তাদের হাতে এসে পৌঁছয়।

এই ঘটনার পর পড়ুয়াদের মুখে যে হাসি ফুটে ওঠে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। বই হাতে পেয়ে তাদের চোখে ছিল আনন্দের ঝিলিক, মুখে ছিল বিস্ময় আর কৃতজ্ঞতা। মুহূর্তের মধ্যেই বইমেলার সেই কোণ যেন আনন্দে ভরে ওঠে। পাশে থাকা অভিভাবক এবং বই বিক্রেতারাও এই দৃশ্য দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।

এই ঘটনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে গোটা বইমেলা প্রাঙ্গণে। উপস্থিত সাধারণ মানুষ পুলিশের এই মানবিক উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান। অনেকেই বলেন, পুলিশের কাজ শুধু আইন রক্ষা নয়, সমাজের পাশে দাঁড়ানোও তাদের দায়িত্ব। এই ঘটনায় সেটাই আবার প্রমাণিত হল।

এলাকার বাসিন্দাদের মতে, বর্তমান সময়ে যখন পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নানা আলোচনা চলে, তখন এমন ঘটনা সমাজে ইতিবাচক বার্তা দেয়। খুদেরা আজ যে বইগুলো হাতে পেল, সেগুলো শুধু কাগজের পাতায় বাঁধা গল্প নয়। এগুলো তাদের ভবিষ্যতের পথ দেখাতে পারে, নতুন চিন্তা শেখাতে পারে, আর বড় স্বপ্ন দেখার সাহস জোগাতে পারে।

শিক্ষাবিদদের একাংশ মনে করছেন, এই ধরনের উদ্যোগ শিশুদের মধ্যে বইপড়ার আগ্রহ বাড়াতে সাহায্য করে। অনেক সময় প্রতিভা শুধু সুযোগের অভাবে সামনে আসতে পারে না। একটি বই হয়তো কারও জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। সেই সুযোগটাই করে দিলেন আইসি মৃণাল সিনহা।

বইমেলার মতো জায়গায় এই ধরনের মানবিক আচরণ সমাজে এক আলাদা দৃষ্টান্ত তৈরি করে। খুদেদের কাছে পুলিশ মানে শুধু ভয় বা শাসন নয়, বরং ভরসার জায়গা হয়ে উঠতে পারে, সেই বার্তাই স্পষ্টভাবে উঠে এল এই ঘটনায়।

এই পড়ুয়ারা হয়তো আগামী দিনে বড় হয়ে মনে রাখবে সেই দিনের কথা। মনে রাখবে কীভাবে একজন পুলিশ অফিসার তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। হয়তো সেই স্মৃতিই তাদের জীবনে মানবিক হতে শেখাবে, অন্যের পাশে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, কান্দি মহকুমা বইমেলায় এই ঘটনা শুধু কয়েকটি বই কেনার ঘটনা নয়। এটি মানবিকতার গল্প, দায়িত্ববোধের গল্প এবং সমাজের প্রতি এক নিঃশব্দ দায়বদ্ধতার ছবি। বইমেলার ভিড়ে দাঁড়িয়ে পুলিশের এই মানবিক মুখ আরও একবার প্রমাণ করে দিল, সামান্য সহানুভূতিই কারও জীবনে বড় আনন্দ এনে দিতে পারে।

এই ঘটনার তাৎপর্য কেবল কয়েকজন খুদের হাতে বই তুলে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধের একটি গভীর বার্তা। বর্তমান সময়ে যখন ছোটদের বড় অংশ মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল পর্দার প্রতি বেশি আকৃষ্ট, তখন বইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি করা সহজ কাজ নয়। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে এই ধরনের মানবিক উদ্যোগ শিশুদের বইমুখী করতে বিশেষ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।

news image
আরও খবর

খুদেদের অনেকেই বইমেলায় আসে বাবা মায়ের হাত ধরে। কিন্তু সব পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা একরকম নয়। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা সংসারের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে অতিরিক্ত খরচ করতে পারেন না। ফলে শিশুদের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বই কেনা হয়ে ওঠে না। এই পরিস্থিতিতে বইমেলায় এসে শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে বই দেখা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না খুদেরদের। এমন মুহূর্তে কেউ যদি পাশে এসে দাঁড়ায়, তবে সেই অভিজ্ঞতা আজীবনের স্মৃতি হয়ে থেকে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, কান্দি থানার আইসি মৃণাল সিনহা এর আগেও নানা সময়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কখনও অসহায় পরিবারের পাশে গিয়ে সাহায্য করেছেন, কখনও আবার পড়ুয়াদের পড়াশোনার বিষয়ে উৎসাহ দিয়েছেন। বইমেলার এই ঘটনাও তাঁর সেই মানবিক মানসিকতারই আরেকটি উদাহরণ বলে মনে করছেন অনেকে।

