Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

শনিবারের মহারণ আমেরিকার বিরুদ্ধে সূর্যদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু

আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে ভিডিয়ো বিশ্লেষণ করে তৈরি সূর্যকুমাররা  ভারসাম্যপূর্ণ একাদশ নামানোর সম্ভাবনা ভারতের

২০ ওভারের বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই বড় ধাক্কা খেল ভারতীয় শিবির। গুরুতর চোটের কারণে টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে গিয়েছেন তরুণ পেসার হর্ষিত রানা। যাঁকে ঘিরে বোলিং আক্রমণে নতুন পরিকল্পনা সাজানো হয়েছিল, তাঁর না থাকা নিঃসন্দেহে দলের জন্য বড় ক্ষতি। তবে সেই ধাক্কা সামলে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করতে প্রস্তুত সূর্যকুমার যাদবের নেতৃত্বাধীন ভারত।

শনিবার বিশ্বকাপের প্রথম দিনে ভারতের প্রতিপক্ষ আমেরিকা। কাগজে-কলমে শক্তির বিচারে এগিয়ে থাকলেও প্রতিপক্ষকে হালকা ভাবে নিতে নারাজ টিম ইন্ডিয়া। আধুনিক ক্রিকেটে ভিডিও বিশ্লেষণ যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা মাথায় রেখেই আমেরিকার ম্যাচ ফুটেজ খুঁটিয়ে দেখে প্রস্তুতি সেরেছেন সূর্যকুমার ও তাঁর সতীর্থরা।


সূর্যকুমারের নেতৃত্বে নতুন অধ্যায়

এই বিশ্বকাপ ভারতের কাছে শুধুই আরেকটি ট্রফির লড়াই নয়। ইতিহাস গড়ার হাতছানি রয়েছে সূর্যদের সামনে। এখনও পর্যন্ত কোনও দল টানা দু’বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। গতবারের চ্যাম্পিয়ন ভারত চাইবে সেই নজির ভাঙতে। আর সেই লক্ষ্যেই নতুন নেতৃত্বে, নতুন কম্বিনেশনে আত্মবিশ্বাসী যাত্রা শুরু করছে দল।

সূর্যকুমার যাদব নিজে সাম্প্রতিক টি-টোয়েন্টি সিরিজ়ে ফর্মে ফিরেছেন। নিউ জিল্যান্ডের বিরুদ্ধে তাঁর ব্যাটে ঝরেছে রান, যা অধিনায়ক হিসেবে তাঁকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। মাঠের ভেতরে তাঁর আগ্রাসী মানসিকতা এবং স্বাধীন ক্রিকেট দর্শনই এই দলের মূল শক্তি।


ওপেনিং জুটি নিয়ে জল্পনার অবসান

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচের আগে ওপেনিং জুটি নিয়ে যে জল্পনা চলছিল, তাতে নিজেই ইতি টেনেছেন সূর্যকুমার। শুক্রবার সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, আমেরিকার বিরুদ্ধে ইনিংস শুরু করবেন ঈশান কিশন এবং অভিষেক শর্মা। ফলে ওপেনিং নিয়ে আর কোনও ধোঁয়াশা থাকল না।

ঈশান কিশন অভিজ্ঞতা ও আগ্রাসনের মিশেল। পাওয়ারপ্লেতে ম্যাচের রং বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। অন্যদিকে অভিষেক শর্মা তরুণ হলেও আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ভয়ডরহীন ব্যাটিংয়ের জন্য পরিচিত। বাঁহাতি-বাঁহাতি জুটি হলেও দু’জনের স্ট্রোকপ্লে এবং মানসিকতা আলাদা, যা বোলারদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।


তিন ও চার নম্বরে ভরসার নাম

তিন নম্বরে ব্যাট করার সম্ভাবনা চোট সারিয়ে ফেরা তিলক বর্মার। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে প্রস্তুতি ম্যাচে তিনি যে আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছেন, তা টিম ম্যানেজমেন্টের চোখে পড়েছে। মিডল অর্ডারে স্থিতি আনার পাশাপাশি প্রয়োজনে রান গতিও বাড়াতে পারেন তিলক।

চার নম্বরে থাকবেন অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব। এই পজিশনেই তিনি সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ। স্পিন হোক বা পেস, সব ধরনের বোলিংয়ের বিরুদ্ধে সমান সাবলীল সূর্য। দলের ব্যাটিংয়ের ছন্দ নির্ধারণে তাঁর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


অলরাউন্ডারদের উপর ভরসা

পাঁচ নম্বরে হার্দিক পাণ্ড্যকে দেখা যেতে পারে। পুরো ফিট না থাকলেও তাঁর অভিজ্ঞতা এবং ম্যাচ ঘোরানোর ক্ষমতা দলের কাছে অমূল্য। ব্যাট হাতে দ্রুত রান তোলার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে জোরে বোলিং আক্রমণেও সাহায্য করবেন হার্দিক।

