রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্তোনিয়ো গুতেরেস হাদি হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা করে বিবৃতি দিয়েছেন তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানান একই সঙ্গে আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বাংলাদেশকে সংযত থাকতে, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং যে কোনও ধরনের উত্তেজনা ও সহিংসতা এড়াতে আহ্বান জানিয়েছেন
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক এবং জনপ্রিয় ছাত্রনেতা ওসমান হাদির মৃত্যুর পর দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা দ্রুতই সহিংসতার দিকে গড়িয়েছে এমন অভিযোগ ও প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপুঞ্জ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতি জারি করেছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের অবস্থান একদিকে স্পষ্ট, অন্যদিকে সংযত ভাষায় ভারসাম্যপূর্ণ: হাদির হত্যার নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ তদন্ত প্রয়োজন; পাশাপাশি, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সম্ভাব্য সাধারণ নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে সব পক্ষকে সংযম দেখাতে হবে এবং সহিংসতার পথ ত্যাগ করতে হবে। এই দ্বিমুখী বার্তাই মূলত রাষ্ট্রপুঞ্জের উদ্বেগকে তুলে ধরে সত্য উদঘাটনের প্রয়োজন এবং একই সঙ্গে দেশের স্থিতিশীলতা ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনপরিবেশ বজায় রাখার তাগিদ।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হন ওসমান হাদি। আহত অবস্থায় সরকারি উদ্যোগে তাঁকে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। টানা কয়েক দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর শেষ পর্যন্ত তিনি মারা যান বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর মৃত্যুসংবাদ প্রকাশ্যে আসে। হাদির মৃত্যু শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি দ্রুতই একটি বৃহত্তর সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। কারণ, তিনি ছাত্ররাজনীতিতে পরিচিত মুখ এবং একটি আন্দোলনঘন সময়ে তাঁর মৃত্যু দেশজুড়ে ক্ষোভকে তীব্র করে তুলেছে।
হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ জোরদার হয়। এক পর্যায়ে, সেই বিক্ষোভের কিছু অংশ সহিংস রূপ নেয় এমন অভিযোগ ওঠে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সংগঠিত জনরোষে’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একাধিক সরকারি ভবন, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, রাজনৈতিক কার্যালয় এবং দেশের দুই উল্লেখযোগ্য সংবাদমাধ্যমের দফতর। এই ঘটনাগুলি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে, কারণ এতে একদিকে যেমন আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে তেমনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও সংগঠিত উসকানির সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।
রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্তোনিয়ো গুতেরেস শুক্রবার রাতে হাদি হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করে বিবৃতি দেন। তাঁর বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তদন্তের মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা। তিনি বলেছেন, তদন্ত হতে হবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ এমন প্রক্রিয়া যাতে জনসাধারণ আস্থা রাখতে পারে এবং যেকোনও পক্ষের প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগ না ওঠে।
একই সঙ্গে গুতেরেসের বার্তায় একটি সময়-সংক্রান্ত চাপও স্পষ্ট কারণ সামনে নির্বাচন। গুতেরেস মনে করেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন মাথায় রেখে তদন্তপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা জরুরি। রাষ্ট্রপুঞ্জের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক নিউ ইয়র্কের সাংবাদিক বৈঠকে এ কথা জানিয়েছেন যে, রাষ্ট্রপুঞ্জ বাংলাদেশের পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে। অর্থাৎ, এটি কেবল উদ্বেগ প্রকাশ নয় আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণও বাড়ছে, এমন ইঙ্গিতও পাওয়া যায়।