বই হাতে পাওয়ার পর খুদেরদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ কেউ সঙ্গে সঙ্গে বইয়ের পাতা উল্টে দেখতে শুরু করে দেয়। কেউ আবার আনন্দে বন্ধুদের দেখাতে থাকে নিজের পাওয়া বই। বইয়ের নাম, লেখকের পরিচয়, ছবিগুলো দেখিয়ে তারা যেন নিজেদের মধ্যে ছোটখাটো উৎসবেই মেতে ওঠে। বইমেলার ভিড়ের মধ্যেও এই দৃশ্য সকলের নজর কাড়ে।

বই বিক্রেতারাও এই ঘটনায় খুশি হন। তাঁদের মতে, বইমেলার আসল সার্থকতা তখনই হয়, যখন বই প্রকৃত পাঠকের হাতে পৌঁছয়। আর সেই পাঠক যদি শিশু হয়, তবে তার গুরুত্ব আরও বেশি। অনেক বিক্রেতাই জানান, এই ধরনের ঘটনা তাঁদেরও অনুপ্রাণিত করে ভবিষ্যতে শিশুদের জন্য বিশেষ ছাড় বা উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবতে।

অভিভাবকদের একাংশ বলছেন, পুলিশের এই মানবিক ভূমিকা শিশুদের মনে পুলিশের প্রতি আস্থা বাড়াবে। অনেক সময় শিশুমনে পুলিশের প্রতি অযথা ভয় তৈরি হয়। কিন্তু এমন ঘটনায় তারা বুঝতে পারে পুলিশ শুধু শাসনের প্রতীক নয়, বরং প্রয়োজনে ভরসার জায়গাও হতে পারে। এই বিশ্বাস সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সমাজকর্মীদের মতে, বই কেনার মতো ছোট উদ্যোগও সমাজে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। একটি বই একজন শিশুর চিন্তাভাবনার জগৎ বদলে দিতে পারে। নতুন প্রশ্ন করতে শেখাতে পারে। নিজের স্বপ্নকে চিনতে সাহায্য করতে পারে। সেই সুযোগটাই তৈরি করে দিল এই ঘটনা।

এলাকার কয়েকজন শিক্ষকও এই ঘটনাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই পড়ার অভ্যাস শিশুদের ভাষাজ্ঞান, কল্পনাশক্তি এবং বিশ্লেষণ ক্ষমতা বাড়ায়। অনেক সময় স্কুলের পড়ার চাপে এই অভ্যাস তৈরি হয় না। বইমেলার মতো জায়গা সেই অভ্যাস তৈরির জন্য আদর্শ। সেখানে যদি এমন মানবিক সহযোগিতা যোগ হয়, তাহলে তা শিশুদের মনে বইয়ের প্রতি ভালোবাসা আরও গভীর করে।

এই ঘটনার পর বইমেলায় উপস্থিত অনেকেই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে শুরু করেন। কেউ বলেন, এমন উদ্যোগ যদি আরও ছড়িয়ে পড়ে, তবে বইমেলার আনন্দ অনেক বেশি অর্থবহ হয়ে উঠবে। কেউ আবার বলেন, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ যদি নিজেদের মতো করে শিশুদের পাশে দাঁড়ান, তবে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব।

বইমেলার দিন শেষ হলেও এই ঘটনার রেশ থেকে যাবে দীর্ঘদিন। আজ যারা বই হাতে ফিরল, তারা হয়তো আগামী দিনে আবার বইমেলায় আসবে আরও বেশি আগ্রহ নিয়ে। হয়তো নিজের পছন্দের লেখকের খোঁজ করবে। হয়তো সেই বই থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়ে নিজের জীবনের পথ খুঁজে নেবে।

এই মানবিক ঘটনাটি আরও একবার মনে করিয়ে দেয়, সমাজ বদলাতে সব সময় বড় উদ্যোগের প্রয়োজন হয় না। কখনও কখনও ছোট একটি সহানুভূতির কাজই বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। কয়েকটি বই, কিছু সময় আর আন্তরিক মনোভাব মিলিয়ে যে আনন্দ তৈরি হয়, তা বহুদিন মনে থেকে যায়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, কান্দি মহকুমা বইমেলায় পুলিশের এই উদ্যোগ শুধুই একটি দান বা সাহায্য নয়। এটি এক ধরনের সামাজিক বার্তা। যেখানে বলা হচ্ছে, শিশুদের স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তাদের আগ্রহকে সম্মান করা দরকার। বইয়ের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করতে সবাইকেই নিজের জায়গা থেকে ভূমিকা নিতে হবে।

এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট হল, বই সত্যিই প্রকৃত বন্ধু। আর সেই বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে যদি কেউ এগিয়ে আসে, তবে তার প্রভাব শুধু কয়েকজন শিশুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তা ছড়িয়ে পড়ে গোটা সমাজে। মানবিকতার এই ছোট গল্পই হয়তো আগামী দিনে আরও অনেককে অনুপ্রাণিত করবে একই পথে হাঁটতে।

Preview image