গোলাপি বলের অ্যাশেজ টেস্ট নিয়ে এবার আবার সামনে এল একই প্রশ্ন ম্যাচ কি একপেশেই হবে? ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, অস্ট্রেলিয়ার গোলাপি বল টেস্টে অবিশ্বাস্য জয়ের হার এবং মিচেল স্টার্কের দুর্দান্ত দক্ষতা মিলেই ম্যাচটিকে কার্যত একতরফা করে তুলছে। স্টার্ক গোলাপি বলে বিশ্বের অন্যতম মারাত্মক পেসার। তাঁর ইন সুইং, আউট সুইং এবং লেট মুভমেন্ট যে কোনও ব্যাটসম্যানকে বিভ্রান্ত করতে যথেষ্ট। ডে নাইট টেস্টে বাদামি আলো, নতুন কুকাবুরা বল এবং অতিরিক্ত সুইং সবকিছু মিলিয়ে স্টার্ক হয়ে ওঠেন অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। অস্ট্রেলিয়ার পরিসংখ্যানও তাই বলছে। গোলাপি বলের টেস্টে তাদের জয়ের হার বিশ্বের সেরা। অ্যাডিলেড থেকে শুরু করে সিডনি সব মাঠেই অস্ট্রেলিয়া গোলাপি বলের পরীক্ষায় দাপট দেখিয়েছে। ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা এমন কন্ডিশনে বারবার সমস্যায় পড়েছে, যেখানেই স্টার্কের প্রথম স্পেল ম্যাচের গতি নির্ধারণ করে দেয়। ইংল্যান্ড দল এই পরিস্থিতি সামলাতে চাইছে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং দিয়ে, কিন্তু স্টার্কের বিপক্ষে সেটা কতটা সফল হবে তা নিয়ে বড় সন্দেহ থেকে যাচ্ছে। তাই ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডে নাইট অ্যাশেজ টেস্ট আবারও একপেশে হয়ে অস্ট্রেলিয়ার পাশেই ঝুঁকতে পারে।
ভূমিকা: অ্যাশেজ সিরিজ হলো ক্রিকেটীয় শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত যুদ্ধ। কিন্তু এই ঐতিহাসিক দ্বৈরথের একটি নির্দিষ্ট ফরম্যাট যেন ক্রমশ একপেশে হয়ে উঠছে— সেটি হলো গোলাপি বলের ডে-নাইট টেস্ট। এই ফরম্যাটটি মূলত অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব দুর্গ হয়ে উঠেছে, যার প্রধান স্থপতি হলেন বাঁ-হাতি পেসার মিচেল স্টার্ক (Mitchell Starc)। ২০১৫ সালে প্রথম ডে-নাইট টেস্টের পর থেকে অস্ট্রেলিয়া এই ফরম্যাটে মোট ১১টি ম্যাচ খেলেছে এবং জয় পেয়েছে প্রতিটিতেই— কোনো হার নেই! এই অবিশ্বাস্য ১১-০ রেকর্ড কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি ইংল্যান্ডের ওপর ম্যাচের আগেই এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে। বিশ্লেষকদের মতে, গোলাপি বল অ্যাশেজ টেস্টের এই রেকর্ড কার্যত ম্যাচটিকে একতরফা অস্ট্রেলিয়ার দখলে নিয়ে গেছে। স্টার্কের ভয়ংকর দক্ষতা, পিঙ্ক বলের প্রযুক্তিগত রহস্য এবং অস্ট্রেলিয়ান পেস ত্রয়ীর সমন্বয়— এই সবকিছুর কারণে গোলাপি বল অ্যাশেজ টেস্ট কীভাবে ইংল্যান্ডের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা নিয়েই এই বিশদ ও গভীর বিশ্লেষণ।