রাষ্ট্রপুঞ্জের বিবৃতিতে সংযম শব্দটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ, বিক্ষোভের পরিবেশে সহিংসতা বাড়লে কয়েকটি ঝুঁকি একসঙ্গে তৈরি হয়
প্রাণহানি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি
রাজনৈতিক সংঘাতের মেরুকরণ
গুজব, বিদ্বেষমূলক প্রচার এবং উসকানির বিস্তার
সংবাদমাধ্যম, নাগরিক পরিসর ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর চাপ
নির্বাচনী পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা
গুতেরেসের ভাষায়, “নির্বাচনের উপযোগী শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য সমস্ত পক্ষকে হিংসা থেকে বিরত থাকতে হবে, উত্তেজনা কমাতে হবে এবং সংযত হতে হবে।” এখানে “সমস্ত পক্ষ” বলাটা খুব তাৎপর্যপূর্ণ এটি কেবল সরকার বা কেবল বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যে নয়; বরং রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন গোষ্ঠী, আন্দোলনকারী, প্রশাসন সবার প্রতিই একটি সাধারণ আহ্বান।
রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার সংক্রান্ত হাইকমিশনার ভলকার টার্কও বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে পৃথক বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি হাদির মৃত্যুসংবাদে ‘অত্যন্ত বিব্রত’ এ কথা জানিয়ে মূলত একটি মানবাধিকারভিত্তিক নৈতিক অবস্থান তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল প্রতিশোধ সমস্যার সমাধান নয়; প্রতিশোধ বিভেদকে আরও স্পষ্ট করে এবং সব পক্ষের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে।
এই কথার অর্থ দাঁড়ায়, কোনও ঘটনার পর ক্ষোভ স্বাভাবিক হলেও সহিংস প্রতিক্রিয়া শেষ পর্যন্ত সাধারণ নাগরিক, সাংবাদিক, সংখ্যালঘু বা দুর্বল গোষ্ঠীর নিরাপত্তাকেই বেশি বিপন্ন করে। ফলে, “কঠিন সময়ে সংযম প্রদর্শন” রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার ভাষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যেখানে বিচার, সত্য উদঘাটন ও শান্তিপূর্ণ নাগরিক পরিসর এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে দেখা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাদির মৃত্যুর পর দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংস ঘটনা ঘটেছে। কোথাও সরকারি স্থাপনায় হামলা, কোথাও রাজনৈতিক কার্যালয় ভাঙচুর, কোথাও সংবাদপত্রের দফতর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর সামনে এসেছে। এর সঙ্গে আরও গুরুতর অভিযোগও রয়েছে খুলনায় এক সাংবাদিককে হত্যা, এবং ময়মনসিংহে এক যুবককে মারধরের পর পুড়িয়ে খুনের অভিযোগ। এই ধরনের সংবাদ পরিস্থিতিকে শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, সামাজিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের দিক থেকেও খুব উদ্বেগজনক করে তোলে।
একটি দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশে সংবাদমাধ্যমের উপর আঘাত সবসময়ই একটি বড় সংকেত। কারণ সংবাদমাধ্যমকে কেন্দ্র করে দুইটি প্রশ্ন উঠে যায়
সত্য তথ্য পৌঁছানো কি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে?
জনমত গঠন ও স্বচ্ছতার প্রক্রিয়া কি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে?
যদি এই প্রশ্নগুলির উত্তর অনিশ্চিত হয়, তাহলে গণতন্ত্রের ন্যূনতম ভিত্তি দুর্বল হতে শুরু করে। তাই রাষ্ট্রপুঞ্জের উদ্বেগ শুধু একটি “হত্যাকাণ্ড” ঘিরে নয় বরং তার পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রব্যবস্থা, নাগরিক সমাজ ও নির্বাচনব্যবস্থার উপর যে চাপ তৈরি হচ্ছে, সেটাও বড় কারণ।
এই প্রেক্ষিতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিংসাত্মক কার্যকলাপের নিন্দা করে বিবৃতি দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে সরকারের ভূমিকা সাধারণত দুটি স্তরে পরীক্ষিত হয়
আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ, নাগরিক সুরক্ষা
বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করা দোষীদের চিহ্নিতকরণ, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিচারিক প্রক্রিয়া