ছয় নম্বরে সহ-অধিনায়ক অক্ষর পটেল। বাঁহাতি ব্যাটসম্যান হিসেবে স্পিনের বিরুদ্ধে কার্যকর এবং বোলিংয়ে কন্ট্রোল ধরে রাখার ক্ষেত্রে অক্ষর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাত নম্বরে শিবম দুবে—আর এক অলরাউন্ডার, যিনি মাঝের ওভারে বড় শট খেলতে পারেন।


টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ম্যাচ জেতা-হারার ফয়সালা অনেক সময়ই শেষ কয়েক ওভারে হয়। আর ঠিক সেই জায়গাতেই ভারতের জন্য অন্যতম বড় ভরসার নাম রিঙ্কু সিংহ। আমেরিকার বিরুদ্ধে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে আট নম্বরে ব্যাট করতে দেখা যেতে পারে এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যানকে। ব্যাটিং অর্ডারে তাঁর জায়গা যতই নিচে হোক, ম্যাচে তাঁর গুরুত্ব কোনও অংশেই কম নয়।

আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্সের জার্সিতে একাধিকবার অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন রিঙ্কু। শেষ ওভারে পাঁচ কিংবা ছয়টা ছক্কা—এই ধরনের নাটকীয় ইনিংসই তাঁকে পরিচিতি দিয়েছে ‘ফিনিশার’ হিসেবে। সেই অভিজ্ঞতাই বিশ্বকাপের মঞ্চে কাজে লাগাতে চাইছে ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট।

রিঙ্কুর সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর মানসিক দৃঢ়তা। বড় ম্যাচ, বড় চাপ—এই দু’টো বিষয় তাঁকে বিচলিত করে না। উইকেট পড়ে যাওয়ার পর বা রান রেট বেড়ে গেলে অনেক ব্যাটসম্যান যেখানে অস্থির হয়ে পড়েন, সেখানে রিঙ্কু পরিস্থিতি বুঝে খেলতে জানেন। কখন ঝুঁকি নিতে হবে, আর কখন স্ট্রাইক ধরে রাখতে হবে—এই ক্রিকেটিং বুদ্ধিটাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।

বিশ্বকাপে ভারতের ব্যাটিং গভীরতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে রিঙ্কুর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টপ অর্ডার যদি দ্রুত রান তোলে, তবে রিঙ্কু শেষ দিকে নির্ভার হয়ে খেলতে পারবেন। আবার প্রাথমিক ধাক্কা এলে, তিনিই হতে পারেন ইনিংস টেনে নেওয়ার শেষ ভরসা। সূর্যকুমার যাদবের দলের কাছে এটাই সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা।


বোলিং আক্রমণ: পেস ও স্পিনের নিখুঁত ভারসাম্য

আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে ভারতের বোলিং আক্রমণেও দেখা যেতে পারে ভারসাম্যের ছাপ। শেষ তিনটি জায়গা রাখা হয়েছে বিশেষজ্ঞ বোলারদের জন্য। সম্ভাব্য একাদশে থাকছেন অর্শদীপ সিংহ, জসপ্রীত বুমরাহ এবং বরুণ চক্রবর্তী। এই তিনজনকে ঘিরেই মূল বোলিং পরিকল্পনা সাজিয়েছেন সূর্যকুমার যাদব।

news image
আরও খবর

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে নতুন বল এবং ডেথ ওভারের গুরুত্ব আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই। সেই দুই গুরুত্বপূর্ণ পর্বেই ভারতের প্রধান ভরসা অর্শদীপ-বুমরাহ জুটি।


অর্শদীপ-বুমরাহ: পেস আক্রমণের মেরুদণ্ড

জসপ্রীত বুমরাহ বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা পেসার। তাঁর ইয়র্কার, স্লোয়ার এবং লাইন-লেংথের বৈচিত্র্য যে কোনও ব্যাটিং লাইনআপকে সমস্যায় ফেলতে পারে। বিশেষ করে ডেথ ওভারে রান আটকে রাখার ক্ষেত্রে বুমরাহর জুড়ি মেলা ভার। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে তাঁর অভিজ্ঞতা ভারতের কাছে অমূল্য সম্পদ।

অন্যদিকে অর্শদীপ সিংহ বাঁহাতি পেসার হিসেবে বোলিং আক্রমণে ভিন্নতা এনে দেন। নতুন বলে সুইং করানো এবং ডেথ ওভারে সঠিক ইয়র্কার ফেলতে পারা—দু’দিকেই তিনি কার্যকর। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে বাঁহাতি পেসারের গুরুত্ব আলাদা, আর সেই ভূমিকাটা নিখুঁত ভাবে পালন করে চলেছেন অর্শদীপ।

হার্দিক পাণ্ড্য এবং শিবম দুবের মতো অলরাউন্ডাররা থাকায় পেস আক্রমণে সূর্যের হাতে আরও বিকল্প থাকবে। প্রয়োজনে মাঝের ওভারে হার্দিককে আক্রমণে এনে ব্রেকথ্রু আনার পরিকল্পনাও থাকতে পারে।


