রোমাঞ্চে ভরা পেনাল্টি শ্যুটআউটে পাঞ্জাব এফসি ৫-৪ গোলে পরাজিত করল বেঙ্গালুরু এফসি-কে, নিশ্চিত করল তাদের প্রথম সুপার কাপ সেমিফাইনাল স্থান। ম্যাচজুড়ে ছিল উত্তেজনা, সমানে সমান লড়াই এবং গোলের বন্যা শেষ পর্যন্ত ইতিহাস গড়ল পাঞ্জাবের ফুটবলাররা!
চণ্ডীগড়: ভারতীয় ফুটবলের মানচিত্রে এক নতুন অধ্যায় রচিত হলো বুধবার রাতে। পাঞ্জাব এফসি, যে দল এতদিন বড় টুর্নামেন্টে থেকেছে ছায়ায়, তারা এবার জ্বলজ্বল করে উঠল জাতীয় মঞ্চে। স্নায়ুযুদ্ধের পেনাল্টি শ্যুটআউটে দিগ্গজ বেঙ্গালুরু এফসিকে ৫-৪ গোলে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো সুপার কাপের সেমিফাইনালে প্রবেশ করল পাঞ্জাব — একটি জয় যা লেখা হবে পাঞ্জাবি ফুটবলের স্বর্ণাক্ষরে।
স্টেডিয়ামের ১৮,০০০ দর্শকের হৃদয়স্পন্দন যেন থেমে গিয়েছিল প্রতিটি পেনাল্টি কিকে। আর যখন পাঞ্জাবের গোলরক্ষক সর্বশেষ শটটি থামিয়ে দিলেন, পুরো স্টেডিয়াম পরিণত হলো উল্লাসের সমুদ্রে।
ম্যাচের শুরু থেকেই স্পষ্ট ছিল — এটা হবে কঠিন লড়াই। আইএসএল চ্যাম্পিয়ন বেঙ্গালুরু এফসি নামে মাঠে তাদের সমস্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে। প্রথমার্ধের প্রথম ২০ মিনিটেই তিনবার গোলমুখে হানা দেয় তারা, কিন্তু প্রতিবারই পাঞ্জাবের রক্ষণভাগ দাঁড়িয়ে যায় দেয়ালের মতো।
"আমরা জানতাম বেঙ্গালুরু চাপ সৃষ্টি করবে," বলেন পাঞ্জাবের কোচ স্তাভরোস গক্যাক্স। "কিন্তু আমাদের ছেলেরা আজ দেখিয়ে দিল — মনোবল থাকলে পাহাড়ও সরানো যায়।"
দ্বিতীয়ার্ধে খেলার চরিত্র বদলে যায়। পাঞ্জাব এবার শুরু করে পাল্টা আক্রমণ। ৬৮তম মিনিটে তাদের স্ট্রাইকার লুকা ডি লা টরের শটটি গোলবারে আছড়ে পড়ে — মাত্র ইঞ্চি কয়েক দূরত্বে গোল হলো না। বেঙ্গালুরুও পিছিয়ে নেই, তাদের রয় কৃষ্ণা ৮৩তম মিনিটে ফ্রি কিক থেকে প্রায় গোল করে ফেলেছিলেন, কিন্তু পোস্টে ঠেকে ফিরে আসে বল।
৯০ মিনিট শেষে স্কোর ০-০। অতিরিক্ত সময়েও গোল হয়নি। এবার পুরো সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে পেনাল্টি স্পটে।
পেনাল্টি শ্যুটআউট — ফুটবলের সবচেয়ে নির্মম, রোমাঞ্চকর মুহূর্ত। যেখানে একজন হিরো, আরেকজন ভিলেন।
প্রথম কিক — পাঞ্জাবের অধিনায়ক হরপ্রীত সিং নিখুঁত গোল করেন। বেঙ্গালুরু সমান করে। দ্বিতীয় রাউন্ডেও একই অবস্থা। তৃতীয় রাউন্ডে এসে নাটক শুরু হয়।
বেঙ্গালুরুর মিডফিল্ডার প্রানয় হালদার যখন কিক নিতে এগিয়ে যান, পুরো স্টেডিয়াম নিস্তব্ধ। কিন্তু পাঞ্জাবের তরুণ গোলরক্ষক রাবন কুমার — মাত্র ২৩ বছর বয়সী এই যুবক — ডান দিকে ঝাঁপ দিয়ে শটটি থামিয়ে দেন!
স্টেডিয়াম গর্জে ওঠে। পাঞ্জাব এগিয়ে ৪-৩। চতুর্থ রাউন্ডে উভয় দল গোল করে। এবার পঞ্চম ও শেষ রাউন্ড।
পাঞ্জাবের ডিফেন্ডার নিখিল পোওয়ার নির্ভুল শট — গোল! এখন সব চাপ বেঙ্গালুরুর উপর। তাদের স্ট্রাইকার সুনীল ছেত্রি যখন স্পটে দাঁড়ান — ইতিহাসের এই মুহূর্তে সবার চোখ তার দিকে। কিক করলেন ছেত্রি... এবং রাবন কুমার আবারও ঝাঁপ দেন — এবার বাঁ দিকে — এবং বল থামিয়ে দেন!
পাঞ্জাব জিতেছে! ৫-৪!
ম্যাচের পর ম্যান অফ দ্য ম্যাচ রাবন কুমার আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, "আজ আমার জীবনের সেরা দিন। কিন্তু এটা শুধু আমার জয় নয়, পুরো টিমের জয়। আমরা পাঞ্জাবের মানুষদের প্রমাণ করেছি — আমরাও পারি।"
পেনাল্টিতে দুটি সেভ করা এই তরুণ গোলরক্ষক রাতারাতি পাঞ্জাবের নতুন ফুটবল আইকন হয়ে উঠেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় #RabanTheLion হ্যাশট্যাগ ভাইরাল হচ্ছে।
হেরে যাওয়ার পরও বেঙ্গালুরুর কোচ মার্কো পেজাওলি পাঞ্জাবকে অভিনন্দন জানান। "ফুটবল এমনই। কখনো তুমি জিতবে, কখনো হারবে। কিন্তু পাঞ্জাব আজ দুর্দান্ত খেলেছে। তাদের অভিনন্দন।"
ভারতীয় সুপার লিগের অন্যতম শক্তিশালী দল বেঙ্গালুরু হলেও, আজকের রাতে তারা হার মেনেছে সম্মানের সঙ্গে।
পাঞ্জাব এফসি ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও, বড় টুর্নামেন্টে তাদের সাফল্য ছিল সীমিত। কিন্তু এই সিজনে তারা দেখিয়েছে নতুন মনোভাব, নতুন কৌশল।
"এই জয় পাঞ্জাবের ফুটবল ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে," বলেন ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কল্যাণ চৌবে। "তরুণ এই দল প্রমাণ করল, কঠোর পরিশ্রম ও বিশ্বাস থাকলে স্বপ্ন সত্যি হয়।"
সেমিফাইনালে পাঞ্জাবের মুখোমুখি হবে মোহন বাগান সুপার জায়ান্ট বা মুম্বাই সিটি এফসির মতো দলের সঙ্গে। যাই হোক, পাঞ্জাব এখন প্রমাণ করেছে — তারা যে কাউকে চ্যালেঞ্জ করতে প্রস্তুত।
"আমরা এখানে এসেছি স্বপ্ন নিয়ে," বলেন পাঞ্জাবের অধিনায়ক হরপ্রীত। "এবং এই স্বপ্ন এখনো শেষ হয়নি।"