U-23 বিশ্বচ্যাম্পিয়ন সুজিত কলকালকে ঘিরে এখন কুস্তি মহলে তুমুল আলোচনা। কারণ তাঁর লড়াইয়ের ধরন ভারতীয় প্রচলিত কুস্তি স্টাইলের সম্পূর্ণ বিপরীত। গতি, কৌশল, রিদম আর আক্রমণের নির্ভুল টাইমিং তাঁকে নতুন প্রজন্মের কুস্তিগীরদের অনুপ্রেরণা করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক স্তরে তাঁর আধুনিক ইউরোপীয়-আমেরিকান ঘরানার টেকনিক ভারতীয় কুস্তিকে নতুন এক পরিচয় দিচ্ছে।
নয়াদিল্লি, ২৮ অক্টোবর ভারতীয় কুস্তি দীর্ঘদিন ধরে শক্তি, গতি এবং ধৈর্যের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এক তরুণ কুস্তিগীর এই প্রচলিত ধারা ভেঙে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন— তিনি সুজিত কলকাল। U-23 বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদক জয়ের মাধ্যমে তিনি শুধু দেশের গর্ব বৃদ্ধি করেননি, বরং ভারতীয় কুস্তির শৈলীতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।
সুজিতের লড়াইয়ের ধরন এক কথায় 'ভারতীয় কুস্তির বিপরীত'। যেখানে প্রচলিত ভারতীয় ঘরানা নির্ভর করে শক্তিশালী ধাক্কা, ক্লিঞ্চ এবং প্রতিপক্ষকে ধরে-বেঁধে ফেলার কৌশলে— সেখানে সুজিত বিশ্বাস রাখেন গতি, বুদ্ধিমত্তা, দ্রুত মুভমেন্ট এবং ম্যাচের রিদম নিয়ন্ত্রণের উপর। তাঁর কুস্তির ধরন অনেকটাই ইউরোপ-আমেরিকান স্টাইলের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ— খোলা অবস্থান, দ্রুত পজিশন পরিবর্তন, ফেইন্ট কৌশলের ব্যবহার এবং আক্রমণে মুহূর্তের মধ্যে রিদম বদলে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করা।
কেন তাঁর স্টাইল ভিন্ন?
বিশ্লেষকরা বলছেন, সুজিতের কুস্তি পদ্ধতি ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় কৌশল থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন। তিনি ক্লোজ গ্রিপ এড়িয়ে ওপেন স্ট্যান্স ব্যবহার করেন, যা তাঁকে প্রতিপক্ষের চলাফেরা বিশ্লেষণ এবং পাল্টা আক্রমণের জন্য বেশি সময় দেয়। জোর করে ট্যাকডাউনের পরিবর্তে তিনি ফেইন্ট প্রয়োগ করে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ তৈরি করেন।
প্রতিপক্ষের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সঠিক মুহূর্তে আক্রমণ করার তাঁর ক্ষমতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। কেবল শারীরিক শক্তির উপর নির্ভর না করে টাইমিং এবং বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে তিনি ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাঁর এই ধরন ভারতীয় কুস্তিকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য আরও আধুনিক এবং প্রতিযোগিতামূলক করে তুলছে। বিশ্ব কুস্তিতে আজ যে গতি এবং কৌশলগত লড়াই প্রাধান্য পাচ্ছে, সুজিত সেই ধারাকে নিখুঁতভাবে আত্মস্থ করেছেন।
সুজিত ছোটবেলা থেকেই আন্তর্জাতিক ফরম্যাটের কুস্তি বিশ্লেষণ করে বড় হয়েছেন। ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ চ্যাম্পিয়নদের ম্যাচ ভিডিও দেখে তিনি নিজস্ব স্টাইল গড়ে তুলেছেন। তাঁর কোচিং টিম তাঁকে শক্তির পাশাপাশি কৌশলগত বুদ্ধিমত্তায় বিশ্বাস করতে উৎসাহিত করেছে।
U-23 বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে তাঁর প্রদর্শনী ছিল এক কথায় টেকনিক্যাল মাস্টারক্লাস। যেখানে অনেক কুস্তিগীর প্রতিপক্ষকে জোর করে চেপে ধরার চেষ্টা করেছিলেন, সেখানে সুজিত প্রতিপক্ষের পজিশনাল ভুল চিহ্নিত করে সেগুলিকে নিজের আক্রমণে রূপান্তরিত করেছেন।
তাঁর একজন প্রশিক্ষক জানিয়েছেন, "সুজিত শুধু প্রতিক্রিয়া দেখায় না, সে ম্যাচটা পড়ে। প্রতিটি মুভমেন্ট তার কাছে একটা তথ্য, যা সে পরবর্তী আক্রমণে কাজে লাগায়। এটাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি।"
ক্রীড়া বিশ্লেষক এবং প্রাক্তন কুস্তিগীররা মনে করছেন, সুজিতের স্টাইল পরবর্তী প্রজন্মের ভারতীয় কুস্তিগীরদের জন্য একটি নতুন পথ তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতীয় কুস্তির জন্য একটি ভিন্ন পরিচয় গড়ে উঠছে তাঁর মাধ্যমে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তিনি শুধু পদক জিতছেন না— একইসঙ্গে ভারতীয় কুস্তির মানসিকতা এবং প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনছেন। তরুণ কুস্তিগীররা এখন বুঝতে পারছেন যে শুধু শক্তি নয়, বুদ্ধিমত্তা এবং কৌশলও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতীয় কুস্তি এখন একটি বড় পরিবর্তনের মুখোমুখি। ঐতিহ্যবাহী শক্তি-নির্ভর কুস্তির পাশাপাশি কৌশলগত এবং গতি-নির্ভর আধুনিক ধারাও স্থান করে নিচ্ছে। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সুজিত কলকাল— যিনি শুধু বিজয় আনছেন না, ভারতীয় কুস্তির ভবিষ্যৎ নতুনভাবে রচনা করছেন।
জাতীয় কুস্তি ফেডারেশনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, "সুজিতের সাফল্য আমাদের প্রশিক্ষণ পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করতে উৎসাহিত করছে। আমরা এখন বুঝতে পারছি যে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আমাদের কৌশল আধুনিকীকরণ করতে হবে।"
সুজিত কলকালের এই যাত্রা শুধু একজন ক্রীড়াবিদের সাফল্যের গল্প নয়— এটি ভারতীয় কুস্তির বিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল। তাঁর অনুপ্রেরণায় নতুন প্রজন্মের কুস্তিগীররা হয়তো ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে এক নতুন ভারতীয় কুস্তির জন্ম দেবে, যা বিশ্বমঞ্চে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করবে।