স্পিন বিভাগে রহস্যের ছোঁয়া

স্পিন আক্রমণে ভারতের সবচেয়ে বড় অস্ত্র বরুণ চক্রবর্তী। তাঁর বোলিংয়ের রহস্য এখনও পুরোপুরি ভেদ করতে পারেননি অনেক ব্যাটসম্যান। ক্যারম বল, ফ্ল্যাট ডেলিভারি আর হালকা গতির পরিবর্তন—সব মিলিয়ে বরুণ টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে কার্যকর এক স্পিনার।

আমেরিকার মতো তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ দলের বিরুদ্ধে বরুণের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। মাঝের ওভারে উইকেট তুলে নিয়ে প্রতিপক্ষের রানের গতি আটকে দেওয়াই হবে তাঁর মূল কাজ।

বরুণের সঙ্গে স্পিনে সহায়তা করবেন অক্ষর পটেল এবং তিলক বর্মা। অক্ষর লাইন-লেংথে ধারাবাহিক এবং রান কম দেওয়ার জন্য পরিচিত। তিলক পার্টটাইম স্পিনার হলেও প্রয়োজনের সময় গুরুত্বপূর্ণ ওভার দিতে পারেন।

সবচেয়ে বড় কথা, সূর্যকুমারের হাতে রয়েছে একাধিক বোলিং অপশন। প্রয়োজনে অভিষেক শর্মা বা রিঙ্কু সিংহকেও ব্যবহার করা যেতে পারে। আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এই ধরনের ফ্লেক্সিবিলিটিই দলকে বাড়তি সুবিধা দেয়।


উপসংহার

ফিনিশিং থেকে শুরু করে পেস-স্পিনের ভারসাম্য—সব দিক থেকেই ভারতের দল গঠন বেশ পরিণত। রিঙ্কু সিংহের মতো ঠান্ডা মাথার ফিনিশার এবং বুমরাহ-বরুণদের মতো ম্যাচ-উইনার বোলার থাকায় আত্মবিশ্বাসী সূর্যকুমার যাদবের দল। আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচেই সেই শক্তির ঝলক দেখাতে চাইবে ভারত।

সব মিলিয়ে, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের দল গঠন দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায় পরিকল্পনার কোনও ঘাটতি রাখতে চাননি সূর্যকুমার যাদব ও টিম ম্যানেজমেন্ট। ব্যাটিং গভীরতা থেকে শুরু করে বোলিং আক্রমণের বৈচিত্র্য—প্রতিটি বিভাগেই ভারসাম্যের ছাপ স্পষ্ট। টপ অর্ডারের আগ্রাসন, মিডল অর্ডারের স্থিতি এবং শেষের দিকে রিঙ্কু সিংহের মতো ঠান্ডা মাথার ফিনিশার থাকায় ভারত যে কোনও ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা রাখে।

বিশেষ করে রিঙ্কুর উপস্থিতি ভারতের ব্যাটিং লাইনআপকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। চাপের মুখে শান্ত থাকা, পরিস্থিতি বুঝে শট নির্বাচন করা এবং শেষ ওভারে বড় রান তোলার ক্ষমতা তাঁকে দলের অপরিহার্য অংশ করে তুলেছে। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এই মানসিক দৃঢ়তাই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।

বোলিং বিভাগেও ভারতের শক্তি কম নয়। জসপ্রীত বুমরাহর নেতৃত্বে পেস আক্রমণ নতুন বল এবং ডেথ ওভারে প্রতিপক্ষের উপর লাগাম টানতে সক্ষম। তাঁর সঙ্গে অর্শদীপ সিংহ বাঁহাতি পেসার হিসেবে ভিন্নতা এনে দেন। মাঝের ওভারে বরুণ চক্রবর্তীর রহস্যময় স্পিন আবার ব্যাটসম্যানদের চাপে রাখবে। অক্ষর পটেল ও তিলক বর্মার মতো বিকল্প থাকায় স্পিন বিভাগেও নমনীয়তা রয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা, এই দলটির হাতে একাধিক ম্যাচ-উইনার রয়েছে। ব্যাটে সূর্যকুমার যাদব, হার্দিক পাণ্ড্য কিংবা ঈশান কিশনের আগ্রাসন যেমন ম্যাচের মোড় ঘোরাতে পারে, তেমনই বল হাতে বুমরাহ বা বরুণ যে কোনও সময় প্রতিপক্ষকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিতে পারেন। অধিনায়ক হিসেবে সূর্যর স্বাধীন চিন্তাভাবনা এবং সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিকতা এই দলকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।

আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচ তাই ভারতের কাছে শুধুই গ্রুপ পর্বের একটি লড়াই নয়, বরং গোটা টুর্নামেন্টের সুর বেঁধে দেওয়ার সুযোগ। শক্তির ঝলক দেখিয়ে জয় দিয়ে অভিযান শুরু করতে পারলে, নজির গড়ার স্বপ্ন আরও দৃঢ় হবে সূর্যকুমার যাদবদের সামনে।

Preview image