গোলাপি কুকাবুরা বল, যা ডে-নাইট টেস্টে ব্যবহৃত হয়, তার প্রযুক্তিগত গঠন লাল বলের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং এই পার্থক্যই মিচেল স্টার্কের জন্য এক স্বর্গ তৈরি করে।
ক. লাক্ষার প্রলেপ ও সুইংয়ের স্থায়িত্ব:
পিঙ্ক বলের ওপর লাক্ষার (Lacquer) একটি অতিরিক্ত প্রলেপ দেওয়া হয়, যাতে এটি রাতে উজ্জ্বল আলোয় ভালো দেখা যায়। এই প্রলেপটি বলের সুইংয়ের স্থায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়। লাল বল দ্রুত নরম হয়ে গেলেও, গোলাপি বল তার উজ্জ্বলতা এবং সেলাই (সিম) দীর্ঘ সময় ধরে ধরে রাখে। ফলে, স্টার্কের মতো দক্ষ সুইং বোলাররা অনেক বেশি সময় ধরে বল থেকে লেট মুভমেন্ট আদায় করতে পারেন।
খ. 'টুইলাইট আওয়ার' এবং আলোর পরিবর্তন:
গোলাপি বলের সবচেয়ে মারাত্মক সময় হলো গোধূলি বা 'টুইলাইট আওয়ার'। দিনের আলো থেকে কৃত্রিম ফ্লাডলাইটে আলো পরিবর্তিত হওয়ার সময়, খেলোয়াড়দের চোখ বলের গতিবিধি অনুসরণ করতে মারাত্মকভাবে সংগ্রাম করে। স্টার্ক ঠিক এই সময়েই তার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর স্পেলগুলো করেন। তাঁর ১৪৫+ কিমি গতির ইন-সুইং ইয়র্কার, যখন আলো-ছায়ার মধ্য দিয়ে তীক্ষ্ণ সিম নিয়ে আসে, তখন তা বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যানদের জন্যও দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
গ. স্টার্কের বাঁ-হাতি অ্যাঙ্গেল (Left-arm Angle):
একজন বাঁ-হাতি পেসার হওয়ার কারণে স্টার্কের বল ডান-হাতি ব্যাটসম্যানদের জন্য ভিন্ন অ্যাঙ্গেলে আসে। গোলাপি বলের অতিরিক্ত লেট সুইংয়ের সঙ্গে যখন এই তীক্ষ্ণ অ্যাঙ্গেল যুক্ত হয়, তখন তা ব্যাটসম্যানকে বাধ্য করে শরীরের কাছাকাছি খেলার জন্য, ফলে ইন-সুইং ইয়র্কারে আউট হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। স্টার্কের ইন-সুইং ইয়র্কার এই ফরম্যাটে সম্ভবত আধুনিক ক্রিকেটের সবচেয়ে মারাত্মক ডেলিভারি।
অস্ট্রেলিয়া দল ডে-নাইট টেস্টে ১১টি ম্যাচ খেলে একটিতেও হারেনি— এই রেকর্ডটির গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব রয়েছে।
ক. প্রত্যাশার চাপ:
এই রেকর্ড ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের ওপর এক বিশাল প্রত্যাশার চাপ তৈরি করে। মাঠে নামার আগেই তাদের মনে থাকে যে, তারা এমন একটি ফরম্যাটে খেলছে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ কখনো হারেনি। এই মানসিক ব্লক প্রায়শই ভুলের দিকে চালিত করে।
খ. 'হোম গ্রাউন্ড' সুবিধা:
