Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

সাপকে আকর্ষণ করে এমন পাঁচটি গাছ, বাগানে লাগালে মুহূর্তে সর্পকুলে ভরে যেতে পারে এলাকা

বাড়ির আশেপাশে লাগানো কিছু গাছ অজান্তেই সাপকে আকর্ষণ করতে পারে। কোন পাঁচটি গাছ আপনার ঘরের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে, জানুন বিস্তারিত এবং সতর্ক থাকুন।

শীতের বিদায় ঘণ্টা প্রায় বেজে উঠেছে। ধীরে ধীরে প্রকৃতির রঙ বদলাচ্ছে। সকালের কুয়াশা কমছে, রোদ্দুরের তেজ বাড়ছে, বাতাসে বসন্তের উষ্ণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আর এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই প্রকৃতিতে শুরু হয় এক নতুন প্রাণচাঞ্চল্য। গাছপালা নতুন পাতায় ভরে ওঠে, পোকামাকড়ের আনাগোনা বাড়ে, ছোট প্রাণীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু এই পরিবর্তনের আরেকটি দিক আছে, যা অনেকেই গুরুত্ব দিয়ে ভাবেন না। গ্রীষ্মের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয় হয়ে ওঠে বিষাক্ত সর্পকুল।

শীতকালে সাপেরা সাধারণত কম সক্রিয় থাকে। অনেক প্রজাতির সাপ ঠান্ডার কারণে গর্ত, ঝোপঝাড় বা নির্জন স্থানে আশ্রয় নেয় এবং দীর্ঘ সময় বিশ্রামে থাকে। কিন্তু তাপমাত্রা বাড়তেই তারা ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে। ক্ষুধা বাড়ে, শিকার খোঁজার প্রবণতা বাড়ে, আর তখনই মানুষের বসতি এলাকায় তাদের আনাগোনা বাড়তে শুরু করে। গ্রামের পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন এলাকাতেও সাপের দেখা পাওয়া যায়। বাড়ির উঠোন, বাগান, ছাদ, রান্নাঘর, স্টোররুম এমনকি শোবার ঘরেও কখনও কখনও সাপ ঢুকে পড়ার খবর পাওয়া যায়।

অনেকেই মনে করেন, সাপ হঠাৎ করেই বাড়িতে চলে আসে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এতটা আকস্মিক নয়। কিছু কিছু পরিবেশগত কারণ, খাদ্যের উপস্থিতি এবং বিশেষ কিছু উদ্ভিদ বা গাছ সাপকে আকর্ষণ করে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ নিজের অজান্তেই এমন পরিবেশ তৈরি করে দেয়, যা সাপের জন্য আরামদায়ক হয়ে ওঠে। ফলে তারা ধীরে ধীরে বাড়ির আশেপাশে বাসা বাঁধে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু গাছ ও উদ্ভিদ এমন বৈশিষ্ট্যযুক্ত, যেগুলি সাপের জন্য প্রাকৃতিক আশ্রয় ও শিকারের সুযোগ তৈরি করে। এই গাছগুলির ঘন পাতা, ঝোপঝাড়, সুগন্ধ অথবা আশেপাশে পোকামাকড় ও ইঁদুরের উপস্থিতি সাপকে আকর্ষণ করে। তাই বাড়ির বাগান সাজানোর আগে শুধু সৌন্দর্য নয়, নিরাপত্তার দিকটিও গুরুত্ব দিয়ে ভাবা জরুরি।

এবার জানা যাক সেই পাঁচটি গাছ বা পরিবেশগত উপাদান সম্পর্কে, যেগুলি বাড়ির আশেপাশে থাকলে সাপের উপস্থিতির সম্ভাবনা বাড়তে পারে।

