এমন এক রূপকথা যেখানে নেই রাজপুত্র আছে দুই রাজকন্যার ভালবাসা। রিয়া আর রাখির সাহসী সিদ্ধান্তে গ্রামের মানুষ আজ সাক্ষী এক নতুন ইতিহাসের। মোবাইলে দেখা গল্প এবার বাস্তবে ফুটে উঠল, আর সেই রূপকথার পরিণতি হ্যাপিলি এভার আফটার
দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক প্রত্যন্ত গ্রাম, রামেশ্বরপুর গাববেড়িয়া। শহরের কোলাহল থেকে বহু দূরে, এই গ্রামটি হঠাৎ করেই সারা দেশের নজরে। কারণ, এখানেই সমাজের বাঁধাধরা নিয়মের গণ্ডি ভেঙে ইতিহাস রচনা করলেন দুই নারী—রাখি নস্কর ও রিয়া সর্দার। রাজপুত্তুরবিহীন এই রূপকথায় রয়েছেন দুই রাজকন্যা, যাঁদের সাহস, ভালবাসা এবং আত্মবিশ্বাস আজ অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।
রিয়া ও রাখি—দু’জনেই পেশায় নৃত্যশিল্পী। জীবনের ছন্দের মতোই তাঁদের সম্পর্কেও এক নরম তান ও এক ঝড়ো তাল মিলেমিশে আছে। তাঁদের পরিচয় এক বান্ধবীর মাধ্যমে, ফোনে। আলাপ ধীরে ধীরে গাঢ় হয়, দেখা হয়, একসঙ্গে নাচের অনুষ্ঠান করতে করতে ভালবাসা পাকাপোক্ত হয়। অবশেষে তাঁরা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমবার বিহারের এক মন্দিরে বিয়ে সারেন তাঁরা, তারপর একসঙ্গে থাকতে শুরু করেন। প্রথমে রাখির বাড়ির পক্ষ থেকে আপত্তি ছিল না, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সমাজের চাপ, লোকের চোখ, এবং পরিবারের অস্বীকৃতি তাঁদের জীবনে ঝড় তোলে।
রিয়ার অভিযোগ, রাখির গ্রামে তাঁদের সম্পর্কের কথা জানাজানি হতেই তাঁদের প্রতি হিংসাত্মক ব্যবহার করা হয়। এক সময় রিয়াকে মারধর পর্যন্ত করা হয়। সেই সময়ই রিয়া নিজের গ্রামে ফিরে আসেন। কিন্তু ভাগ্য এবার যেন অন্য কিছুই লিখে রেখেছিল তাঁদের জন্য। রিয়ার গ্রামের মানুষ তাঁদের গল্পে কৌতূহলী হন, কিন্তু শত্রুতা নয়—দেখান সহমর্মিতা। বিহারের বিয়ের কথা জানার পর গ্রামের মানুষ নিজেরাই আবার আয়োজন করেন রিয়া ও রাখির বিয়ের, গ্রামের মন্দিরে।
মন্দিরের সামনে উলুধ্বনি, আগুন জ্বেলে হোমযজ্ঞ, এবং আশেপাশের মানুষের হাসিমুখ—সব মিলিয়ে এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। গ্রামবাসীরা বলেন, “এমন বিয়ে মোবাইলে দেখেছি, কিন্তু সামনে থেকে এই প্রথম।” শহরে যেখানে ‘প্রাইড প্যারেড’ বা ‘প্রাইড মান্থ’-এর মতো আন্দোলন চলতে থাকে, সেখানে গ্রামের মানুষ নিজেরাই ভালবাসার জয়গান গাইলেন, কোনোরকম দ্বিধা ছাড়াই। যেন মোবাইল থেকেই শিখে নিয়েছে, ভালবাসার কোনো লিঙ্গ হয় না, শুধু হৃদয় লাগে।
সমলিঙ্গের বিবাহ এখনও ভারতে আইনি স্বীকৃতি পায়নি। তবুও এই দুই নারীর বিয়ে সমাজে এক নতুন ভাবনার দিশা দেখাল। এ নিয়ে মত প্রকাশ করেন সমাজকর্মী ও ‘সাফো ফর ইক্যুয়ালিটি’-র মুখপাত্র মীনাক্ষী সান্যাল। তাঁর মতে, শহর বা গ্রাম নয়, আসল বিষয় হল মানসিকতা। “শহরে অনেক সময় তথাকথিত শিক্ষিত সমাজও সংকীর্ণ মানসিকতার হয়। কিন্তু রিয়ার গ্রামের মানুষ সেই সংকীর্ণতা পেরিয়ে গিয়েছেন, তাঁরা ভালবাসাকে মর্যাদা দিয়েছেন,” বলেন মীনাক্ষী।
‘বিয়ে’ শব্দটি নিয়েও আলোচনা ওঠে। কেন সমাজের গণ্ডি ভাঙতে চাওয়া মানুষ আবার ‘বিয়ে’ নামের আরেকটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে আশ্রয় নিলেন? রিয়া ও রাখির মতে, এই বিয়ে তাঁদের কাছে শুধু আচার নয়, একটি প্রতিশ্রুতি—নিরাপত্তার, নিশ্চয়তার। সমাজের চোখে একে অপরের প্রতি অঙ্গীকারের সিলমোহর। যেন বলছে, “এখন কেউ আমাদের আলাদা করতে পারবে না।” আইনি স্বীকৃতি থাক বা না থাক, সমাজের স্বীকৃতি পেয়ে গিয়েছে তাঁদের সম্পর্ক।
এই ঘটনার আরেকটি বিশেষ দিক হল গ্রামের মানুষদের ভূমিকা। তাঁরা প্রমাণ করলেন, গ্রাম মানেই অজ্ঞতা নয়। বরং অনেক সময় সরলতা ও সহানুভূতির জায়গা থেকে উদারতার জন্ম হয়। তাঁদের এই সিদ্ধান্তের মধ্যে লুকিয়ে আছে ভারতের নারী ক্রিকেট দলের জয়ের মতোই এক স্পিরিট—জয়ের চেয়ে বড় কিছু নয়, মানবতার জয়।
এই খবর সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই রিয়া ও রাখি হয়ে ওঠেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এক বামপন্থী নেত্রী তাঁদের কাহিনি পোস্ট করেন, অসংখ্য মানুষ লাইক, শেয়ার ও শুভেচ্ছা জানান। তবুও কিছু কটূ মন্তব্যও আসে—কিন্তু তাতে তাঁদের কণ্ঠ থেমে যায়নি। রিয়া বলেন, “এখন আর পরের কথা ভাবি না। নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়ে সংসার গড়াই আমাদের লক্ষ্য।”
তাঁদের গল্প যেন প্রমাণ করে দিল—ভালবাসা কোনো রূপে আবদ্ধ নয়। তা জন্মায়, বেড়ে ওঠে, এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে যায়। আজ রিয়া ও রাখির বিয়ে শুধু তাঁদের নয়, এটা এক সম্পূর্ণ প্রজন্মের জয়গাথা, যেখানে মানুষের সহমর্মিতা ও প্রেমের শক্তি মিলেমিশে তৈরি করেছে সত্যিকারের এক রূপকথা—যেখানে রাজপুত্তুর নেই, কিন্তু আছে দুই রাজকন্যার হাসি, আশা আর অটুট বন্ধনের জ্যোতি।