অস্ট্রেলিয়া মূলত অ্যাডিলেড, পার্থ এবং ব্রিসবেনের মতো নিজেদের ঘরের মাঠে এই টেস্টগুলি আয়োজন করে, যেখানে পিচগুলি তাদের পেসারদের সুবিধার জন্য তৈরি করা হয়। তারা কন্ডিশন এবং পিচের গতি সম্পর্কে এতই অভিজ্ঞ যে, টস জেতার পর তারা ঠিক জানে কখন ব্যাট করতে হবে এবং কখন বোলিং শুরু করতে হবে। এই 'হোম টার্ফ' আধিপত্যই পিঙ্ক বল টেস্টকে একপেশে করে তুলেছে।
ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানরা গোলাপি বলে প্রায়শই ব্যর্থ হয়েছেন। এর প্রধান কারণ, তাদের চিরাচরিত রক্ষণাত্মক কৌশল এই ফরম্যাটে কাজ করে না, আবার নতুন ‘ব্যাজবল’ (Bazball) কৌশল এখানে আরও বিপজ্জনক হতে পারে।
ক. 'টুইলাইট আওয়ারে' পতন:
ইংল্যান্ডের ওপেনাররা গোলাপি বলে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। বিশেষ করে 'টুইলাইট আওয়ার'-এ যখন স্টার্ক, কামিন্স ও হেইজেলউড আক্রমণে আসেন, তখন ইংল্যান্ডের পুরো টপ-অর্ডার ভেঙে পড়ার প্রবণতা দেখা যায়। এই সময়ে রক্ষণাত্মক হওয়া যেমন কঠিন, তেমনি আক্রমণাত্মক হলে উইকেট ছুঁড়ে আসার সম্ভাবনাও বেশি।
খ. 'ব্যাজবল' কৌশল— আত্মঘাতী হতে পারে?:
ইংল্যান্ড এখন আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের 'ব্যাজবল' দর্শন নিয়ে খেলছে। কিন্তু পিঙ্ক বলে স্টার্কের গতি ও সুইংয়ের মুখে আগ্রাসী ব্যাটিং আত্মঘাতী হতে পারে। স্টার্ক জানেন যে ব্যাজবল ব্যাটাররা ঝুঁকি নেবেনই। ফলে তিনি তার ইয়র্কার এবং শর্ট বল দিয়ে আগ্রাসী ব্যাটিংকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবেন। সামান্য একটি ভুল শটও এখানে ম্যাচের গতিপথ নির্ধারণ করে দিতে পারে।
গ. করণীয়: রক্ষণাত্মক আগ্রাসন:
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইংল্যান্ডকে পিঙ্ক বলে একটি নতুন কৌশল নিতে হবে— 'রক্ষণাত্মক আগ্রাসন'। প্রথম ১৫-২০ ওভার ধরে খেলার মানসিকতা, বিশেষ করে স্টার্কের প্রাথমিক স্পেলে। লেট মুভমেন্ট বুঝে খেলা এবং অফ-স্টাম্পের বাইরে শর্ট বলের মোকাবিলা করা হবে মূল চ্যালেঞ্জ।
মিচেল স্টার্ক একাই নয়, প্যাট কামিন্স এবং জোশ হেইজেলউডের সঙ্গে তাঁর সমন্বয় পিঙ্ক বলকে ইংল্যান্ডের জন্য একটি সম্পূর্ণ আক্রমণের রূপ দেয়।
প্যাট কামিন্স (চাপ সৃষ্টিকারী): তাঁর নিখুঁত লাইন-লেংথ, স্কিডি বাউন্স এবং বিরতিহীন চাপ ব্যাটসম্যানকে প্রান্ত থেকে নড়তে দেয় না। স্টার্ক যখন সুইং করছেন, তখন কামিন্স চাপ তৈরি করে উইকেট নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেন।
জোশ হেইজেলউড ('টপ অফ অফ' মাস্টার): গোলাপি বলে তাঁর নিখুঁত সিম পজিশন আরও বেশি মুভমেন্ট তৈরি করে। তিনি আউট-সুইং এবং বাউন্সারে ব্যাটসম্যানদের ভুল করতে বাধ্য করেন।