প্রথমত, ঘন পাতাযুক্ত ঝোপজাতীয় গাছ।
অনেক বাড়ির বাগানে এমন কিছু গাছ দেখা যায়, যেগুলির পাতা অত্যন্ত ঘন এবং ঝোপালো। বাইরে থেকে দেখতে এগুলি খুব সুন্দর লাগে। বাগানের সৌন্দর্য বাড়ায়, ছায়া দেয়, পরিবেশকে শীতল রাখে। কিন্তু এই ধরনের গাছ সাপের জন্য আদর্শ আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। ঘন পাতার মধ্যে সহজেই লুকিয়ে থাকতে পারে সাপ। বাইরে থেকে কেউ বুঝতেও পারে না যে গাছের ভিতরে কোনও সাপ লুকিয়ে রয়েছে। সাপ সাধারণত শিকারের অপেক্ষায় এমন জায়গাতেই ওত পেতে থাকে। তাই বাড়ির ভিতরে বা খুব কাছাকাছি এই ধরনের ঝোপালো গাছ রাখা নিরাপদ নয়। যদি রাখতেই হয়, তবে নিয়মিত ছাঁটাই করা এবং গাছের ভিতরের অংশ পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত জরুরি।

দ্বিতীয়ত, জুঁই ফুলের গাছ।
জুঁই ফুলের সৌন্দর্য ও সুবাসে মুগ্ধ হন না এমন মানুষ খুব কমই আছে। সন্ধ্যার সময় জুঁই ফুলের মিষ্টি গন্ধ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিবেশকে আরও মনোরম করে তোলে। কিন্তু অনেকের অজানা একটি বিষয় হল, এই তীব্র সুগন্ধ কিছু প্রাণীর কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে পোকামাকড়, ছোট প্রাণী এবং কিছু ক্ষেত্রে সাপের কাছেও। জুঁই গাছের ঘন পাতা সাপের জন্য লুকিয়ে থাকার সুযোগ তৈরি করে। পাশাপাশি এই গাছের আশেপাশে পোকামাকড় ও ছোট প্রাণীর উপস্থিতি বাড়ে, যা সাপের জন্য খাদ্যের উৎস হয়ে ওঠে। ফলে ধীরে ধীরে সাপ ওই এলাকায় আসতে শুরু করে। তাই বাড়ির খুব কাছাকাছি জুঁই গাছ লাগানোর আগে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, লম্বা ও অপরিষ্কার ঘাস।
গ্রামাঞ্চলে বা শহরের ফাঁকা জমিতে প্রায়ই লম্বা লম্বা ঘাস জন্মাতে দেখা যায়। অনেক সময় বাড়ির আশেপাশেও এই ধরনের ঘাস গজিয়ে ওঠে। এই লম্বা ঘাস সাপের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থলগুলির একটি। ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সাপকে সহজে দেখা যায় না। ফলে মানুষ অজান্তেই সাপের খুব কাছাকাছি চলে যায়। এছাড়া লম্বা ঘাসের মধ্যে ইঁদুর, ব্যাঙ, টিকটিকি এবং নানা ধরনের পোকামাকড় বাস করে, যা সাপের প্রধান খাদ্য। তাই যেখানে লম্বা ঘাস থাকে, সেখানে সাপের উপস্থিতির সম্ভাবনাও বেশি থাকে। এজন্য বাড়ির আশেপাশে নিয়মিত ঘাস পরিষ্কার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চতুর্থত, লেবু এবং লেবুজাতীয় ফলের গাছ।
লেবু, কমলা, মাল্টা, বাতাবি লেবু ইত্যাদি ফলের গাছ অনেকের বাড়িতেই দেখা যায়। এই গাছগুলি পাখি ও ইঁদুরদের আকর্ষণ করে। পাখিরা ফল খেতে আসে, ইঁদুরেরা ফল ও বীজের সন্ধানে গাছের আশেপাশে ঘোরাফেরা করে। আর যেখানে ইঁদুর ও ছোট প্রাণী থাকে, সেখানে সাপের উপস্থিতি স্বাভাবিক। কারণ সাপের প্রধান খাদ্যই হল ইঁদুর এবং ছোট প্রাণী। ফলে লেবুজাতীয় গাছের আশেপাশে সাপ প্রায়শই দেখা যায়। যদিও এই গাছগুলি সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়, তবে বাড়ির খুব কাছাকাছি না রেখে কিছুটা দূরে লাগানো এবং আশেপাশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা জরুরি।