রাষ্ট্রপুঞ্জের বার্তা সেই দ্বিতীয় স্তরটিকে বিশেষভাবে জোর দিয়েছে কারণ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত মানে শুধুমাত্র তদন্ত শুরু করলেই হবে না; তদন্তের প্রতিটি ধাপে বিশ্বাসযোগ্যতা থাকতে হবে।
রাষ্ট্রপুঞ্জ বারবার “নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ, মানবাধিকারসম্মত তদন্ত” এর উপর জোর দিচ্ছে কারণ, রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হত্যাকাণ্ডে তদন্তকে ঘিরে সাধারণত কয়েকটি সমস্যা দেখা যায়
তদন্ত রাজনৈতিক প্রভাবিত হওয়ার অভিযোগ
তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহ
দ্রুত ফল দেখানোর চাপের কারণে প্রক্রিয়াগত ত্রুটি
পক্ষ-বিপক্ষের প্রচারের লড়াইয়ে সত্য আড়ালে চলে যাওয়া
ফলে রাষ্ট্রপুঞ্জের দাবির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে একটি গ্রহণযোগ্য তদন্তপ্রক্রিয়া যাতে সমাজে আস্থা ফিরতে পারে। আস্থা না ফিরলে বিক্ষোভ ও প্রতিশোধস্পৃহা আরও বাড়তে পারে, যা দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাকে কঠিন করে তুলবে।
রাষ্ট্রপুঞ্জের বক্তব্যে নির্বাচন প্রসঙ্গটিও খুব স্পষ্টভাবে এসেছে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা। নির্বাচন মানেই শুধু ভোটের দিন নয়; এটি একটি দীর্ঘ প্রস্তুতি-পর্ব, যেখানে প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, সংবাদমাধ্যম, নাগরিক সমাজ সবাই যুক্ত থাকে।
যদি এই সময়টা সহিংসতায় আচ্ছন্ন হয়, তাহলে কয়েকটি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে
নির্বাচনী প্রচারে হামলা-সংঘর্ষের সম্ভাবনা
ভয়ভীতি, হুমকি বা প্রতিশোধের কারণে ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়া
নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনাস্থা
গুজব ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচার বৃদ্ধি
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে জরুরি বিধিনিষেধের আশঙ্কা
রাষ্ট্রপুঞ্জ তাই বলছে, “ভোটের কথা মাথায় রেখে” এখনই উত্তেজনা কমানো দরকার। এটি রাজনৈতিক বার্তা হলেও এর ভেতরে একটি বাস্তব প্রশাসনিক যুক্তিও আছে শান্তি ছাড়া নির্বাচনপ্রক্রিয়া বিশ্বাসযোগ্য রাখা কঠিন।
এই পরিস্থিতি থেকে বেরোতে সাধারণভাবে কয়েকটি দিককে একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হয়
তদন্তকে বিশ্বাসযোগ্য করা: স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা, সময়মতো অগ্রগতি এবং নিয়মিত তথ্য প্রকাশ যাতে গুজব কমে
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা: সহিংসতা বন্ধ করা, অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা, কিন্তু মানবাধিকারের সীমা মেনে চলা
সংলাপ ও উত্তেজনা প্রশমন: রাজনৈতিক শক্তি ও সামাজিক গোষ্ঠীগুলির মধ্যে আলোচনা, যাতে সংঘাত কমে
সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক পরিসর রক্ষা: সাংবাদিক ও সংবাদসংস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রাখা
নির্বাচনী প্রস্তুতি: নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে এমনভাবে প্রস্তুত করা যাতে সাধারণ মানুষ আস্থা পায়
রাষ্ট্রপুঞ্জের বক্তব্য মূলত এই দিকগুলিরই একটি সারসংক্ষেপ। তারা একদিকে বলছে হাদির হত্যা নিয়ে সত্য উদঘাটন জরুরি; অন্যদিকে বলছে—সেই সত্য উদঘাটনের পথে দেশ যেন সহিংসতার আগুনে পুড়ে না যায়।
ওসমান হাদির মৃত্যু-পরবর্তী বাংলাদেশে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা এখন কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয় আন্তর্জাতিক মহলের চোখেও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। রাষ্ট্রপুঞ্জের বিবৃতি তাই দ্বিমুখী নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি এবং সংযমের আহ্বান।
এখন পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে তা অনেকটাই নির্ভর করবে তদন্ত কতটা বিশ্বাসযোগ্য হয়, সহিংসতা কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে, এবং নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে আস্থা কতটা ফিরিয়ে আনা যায় তার উপর। রাষ্ট্রপুঞ্জের ভাষায় বলা যায়, সত্য ও শান্তি এই দুটোকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতেই হবে; একটিকে উপেক্ষা করলে অন্যটিও টেকসই হবে না।