এই তিনজনের কম্বিনেশন এমন যে, এক প্রান্ত থেকে যদি স্টার্ক সুইং দিয়ে উইকেট নেন, অন্য প্রান্ত থেকে কামিন্স ও হেইজেলউড চাপ ধরে রাখেন। এই পেস ত্রয়ীকে একসঙ্গে সামলানো ইংরেজ ব্যাটিং লাইনের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।
পিঙ্ক বল টেস্টে নাথান লায়নের স্পিন বোলিংয়ের গুরুত্বও বাড়ে।
অন্ধকারে গ্রিপ ও টার্ন: দিনের আলো কমে এলে লায়ন পিচ থেকে অতিরিক্ত গ্রিপ পান, যা তাঁকে কার্যকর করে তোলে। তিনি গোলাপি বলে প্রায় সব টেস্টেই গুরুত্বপূর্ণ ৪-৫ উইকেট নিয়েছেন।
ব্যাটসম্যানদের দুর্বলতা: পেসারদের আক্রমণে কোণঠাসা ব্যাটসম্যানরা যখন স্পিনারকে খেলেন, তখন তাদের রক্ষণাত্মক মানসিকতা লায়নকে আরও বেশি আক্রমণাত্মক হওয়ার সুযোগ দেয়।
এছাড়াও, অস্ট্রেলিয়ার লোয়ার-অর্ডার ব্যাটিং (যেমন প্যাট কামিন্স বা মিচেল স্টার্কের ছোট ক্যামিও) প্রায়শই অস্ট্রেলিয়ার জয়ের ব্যবধান বাড়িয়ে দেয়, যা ইংল্যান্ডের পক্ষে ম্যাচে ফিরে আসা কঠিন করে তোলে।
গোলাপি বলের ডে-নাইট অ্যাশেজ টেস্টের এই একপেশে হওয়ার কারণগুলি স্পষ্ট: মিচেল স্টার্কের মারাত্মক দক্ষতা, গোলাপি বলের প্রযুক্তিগত সুবিধা, অস্ট্রেলিয়ার ১১-০ রেকর্ড-সৃষ্ট মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা এবং পেস ত্রয়ীর নিখুঁত কৌশলগত সমন্বয়।
ইংল্যান্ডের জন্য চ্যালেঞ্জটি শুধু ক্রিকেটীয় নয়, মানসিকও। তারা যদি তাদের পুরনো দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে না পারে এবং স্টার্কের शुरुआती স্পেল সামলাতে ব্যর্থ হয়, তবে এই ম্যাচটিও পূর্বের মতো একতরফা হতে পারে। গোলাপি বল মানেই স্টার্ক, আর স্টার্ক মানেই অ্যাশেজে অস্ট্রেলিয়ার অপ্রতিরোধ্য আধিপত্য— এই সমীকরণ ভাঙতে না পারলে ইংল্যান্ডের অ্যাশেজ স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।
অ্যাশেজ সিরিজ মানেই ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে ঐতিহাসিক, উত্তেজনাপূর্ণ এবং তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার লড়াই। তবে সব ম্যাচ যে সমানে সমান হয়, তা কিন্তু নয়। বিশেষ করে গোলাপি বলের ডে-নাইট অ্যাশেজ টেস্ট অস্ট্রেলিয়ার অধীনেই চলে গেছে বহুদিন ধরে। আর এর প্রধান কারণ একটাই— মিচেল স্টার্কের ভয়ংকর দক্ষতা।
স্টার্ক গোলাপি বল হাতে পেলেই এক অন্য রূপে হাজির হন। অস্ট্রেলিয়ার জয়ের শতাংশও এ ক্ষেত্রে আকাশছোঁয়া। ফলে বিশ্লেষকদের মতে, গোলাপি বল অ্যাশেজ টেস্ট কার্যত একপেশে অস্ট্রেলিয়ার দখলে।
এই প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো কেন স্টার্ক এবং অস্ট্রেলিয়ার পিঙ্ক-বল রেকর্ড ইংল্যান্ডের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, এবং কেন এই টেস্টটি আবারও একতরফা হতে পারে।