news image
আরও খবর

পঞ্চমত, সাইপ্রাস বা ঝোপজাতীয় শোভাময় গাছ।
সাইপ্রাস একটি জনপ্রিয় শোভাময় গাছ। অনেক বাড়ির বাগানে এই গাছ দেখা যায়। এর ঘন ঝোপ, উঁচু আকৃতি এবং সবুজ রঙ বাগানের সৌন্দর্য বাড়ায়। কিন্তু এই গাছের ঘন ঝোপের মধ্যে পাখি, পোকামাকড় এবং ছোট প্রাণীরা বাসা বাঁধে। আর সাপ তাদের শিকার করার জন্য এই ধরনের জায়গা পছন্দ করে। ফলে সাইপ্রাস গাছের আশেপাশে সাপের উপস্থিতির সম্ভাবনা থাকে। তাই বাড়ির খুব কাছাকাছি এই ধরনের গাছ লাগানোর আগে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। সব ক্ষেত্রে যে এই গাছগুলি থাকলেই সাপ আসবে, এমন নয়। কিন্তু এই গাছগুলি সাপের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। তাই ঝুঁকি বাড়ে। সাপ সাধারণত এমন জায়গায় থাকতে পছন্দ করে, যেখানে সহজে লুকিয়ে থাকা যায় এবং খাদ্যের অভাব নেই। যদি বাড়ির আশেপাশে ঘন ঝোপ, লম্বা ঘাস, ইঁদুরের উপদ্রব এবং পোকামাকড়ের আধিক্য থাকে, তবে সাপের উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে।

শুধু গাছ নয়, বাড়ির পরিবেশও সাপ আকর্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাড়ির আশেপাশে আবর্জনা জমে থাকা, পুরনো কাঠ, ইট, টিন, ভাঙা আসবাবপত্র বা নির্মাণ সামগ্রী পড়ে থাকা সাপের জন্য আশ্রয়স্থল তৈরি করে। এছাড়া রান্নাঘরের বর্জ্য, খাদ্যদ্রব্য খোলা জায়গায় রাখা ইঁদুর আকর্ষণ করে। আর ইঁদুর মানেই সাপের জন্য সহজ খাদ্য।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, সাপের উপদ্রব কমাতে হলে শুধু গাছ কাটা নয়, বরং পুরো পরিবেশকে সুশৃঙ্খল রাখা প্রয়োজন। বাড়ির আশেপাশে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, ঝোপঝাড় পরিষ্কার করা, লম্বা ঘাস কাটা, ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ করা এবং অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি।

আরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। সাপ সাধারণত মানুষের ক্ষতি করতে চায় না। তারা ভয় পেলে বা বিপদ অনুভব করলে আক্রমণ করে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ নিজের অজান্তেই সাপের খুব কাছে চলে যায়, ফলে দুর্ঘটনা ঘটে। তাই সাপ দেখা গেলে আতঙ্কিত না হয়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেওয়া উচিত।

গ্রামাঞ্চলে সাপের কামড়ে মৃত্যুর ঘটনা এখনও উদ্বেগজনকভাবে বেশি। প্রতি বছর বর্ষা ও গ্রীষ্মকালে বহু মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় প্রাণহানি ঘটে। তাই সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। বাড়ির পরিবেশ নিরাপদ রাখা, সম্ভাব্য ঝুঁকি কমানো এবং সাপ সম্পর্কে মৌলিক ধারণা রাখা জীবন বাঁচাতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বাগান সাজানোর সময় শুধু সৌন্দর্য নয়, নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে ভাবা প্রয়োজন। কিছু গাছ দেখতে সুন্দর হলেও সেগুলি বাড়ির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই বাগান তৈরির আগে ভালোভাবে চিন্তা করা, প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়া এবং পরিবেশ পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত জরুরি।

আপনার অজান্তেই কি আপনি সাপের জন্য আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করে দিচ্ছেন না তো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা এখনই প্রয়োজন। কারণ সামান্য অসতর্কতা বড় বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

ডিসক্লেইমার
এই প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য সাধারণ জ্ঞান ও বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত। সব ক্ষেত্রে একই ফলাফল পাওয়া যাবে এমন নিশ্চয়তা নেই। সাপ ও উদ্ভিদ সম্পর্কিত বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করা উচিত।

Preview image